thereport24.com
ঢাকা, বুধবার, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ৪ আশ্বিন ১৪২৫,  ৮ মহররম ১৪৪০

৪৩ বছর ধরে শহীদদের আগলে রেখেছেন মুক্তিযোদ্ধা করিম

২০১৪ ডিসেম্বর ১৬ ১৪:৩৬:৫৩
৪৩ বছর ধরে শহীদদের আগলে রেখেছেন মুক্তিযোদ্ধা করিম

এম এ কে জিলানী, দ্য রিপোর্ট : ব্রাক্ষ্মণবাড়িয়ার ‘কসবা উপজেলা’র ‘কোল্লাপাথর’ গ্রামের মুক্তিযোদ্ধা আবদুল করিম। একাত্তর থেকে দীর্ঘ ৪৩ বছর ধরে কোল্লাপাথরে ৫০ জন শহীদ বীর মুক্তিযোদ্ধার সমাধিকে আগলে রেখেছেন। শহীদদের সঙ্গে এতো দীর্ঘ পথ চলায় এতোটুকুও ক্লান্তি নেই আবদুল করিমের।

মুক্তিযোদ্ধা আবদুল করিমের সঙ্গে ব্রাক্ষ্মণবাড়িয়ার ‘কসবা উপজেলা’র ‘কোল্লাপাথর’ গ্রামে আলাপ হয় দ্য রিপোর্টের এই প্রতিনিধির। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে কিন্তু আমিতো স্বাধীন হইনি।’

তার কথা শুনে পিলে চমকে যায়। তার কাছে বিস্তারিত জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘কোল্লাপাথরে মাত্র ৫০ জন শহীদের সমাধি রয়েছে। কিন্তু ব্রাক্ষণবাড়িয়া, কসবা এবং ভারতের আগরতলায় আরও কমপক্ষে এক হাজার শহীদ বীর যোদ্ধার সমাধি রয়েছে। যা এখনো অবহেলা আর অযত্নে পড়ে আছে।’

মুক্তিযোদ্ধা আবদুল করিম বলেন, ‘বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা এই শহীদদের এক জায়গায় আনার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি বহু বছর ধরে। কিন্তু কিছুতেই কিছু হচ্ছে না। মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয় একবার উদ্যোগ নিলেও হঠাৎ কেন যে আবার বন্ধ হয়ে গেছে, জানি না।’

তিনি আরও বলেন, ‘এই শহীদদের এক জায়গায় এনে তাদের প্রাপ্যা মর্যাদা দিতে না পারলে আমি মরে গেলেও শান্তি পাবো না। আমি আমার কাছে স্বাধীন হবো না।’

‘কোল্লাপাথর’ শীর্ষক গ্রন্থে জামাল এ নাসের চৌধুরী মুক্তিযোদ্ধা আবদুল করিম সম্পর্কে লিখেছেন, ‘এলাকার পুরো ইতিহাসের সাক্ষী হচ্ছেন আবদুল করিম। ১৯৭১ সালে কসবা রণাঙ্গনে শহীদ হয়েছেন অসংখ্য মুক্তিযোদ্ধা। তাদের অনেককে দাফন করা হয়েছে এলাকার বিভিন্ন জায়গায়, যাদের কবর চিহ্নিত করা খুবই কষ্টসাধ্য বিষয়। ৫০ জন শহীদের কবর রচিত হয়েছে কোল্লাপাথরের শহীদ স্মৃতিসৌধে। তাদেরকে আজ চিহ্নিত করা সম্ভব হচ্ছে।’

‘কোল্লাপাথর’ শীর্ষক গ্রন্থ থেকে জানা গেছে, ‘মুক্তিযুদ্ধের পুরোটা সময় আবদুল মান্নান, তার স্ত্রী তাজাকুতেন্নেসা, ছেলে আব্দুল করিম আর ছেলের বউ মিলে নিজেদের নিবেদিত রেখেছেন শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের শেষ আশ্রয় রচনায়। আবদুল মান্নান পরম মমতায় নিজের হাতে শহীদদের গোসল করিয়েছেন, এলাকার সকলে মিলে কবর তৈরি করেছেন, তার স্ত্রী, পুত্রবধু মিলে শহীদদের গোসলের জন্য পানি গরম করেছেন। আর শহীদদের পরিচয় যাতে হারিয়ে না যায় সেদিকে পিতাপুত্র মিলে খেয়াল রেখেছেন।’

আরও জানা গেছে, ‘শহীদের সংখ্যা দিন দিন বেড়েছে। বেড়েছে কবরের সংখ্যা। তারা প্রতিটি কবর বাঁশের বেড়া দিয়ে ঘিরে দিয়েছেন। শহীদদের নাম-ঠিকানা যাতে হারিয়ে না যায় এ জন্য তখনই আগরতলা থেকে কিছু নাম কাঠের বাটে, কিছু নাম টিনের পাতে লিখে এনে বেড়ার সঙ্গে টাঙিয়ে দেন। পুরোটা যুদ্ধের সময়েই তারা এই কাজটা যত্নের সঙ্গে করেছেন।’

মুক্তিযোদ্ধা আবদুল করিম দ্য রিপোর্টকে বলেন, ‘একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত এলাকা কসবা। যুদ্ধকালীন এখানে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সঙ্গে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রচণ্ড লড়াই হয়। দুই নম্বর সেক্টরের অধীনে এখানে মুক্তিযোদ্ধারা সংগঠিত হয়ে যুদ্ধ করেন। শহীদ হন অগণিত বীর মুক্তিযোদ্ধা। তখন বিভিন্ন এলাকা থেকে যুদ্ধে নিহত বীর শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের কোল্লাপাথর শহীদ সমাধিস্থলে এনে নিজ হাতে সমাহিত করেছি।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমার বাবা আবদুল মান্নান ৬৫ শতক জায়গা মুক্তিযোদ্ধাদের সমাধির জন্য দান করেন। বাবা, এলাকাবাসী আর আমি মিলে কাঁধে করে শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের এখানে সমাধিস্থ করতাম। ওই সমাধিস্থলই এখন ভ্রমণ পিপাসু মুক্তিযুদ্ধপ্রেমী প্রজন্মের কাছে অহংকার হয়ে উঠেছে। ৪৩ বছর ধরে আমিই সেটি রক্ষণাবেক্ষণ করছি। সকাল-বিকেল পরিচর্যা করছি। যারা এখানে আসেন তাদেরকে মুক্তিযুদ্ধের গল্প শোনাই।’

(দ্য রিপোর্ট/জেআইএল/এইচএসএম/ডিসেম্বর ১৬, ২০১৪)

পাঠকের মতামত:

SMS Alert

বিশেষ আয়োজন এর সর্বশেষ খবর

বিশেষ আয়োজন - এর সব খবর



রে