thereport24.com
ঢাকা, সোমবার, ১৯ নভেম্বর ২০১৮, ৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৫,  ১০ রবিউল আউয়াল ১৪৪০

লোকে ব্যঙ্গ করে ডাকে পাঞ্জাবির বউ

২০১৪ ডিসেম্বর ১২ ১৮:১০:৫২
লোকে ব্যঙ্গ করে ডাকে পাঞ্জাবির বউ

তমাল ফেরদৌস, মৌলভীবাজার : এলাকার লোকে প্রভা রানী মালাকারকে ব্যঙ্গ করে ডাকে পাঞ্জাবির বউ, আর তার ছেলেকে ডাকে জারজ। এতে তিনি কষ্ট পান না। তবে আপসোস করেন স্বাধীনতার ৪৩ বছরেও বীরাঙ্গনার স্বীকৃতি পাননি।

‘ভাঙা কুঁড়ে ঘরে ছেলে, ছেলের বউ, নাতি-নাতনি নিয়ে বসবাস করি। আমি গ্রামে গ্রামে ফেরি করি আর আমার একমাত্র ছেলে কাজল মালাকার রিকশা চলায়।’ এই কথাগুলো বলতে বলতে কান্নায় ভেঙে পড়েন জেলার কমলগঞ্জের বীরাঙ্গনা ৫৯ বছর বয়সী প্রভা রানী মালাকার।

তিনি জানান, যুদ্ধকালীন সময়ে ষোল বছরের তরুণী তিনি। সঠিক দিন তারিখ মনে না থাকলেও বৈশাখ মাসে তার বিয়ে হয় আর শ্রাবণ মাসে শুরু হয় মুক্তিযুদ্ধ। তখন স্বামী কামিনী রাম মালাকার চলে যান ভারতে। তিন মাসের গৃহবধূ প্রভা আশ্রয় নেন বাবার বাড়ি পার্শ্ববর্তী গ্রাম বিক্রমকলসে। বিক্রমকলস গ্রামের রাজাকার নজির মিয়া ও জহুর মিয়া একদিন প্রভাকে তার মায়ের সামনে থেকে জোর করে তুলে নিয়ে যায় পার্শ্ববর্তী বাদল মাস্টারের বাড়ি। ওই রাতেই বাদল মাস্টারের বাড়িতে পাকিস্তানী সেনারা তাকে ধর্ষণ করে।

পরদিন সকালে আর্মিরা তাকে ছেড়ে দিলে তিনি আশ্রয় নেন বোনের বাড়ি জাঙ্গালহাটি গ্রামে। সেখানে কয়েকদিন আত্মগোপন করে থাকেন। কিন্তু কিছুদিন পর রাজাকার কাদির, রইছ, ইনতাজ, জহুর আবার সন্ধান পেয়ে যায় তার। শত চেষ্টা করেও প্রভা তাদের হাত থেকে নিজেকে বাঁচাতে পারেননি। রাজাকারদের হাত থেকে বাঁচতে ধানের বীজের জমির আইলের নিচে আশ্রয় নেন। কিন্তু শেষ রক্ষা হয়নি। রাজাকাররা প্রভাকে নিয়ে আসে শমশেরনগর ডাক বাংলোয় পাকিস্তানী আর্মিদের ক্যাম্পে। সারারাত পাকিস্তানী আর্মিরা তাকে পর্যায়ক্রমে ধর্ষণ করে। এক সময় জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন। এরপর সবাই চলে গেলে তিনি কোনো রকমে হেঁটে হেঁটে বোনের বাড়িতে আশ্রয় নেন।

প্রভা রানী জানান, দেশ স্বাধীন হওয়ার পর তার স্বামী দেশে ফিরে আসে। তার স্বামী তাকে আনতে গেলে তিনি যেতে রাজি হননি। সবকিছু খুলে বলেন স্বামীর কাছে। উত্তরে স্বামী বলেছিলেন তোমার মতো হাজার হাজার নারী ইজ্জত দিয়েছে দেশের জন্য। তুমি তাদের একজন। আমার কোনো দুঃখ নেই। প্রভা স্বামীর বাড়ি যান। দেশ স্বাধীন হবার এক বছর পর তার ছেলের জন্ম হয়।

তবে সে সময় তাকে ধর্ষণ করা দলের নজির, ইন্তাজ, ইদ্রিছ, রইছ পরবর্তীতে জেল খাটে। জেল থেকে বের হয়ে কমলগঞ্জ উপজেলার শমশেরনগরের ইদ্রিছ মিয়া প্রভা রানীর স্বামীর উপর মিথ্যা মামলা দেয়। যে কারণে তার স্বামীকে জেল খাটতে হয়। কয়েক বছর পর তার স্বামী মারা যায়। স্বামী মারা যাওয়ার পর দু’বেলা খাবারের জন্য প্রভা রানী বেছে নেন গ্রামে গ্রামে ফেরি করার কাজ। নিজের মাথার উপর টুকরি রেখে গ্রামে গ্রামে তিনি বিক্রি করেন সংসারের বিভিন্ন প্রয়োজনীয় সামগ্রী। এক সময় তার ছেলে কাজল মালাকারকে বিয়ে দেন।

কমলগঞ্জ উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের কমান্ডার আব্দুল মুমিন তরপদার দ্য রিপোর্টকে বলেন, ‘সাবেক মুক্তিযোদ্ধা সংসদের কমান্ডারের মাধ্যমে প্রভা রানীর সকল তথ্যাদি সংশ্লিষ্ট দফতরে পাঠানো হয়। বর্তমান মহাজোট সরকার বীরাঙ্গনাদের মুক্তিযোদ্ধা স্বীকৃতি দিয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি রক্ষা, স্বাধীনতা যুদ্ধে বীরাঙ্গনা ও শহীদ পরিবারের যে সকল তথ্য অন্তর্ভুক্ত হয়নি, সে সব তথ্যের জন্য কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। আশাকরি রাষ্ট্রীয়ভাবে প্রভা রানী মালাকার অচিরেই বীরাঙ্গনার স্বীকৃতি পাবেন।’

(দ্য রিপোর্ট/টিএফ/এমসি/এইচ/ডিসেম্বর ১২, ২০১৪)

পাঠকের মতামত:

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ

M

M

SMS Alert

বিশেষ আয়োজন এর সর্বশেষ খবর

বিশেষ আয়োজন - এর সব খবর