thereport24.com
ঢাকা, শুক্রবার, ১৬ নভেম্বর ২০১৮, ১ অগ্রহায়ণ ১৪২৫,  ৭ রবিউল আউয়াল ১৪৪০

রাঙাবিবি ও ক্যাপ্টেন

২০১৫ মার্চ ২৫ ২১:২৬:৩০
রাঙাবিবি ও ক্যাপ্টেন

কাফি কামাল

প্রতিদিন সকালে একদল অপেক্ষারত মানুষের আড্ডা জমে ওঠে ডিএফপি’র ক্যান্টিনে। কারও মেয়ে, কারও বা নাতনি; আশপাশের বালিকা বিদ্যালয়গুলোর প্রভাতী শাখার প্রাথমিকের ছাত্রী। বাচ্চাদের স্কুল ছুটি না হওয়া পর্যন্ত বেইলি রোডের ফুটপাত কিংবা পাশের রেস্টুরেন্টগুলোতে আড্ডা দিয়ে সময় কাটান তারা। ডিএফপি’র ক্যান্টিনে তেমন একটি আড্ডায় আমিও মাঝে-মধ্যে যাই। ব্যক্তিগত চর্চা, নেতা-অতিনেতাদের নিয়ে সমালোচনা আর বিচিত্র সব গাল-গল্প হয় সেখানে। চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে শোনা হয় সেগুলো। অবশ্য বেশির ভাগই এ-কান দিয়ে ঢুকে ও-কান দিয়ে বেরিয়ে যায়। কিন্তু সেখানে শোনা একটি গল্প গেঁথে গেছে হৃদয়ে।

দিনের পত্রিকা হাতে করে কেউ কেউ সে আড্ডায় যোগ দেন। সেদিন দ্রুতই আড্ডার খোরাক হয়ে ওঠে পত্রিকার একটি খবর। খবরটি বেরিয়েছে দৈনিক সময়কালের প্রথম পাতায়। ‘মুক্তিযুদ্ধের চার দশক পর স্বীকৃতি পাচ্ছেন চল্লিশ নারী মুক্তিযোদ্ধা। বিজয় দিবসে প্রধানমন্ত্রী আনুষ্ঠানিকভাবে সেসব সাহসী নারীদের হাতে তুলে দেবেন স্বীকৃতি সনদ।’ আজকাল মুক্তিযুদ্ধ যেভাবে রাজনীতির খোরাক হয়ে ওঠেছে, এসব খবর মনোযোগ আকর্ষণ করে না। কিন্তু কি হয়েছিল সেদিন? আমার মতো অনাগ্রহী শ্রোতার হৃদয়েও গেঁথে গেল? শোনেন তাহলে।

পত্রিকায় চোখ বুলাতে বুলাতে সিকদার আবদুল মতিন বললেন, যুদ্ধ গেছে সেই কবে, এখনো স্বীকৃতি দেয়া শেষ হলো না।

তার কথা শুনে সোজা হয়ে বসলেন রফিকুল মওলা। চা পানের প্রাচীন ভঙ্গির কারণে লোকটির প্রতি এক ধরনের দুর্বলতা তৈরি হয়েছে আমার। তিনি পিরিচে ঢেলে ফুরুৎ ফুরুৎ শব্দে চা পান করেন। শহুরে জীবনে এমন দৃশ্য এখন বিরল। সংস্কৃতি অনেক দূর এগিয়ে গেছে। ওসব এখন গ্রাম্য, হাস্যকর। কাপে ঠোঁট লাগিয়ে নিঃশব্দে চা পানে অভ্যস্ত শহুরে মানুষজন। এক সকালে তার ফুরুৎ ফুরুৎ করে চা পানের দৃশ্য আমাকে স্মৃতিকাতর করে দিয়েছিল। সেই থেকে আজ অবধি, একই ভঙ্গিতে তার চা পান, একই রকম স্মৃতিকাতরতা আমারও। তো রফিকুল মওলা বললেন, দেখেন তো কে কে পাচ্ছেন।

সিকদার আবদুল মতিন তার কথায় সায় পেয়ে নারী মুক্তিযোদ্ধাদের নামগুলো উচ্চারণ করলেন। আলোচনা জমে উঠতে দেরি হল না। কার এলাকায় কোন নারী মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিল, কে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের সাহায্য করেছিল ইত্যাদি, ইত্যাদি...।

আমার মতো অনেকক্ষণ ধরেই আনমনে সেসব গল্প শুনছিলেন সাহাবউদ্দিন সাথী। আপনারা অনেকেই হয়তো তাকে চিনবেন। এককালে ছাত্ররাজনীতি করতেন। ভাবুক ধরনের লোকটি সক্রিয় রাজনীতি থেকে সরে গেছেন বহু আগেই। কিন্তু অভ্যাসবশত দীর্ঘদিন ধরেই তোপখানা রোডে তত্ত্বপন্থী রাজনীতিকদের সঙ্গে আড্ডা দেন। তরুণদের কাছে মুক্তিযুদ্ধ আর ছাত্ররাজনীতির স্মৃতিচারণ করেন। প্রথম থেকেই আমি তার ভক্ত হয়ে উঠেছি। অবলীলায় বন্ধু করে নিয়েছি পিতার বয়সী মানুষটিকে। অন্যদের মতো আমিও সম্বোধন করি সাথী ভাই বলে। মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে আলোচনা হচ্ছে কিন্তু সাথী ভাই চুপচাপ, বিষয়টি অবাক হয়ে খেয়াল করছিলাম।

অনেকক্ষণ পর নীরবতা ভাঙলেন তিনি। চায়ের কাপটা টেবিলে রেখে বললেন, শোনেন। মুক্তিযুদ্ধে অসীম সাহসী এক নারীর গল্প বলি।

মেলাঘরে ট্রেনিং শেষ হওয়ার পর অক্টোবরের শেষদিকে আমাকে পাঠানো হয় মেজর খালেদ মোশাররফের অধীনে ২ নম্বর সেক্টরে। ক্যাপ্টেন আকবরের নিয়ন্ত্রণাধীন সাব-সেক্টরের তোরাব কমান্ডারের বাহিনীতে যোগ দিই। আমাদের ক্যাম্পটি ছিল চৌদ্দগ্রাম-ত্রিপুরা সীমান্তের হিম্মতপুরে গ্রামে। কাছেই ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক। জোরে চিৎকার দিলে সীমান্তের ওপারের গ্রাম থেকে শোনা যায়। কৌশলগত অবস্থানের কারণে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার পর মহাসড়কের গোবিন্দ মানিক্যের দীঘি থেকে জগন্নাথ দীঘি পর্যন্ত অংশটুকু খুবই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠেছিল তখন। পাকিস্তানী বাহিনীর গাড়িতে হামলা করে দ্রুতই ভারতে ঢুকে পড়তে পারত মুক্তির ছেলেরা। জগন্নাথ দীঘির ইপিআর ক্যাম্পটি তো যুদ্ধের শুরুতেই দখল করে নিয়েছিল মুক্তিবাহিনী। পরে আক্রমণের মুখে আবার বেদখল হয়ে গেছে। সীমান্তবর্তী ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের চৌদ্দগ্রামের এ অংশে একের পর এক হামলায় পাকিস্তানী বাহিনীকে আতঙ্কিত করে তুলেছিল গেরিলারা। মেলাঘর ক্যাম্পে প্রশিক্ষণ নেয়ার সময় এসব বীরত্বপূর্ণ হামলার গল্প আমাদের খুব অনুপ্রাণিত করত। সি ব্যাটালিয়ানের তিনটি গাড়ি গোবিন্দ মানিক্য দীঘির কাছে গেরিলা হামলায় পড়ার পর ভাবিয়ে তুলে পাকিস্তানী বাহিনীকে। কুমিল্লা অঞ্চলের কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার আনসারীর নির্দেশে গোবিন্দ মানিক্য দীঘির পাড়ে ক্যাম্প বসায় পাকিস্তানী বাহিনী।

ওপারে দৃষ্টির মধ্যেই নিজের দেশে বর্গীর ক্যাম্প। হিম্মতপুর ক্যাম্পে তোরাব কমান্ডারের বাহিনীতে যোগদানের পর থেকে ওই ক্যাম্পটিকে দেখে উড়িয়ে দেয়ার জন্য উদগ্রীব হয়ে পড়েছিলাম। ক্যাম্পটি উড়িয়ে দিতে পারলে পাকবাহিনীর মনোবলে আরও চিড় ধরবে। কিন্তু কমান্ডার সিদ্ধান্ত না দেয়া পর্যন্ত তো সে উপায় নেই। তিনি যুদ্ধবিগ্রহে অভিজ্ঞ পাক আর্মির অবসরপ্রাপ্ত হাবিলদার। ধীরস্থির চিন্তা, সূক্ষ্ম পরিকল্পনা এবং তড়িৎ আক্রমণে গোবিন্দ মানিক্য দীঘি ক্যাম্পের পতন ঘটাতে চান।

দিনটি ছিল রবিবার। রোদের তেজ মরা বিকাল। ক্যাম্পে বসে তাস পেটাচ্ছিলাম। আগের রাতে যারা অপারেশনে গিয়েছিল তাদের কেউ কেউ দুপুরের খাবার খেয়েই ক্যাম্পের খড়ের বিছানায় নাক ডাকছিলেন বৈকালিক ঘুমে। কেউ আবার চরমপত্র শোনার জন্য রেডিওর নব ঘুরিয়ে ধরার চেষ্টা করছিলেন স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র। ক্যাম্পের বাইরে মাটির চুলোয় কেটলিতে তখন টগবগ করে ফুটছে চায়ের জল। আমাদের কমান্ডার আবু তোরাব তখন সিগারেট টানতে টানতে আঁকিবুকি করছিলেন একটি কাগজে। আঁকিবুকি নয়, আসন্ন রাতের বেলা গোবিন্দ মানিক্য দীঘি ক্যাম্পে পাকবাহিনীর ওপর হামলা ও নিরাপদে ফিরে আসার ছক। সন্ধ্যার পর ক্যাম্পে আসবেন ক্যাপ্টেন আকবর। তোরাব কমান্ডারের ছকটি দেখে তিনিই হামলার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেবেন।

ঠিক ওই সময় ওপার থেকে ভেসে এলো হঠাৎ এলোপাতাড়ি গুলির শব্দ। মুহূর্তেই আমাদের কান খাড়া হয়ে গেল। বৈকালিক ঘুম থেকে ধড়ফড় করে জেগে উঠল কয়েকজন। থেমে গেল কমান্ডারের হাতের কলম। আমরা পরস্পরের মুখ চাওয়া-চাওয়ি করছি। ঘটনা কি? মনের পর্দায় ভেসে ওঠল হরিণমারা গ্রামের কুদ্দুসের মুখ। বিশ্ববিদ্যালয়ে আমাদের দুই বছরের সিনিয়র। বাম রাজনীতি করেন। সীমান্ত পেরিয়ে তারা মুক্তিবাহিনীতে যোগ দেয়নি। প্রতিবেশী ভারতের প্রতি তাদের তেমন আস্থা নেই। তারা দেশে থেকেই যুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন করতে চায়। যত্তসব!

আমরা ততক্ষণে ধরে নিয়েছি এটা কুদ্দুসের কাজ। তোরাব কমান্ডারের বাহিনী গোবিন্দ মানিক্যের দীঘি ক্যাম্পে হামলা চালাতে যাচ্ছে। খবর পেয়েই হয়তো শালা এমন কাঁচা কাজ করল? মনে মনে তাকে কষে গালি দিলাম। শালা না পারে ছিড়তে, না পারে উপড়াতে; করে খালি খোঁচাখুঁচি। যদিও মাঝে মধ্যে তাদের চোরাগোপ্তা হামলা মুক্তিবাহিনীকে দারুণ ফল দেয়। দ্বিমুখী আক্রমণের কারণে উত্তেজিত পাকবাহিনী প্রায়ই ভুল করে।

খ.

দক্ষিণে জগন্নাথ দীঘি ইপিআর ক্যাম্প আর উত্তরে আর্মি ক্যাম্প গোবিন্দ মানিক্যের দীঘি ক্যাম্প। দুই ক্যাম্পের সর্বক্ষণিক নেতৃত্বে ছিলেন ক্যাপ্টেন মঞ্জুর। বেলুচ রেজিমেন্টের অফিসার। দিনে তারা মহাসড়ক দিয়ে যাওয়া গাড়ি তল্লাশি ও আশপাশের গ্রামগুলোতে টহল এবং রাতে ভারত সীমান্তের দিকে নজর রাখতো। আর জগন্নাথ দীঘির উত্তরে চিওড়া রোডের মাথা, নানকরা-দুর্গাপুর রোডের মাথায়, দক্ষিণে বেতিয়ারা ও গাংরা রোডের মুখে চেক পোস্ট বসিয়ে পাহারা দিত রাজাকারের দল। ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, চাঁদপুর, কুমিল্লার ছেলেরা মুক্তিবাহিনীতে যোগ দিতে ওইসব পথ দিয়েই পাড়ি দিত ত্রিপুরা সীমান্ত। এপারে সিদ্ধনগর গ্রাম। সেখানে গড়ে তোলা হয়েছে মুক্তিবাহিনীর ক্যাম্প।

যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে পাকিস্তানী বাহিনীর চেয়ে ভয়ংকর আচরণ করছিল রাজাকাররা। একদিন বিকালে আমজাদের হাটে কেরোসিন কিনতে গিয়ে পরিচিত লোকজনের সঙ্গে ফিসফিসানির আড্ডায় বসেছিলেন ডিমাপুর গ্রামের আজিজুর রহমান মুন্সী। তিনি জানতেন না সেখানে ঘাপটি মেরে ছিল রাজাকারের এক চর। আজিজুর মুন্সী বলেছিল বাংলার দামাল ছেলেদের ঘুম ভেঙেছে। গভীর রাতে অস্ত্র হাতে তারা এসে যখন দরোজায় টোকা দেয় তখন আমার বুকটা ভরে যায়। মনে হয় মুক্তির স্বাদই যেন আমার দরোজায় টোকা দিচ্ছে। এবার পাকিস্তানী শোষকদের আর রক্ষা নেই।

সেদিন রাতেই পাকিস্তানী বাহিনী অপারেশন চালায় তার বাড়িতে। ঘুম ভাঙা চোখে মুন্সী উঠোনে বেরুতেই একঝাঁক গুলি এসে বিঁধে তার চওড়া বুকে। পাকিস্তানী হায়েনাদের বর্বরতা থেকে রক্ষা পায়নি তার মেয়ে ও ছেলের বউ। এ ফাঁকে মুন্সীর ধানের গোলা আর গোয়াল খালাস করে দেয় রাজাকাররা। যাওয়ার সময় জ্বালিয়ে দেয় তার বসতঘর।

কয়েকদিন পর বসন্তপুর গ্রামের মওলা বক্সের উঠোনে বসে বৈঠক করছিল কয়েকজন। কথা হচ্ছিল মুক্তি নামে গণ্ডগোল পাকানো বেয়াড়া পোলাপানদের নিয়ে। সেখানে উপস্থিত হয়েছেন গ্রামের কয়েকজন সম্পন্ন গৃহস্থ। জগন্নাথ দীঘি ইউনিয়নের মেম্বার মওলা বক্স। সাত পদের জর্দা যুক্ত একটি মিষ্টিপান চিবুতে চিবুতে তিনি বললেন- হিন্দুস্তানের সাহায্যে নিয়ে গণ্ডগোলকারীরা যা শুরু করেছে তাতে গ্রামের শান্তি হারিয়ে গেছে। একটা বিহিত করতে হবে। কি বলো মিয়ারা? দু’একজন হ্যাঁ-হু করে তার কথার সমর্থন দেন। স্বাধীনতা, মুক্তিযুদ্ধের চেয়ে তাদের ভাবনায় ঘুরপাক খায় ক্ষুধা, উনুন, ধানের গোলা আর সংসার। প্রতিঘরেই জোয়ান মেয়ে, প্রতিদিনই গ্রামে পাকিস্তানী বাহিনীর টহল। নানা প্রশ্ন, খোঁজ-খবর। কখন কি ঘটে যায় বলা মুশকিল। মওলা বক্সের পাশেই বসেছিল বসন্তপুরের সদরুজ্জামান। পাকিস্তান আর্মির সহায়তায় গঠিত একটি রাজাকার দলের নেতৃত্ব দিচ্ছিল সে। মওলা বক্সের কথা শুনে সদরুজ্জামান বলল, আমাদের এলাকায় কোন মুক্তির দলকে আশ্রয়-প্রশ্রয় দেয়া হবে না। মনে রাখবে সবাই, কেউ এমনটি করলে তার পরিণতি হবে কঠোর। গাদ্দার আজিজুর মুন্সীর মতো।

সদরুজ্জামানের কথা শুনে ভয়ে গৃহস্থদের প্রাণ শুকিয়ে আসে। তারা বুঝে পাকিস্তানী বাহিনী মানুষের শরীরকে হত্যা করতে পারবে নিমিষে। কিন্তু ক্ষুধাকে হত্যা করতে পারবে না। তাই সংসারের ক্ষুণ্নিবৃত্তির জন্য শুয়োরের বাচ্চার মতো ঘাড় নিচু করে আর শেয়ালের মতো বুদ্ধি করে প্রাণ বাঁচাতে হবে। নিজের মায়ের সঙ্গে বেঈমানী করে বলতে হবে পাকিস্তান জিন্দাবাদ। কামনা করতে হবে মেয়ের ধর্ষকদের দীর্ঘজীবন। ছেলের খুনীদের বলতে হবে যুগ যুগ জিও। বলতে হবে পেটের দায়ে। জিনিসপত্রের মূল্য বাড়ছে হু হু করে। তিন সের দুধ বেঁচে এক সের লবণ মেলে না।

গ.

যুদ্ধের দিন শুরু হওয়ার পর থেকে রাবেয়ার প্রতি মনোযোগ হারিয়ে ফেলেছে সদরুজ্জামান। দিনরাত ফেই ফেই করে ঘুরে বেড়ায়। তবে ঘরে জমছে বস্তা বস্তা চাল ডাল। মাঝে-মধ্যে গুনতে দেখা যায় কড়কড়া নোটের বান্ডিল। সবই লুটের মাল। রাবেয়া জানে সদরুজ্জামান রাজাকারের দলে নাম লিখিয়েছে। পাকিস্তানী আর্মির জিপে চড়ে বেড়াচ্ছে। প্রথম যেদিন সদরুজ্জামান একবান্ডিল নোট আর দুই বস্তা চাল নিয়ে ঘরে এসেছিল সেদিন অবাক হয়ে প্রশ্ন করেছিল রাবেয়া। কোথায় পেলেন এইসব?

সদরুজ্জামান ধমক দিয়ে বলেছিল- তুমি মেয়ে মানুষ। এইসব জেনে তোমার কাম নেই।

বিস্ময়ভরা দৃষ্টিতে কয়েক মুহূর্ত তাকিয়ে থেকে রাবেয়া সরে যায় সদরুজ্জামানের সামনে থেকে। আর কোন দিন প্রশ্ন করেনি সে।

ঘরে যতই শান্তি থাকুক মনে কিন্তু শান্তি নেই রাবেয়ার। সব সময় এক ধরনের অস্থিরতা ও ভয় তাকে কুরে কুরে খাচ্ছে। প্রকাশ্যে কেউ কিছু বলে না। আড়ালে-আবডালে কানাঘুষা করে। প্রতিবেশীরা বলে, সদরুজ্জামান দেশের সঙ্গে গাদ্দারি করছে। দেশ স্বাধীন হলে তার বিচার হবে। মুক্তিরা তাকে ছাড়বে না। রাবেয়া শুনেছে তার বাপের বাড়ির অনেকেই সীমান্ত পাড়ি দিয়ে ভারতে চলে গেছে। তার ছোট ভাই রওশন ক্লাস টেনে পড়ে। সেও নাকি কাউকে কিছু না বলে মুক্তির দলে নাম লেখাতে সীমান্ত পাড়ি দিয়েছে। আর তার স্বামী নাম লিখিয়েছে রাজাকারের দলে। এ নিয়ে স্বামীর ওপর মাঝে মাঝে রাগ ও ঘৃণা হয় রাবেয়ার। কিন্তু নিয়তির লিখন, খণ্ডাবে কে? বিবাহিত নারীর কাছে তো স্বামীই সবকিছু।

লাঙ্গলকোটের রায়কোট গ্রামের সবচেয়ে সুন্দরী মেয়েটি ছিল রাবেয়া। গ্রামের তরুণরা উঁকি-ঝুঁকি মারতো তার চলার পথে। সেয়ানা হয়ে ওঠার পর প্রায়দিনই বিভিন্ন এলাকা থেকে সম্বন্ধ নিয়ে আসতো লোকজন। চাকরিজীবী, সম্পন্ন গৃহস্থের ছেলে। কত প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়েছেন তার বাপজান। শেষ পর্যন্ত বসন্তপুরের একবাপের একপুত সদরুজ্জামানের সঙ্গে তার বিয়েতে রাজি হলেন তিনি। বলেছিল, শ্বশুর নেই, শাশুড়িও যায় যায়। নির্জঞ্ঝাট সংসার। মেয়ে আমার সুখেই থাকবে। তারপর রায়কোট গ্রাম ছেড়ে গোবিন্দ মানিক্যের দীঘি। বিয়ের পর কেটে গেছে আট বছর। কিন্তু এখনও তার কোল জুড়েনি সন্তানে। তিনবার এসেছিল। একবারও টিকেনি। বিয়ের আট বছর পরও তাকে দেখলে লোকজনের দৃষ্টি আটকে যায়। এমনিতেই সুন্দরী বউ হিসেবে রাঙাবিবি নামে তার সুনাম আছে গ্রামজুড়ে।

ঘ.

রফিকুল মওলা বার বার ঘড়ির দিকে তাকাচ্ছিলেন। তিনি বললেন- সাথী ভাই, আসল ঘটনার দিকে যান।

আরে ভাই, যাচ্ছি তো। একটু ধৈর্য ধরেন না। সাথী ভাই কিছুটা বিরক্ত হন।

তিনি ফিরে যান, সে বৈকালিক গোলাগুলির কৌতূহলী ঘটনায়।

বুঝলেন, বিকাল বেলা এমন কৌতূহলী গোলাগুলির পর সে রাতের আক্রমণ স্থগিত করলেন তোরাব কমান্ডার। সন্ধ্যার পর ক্যাপ্টেন আকবর গোলাগুলির ঘটনা শুনে বললেন, আগে ঘটনা কি খোঁজ নেন। আমরা রেডিওর নব ঘোরাতে লাগলাম স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে। কিন্তু সে রাতে কোন খবর মিলল না। পরদিন ভোরে, খোঁড়াতে খোঁড়াতে ক্যাম্পে এসে হাজির হল হরিশ্বরহাটের আবদুল ময়েজ মজুমদার। মুক্তিবাহিনীর গোয়েন্দা। ময়েজ মজুমদারকে পেয়ে আমরা সবাই ঘিরে ধরলাম। কাল বিকালে গোবিন্দ মানিক্য দীঘি এলাকায় কি ঘটেছিল?

ময়েজ মজুমদার যেন আমাদের সে ঘটনা বর্ণনা করতে তৈরি হয়েই ছিল। সে প্রশ্ন করল, ডাকাতিয়া নদীর পারে রাজাকারের টহল দলের ওপর ক্যাপ্টেন ইমামুজ্জামানের বাহিনীর হামলার কথা তো শুনেছেন? আমরা তার প্রশ্ন শুনে হ্যাঁ সূচক মাথা নাড়লাম। ময়েজ বলতে শুরু করল, রাজাকার দলটি মুক্তিবাহিনীতে যোগ দিতে আসার পথে তরুণ-যুবকদের আটক করে পাকিস্তানী বাহিনীর হাতে তুলে দিত। দলটির কমান্ডার সদরুজ্জামান ওই হামলায় নিহত হয়েছিল।

ময়েজের কথা শুনতে শুনতে আমাদের কৌতূহল তখন গরম তেলের মতো টগবগ করে ফুটতে শুরু করেছে। তাহলে কি তারা প্রতিশোধমূলক হামলা করেছে? কিন্তু ময়েজ শোনাল অন্য গল্প।

রাজাকার কমান্ডার সদরুজ্জামান নিহত হওয়ার পর ডাকাতিয়া নদীর পাড়ে সময়ে অসময়ে টহল দিতে শুরু করল পাকিস্তানী বাহিনী। সদরুজ্জামানের স্থান দখল করল গোয়ালপাড়ার আবদুস সবুর। সেদিন ডাকাতিয়া নদীর পাড়ে টহল শেষে সবুরকে নিয়ে জিপে করে গোবিন্দ মানিক্যের দীঘি ক্যাম্পে ফিরছিল ক্যাপ্টেন মঞ্জুর। হরিশ্বরহাট থেকে গোবিন্দ মানিক্যের দিকে যাওয়ার কয়েকটি পথ থাকলেও বসন্তপুরে সদরুজ্জামানের বাড়ি হওয়ায় সে পথটিই বেশির ভাগ সময় ব্যবহার করত রাজাকারের দল। তো, ক্যাপ্টেন মঞ্জুরের জিপ বসন্তপুর রামপুকুর পাড়ে পৌঁছলে হঠাৎ জিপের সামনে পড়ে সদ্যস্নাত এক নারী। পুকুর থেকে গোসল সেরে রাস্তায় ওঠছিল সে। কাঁচা হলুদের মতো গায়ের রঙ, চুল থেকে টপটপ করে ঝরছে রামপুকুরের টলটলে স্বচ্ছ জল। জানেন তো, রামপুকুরের দক্ষিণ পাড়েই রাজাকার কমান্ডার সদরুজ্জামানের বাড়ি। পুকুর থেকে রাস্তায় ওঠেই পাকিস্তানী আর্মির জিপের সামনে পড়ায় জড়োসড়ো রাবেয়া মাথার কাপড় টেনে ঘোমটা দেয়। চকিত হরিণীর মতো দ্রুত পায়ে বাড়ির দিকে চলে যায়।

আওরাতটা দেখেই শরীর শিরশিরিয়ে ওঠে ক্যাপ্টেন মঞ্জুরের। তার আঙুলের ইশারায় থেমে যায় জিপ। পেছনে বসা রাজাকার সবুরকে জিজ্ঞেস করে ক্যাপ্টেন- সবুর, ইয়ে আওরাত কোন হ্যায়। বহুত হাসিন। তুম জিপ সে উথারো। ইস হাসিনকো ক্যাম্প মে লে আও। সবুর নামতেই জিপ গোবিন্দ মানিক্যের দিকে ছুটে যায়।

সবুর বুঝতে পারে, মেয়েটিকে ক্যাপ্টেনের মনে ধরেছে। সে জিপের পেছনে বসায় মুখ দেখতে পায়নি, কিন্তু ঘোমটা ফেলে চলে যাওয়ার সময় পা দেখেই বুঝেছে মেয়েটি খুবই সুন্দর। মরহুম কমান্ডার সদরুজ্জামানের সঙ্গে তার সখ্য থাকলেও কোনদিন তার বাড়ি আসা হয়নি। কিন্তু সে জানে আশপাশেই কোথাও তার মরহুম কমান্ডারের বাড়ি।

রাজাকার সবুর ভাবতে ভাবতে সদরুজ্জামানের উঠোনে গিয়ে ওঠে। রাবেয়া তখন ভেজা কাপড়গুলো মেলে দিচ্ছিল উঠোনের টাঙানো বাঁশে। এমন সময় সবুর জিজ্ঞেস করে, এটা কার বাড়ি? দ্বিতীয়বার প্রশ্নের আগেই মাথার কাপড় টেনে গুটিয়ে দাঁড়ায় রাবেয়া। তারপর উত্তর দেয়- জ্বি মৌলভী সদরুজ্জামানের।

উত্তর শুনে সবুর ভাবনায় পড়ে যায়। মেয়েটি কি মরহুম কমান্ডারের স্ত্রী? খুব বেশি ভাবতে পারে না সবুর। তার কানে বাজে ক্যাপ্টেনের নির্দেশ- ইস হাসিন কো ক্যাম্প মে লে আও। সে জানে পাকিস্তানী আর্মি অফিসারের কাছে মৃত ঘোড়ার কোন দাম নেই। যতদিন কমান্ডার বেঁচে ছিলেন ততদিন তার কি গুরুত্ব। কথায় কথায় ক্যাপ্টেন বলতেন, সদর কো বোলাও। কিন্তু মৃত্যুর পর একটিবারও সদরুজ্জামানের নামটি মুখে আনেননি ক্যাপ্টেন সাব। সবুর জানে, ক্যাপ্টেনের যখন মনে ধরেছে; তখন কমান্ডারের স্ত্রী হোক আর যেই হোক রক্ষা নেই। মেয়েটি তাই সদরুজ্জামানের কি হন সে প্রশ্নও করে না সবুর। কৃত্রিম রাগী কণ্ঠে বলে- তোমাকে গোবিন্দ মানিক্য ক্যাম্পে নিয়ে যেতে বলেছেন ক্যাপ্টেন সাব।

লোকটির কথা শুনে চোখে সর্ষেফুল দেখে রাবেয়া। সদরুজ্জামান রাজাকারের দলে নাম লেখানোর পর থেকে ভয়ে ও ঘৃণা তক্কেতক্কে থাকতো সে। মাত্র দুই সপ্তাহ হল মুক্তিবাহিনীর হামলায় নিহত হয়েছে সদরুজ্জামান। যাদের জন্য তার এ অকাল মৃত্যু সে পাকিস্তানী বাহিনী কিংবা শান্তি কমিটির লোকজন একবার তার খবর পর্যন্ত নেয়নি। এ নিয়ে যদিও তার কোন আফসোস নেই। বেঁচে থাকতে যত ঘৃণাই করুক মৃত্যু পর তার রাজাকার স্বামীর দাফন-কাফন করেছে তো প্রতিবেশীরাই। দু’সপ্তাহের মাথায় আজ তাকেই ডেকে পাঠিয়েছে ক্যাপ্টেন সাব। প্রতিবেশীদের কানাঘুষোয় পাক আর্মির চরিত্র সম্পর্কে তার ধারণা তৈরি হয়েছে। নিশ্চয় কোন বদমতলব। তবু সে লোকটিকে প্রশ্ন করে- কেন? সবুর কণ্ঠে রাগ ফুটিয়ে বলে, অত কিছু জানি না, নিয়ে যেতে বলেছে; চলো বোরকা পরে নাও?

গ্রামের পর্দানশীল গৃহিণী হলেও আলাভোলা নিরক্ষর নয় রাবেয়া। লাঙ্গলকোটের রায়কোট সম্ভান্ত গৃহস্থ পরিবারের মেয়ে সে। পাক আর্মির দোসর মরহুম সদরুজ্জামানের স্ত্রী। মনে সাহস সঞ্চয় করে রাবেয়া। রাজাকারটির সঙ্গে কোন অস্ত্র নেই। তাই সবুরকে বলে, ক্যাপ্টেন সাব কেন আমাকে ডাকবেন?

সবুর রাজাকার বলল, পুকুর থেকে আসার সময় তোমাকে দেখেই পছন্দ করেছেন ক্যাপ্টেন সাব।

অন্য মেয়ে হলে কি করতো জানি না। ভয়ে হয়তো সংজ্ঞাহীন হয়ে পড়তো। নয়তো কান্নাকাটি জুড়ে দিত। ধমক-টমক খেয়ে স্বামী-সন্তানের নিরাপত্তায় সুড়সুড় করে হাঁটা ধরতো সবুরের পেছনে পেছনে। কিন্তু রাবেয়া অন্য ধাতুতে গড়া। সে বুঝতে পারে ক্যাপ্টেনের চোখে যখন পড়েছে তখন তার হিংস্র থাবা থেকে রক্ষা মিলবে না। সদরুজ্জামান বেঁচে থাকতে গর্ব করে বলতেন পাকিস্তানী আর্মির নৃশংসতার কথা। এ নেকড়ে দলের সঙ্গে ভিড়ে তার স্বামীর অকাল মৃত্যু হয়েছে। বেছে নিয়েছে ঘৃণিত মৃত্যু। সদরুজ্জামানের জন্য তার মনে কষ্ট নেই। দীর্ঘ আটটি বছর ভাল মন্দ মিলিয়ে সংসার করেছে। শরীরের চাহিদা এখন আর অদম্য নয়। বরং সে নিজেকে ভাগ্যের ওপর সপে দেয়। সদরুজ্জামানের মৃত্যুর পর সবাই তাকে বাপের বাড়ি যাওয়ার পরামর্শ দিলেও স্বামীর বাড়ি ছাড়তে রাজি হয়নি সে। কিন্তু নিজের সম্ভ্রম তার কাছে অমূল্য। দ্রুত সে মনে মনে কঠিন একটি সিদ্ধান্ত নিল। ঠিক করল, কোনভাবেই ক্যাম্পে যাবে না কিন্তু ক্যাপ্টেন সাবের পছন্দের কথা শুনে সে যে আনন্দিত সেটা প্রকাশ করবে। নিরিবিলি পরিবেশে বাড়িতেই আমন্ত্রণ জানাবে ক্যাপ্টেন সাবকে। তারপর? তার মাথায় ত্বরিত একটি বুদ্ধি আসে।

লোকটির দিকে তাকিয়ে হঠাৎ হাসতে হাসতে গড়িয়ে পড়ে রাবেয়া। তার হাসি দেখে বিভ্রান্ত হয় রাজাকার সবুর। হাসতে হাসতেই রাবেয়া বলল, স্বামী নেই বলেই কি যেখানে সেখানে যেতে হবে। আমি ক্যাম্পে যাবো না। আপনাদের ক্যাপ্টেন সাবকে গিয়ে জানান, পর্দানশীল ঘরের মেয়ে ক্যাম্পে যায় না। ক্যাপ্টেন সাবের পছন্দ হলে বাড়িতেই তার দাওয়াত রইল।

মেয়েটির আচরণে বিভ্রান্ত হয় সবুর। গণ্ডগোলের দিনে কোন মেয়ে এ রকম সাহসের সঙ্গে কথা বলতে পারে সেটা সবুর ভাবতেই পারে না। সবাই যেখানে আল্লাহ-রাসুলের দোহাই দিয়ে বাঁচতে চায় সেখানে মেয়েটি ক্যাপ্টেনকেই দাওয়াত করছে। সম্ভবত স্বামীহীন সুন্দরী বলেই তার এত রাখঢাক নেই। মেয়েটির হাসির গমকে সে আরও বিভ্রান্ত হয়ে মনে মনে ধরে নিল, ক্যাপ্টেন সাবের দাওয়াত মানে তো কদিন পর তারও পথ খোলা।

দিনের বেলা জোর করে মেয়েটিকে ধরে নিয়ে যাওয়ায় ঝামেলা আছে। হাতে অস্ত্র থাকলে সেটা সম্ভব হতো। বোকার মতো জিপে বন্দুকটি রেখেই নেমে এসেছে সে। বড় কথা হচ্ছে, মেয়েটির হাসিতেই বোকা বনে গেছে রাজাকার সবুর। তাই সে হাসিমুখে বলে, সত্যি তো? দেখো পালানোর চেষ্টা করবে না। চারদিকে কিন্তু আমাদের লোকজন আছে। আর যদি ক্যাপ্টেন সাবকে খুশি করতে পারো তবে পুরস্কার পেতে পারো।

জবাবে রাবেয়া একটি মোহনীয় হাসি দিল।

ঙ.

সাথী ভাইয়ের গল্পের মধ্যে ফের ব্রেক কষেন রফিকুল মওলা। হাত ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বলেন, স্কুল ছুটির সময় হয়ে এসেছে।

রফিকুল মওলা যে সংক্ষেপ করার জন্য বলছেন তা বুঝতে পারেন সাথী ভাই। তিনি হাসি ফুটিয়ে বলেন, আপনার মতো আমাদের একজনও সেদিন ময়েজকে বলেছিল বাকিটা নাস্তার পরে শোনবো।

সাথী ভাইয়ের কথা শুনে আমরা কয়েকজন বললাম, না ভাই বলেন তারপর কি হলো।

সাথী ভাই আবার গল্পে ঢুকে গেলেন। ময়েজের বরাতে তিনি হাসতে হাসতে বললেন, শালা বলদের বাচ্চা সবুর কিছুক্ষণ পর গেল গাধার বাচ্চা ক্যাপ্টেন মঞ্জুরের গোবিন্দ মানিক্য ক্যাম্পে। আর সবুর রাজাকারের কাছে মেয়েটির কথা শুনে ভাদ্র মাসের কুত্তার মতো উতলা হয়ে উঠে বেলুচ রেজিমেন্টের ক্যাপ্টেন মঞ্জুর।

রাতে মাঝে মধ্যে ময়নামতি ক্যান্টনমেন্ট থেকে ক্যাম্প পরিদর্শনে আসে ঊর্ধ্বতন অফিসাররা। রাত নামলে বাড়ে মুক্তিদের আনাগোনা। রাতের দাওয়াত তাই চাকরি ও জীবন দুটোর জন্যই ঝুঁকিপূর্ণ। দিনের বেলায় দাওয়াতে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিল ক্যাপ্টেন। সবুর রাজাকারকে বলল, কাল টহল থেকে ফেরার সময় যাবো। কি বলো?

সবুর কি বলবে, সেও মোহাবিষ্ট হয়ে পড়েছে। ক্যাপ্টেনের দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে সায় দিল।

পরদিন ডাকাতিয়া নদীর পাড়ে টহল দিয়ে শান্তি কমিটির সদস্য গফুর মেম্বারের বাড়িতে দুপুরের খাবার খেল ক্যাপ্টেন মঞ্জুর। মেম্বারের বাড়িতে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে বসন্তপুরের রাস্তা ধরে গাড়ি ছুটালো গোবিন্দ মানিক্য দীঘি ক্যাম্পের দিকে। রামপুকুর পাড়ে এসেই জিপ থামাতে নির্দেশ দিল ক্যাপ্টেন। রাজাকার সবুরকে পাঠাল সে মেয়েটির বাড়িতে।

উঠোনে মোড়ায় বসে প্রতিবেশী বাড়ির একটি গৃহবধূর সঙ্গে গল্প করছিল রাবেয়া। অপরিচিত লোককে উঠোনে ঢুকতে দেখে পাশের বাড়ির বউটি ঘোমটা টেনে ছুটে পালাল। কিন্তু আগের দিনের সে রাজাকার লোকটিকে দেখে আজ আর মাথার কাপড়ও টেনে দিল না রাবেয়া। সবুর বিষয়টি খেয়াল করল। তারপর হাসি মুখে বলল, ক্যাপ্টেন সাব এসেছেন।

রাবেয়া তো আগের দিন বুদ্ধি করে রেখেছে। সে লজ্জামাখা হাসি দিয়ে বলল, সত্যিই!

সবুর বলল, নিয়ে আসব?

রাবেয়া হেসে সায় দিয়ে ঘরে ঢুকে পড়ল।

জিপে বসা সিপাহীদের অপেক্ষা করতে বলে সবুর রাজাকারের কাছে মৃগয়ায় ঢুকে পড়ল ক্যাপ্টেন। কিন্তু ততক্ষণে ধারালো দা’টি খাটের পাশে এনে গুজে রেখেছে রাবেয়া। সদরুজ্জামানের লুট করে আনা চীনা মাটির গ্লাসে কড়া করে গুলিয়ে রেখেছে বাটা মরিচের পানি।

উঠোনে অপেক্ষারত রাবেয়ার শাড়ির বাঁক দিয়ে ফুটে আছে তার সুপুষ্ট স্তন। সেদিকে তাকিয়ে ক্যাপ্টেনের শরীরের আগুন জ্বলে ওঠল। চোখে সে আগুনের লকলকে শিখা। রাবেয়ার চোখেও খেলা করছে দুষ্টুমি। সবুর রাজাকারকে ইশারায় জিপের দিকে যেতে বলে নিজে রাবেয়ার দিকে পা বাড়াল ক্যাপ্টেন। রূপের প্রশংসা করে বলল, ক্যায়া গুলবদন হ্যায়!

মুখে রূপের প্রশংসা শুনলেও ক্যাপ্টেনকে এগিয়ে আসতে দেখে ভেতরে ভেতরে ঘামতে শুরু করল রাবেয়া। ক্যাপ্টেন একটানে রাবেয়াকে বুকের মধ্যে চেপে ধরল। পাকিস্তানী শক্ত সামর্থ্য ক্যাপ্টেনের বুকে চাপা পড়তে পড়তে ঘরের দিকে ইশারা করল রাবেয়া। ক্যাপ্টেন যতই কামকাতর হোক, উঠোনে তো আর সম্ভব নয়। ক্যাপ্টেন রাবেয়াকে জড়িয়ে ধরে ঢুকে পড়ল ঘরে। রাবেয়া গামছা দিয়ে পরিষ্কার বিছানা ফের ঝেড়ে নিল। একবার ক্যাপ্টেনের দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসল। ক্যাপ্টেন জড়িয়ে ধরে গোলাপ পাপড়ির মতো ঠোঁটে চুমো দিল। রাবেয়া হাসিমুখে এক ঝটকায় নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে বলল, সাব পিপাসা পেয়েছে, একটু পানি খাব। পাশের ঘরের দিকে যেতে যেতে হাতের ইশারায় এক মুহূর্ত অপেক্ষা করতে বলল।

ক্যাপ্টেন এই কয়েক মাসে অসংখ্য বাঙালী নারীর সহবত পেয়েছে। কিন্তু এমন নটঙ্গি নারী আর একটিও জোটেনি। কামের আগুনে তার অবস্থা তখন গরম তাওয়ায় দেয়া ভুট্টার মতো। রাবেয়া অন্য ঘর থেকে বেড়ার ফোকর দিয়ে দেখল ক্যাপ্টেন বিছানায় গিয়ে বসেছে। ডান কোমরের খাপ খুলে রিভলবারটি পাশের টেবিলের ওপর রেখে প্যান্টের বেল্ট খুলছে। ঠিক এ সময়টাই মরিচপানি ভর্তি চীনা মাটির গ্লাসটি হাতে নিয়ে ফিরে এল সে। ক্যাপ্টেন তার দিকে তাকাতেই ঝপাৎ করে মরিচপানি ছিটিয়ে দিল তার মুখে। মেজর প্রথমেই চিৎকার দিলো না। একহাতে জ্বালা ধরা চোখ ডলতে ডলতে অন্যহাতে টেবিলে রাখা রিভলবার হাতড়াল। তখনই রাবেয়া ধারালো দা দিয়ে এলোপাতাড়ি কুপাতে শুরু করল ক্যাপ্টেনকে। ক্যাপ্টেন তখন চোখ ঢলা বাদ দিয়ে কোপ থেকে বাঁচতে চাইল। আর আর্তচিৎকার শুরু করল- মেরা লস্কর, মুজে বাঁচচাও।

এতটুকু বলে, নিজেই একটু ব্রেক কষলেন সাথী ভাই। এবার আমাদের সবার কৌতূহল উপচে পড়ল। সমস্বরে প্রশ্ন করলাম, তারপর কি হল?

সাথী ভাই বললেন, তারপর কি আবার হবে? পাকিস্তানী সিপাইরা ক্যাপ্টেনের চিৎকার শুনে প্রথমে হতভম্ব হয়ে পড়ে। মুক্তির দল হানা দিয়েছে মনে করে তারা গাড়িকে শেল্টার বানিয়ে এলোপাতাড়ি গুলি ছুড়তে শুরু করে। আর আমরা হিম্মতপুর ক্যাম্পে বসে তাস পেটাতে পেটাতে সেই গুলির শব্দ শুনছিলাম।

রফিকুল মওলা একটি দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন। আমি তার মুখের দিকে তাকিয়ে রইলাম। সিকদার আবদুল মতিন বয়সী মানুষ। তিনিও মুক্তিযুদ্ধ কাছে থেকেই দেখেছেন। জানতে চাইলেন, রাঙাবিবির কি হলো শেষে?

সাথী ভাইয়ের চেহারাটা মুহূর্তেই পাল্টে গেল। সেখানে যেন একই সঙ্গে খেলা করছে অন্যায়ের বদলা নেয়ার আনন্দ আর স্বজন হারানোর বেদনা। বললেন, শালা বেলুচ ক্যাপ্টেন তো মরল, কিন্তু রাঙাবিবির আর কোন খোঁজ পাওয়া গেল না।

পাঠকের মতামত:

SMS Alert

সাহিত্য এর সর্বশেষ খবর

সাহিত্য - এর সব খবর