thereport24.com
ঢাকা, শুক্রবার, ১৬ নভেম্বর ২০১৮, ১ অগ্রহায়ণ ১৪২৫,  ৭ রবিউল আউয়াল ১৪৪০

বীরাঙ্গনাদের আশ্রিতা স্বর্ণলতা ফলিয়া

২০১৪ ডিসেম্বর ২৪ ০২:৩২:৫৭
বীরাঙ্গনাদের আশ্রিতা স্বর্ণলতা ফলিয়া

মুহম্মদ আকবর, দ্য রিপোর্ট : স্বর্ণলতা ফলিয়া একজন মুক্তিযোদ্ধা এবং বীরাঙ্গনাদের সংগঠক। ৮ নম্বর সেক্টরের এই মুক্তিযোদ্ধা হেমায়েত বাহিনীর অধীনে মুক্তিযুদ্ধ করেছেন। নারিকেলবাড়ি ক্যাম্প থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে মহিলা মুক্তিযোদ্ধা সংগ্রহের পাশাপাশি নিজেও অনেক সশস্ত্রযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। স্বাধীনতাপরবর্তী সময়ে কাজ করেছেন বীরাঙ্গনাদের সংগঠিত এবং পুনর্বাসনের কাজে। যেদিন বঙ্গবন্ধু বীরাঙ্গনাদের পুনর্বাসনের কার্যক্রম শুরু করেন, সেদিন থেকে কাজটি শুরু করেছিলেন। পরবর্তী সময়ে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের ৩৬ জন বীরাঙ্গনাকে একত্রিত করে তাদের চিকিৎসা, চাকরি এবং অধিকার আদায়ের উদ্দেশ্যে নিজেকে নিয়োজিত রেখেছেন স্বর্ণলতা।

স্বর্ণলতা ফলিয়া ১৯৫৪ সালের ৬ অক্টোবর গোপালগঞ্জ জেলার কোটালীপাড়া উপজেলার সোনাইলবাড়ি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। বাবা নিশিকান্ত ফলিয়া কৃষক এবং মা মারিয়া ফলিয়া গৃহিণী ছিলেন। ৭ ভাই-বোনের মধ্যে তিনি পঞ্চম। কোটালীপাড়া উপজেলার নারিকেলবাড়ি মিশনারি স্কুলে নবম শ্রেণী পর্যন্ত পড়ালেখা করেন তিনি।

তৃতীয় শ্রেণীতে পড়ার সময় বাবাকে হারানোর কারণে মায়ের কাছে একটু বেশী আদরে বড় হয়েছেন। তাই স্বর্ণলতার চঞ্চলতা স্বাভাবিকের চেয়ে একটু বেশীই ছিল। হাডুডু, হাঁড়ি ভাঙা, নৌকাবাইচ, ফুটবল থেকে শুরু করে সব ধরনের ছেলেদের খেলাতেই অংশগ্রহণ করতেন। স্কুলের ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় নিয়মিত অংশগ্রহণ করে পুরস্কার পেলেও সবচেয়ে বেশী ভালবাসতেন যেমন খুশী তেমন সাজো অনুষ্ঠানে।

স্বর্ণলতা ফলিয়া দ্য রিপোর্টকে জানান, একবার মুচি সেজে স্কুলের ব্রাদার এবং সিস্টারদের জুতা পরিষ্কার করে ৭৫ টাকা পেয়েছিলেন। সেই টাকা দিয়ে বন্ধুরা মিলে বনভোজনের আয়োজন করেন। এ ছাড়াও শীতের সময় বন্ধুরা মিলে আশপাশের বাড়ি থেকে লাউ, মানকচু এবং মিষ্টি কুমড়ার মতো বিভিন্ন ধরনের সবজি চুরি করে এনে বনভোজন করতেন। এ সব স্মৃতি এখনো তাকে আনন্দ দেয়। মুক্তিযুদ্ধের সময় মাত্র অষ্টম শ্রেণী থেকে নবম শ্রেণীতে উঠেছেন। স্কুলে ভর্তি হলেও যুদ্ধের জন্য ওই বছর ক্লাস হতো না। স্কুল ছুটির পর একদিন বন্ধুরা মিলে মাঠে খেলছিলেন। সে সময় আশালতা বৈদ্য এসে তাদের বলেন, ‘দেশে যুদ্ধ শুরু হবে, আমি তো যুদ্ধ করব। তোরা কে কে আমার সঙ্গে যুদ্ধে যাবি।’ এ কথা শুনে স্বর্ণলতা রাজি হয়ে যান। যুদ্ধের ট্রেনিং নেওয়ার আগে বন্ধুরা মিলে এলাকায় ঘুরতেন আর মহিলা মুক্তিযোদ্ধা জোগাড় করতেন। সুযোগ পেলেই বন্ধুদের সঙ্গে ‘মা-বোনেরা অস্ত্র ধরো, স্বাধীন বাংলা রক্ষা করো’ স্লোগান দিতেন।

স্বর্ণলতা ফলিয়ার ভাষ্য, ‘এভাবে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়ে গেলে গ্রামের হিন্দু পরিবারকে আশ্রয় দেওয়ার পাশাপাশি তাদের মালপত্র সংরক্ষণের জন্য সাহায্য করতে থাকি। পরবর্তী সময়ে আমরা ৩০ জন মিলে হেমায়েতবাহিনীর সঙ্গে অস্ত্র চালানোর প্রশিক্ষণ গ্রহণ করি। যুদ্ধ চলাকালীন বেশ কয়েকটি যুদ্ধে অংশগ্রহণ করলেও দুটি অপারেশন ছিল উল্লেখযোগ্য, যার মাঝে একটি যুদ্ধে পাকবাহিনীর বেশ কয়েকটি লঞ্চ ডুবিয়ে দিয়েছিলাম। আর একটি অপারেশন করেছিলাম নদীতে। সে যুদ্ধে আমার পাশে দু’জন মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হওয়ার পাশাপাশি বীরবিক্রম হেমায়েতউদ্দিনের গালে গুলি লেগেছিল। অল্পের জন্য সেদিন প্রাণে বেঁচে গেলেও আমার একটি আঙ্গুল ভাঙার পাশাপাশি শারীরিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হই।’

স্বাধীনতাপরবর্তী সময়ে তার কার্যক্রম সম্পর্কে তিনি জানান, স্বাধীনতাপরবর্তী সময়ে খাদ্যাভাবে চলে এসেছিলেন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পাশে। এই এলাকাতেই খাওয়ার জন্য ঘোরাঘুরি করতেন। বঙ্গবন্ধু যখন বীরাঙ্গনাদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করেন, তখন তিনি রাস্তা থেকে বিভিন্ন বীরাঙ্গনাকে নিয়ে ঢাকা এবং নারায়ণগঞ্জের পুনর্বাসন কেন্দ্রে দিয়ে আসতেন। এভাবে অনেক বীরাঙ্গনার সঙ্গে তার পরিচয় হয়। পরবর্তী সময়ে যখন পুনর্বাসন কেন্দ্র থেকে আবার সব বীরাঙ্গনা বের হয়ে যান, তখন তিনি তাদের সংগঠিত করার পাশাপাশি চাকরি দেওয়া, চিকিৎসাসহ অধিকার আদায়ের জন্য কাজ করেছেন। বিভিন্ন অফিস-আদালত এবং মন্ত্রণালয়ে ঘোরাঘুরি করেছেন চাকরি দেওয়ার জন্য।

এমনি একদিন মগবাজার এলাকা দিয়ে যাওয়ার সময় ৪ থেকে ৫ জন মহিলার কান্না শুনতে পান। সে সময় তার কাছে ছিল দেড় টাকা। এই টাকা দিয়ে দুটি রিকশা ভাড়া করে সেই মহিলাদের ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান। হাসপাতালে গিয়ে দেখেন সেখানে আরো অনেক বীরাঙ্গনা রয়েছেন। বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে দেখা করেও তিনি বীরাঙ্গনাদের সাহায্যের দাবি তুলে ধরেছিলেন।

অন্যের কষ্টকে যিনি নিজের কষ্ট মনে করে তাদের পাশে দাঁড়িয়েছেন, চাকরি দিয়েছেন, আবাসনের ব্যবস্থা করেছেন; বীরাঙ্গনাদের সেই পরম সতীর্থ মুক্তিযোদ্ধা স্বর্ণলতা ফলিয়া নিজের সুখ-আহ্লাদ উপক্ষো করে বাস করছেন তেজগাঁও বস্তিতে।

(দ্য রিপোর্ট/এমএ/এপি/এজেড/ডিসেম্বর ২৪, ২০১৪)

পাঠকের মতামত:

SMS Alert

বিশেষ আয়োজন এর সর্বশেষ খবর

বিশেষ আয়োজন - এর সব খবর