thereport24.com
ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১৫ নভেম্বর ২০১৮, ১ অগ্রাহায়ণ ১৪২৫,  ৬ রবিউল আউয়াল ১৪৪০

স্বাধীন বাংলাদেশের রাজনৈতিক-সামাজিক চিত্রচরিত্র

২০১৫ মার্চ ২৬ ০০:০৭:১৭
স্বাধীন বাংলাদেশের রাজনৈতিক-সামাজিক চিত্রচরিত্র

আহমদ রফিক

১৯৭০-এর সাধারণ নির্বাচন শেষে জাতীয়তাবাদী চেতনার পাল হাওয়ায় উড়ে আকাশ ছুঁতে চেয়েছে। আবেগে ভরপুর হাওয়া। আকাশে মেঘ সঞ্চারের তাৎপর্য তাই মননশীল বাঙালীর চৈতন্যেও দাগ কাটেনি। জাতীয়তাবাদী আবেগ শ্রেণী ভাবনাকে অনেকে পিছে ফেলে এগিয়ে গিয়েছিল। পাকিস্তানী রাজনীতি ও শাসন ব্যবস্থার আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপটে এমনটাই স্বাভাবিক ছিল। অথচ এর সামাজিক ভিত্তি ও সেক্যুলার চরিত্র বাস্তবে কতটা সত্য ছিল স্বাধীনতা-উত্তর বহুবিধ ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে তা নিয়ে প্রশ্ন তোলা যায়। আসলে বিষয়টা ছিল বহিরঙ্গে, চেতনার গভীর নয়। ব্যতিক্রম অবশ্য থাকবে, এটাই স্বাভাবিক।

এদিক থেকে রাজনৈতিক চেতনার মনে যে উঁচুতারে বাঁধা ছিল না একটি ছোট্ট ঘটনার প্রতীকী তাৎপর্যে তা বোঝা যায়। একাত্তরের মার্চ মাসের শুরুতে যখন প্রবল উন্মাদনা, সে সময় ঢাকা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের চতুর্থ শ্রেণী কর্মচারী ইউনিয়নের সেক্রেটারি তরুণ শ্রমিক নেতাকে ব্যক্তিগত ঘনিষ্ঠতার সুবাদে প্রশ্ন করি জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের শ্রেণীস্বার্থের ইতি ও নেতির বিষয়ে।

তরুণ ট্রেড ইউনিয়ন নেতার উত্তেজিত জবাবে অবাক হই। তার ভাষায় ‘মাউরা গো শোষণে আমাগো সব শেষ শ্যাষ। হ্যাগো তাড়েইতে হইবো, দ্যাশ স্বাধীন করতে হইবো। না ওইলে বাঙালীর বাঁচন নাই।’ তার কথার প্রতিটি শব্দ রাজনৈতিক দিক থেকে গুরুত্বের সঙ্গে বিচার্য। তার শেষ কথাটার আবেগই আমাকে অবাক করেছিল শ্রেণী চেতনার ব্যাপারে ‘আমি কিছু না পাইলেও আমার বাঙালী-ভাই তো পাইবো।’

বাঙালীয়ানার তাৎক্ষণিক আবেগ তার শেণীচেতনা ভাসিয়ে নিয়ে ছিল। তবে সেটা ছিল সাময়িকবোধ। বছর কয় পর তার মুখেই শুনেছি ভিন্ন কথা এবং হতাশার প্রকাশ ও ভুল স্বীকার।

।দুই।

একাত্তরে জাতীয়তাবাদে সর্বজনীন চেতনাই তখনকার রাজনৈতিক বাস্তবতা। ‘সোনার বাংলা’র স্বপ্ন সব শ্রেণীর মানুষের মনে দাগ কেটে চলেছে। এর অর্জনে বাধা-বিঘ্নগুলো বড় হয়ে দেখা দেয়নি। মুক্তি সংগ্রামের সুনির্দিষ্টি পদ্ধতি জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক অঙ্গনে ‍সুন্দরভাবে নির্ধারিত হয়নি। আবারও বলতে হয়, ব্যাপক জনসমর্থনের কারণে লক্ষ্য সহজলভ্য মনে হয়েছে। প্রথমত নির্বাচননির্ভর সংসদীয় পথে ক্ষমতার আসীন হওয়া। পরে আরোপিত যুদ্ধে অন্যের সাহায্য নিয়ে আপ্রাণ লড়ে যাওয়ার কোনো বিকল্প ছিল না।

সে লড়াইয়ের আয়োজনে ও চরিত্র নির্ধারণে রাজনৈতিক নেতৃত্বের দিক থেকে সুষ্পষ্ট পরিকল্পনার অভাব ছিল। যেমন— ইয়াহিয়ার সঙ্গে অর্থহীন সংলাপ চালিয়ে যাওয়ায়, তেমিন বিকল্প সশস্ত্র প্রতিরোধ ও সংগ্রামের সুনির্দিষ্ট ব্যবস্থাপনার অভাব। পরিকল্পনা অভাবের কথা অনেকে অস্বীকার করে থাকেন। কিন্তু সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনাই যদি থাকবে তাহলে জাতীয়তাবাদী শীর্ষ নেতৃত্বকে বিচ্ছিন্নভাবে যে যার মতো অসহায়ভাবে অনির্দিষ্টভা গন্তব্যে সীমান্ত অতিক্রম করতে হবে কেন এবং সর্বোচ্চ নেতাকেই বা স্বেচ্ছায় সামরিক বাহিনীর হাতে ধরা দিতে হবে কেন? এ সব প্রশ্নের যুক্তিনির্ভর জবাব মেলে না।

তা ছাড়া বড়ো একটি প্রশ্ন— আত্মশক্তিতে লড়াই যদি লক্ষ্য হবে তাহলে লড়াইয়ের প্রধান দায়িত্ব ভারতের সমরশক্তির ওপর ছেড়ে দিতে হবে কেন? ব্যাপক জনসমর্থন সত্ত্বেও যদি লড়াইয়ের ক্ষমতা না থাকে তাহলে লড়াইয়ের প্রস্তুতি এবং সশস্ত্র গণবাহিনী তৈরীর জন্য সময় নেওয়ার মতো রাজনৈতিক কৌশলগ্রহণ অগ্রাধিকার পাওয়ার কথা। অর্থাৎ প্রয়োজনে দু’পা পিছিয়ে সময়মতো তিন’পা এগুনোর নীতিই গ্রহণ করা উচিত। তা কি করা হয়েছিল?

অথবা ‘আমি চাইছিলাম তারা আগে আঘাত করুক (ডেভিট ফ্রাটকে প্রদত্ত বক্তব্য) যদি নেতার রণকৌশল হয়ে থাকে তাহলে আঘাত প্রতিহত করার শক্তি অর্জনের বিষয়টি বিচেনায় থাকা উচিত। অর্থাৎ দরকার সমরশক্তির বিরুদ্ধে সমরশক্তির সুসংহত আয়োজন। কিন্তু কেমন সুসংবদ্ধ সামরিক পরিকল্পনা ছিল বলে কি মনে হয়? বরং তখন চিন্তা ও কাজের বিশৃঙ্খলাই প্রকাশ পেয়েছে। বিচক্ষণ দূরদর্শী চিন্তার গভীরতা ছিল অনুপস্থিত।

রোমান্টিক আবেগ উচ্ছ্বাসই প্রকাশ পেয়েছে প্রতিদিনের রাজনৈতিক তৎপরতায়। লাঠি-বৈঠা বা ডামি রাইফেলের মিছিল নিয়ে জনমনে উত্তেজনা সৃষ্টি করা যেতে পারে। কিন্তু সুসজ্জিত, প্রশংসিত সেনাবাহিনীর সঙ্গে যুদ্ধকরা সম্ভব হয় না।

হয়তো তাই প্রশ্নটি পরিণত বয়সী মানুষের মনে জেগেছে, সৃষ্টি করেছে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা। অবশ্য তারুণ্য ছিল ছিল এ সব কিছু চিন্তা-ভাবনার ঊর্ধ্বে। তাই তাদের অতিউৎসাহী সমস্যগণ সুষ্পষ্ট সংবাদ থাকা সত্ত্বেও টার্গেট এলাকা তথা ছাত্র এলাকা ছেড়ে যায়নি। পরিণামে ২৫ মার্চ রাতে ইকবাল হল, জগন্নাথ হল ট্র্যাজেডি। আর যারা রাজনীতির সূক্ষ্ম হিসাব-নিকাশ নিয়ে মাথা ঘামায় না, সেই নিম্নবর্গীয় মানুষ বা ঝুপড়িবাসী মানুষ রাজপথে দাপিয়ে বেড়িয়েছে, পাওয়া না পাওয়ার হিসাব না কষে, শুধু বাঁশিওলার মন্দ্র স্বরের আহ্বান শুনে, বুঝে না বুঝে। ওদেরই এ কাজের সবচেয়ে বেশি মাশুল বা খেসারত দিতে হয়েছিল। ওদের বস্তিতে-ঝুপড়িতে আগুনের উৎসব দেখা গেছে ২৫ মার্চ মধ্যরাতে।

একই ধরনের দাম দিয়েছে স্বাধীনতা স্বপ্ন দেখা ছাত্র, পরোক্ষ দায়ে কিছু সংখ্যক শিক্ষক-কর্মচারী। তবে আঘাতটা একটু বেশি মাত্রায় পড়েছে স্বাধিকার চেতনায় উদ্বুদ্ধ পুলিশ ও বাঙালী ইপিআর সদস্যদের ওপর। পিলখানা থেকে রাজারবাগ পুলিশ লাইনের ওপর আক্রমণ বর্বরতার সীমা অতিক্রম করেছে, তাতেঅনুতাপের কারণ ঘটেনি পাকসেনা কর্মকর্তা ও জওয়ানদের। গণহত্যার হোলি উৎসব চলেছে মহানন্দে। এক কাজ তারা পবিত্র ধর্মীয় কর্তব্যজ্ঞানে করেছে। সে রাতে কেমন কেটেছে গণহত্যা অভিযানের আশপাশ এলাকার বাসিন্দাদের? সে কে ভয়াবহ অভিজ্ঞতা সংশ্লিষ্ট মহল্লাবাসী মানুষের। মধ্যরাত থেকে গোলগুলির বিকট ও বিচিত্র শব্দ মানুষের ঘুম তো হারাম হয়েছেই, তদুপরি শাব্দিক ভয়াবহতা থেকে ঘটনার ভয়াবহতা অনুমান করে নিয়েছে সবাই। ভয়, আতঙ্ক কৌতূহল এবং ঘটনা জানার প্রচণ্ড ইচ্ছায় বিধ্বস্ত চেতনা নিয়ে চরম অনিশ্চয়তায় নির্ঘুম রাত কেটেছে তাদের। ভোরের আজানেও বন্ধ হয়নি মানুষ হত্যার অভিযান। ‘কল্যাণের জন্য এসো’-এ আজানে আহ্বান রক্তের স্রোতে ভেসে গিয়েছিল।

দুঃস্বপ্নের রাত শেষ হওয়ার পর বেতারে প্রচারিত সকালের খবরে জানা গেল দেশে নতুন করে সামরিক আইন জারি হওয়ার কথা। সেই সঙ্গে কারফিউ ঘোষণা এবং সামরিক আইনের বিধি-বিধানসমূহের বয়ান অনভ্যস্ত কণ্ঠস্বরে। স্বায়ত্তশাসন বা স্বাধীনতার দাবিতে স্বোচ্চার রাজনৈতিক দলগুলোকে রাষ্ট্রদ্রোহী হিসেবে চিহ্নিত করে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। আসলে স্বাধীনতাকামী বা স্বাতন্ত্র্যবাদী বাঙালী জাতির বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু হল এর সাংকেতিক নাম ‘অপারেশন সার্চ লাইট’।

গণহত্যার মাধ্যমে পাকিস্তানী সেনাবাহিনী পূর্ববাংলায় যে যুদ্ধের সূচনা ঘটায়, তা এক চরিত্র নিয়ে প্রতিহিংসামূলক নির্মমতা ও নিষ্ঠুরতায় নজিরবিহীন। সেই সঙ্গে ছিল পরিকল্পিত নারী নির্যাতন। গণহত্যা পিলখানা বা রাজারবাগে সীমাবদ্ধ থাকেনি, চলেছে পরবর্তী নয় মাসে নানা অমানবিক চরিত্রের প্রকাশ ঘটিয়ে। চলেছে বিশেষভাবে হিন্দু সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে। তাঁতী বাজার, শাখারী বাজারসহ দেশময় বহু এলাকা তার প্রমাণ। এ যুদ্ধের চরিত্র আরেকটি বাক্যের তাৎপর্যে প্রকাশ পেয়েছে। আর তা হল- হললোগ মিক্তি মাংতা, আদমি নেহি মানতা।’ অর্থাৎ মানুষ চাই না, মাটির অধিকার চাই না। ১৯৪৭ আগস্ট থেকে পাকিস্তানী শাসকশ্রেণী পূর্ববঙ্গের প্রতি যে নীতি বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নিয়েছিল এই যুদ্ধে সেই বাংলা-বাঙালীবিরোধী নীতিরই নগ্ন ও ন্যক্কারজনক প্রকাশ ঘটতে দেখা গেছে। এক কথায় উপনিবেশবাদী শাসন-শোষণের নীতি, সঙ্গে বাড়তি উপহার ঘৃণা অবজ্ঞা এবং তা জাতি হিসেবে বাঙালীর বিরুদ্ধে। বদলায়নি ভাষাও।

ভাবতে অবাক লাগে যে বাঙালী মুসলমান এই পাকিস্তানের জন্য চল্লিশ দশকে অন্ধ উন্মাদনার প্রকাশ ঘটিয়ে ছিল। সেখানে ছিল রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও বিচক্ষণতার অভাব। ছিল হীনমন্যতার প্রকাশ। যে হীনমন্যতার তলানী থেকে একটি রক্তক্ষয়ী স্বাধীনতা যুদ্ধের পরও মুক্তি পায়নি বাঙালী মুসলমান। পাকিস্তান প্রসঙ্গে এখানো তা আমাদের আচরণে প্রকাশ পায় সমাজের বড়সর অংশে। পাকিস্তান সম্পর্কে এ জাতীয় মানসিকতার কারণ কতটা রাজনৈতিক, কতটা সামাজিক বা কতটা চেতনার সাথে যুক্ত তা নিয়ে বিচার-বিশ্লেষণের প্রয়োজন রয়েছে।

কারণ আমাদের জাতিগর্বের উৎস সূত্রটি স্পষ্ট হবে এবং আমাদের সেক্যুলার চরিত্র বিষয়ক ধোঁয়াশাও কেটে যাবে। জাতি ও জাতীয়তার বিচারে বাঙালী মুসলমান জাতিসত্তাভিত্তিক একটা রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পরও রাজনৈতিক হীনমন্যতার হাত থেকে যে পুরোপুরি মুক্ত হতে পারেনি নানা ঘটনায় তার প্রমাণ মেলে। মেলে তাদের আচরণে। মানসিক সাম্প্রদায়িকতা বা সংকীর্ণ ধর্মীয় চেতনা সজীব রেখে কি শুধু সংবিধানের বদৌলতে সেক্যুলার, গণতন্ত্রী রাষ্ট্র গঠন করা যায়?

তা যায় না বলেই স্বাধীনতা যুদ্ধের চার দশকেও বাংলাদেশ সত্যিকার অর্থে গণতান্ত্রিক সেক্যুলার রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে উঠেনি। সমাজের চরিত্র সম্পর্কেও একই কথা খাটে। এটার দায় যেমন রাজনৈতিক, তেমনি সামাজিক। তাই শুদ্ধ সমাজতান্ত্রিক শাসন যেমন প্রতিষ্ঠা করা যায়নি, তেমনি থেকে থেকে দেখা যাচ্ছে সাম্প্রদায়িক সহিংসতার পূর্ণরূপ। যা দেখা গেছে অভিভক্ত বঙ্গে এবং দেশ ভাগের পর পাকিস্তানী পূর্ববঙ্গে।

স্বাধীনতা যুদ্ধের সুফল বা ২৬ মার্চের ঘোষণা ও চেতনা দুই-ই আমরা হারাতে বসেছি সামাজিক মূল্যবোধের দূষণে এবং দূষিত রাজনীতির কল্যাণে। তাই বিচ্ছিন্ন সম্প্রদায় চেতনার চেয়েও গুরুতর ধর্মীও মৌলবাদ-জঙ্গিবাদের আবির্ভাব ও সহিংসতার বিস্তার ‘গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ’-এ। ক্রমে ক্রমে এ প্র্রভাব বাড়ছে এতটাই যে, এ দেশে, এ সমাজে স্বাধীন চিন্তা ও বাকস্বাধীনতার বিরুদ্ধে সহিংসতা এবং হত্যাকাণ্ড অবিশ্বাস্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। একশ্রেণীর ব্লগারদের নাস্তিক জ্ঞানে কুপিয়ে মারা হচ্ছে। এই হল স্বাধীন বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট।

তাই বলতে হয়, মুক্তিযুদ্ধ করেও বাংলাদেশী সমাজের মানবিক মুক্তি মেলেনি। সে জন্য দরকার নতুন করে লড়াইয়ের এবং সমাজ পরিবর্তনের।

লেখক : কবি, প্রাবন্ধিক, ভাষা সংগ্রামী ও রবীন্দ্র গবেষক

পাঠকের মতামত:

SMS Alert

সাহিত্য এর সর্বশেষ খবর

সাহিত্য - এর সব খবর