thereport24.com
ঢাকা, শনিবার, ১৭ নভেম্বর ২০১৮, ৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৫,  ৮ রবিউল আউয়াল ১৪৪০
মুহম্মদ আকবর

দ্য রিপোর্ট

‘পরে জানতে পারি আমার স্বামীরে ওরা মাইরা ফেলছে’

২০১৪ ডিসেম্বর ১৮ ১৮:৩৫:১৮
‘পরে জানতে পারি আমার স্বামীরে ওরা মাইরা ফেলছে’

১৯৭১ সাল। স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধ চলছে। সাধারণ মানুষের ওপর নেমে এসেছে নির্মম নির্যাতন। পাকিস্তানী সেনারা গ্রামে ঢুকে মানুষ হত্যা করছে, গ্রাম জ্বালিয়ে দিচ্ছে। ৭১ এর কোনো এক রাতে সিরাজগঞ্জের কোলগলা গ্রামও লণ্ডভণ্ড করে দেয় পাকিস্তানী সেনারা। সম্ভ্রম লুটে নেয় ওই গ্রামের সুরাইয়া বেগমের।

ভয়াবহ সেই দিনগুলোর কথা উঠতেই দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বীরাঙ্গনা সুরাইয়া বেগম বলেন, ‘খেয়ে না খেয়ে থাকি সেখানে আপত্তি নেই। আপত্তি একটাই- আজও অপবাদ থেকে নিজেকে মুক্ত করতে পারিনি।’

তিনি বলেন, ‘যতই বিপদ আসুক না কেন যুদ্ধ শুরু হলে মা কি তার সন্তানকে ফেলে যেতে পারে? পারে না। আমিও পারিনি। ভয়ঙ্কর ওই পরিস্থিতিতে তিন সন্তানকে আগলে রাখার চেষ্টা করলাম। কিন্তু শেষ পর্যন্ত যা হবার নয়, তাই হল। সন্তানদের আমার বুক থেকে ছুঁড়ে ফেলে ঘরের ভেতর আমার সম্ভ্রম কেড়ে নেয় পাকিস্তানী হানাদাররা। আর আমি সন্তানের সামনে বিবস্ত্র হয়ে পড়ে থাকলাম। অবুঝ সন্তানেরা আমার গলা জড়িয়ে কাঁদতে শুরু করল। আমি ভেবে পাচ্ছিলাম না তখন ওদের কী বলা উচিৎ।’

সুরাইয়া বেগমের জন্ম সিরাজগঞ্জের কোলগলা গ্রামে। স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় তার বয়স ২২ বছর। তিন সন্তান আর কোর্টে (মহুরী) চাকরিরত স্বামীকে নিয়ে বেশ ভালই কাটছিল তার দিন। কিন্তু পাকিস্তানী হানাদাররা তার সবকিছু উলোট পালোট করে দেয়। ছন্দপতন হয় তার জীবনের। স্ত্রীর এমন সংবাদ শোনার পর স্বামী শামসুল আলম বাড়িতে আসার জন্য ছুটি চাইলে নাকচ করে দেন কোর্ট কর্তৃপক্ষ। এক সময় অনেক কৌশলে তিনি বাড়িতে আসেন। স্ত্রীর সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করেন। কিন্তু সুরাইয়া মুখ ঢেকে বসে থাকেন। স্বামী তাকে বোঝান, যা হয়েছে এটা দুর্ঘটনা ছাড়া আর কিছু না। সবকিছু ভুলে যখন আবার স্বাভাবিক জীবন গড়ার কথা ভাবতে শুরু করেন ঠিক তখনই রাজাকারদের সহায়তায় দ্বিতীয় দফা তার ওপর অত্যাচার চালায় পাকিস্তানী সেনারা।

সুরাইয়া বেগম বলেন, ‘আমার স্বামী কাজ করছিল বাড়ির সামনে। আমি আমার মেয়েকে নিয়ে ঘুমাচ্ছিলাম। যখন ওরা (পাকিস্তানী সেনারা) আমার ঘরে দ্বিতীয়বারের মতো হামলা করে তখন আমাকে বাঁচানোর জন্য এগিয়ে আসে আমার স্বামী। এ সময় রাজাকাররা ওর মাথায় বন্দুক ধরে। আমি অসহায় মানুষের মতো আবার নিজেকে সঁপে দিলাম অন্ধকারে। এরপর আমি জ্ঞান হারিয়ে পড়ে থাকি। পরে জানতে পারি আমার স্বামীরে ওরা মাইরা ফেলছে।’

তিনি বলেন, ‘নিজেকে সামলে নিয়ে শুধুমাত্র সন্তানদের দিকে তাকিয়ে বেঁচে আছি। কারণ আমি না থাকলে কে ওদের দেখবে। এই ভেবে এতটা বছর পার করে দিয়েছি।’

স্বাধীনতা যুদ্ধের পরে তিনি সহায়তা পেতেন নির্যাতিত নারী আশ্রয়কেন্দ্র থেকে। তিনি জানান, সেখানে সকল বীরাঙ্গনার থাকা খাওয়ার ব্যবস্থা ছিল। সবকিছু ভুলে যাতে নতুন করে জীবন শুরু করা যায় সে জন্য বিভিন্ন ধরনের কাজের প্রশিক্ষণ দেওয়া হতো। বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর বীরাঙ্গনাদের আবাস স্থল জালিয়ে দেওয়া হয়। বন্ধ হয়ে যায় সাহায্য।

মা-বোনদের সম্ভ্রমহানির মধ্য দিয়ে অর্জিত হয়েছে স্বাধীনতা। মুক্তিযোদ্ধাদের নানাভাবে রাষ্ট্রীয় সাহায্য-সহযোগিতা ও পৃষ্ঠপোষকতা করা হলেও বীরাঙ্গনারা সবকিছু থেকে বঞ্চিত। তাদের পাশে সেভাবে কেউ দাঁড়ায়নি। দুঃখ-দুর্দশায় জর্জরিত বীরাঙ্গনাদের মাঝে এ নিয়ে রয়েছে ক্ষোভ।

(দ্য রিপোর্ট/এমএ/এমসি/এনআই/ডিসেম্বর ১৮, ২০১৪)

পাঠকের মতামত:

SMS Alert

বিশেষ আয়োজন এর সর্বশেষ খবর

বিশেষ আয়োজন - এর সব খবর