thereport24.com
ঢাকা, শুক্রবার, ১৬ নভেম্বর ২০১৮, ২ অগ্রহায়ণ ১৪২৫,  ৭ রবিউল আউয়াল ১৪৪০

‘সব রাজাকারের ফাঁসি হলে শান্তি পেতাম’

২০১৪ ডিসেম্বর ১৯ ১৬:৪০:২২
‘সব রাজাকারের ফাঁসি হলে শান্তি পেতাম’

বিধান সরকার, বরিশাল : সাংবাদিক পরিচয় পেয়ে প্রথমে কথা বলতে চাননি বিভা রাণী (৬২)। স্পষ্ট জবাব দিলেন, ‘কথা বলে কি হবে, কথা বলে কোনো লাভ নেই।’ এবার কিছুটা বোঝানোর পর বিভা রাণী রাজি হলেন। বলতে থাকেন তার জীবন সংগ্রামের নানা কথা—

একাত্তরে পাশবিক নির্যাতনের পর বিয়ে হয়েছিল বিভা রাণীর। স্বামী নকুল কুমার যুদ্ধকালীন ঘটনা জানার পরে বিভা রাণীকে ত্যাগ করেন। স্ত্রী-সংসার ফেলে স্বামী চলে যান ভারতে।

স্বাধীনতার কয়েক বছর পর মারা যান বিভা রাণীর বাবা। বিভার জীবন সংগ্রাম আরও কঠিন হয়ে পড়ে এবার। পরিবারের বড় হওয়ায় মা, চার বোন আর এক ভাইয়ের দায়িত্ব পড়ে তার কাঁধে।

সেই সংগ্রাম এখনও চলছে তার। প্রতিবন্ধী ছেলেকে নিয়ে দুইবেলা দুইমুঠো খাবার যোগাড় করা বিভার জন্য যেন এখন বড় চ্যালেঞ্জ।

স্বামী, সংসার, ব্যক্তি কিংবা রাষ্ট্র কারও সহায়তা না পেলেও নিয়তি মেনে নিয়ে বেঁচে থাকার অবিরাম সংগ্রাম করে যাচ্ছেন বরিশালের গৌরনদী উপজেলার টরকীর চর গ্রামের এই বীরাঙ্গনা।

দ্য রিপোর্টের সঙ্গে আলাপকালে বিভা রাণী তুলে ধরেন একাত্তরে তার জীবনে ঘটে যাওয়া পাশবিতার কথা।

পাকিস্তানী বাহিনী আসবে এ খবর পেয়ে ১৮ বছরের বিভা রাণী আত্মগোপন করেন পাশের চর আইরকান্দি গ্রামের বীরেন্দ্র মজুমদারের বাড়িতে। সেখানে পালিয়েও শেষ রক্ষা হয়নি তার। পাকসেনাদের সহযোগী স্থানীয় রাজাকার আইয়ুব আলী ব্যাপারীর নেতৃত্বে ৭/৮ জন রাজাকার-আলবদর মিলে তার ওপর চালায় পাশবিক নির্যাতন।

দেশ স্বাধীনের পর গৌরনদী উপজেলার টরকীর চর গ্রামের বৃন্দাবন মজুমদারের ছেলে নকুল মজুমদারের সঙ্গে বিয়ে হয় বিভা রাণীর। একাত্তরের ঘটনা জানার পরেই স্বামীর সঙ্গে কলহ শুরু হয় বিভার। ১৯৭২ সালের শেষ দিকে স্বামী নকুল মজুমদার তাকে রেখে ভারতে পালিয়ে যান।

স্বামী ফিরে না আসায় ১৯৭৪ সালে ভারতের উত্তরপ্রদেশে যান স্বামীর খোঁজে। ভারতে গিয়ে গৃহকর্মীর কাজ নেন পাশাপাশি স্বামীর সন্ধান করতে থাকেন। একপর্যায়ে স্বামীর দেখা মিললেও তাকে দেশে আনতে পারেননি বিভা রানী। অবশেষে ফিরে আসেন বাবার বাড়ি। অনেক কটু কথা আর টিপ্পনি মুখ বুঝে সহ্য করে বিভা রাণী সেলাই কাজের প্রশিক্ষণ নেন।

১৯৭৮ সালে তার বাবা রমেশ মণ্ডল মারা যাওয়ার পর চারদিকে আঁধার নেমে আসে । সবার বড় হওয়ায় মা, চার বোন ও এক ভাইয়ের সংসারের দায়িত্ব পড়ে বিভা রাণীর কাঁধে। এ জন্য কখনও রাজমিস্ত্রির সহযোগী কিংবা জমিতে দিনমজুরের কাজ করতে হয়েছে তাকে।

১৯৮৮ সালের দিকে স্বামী নকুল মজুমদার দেশে ফেরেন। তবে তা আর বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। কয়েক মাস থেকে ফের ভারতে পাড়ি জমান নকুল। শুনেছেন সেখানে গিয়ে দ্বিতীয় বিয়েও করেছেন স্বামী। পরবর্তী সময়ে বিভার গর্ভে জন্ম নেয় বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী সন্তান সাগর।

জীবিকার তাগিদে এখনও সেলাই কাজ করেন বিভা রাণী। প্রতিবন্ধী ছেলে সাগরকে নিয়ে কোনোমতে চালিয়ে যাচ্ছেন সংসার। তবে বয়সের পাল্লা ভারি হওয়ায় ঠিকমত কাজ করতে পারছেন না তিনি। চিকিৎসা করাতেও পারছেন না সন্তান সাগরের।

এ অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য সরকারের দেওয়া বীরাঙ্গনাদের স্বীকৃতির ঘোষণা পেয়ে সম্প্রতি তিনি অনলাইনে আবেদন করেছেন বলে জানান।

তবে ৪৪ বছর আগে তার জীবনে ঘটে যাওয়া দুর্ঘটনার জন্য ঘৃণা-ক্ষোভ রয়েছে যথেষ্ট। দীর্ঘ বছর পর হলেও যুদ্ধাপরাধীদের বিচার শুরু হওয়ায় বিভা রাণী আশাবাদী যে, এবার নিশ্চয় ঘাতকদের যথাযথ বিচার সম্ভব হবে।

তিনি বলেন, ‘রাজাকারদের বিচার হচ্ছে জেনে খুশি হয়েছি। তবে সব রাজাকারের ফাঁসি হলে শান্তি পেতাম।’

(দ্য রিপোর্ট/বিএস/একে/এনআই/ডিসেম্বর ১৯, ২০১৪)

পাঠকের মতামত:

SMS Alert

জেলার খবর এর সর্বশেষ খবর

জেলার খবর - এর সব খবর