thereport24.com
ঢাকা, রবিবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ৭ আশ্বিন ১৪২৫,  ১২ মহররম ১৪৪০

কেন ৮ ই ফাল্গুনের স্থানে ২১ শে ফেব্রুয়ারি?

২০১৫ ফেব্রুয়ারি ২১ ০৩:৪০:২০
কেন ৮ ই ফাল্গুনের স্থানে ২১ শে ফেব্রুয়ারি?

কাজী জামশেদ নাজিম

‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারী, আমি কি ভুলিতে পারি।’ না আমরা ভুলিনি, ভুলব না। লাল-সবুজের পতাকার সঙ্গে দেশের প্রতিটি প্রান্তের বাতাসের মতো প্রবাহমান থাকবেন তাঁরা। শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ রাখা হবে তাঁদের— যাঁরা মাতৃভাষার জন্য রক্ত দিয়েছেন, জীবন দিয়েছেন।

সাংবাদিকতা অন্যান্য পেশার থেকে ব্যতিক্রমী। ফলে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই কলমসৈনিকদের সহধর্মিণীরা বঞ্চিত। বঞ্চিত তারা তাদের স্বামীর স্মৃতির খাতার গল্প থেকেও। এরপর অপরাধ বিষয়ক প্রতিবেদক হলে তো কথাই নেই। তাদের সঙ্গীর দেখা মিলবে কমপক্ষে রাত ১১টায়। তার মধ্যে আমিও একজন।

শুক্রবার আমার সাপ্তাহিক ছুটির দিন। বাসা থেকে বের হওয়ার সময় বউয়ের আবদার, ‘আজ রাতে একটু আগে এসো। আমার শরীরটা ভাল যাচ্ছে না।’ বউয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে তাকে না করতে পারলাম না। তাকে বললাম, ‘আজ শহীদ মিনারে যাব। প্রথম প্রহরে ফুল দেব। বাসায় ফিরতে বেশ রাত হবে যে...।’

সে কিছুক্ষণ চুপ থেকে মৃদু স্বরে বলে, ‘শহীদ মিনারে আমরা যেতাম সকালে। পায়ে জুতা থাকত না। তুমি কি জুতা পরে শহীদ মিনারে যাবে?’ আমার বউ গ্রামের মেয়ে। তার ঢাকায় অবস্থানের বয়স বছর দুই। গত ফেব্রুয়ারিতে সে গ্রামের বাড়ি কাটিয়েছিল।

ভাষা আন্দোলন নিয়ে আমার যতটুকু মনে পড়ে— রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবীতে ১৯৫২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে দেশ ছিল উত্তাল। একুশে ফেব্রুয়ারি পুলিশ ভাষা আন্দোলনকারী ছাত্রদের মিছিলে গুলি চালায়। এতে সালাম, বরকত, রফিক, জব্বার, শফিক শহীদ হন। সে সময় ঢাকা কলেজের ছাত্র আব্দুল গাফফার চৌধুরী ঢাকা মেডিকেলে আহতদের দেখতে যান। ঢাকা মেডিকেলের আউটডোরে তিনি মাথার খুলি উড়ে যাওয়া একটি লাশ দেখতে পান। সেটি ছিল ভাষা সংগ্রামী রফিকের লাশ। এই লাশ দেখে সাংবাদিক ও লেখক আব্দুল গাফফার চৌধুরী ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারী, আমি কি ভুলিতে পারি’ শিরোনামে একটি গানটি রচনা করেন। প্রতি বছর ২১শে ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশের সব অঞ্চল থেকে ভাষা শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে শত শত মানুষ এই গান গেয়ে শহীদ মিনার অভিমুখে খালি পায়ে হেঁটে যান।

মগবাজারের বাসা থেকে বের হলাম। গন্তব্য ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি (ডিআরইউ)। ছুটির দিনেও রাস্তায় যানজট লেগে আছে। রিকশায় বসে আছি। মাথায় অগোছাল ভাবনা ঘুরপাক খাচ্ছে। সঙ্গেই স্কুল জীবনের ডায়েরির অদৃশ্য পাতাগুলো যেন সামনে ভেসে উঠছে...

জীবন চলতে চলতে প্রাথমিক বিদ্যালয় সমাপ্তি টেনে বাড়ির পাশেই গোহালা টিসিএএল উচ্চ বিদ্যালয়ে পা রেখেছি। স্কুলে যেতে না যেতেই ফেব্রুয়ারি মাস চলে আসে। শুরু হয় একুশে ফেব্রুয়ারির প্রস্তুতি। তখন আমার বয়স আর কিই হবে। পাপ, পুণ্য কিংবা ইবাদতের হিসেব কতটুকুই বা বুঝতাম। ফুল সংগ্রহ করতে হবে। শহীদ মিনারে ফুল দিতে হবে এটাই ছিল ধ্যান ও জ্ঞান। আর ফুল সংগ্রহ করার ‘প্রধান উপায়’ চুরি! পাশের ইউনিয়ন জলিরপাড়। হিন্দু অধ্যুষিত এলাকায় ফুলের ছড়াছড়ি।

একটি ঘটনা দাগ কেটে আছে। তখন অষ্টম শ্রেণীর ছাত্র। আমার সঙ্গে ছিল আমাদের পাড়ার ছেলে ঝুমন, রাফিজুল ও রইচ। আমাদের পরিকল্পনা— আমরা সব থেকে বেশী ফুল দিয়ে শহীদ মিনারটা সাজাব। বামনডাঙ্গা কিংবা গোহালা গ্রামের শিক্ষার্থীদের চেয়ে বেশী ফুল দিয়ে আমরা প্রথম স্থানে যেতে চাওয়া যাকে বলে। যে কথা, সেই কাজ। ২১ ফেব্রুয়ারি রাত ৯টায়। গ্রামের তেলের বাতির নিভু নিভু আলো। জলিরপাড়বাসী প্রায় ঘুমিয়ে। দু’-একটি ঘরে আলো জ্বলছে। জলিরপাড় আশ্রমের ফুলের বাগানে ঢুকেছি। ফুল ছিড়ছি আর ব্যাগে ভরছি। হঠাৎ দেখি, আমাদের সামনে যেন কারা বসে আছে। ওদের দেখেই দিলাম দৌড়। দৌড়ে রাস্তায় গিয়ে হাফ ছাড়লাম। পিছনে ফিরে দেখি— ওরাও দলে ৪/৫ জন। ওরাও দৌড়াচ্ছে। পরে আমরা বুঝতে পারলাম ওরাও ফুল চুরি করতে এসেছিল...

ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি কাছে আসতে আসতে যেন সামনে ভেসে উঠল প্রয়াত শিক্ষাগুরু আমাদের স্কুলের প্রধান শিক্ষক আব্দুস সালাম বিশ্বাস! তিনি স্কুলের পাশেই সপরিবারের বসবাস করতেন। শিশিরে ভেজা ঘাস পারিয়ে তিনি আসতেন শহীদ মিনারে। তার সঙ্গে শত শত শিক্ষার্থী ফুলের ডালা নিয়ে শহীদ মিনারে যেতাম। ভাষা শহীদদের ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানাতাম। শহীদের আত্মা কষ্ট না পায় এ জন্যই খালি পায়ে হাঁটা। ফলে পায়ে জুতা দেওয়াটা পাপ ছিল। খালি পায়ে দীর্ঘপথ ধীরে ধীরে হাঁটতাম। হাঁটার মধ্যে যেন শব্দ না হয়। —এমন ধারণা ও শ্রদ্ধা নিয়েই ছিল জীবন চলা...

ডিআরইউর বাগানে সাংবাদিকদের আড্ডা হয় দুপুরে। বিকেলে কেউ নেই। বাগানে বসে একা একা ভাবছিলাম— সে দিন ছিল ১৩৫৮ সালের ৮ই ফাল্গুন। এ দেশের একদল যুবক ভাষার জন্য জীবন দেয়। তাদের ভাষার নাম বাংলা। অথচ এ জাতি তাঁদের স্মরণ করে ইংরেজি তারিখে। ৮ই ফাল্গুন নয়, রাষ্ট্রীয়ভাবে পালিত হয় ২১শে ফেব্রুয়ারি! বর্তমানে যা আন্তর্জাতিক মাতৃভাষার স্বীকৃতিও পেয়েছে। পেলে কি হবে! ভাষা সংগ্রামীদের আত্মা কি এই জাতীয় তামাশায়— লজ্জা ও অপমানে ডুকরে কাঁদে না? অবশ্যই কাঁদে। তাঁদের যে আজ প্রতিবাদের কোনো সুযোগ ও ক্ষমতা নেই।

এটা কি এভাবে চলতেই থাকবে?

লেখক : সাংবাদিক

পাঠকের মতামত:

SMS Alert

সাহিত্য এর সর্বশেষ খবর

সাহিত্য - এর সব খবর



রে