thereport24.com
ঢাকা, রবিবার, ১৮ নভেম্বর ২০১৮, ৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৫,  ৯ রবিউল আউয়াল ১৪৪০
আল-হেলাল

অতিথি লেখক

মাছের গান ও কামাল পাশার মুক্তিযুদ্ধ

২০১৫ মার্চ ২৬ ০০:২৭:২৩
মাছের গান ও কামাল পাশার মুক্তিযুদ্ধ

‘দেশে আইল নতুন পানি, গুছে গেল পেরেশানি। মাছের বাড়ল আমদানি, দুঃখ নাইরে আর।’— কামাল পাশা

১৯৪৭ সালে দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে ভারত ও পাকিস্তান নামে দুটি রাষ্ট্রের জন্ম হয়। পূর্ব পাকিস্তান নামে পাকিস্তানে যুক্ত হয় পূর্ববঙ্গ। কিন্তু পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তান এ দুই প্রদেশের সাধারণ মানুষের মধ্যে রাজনীতি, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক সম্প্রীতি বলতে আদৌ কোনো ভ্রাতৃত্ববোধ ও ঐক্য ছিল না। বাঙালীরা বরাবরই ছিল শোষিত, নির্যাতিত আর পশ্চিমারা ছিল আগ্রাসনবাদী।

এ সবের প্রতিবাদে পূর্ববঙ্গে গড়ে ওঠে আন্দোলন। ওই সময়কার উল্লেখযোগ্য ঘটনার মধ্যে রয়েছে ভাষা আন্দোলন, যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন, শিক্ষা আন্দোলন, ১১ দফা, ৬ দফা আন্দোলন, ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান, ১৯৭০ সালের সাধারণ পরিষদ ও প্রাদেশিক পরিষদ নির্বাচন। সর্বশেষ দুটি নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন পায় আওয়ামী লীগ। তারপরও শেখ মুজিবুর রহমানের হাতে শাসনক্ষমতা অর্পণ না করে ক্ষমতাসীনরা চক্রান্তে লিপ্ত হয়। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে অসহযোগ আন্দোলনের ডাক দেন। অন্যদিকে ২৫ মার্চের কালরাতে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের নির্দেশে রাজারবাগ পুলিশ লাইনসহ পুরো রাজধানীতে নির্বিচারে গণহত্যা শুরু হয়। এরপর দীর্ঘ ৯ মাস রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মধ্য দিয়ে বিশ্ব মানচিত্রে স্বাধীন দেশ হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ। এ সবের অগ্রভাগে ছিল বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্ব। মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন ছাত্র-শিক্ষক, কৃষক-কামার-কুমার, উকিল-ব্যারিস্টার, পীর-ফকির-দরবেশ-আলেম-ওলামাসহ সকল শ্রেণী-পেশার মানুষ। কবি, সাহিত্যিক ও শিল্পীদের অবদানও ছিল অসামান্য। তাদের লেখা কবিতা ও গান শুনে বাংলার দামাল ছেলেরা উৎসাহী হয়ে রণাঙ্গনে লড়েছেন। এ রকম একজন কিংবদন্তী বাউল শিল্পী কামাল পাশা (কামাল উদ্দিন)।

পাকিস্তানের বৈষম্যমূলক আচরণ ও শোষণ-নির্যাতনের চিত্র গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করেন ভাটির এই বাউল। প্রকাশ্যে সরকারের বিরুদ্ধে গান লেখা ও গাওয়ার জন্য কামাল পাশাকে ১৯৪৮ সালে কারাভোগ করতে হয়। গ্রেফতারের পাশাপাশি প্রশাসন তার গানের পাণ্ডুলিপি পুড়িয়ে দেয়। কিন্তু তিনি ভয় পেয়ে বসে থাকার পাত্র নন। প্রশাসনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে বাঙালীর ঐতিহ্য মাছকে উপলক্ষ করে রূপক অর্থে দুঃশাসনের বিরুদ্ধে পরিবেশন করেন গণসঙ্গীত। ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট ও ১৯৭০ সালের সাধারণ পরিষদ ও প্রাদেশিক পরিষদ নির্বাচনে কামাল পাশা বিরচিত ওই সঙ্গীত নৌকা প্রতীকে আব্দুস সামাদ আজাদের বিজয়ে বিশেষ ভূমিকা রাখে। ওই সময় আরও রচনা করেন— ‘নৌকা আগে আগে চলে রে ঐ নৌকাটা শেখ মুজিবের, ও নাও দেখতে ভাল চাঁদের আলো গলই ছিল চন্দনের।’

কামাল পাশা ১৯০১ সালের ৬ ডিসেম্বর সুনামগঞ্জ জেলার দিরাই উপজেলার ভাটিপাড়া গ্রামে তালুকদার পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা বিখ্যাত সাধক পুরুষ মরমী কবি আজিম উদ্দিন, মায়ের নাম আমেনা খাতুন। ২ ভাই ও ৩ বোনের মধ্যে বড় ছিলেন কামাল পাশা। তিনি কবিয়াল কামাল, বাউল কামাল উদ্দিন, কামাল পাশা, কামাল উদ্দিন সরকার ও শেখ কামাল প্রভৃতি নামে পরিচিত। তিনি কলকাতা থেকে গ্রামোফোন রেকর্ড প্রকাশ করেন। সঙ্গীত সাধনার পাশাপাশি কামাল পাশা ১৯৩৫ সালে জমিদার আগ্রাসনের প্রতিবাদে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে ঐতিহাসিক নানকার আন্দোলন, ১৯৪৭ সালের ব্রেফারেন্ডামে অংশগ্রহণ করেন। ১৯৭০ সালের সাধারণ ও প্রাদেশিক পরিষদ নির্বাচনের আগে আজমেরীগঞ্জ, শাল্লা, দিরাই, জামালগঞ্জ ও মোহনগঞ্জ উপজেলা সদরসহ বঙ্গবন্ধুর বেশ কয়েকটি জনসভায় পরিবেশন করেন স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রের পক্ষে নির্বাচনী সঙ্গীত। মুক্তিযুদ্ধকালে তার কণ্ঠে উচ্চারিত হয়— ‘তোমরা অস্ত্র ধররে ওরে আমার বীর বাঙ্গালী ভাই, পাঞ্জাবী আসিল দেশে বাঁচার উপায় নাই।’

১৯৫৪ সালের নির্বাচনে তার রচিত ‘দেশে আইলো নতুন পানি ঘুচে গেল পেরেশানি, মাছের বাড়ল আমদানি দুঃখ নাইরে আর’ শীর্ষক ৫৪ লাইনের রোমান্টিক গান পাকিস্তানের সামরিক শাসন ব্যবস্থার বিরুদ্ধে জনমত গড়ে তোলে। পাকিস্তানী সামরিক জান্তাকে পাঙ্গাস-বোয়াল মাছ, বাঙালী জাতিকে শিং মাগুরের সঙ্গে তুলনা করে ওই গান লিখেন। নির্যাতিত জনগোষ্ঠীর জয়গান গেয়ে লিখেছেন, ‘শোন দেশের জনগণ লাগল মজার নির্বাচন, মাছে মাছে করে কীর্তন, স্বাধীনের আশায়।’ মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে ৫নং সেক্টরের অধীনস্থ টেকেরঘাট সাবসেক্টর মুক্তিফৌজের ক্যাম্পে জাগরণী গান পরিবেশন করেন। প্রতিষ্ঠাতা আহ্বায়ক হিসেবে গড়ে তুলেন সাংস্কৃতিক সংগঠন ‘স্বাধীন বাংলা শিল্পী সংগ্রাম পরিষদ’। ১৯৭৩ সালে সুনামগঞ্জ স্টেডিয়াম মাঠে জাতির জনকের সংবর্ধনা মঞ্চে গেয়ে উঠেন, ‘নৌকা বাইয়া যাওরে বাংলার জনগণ, বঙ্গবন্ধুর সোনার নাও ভাসাইলাম এখন।’

এমনি গানের মধ্যে আরও রয়েছে ‘নৌকা বানাইয়া দিল সুজন মেস্তরী, ময়ূরপঙ্খী নায়েরে আপনি কাণ্ডারী’, ‘নাও চলেরে নাও চলেরে লিলুয়া বাতাসেরে, লিলুয়া বাতাসে নাও চলেরে’, ‘কে যাও পানসি বাইয়ারে ও বিদেশী নাইয়ারে, খবর একটা যাওরে লইয়া ঘাটে নাও ভিড়াইয়ারে’, ‘মুজিব বাইয়া যাওরে তোমার ৬ দফার নাও, নিপীড়িত জনগনকে মুক্ত করে দাও’ ও ‘বাংলা মায়ের সন্তান আমরা কাঁদে কাঁদ মিলাইয়া চলি, আমরা বীরবাঙ্গালী রে ভাই আমরা বীরবাঙ্গালী’। এ সব গান দেহতত্ত্ব, সাধনতত্ত্বসহ নানা আঙ্গিকে লেখা হয়েছে।

কামাল পাশা সম্পর্কে আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য ও প্রাক্তন পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রয়াত আব্দুস সামাদ আজাদ বলেছিলেন, ‘যুক্তফ্রন্টের নির্বাচন চলাকালে ভাটি অঞ্চলে গনসংযোগে আসতে পারেননি হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, শেরেবাংলা এ কে এম ফজলুল হক, মওলানা ভাসানী ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানসহ জাতীয় নেতারা। বিশাল হাওর অঞ্চলের বৃহত্তর নির্বাচনী এলাকায় প্রার্থী হিসেবে প্রচারাভিযান চালানো আমার একার পক্ষে দুঃসাধ্য ছিল। এ সময় বাউল কামাল ভাই ও আব্দুল করিম এ দুই বাউল শিল্পী নৌকা ও আওয়ামী লীগের সমর্থনে মুসলিম লীগের বিপক্ষে পালাগান গেয়ে ১০ গ্রামের ভোটারদের আকৃষ্ট করতেন। আমার বিজয় ও আওয়ামী রাজনীতি প্রতিষ্ঠায় এ দুজন বাউল শিল্পীর অবদান আজীবন কিংবদন্তী হয়ে থাকবে।’

কামাল পাশা আগাগোড়াই রাজনীতি সচেতন ছিলেন। তিনি দিরাই থানা শাখা কংগ্রেসের সভাপতি ও সুনামগঞ্জ মহকুমা শাখার সহ-সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। কংগ্রেস নেত্রী সরোজিনী নাইডু ও পণ্ডিত জওহরলাল নেহেরুর সুনামগঞ্জ সফরকালে মহকুমা স্টেডিয়ামের বিশাল জনসভায় অখণ্ড ভারতের পক্ষে গণসঙ্গীতও পরিবেশন করেন কামাল যাশা। তিনি ব্যক্তিগতভাবে দ্বিজাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে বিভক্তির ঘোর বিরোধী ছিলেন। বিশেষ করে বৃহত্তর সিলেট জেলাকে আসাম প্রদেশ থেকে আলাদা করে পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত করাতে তার আপত্তি ছিল। দেশের সকল শিক্ষিত জনগণকে তিনি আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে গেছেন ধর্ম ও জাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে দেশ বিভক্তি হবে চরম আত্মঘাতীর শামিল। রূপক অর্থে তাই তার কন্ঠে ধ্বনিত হয়েছে, ‘জ্ঞানী মানুষ অজ্ঞান হইয়া যে দেশেতে দিন কাটায়, এমন একটা দেশে থাকার কোন মানুষের মনে চায়।’ এ গানে পাকিস্তান রাষ্ট্রের ভিত্তির উপর তার ভবিষ্যদ্বাণীর ইঙ্গিত পাওয়া যায়। পরবর্তীতে ‘আওয়ামী লীগ নাম নিয়া ছয় দফা এগিয়া’ গানে শেখ হাসিনার উল্লেখ করেন তিনি। বঙ্গবন্ধু ও কামাল পাশা ইহজগতে না থাকলেও কামালগীতি টিকে আছে স্বগৌরবে— ‘বাংলা মায়ের শ্রেষ্ঠ সন্তান বঙ্গবন্ধু নামরে, বাংলা মায়ের শ্রেষ্ঠ সন্তান বঙ্গবন্ধু নাম।’

কামাল পাশা জীবদ্দশায় নানাভাবে সম্মানিত হয়েছেন। এই সাধক জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের সিলেট শুভাগমন উপলক্ষে দেওয়া সংবর্ধনা সভায় সঙ্গীত পরিবেশন করেন। ১৯৬৪ সালের ১৮-২৪ ফেব্রুয়ারি সুনামগঞ্জ জুবিলি উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে সপ্তাহব্যাপী সাহিত্য ও সংস্কৃতি উৎসবে আয়োজক কমিটির সভাপতি ছিলেন তৎকালীন মহকুমা প্রশাসক এম এ মোত্তালিব ও আর্টস কাউন্সিল সেক্রেটারি সাংবাদিক আব্দুল হাই হাছন। তাদের আমন্ত্রণে মালজোড়া পালাগান পরিবেশন করে শ্রেষ্ঠ বাউল শিল্পীর পদকসহ ‘গানের সম্রাট’ উপাধিতে ভূষিত হন। ওই উৎসবের প্রত্যক্ষদর্শী গীতিকার ও নাট্যকার দেওয়ান মহসিন রাজা চৌধুরী বলেন, ‘অনুষ্ঠানে কিশোরগঞ্জ জেলা সদরের নীলগঞ্জ গ্রামের মনমোহনী সরকার পালাগানে বাউল কামাল পাশার কাছে পরাজিত হয়ে শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন।’ ওই অনুষ্ঠানেই ঢাকা থেকে আগত অতিথি শিল্পী আব্দুল আলিম বাউল কামাল পাশার গানের তারিফ করে নিজেকে কামাল পাশার ভাবশিষ্য বলে ঘোষণা দেন। এমনকি কামাল পাশা বিরচিত ‘প্রেমের মরা জলে ডুবে না’, ‘আমি চাইনা দুনিয়ার জমিদারী’ ইত্যাদি কামালগীতি রেডিও ও টেলিভিশনে পরিবেশন করে দেশব্যাপী সুনাম অর্জন করেন। কিন্তু কামাল পাশা আজ রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির ক্ষেত্রে অবহেলিত।

এই বাউল সাধক ১৯৮৫ সালের ৬ এপ্রিল (১৩৯২ বঙ্গাব্দের ২০ বৈশাখ) নিজ বাড়িতে ইন্তেকাল করেন।

সঙ্গীত সাধনায় কামাল পাশার ত্যাগ আদর্শ ও শ্রম বৃথা যায়নি। ২০০৮ সালের ২১ ফ্রেব্রুয়ারি গবেষক ও শিল্পী সাংবাদিক আল-হেলালের সম্পাদনায় ১০১টি গান নিয়ে ‘গানের সম্রাট কামাল উদ্দিন’ ও ২০১২ সালের ২২ জানুয়ারি ‘গানের সম্রাট কামাল পাশা’ নামে একটি বিশেষ ক্রোড়পত্র এবং ২০১৩ সালে ড. মুজিবুর রহমান চৌধুরীর সম্পাদনায় ৩০১টি গান নিয়ে ‘কামাল পাশা গীতিসমগ্র’ প্রকাশিত হয়েছে। বর্তমানে ১ হাজার গান নিয়ে ‘কামাল পাশা গীতিসমগ্র’ ২য় সংকলন প্রকাশের চেষ্টা চলছে।

লেখক : আল-হেলাল

গীতিকার, বাউল সাংবাদিক ও লোকগীতি সংগ্রাহক,

প্রতিষ্ঠাতা আহ্বায়ক বাউল কামাল পাশা স্মৃতি সংসদ, সুনামগঞ্জ।

পাঠকের মতামত:

SMS Alert

সাহিত্য এর সর্বশেষ খবর

সাহিত্য - এর সব খবর