thereport24.com
ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ৪ আশ্বিন ১৪২৫,  ৯ মহররম ১৪৪০

মুক্তিযুদ্ধের মঞ্চ নাটকে শিল্পমান

২০১৫ মার্চ ২৬ ০০:৪১:৫৩
মুক্তিযুদ্ধের মঞ্চ নাটকে শিল্পমান

পাভেল রহমান, দ্য রিপোর্ট : স্বাধীনতার চার দশক পেরিয়ে এসে বলা যায়, বাংলাদেশে শক্তিশালী শিল্প মাধ্যম হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে মঞ্চ নাটক। মুক্তিযোদ্ধা নাট্যকর্মীদের হাত ধরেই নাট্যচর্চার শক্ত ভিত্তি নির্মিত করেছে। অর্থাৎ, মঞ্চ কেন্দ্রিক নাট্যচর্চার মূল সোপান হল মুক্তিযুদ্ধ। ফলে অন্যান্য শিল্প মাধ্যমের মতো মঞ্চনাটকে বারবার উঠে এসেছে মুক্তিযুদ্ধ।

বাংলাদেশের মঞ্চ বিভিন্ন সময়ে আলোড়িত হয়েছে মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক নাটকে। উল্লেখযোগ্য নাটকের মধ্যে রয়েছে— পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়, কোর্ট মার্শাল, সময়ের প্রয়োজনে, কথা ৭১, লাল জমিন, বিদেহ, আমি বীরাঙ্গনা বলছি, টার্গেট প্লাটুন, ক্ষ্যাপা পাগলার প্যাঁচাল ও জিয়ন্তকাল। সব মিলিয়ে চার দশকে সারাদেশের বিভিন্ন নাট্যদল মঞ্চে এনেছে ৫ শতাধিক মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক নাটক। ২০১৩ সালে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমীর পৃষ্ঠপোষকতায় সারাদেশে কলেজ পর্যায়ে মঞ্চে আসে ১০০টি মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক নাটক। এ ছাড়া সরকারি অনুদানে বিভিন্ন নাট্যদল মঞ্চে এনেছে ৩০টির মতো মঞ্চ। তবে বেশীর ভাগ নাটকই মঞ্চস্থ হয়েছে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ছাড়াই।

সংখ্যা বিবেচনা করলে বলতেই হয় মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে মঞ্চে অনেক নাটক হয়েছে। তবে কতটা আশাজাগানিয়া হয়ে উঠে এসেছে? এতে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও রাষ্ট্র নির্মাণের ধারণা কতটা স্থান পেয়েছে? এ নিয়ে ভিন্নমত রয়েছে। কেউ বলছেন নাটকে মুক্তিযুদ্ধ শৈল্পিকভাবে উপস্থাপিত হচ্ছে না। মুক্তিযুদ্ধের আবেগকে গুরুত্ব দিতে গিয়ে নাটক হয়ে উঠছে স্লোগাননির্ভর। কেউ বলছেন মুক্তিযুদ্ধ তো স্লোগানেরই ফসল। নাট্যজনদের এমন বক্তব্যে উঠে এসেছে মঞ্চনাটকে জাতি গঠনের যুদ্ধ ও তার রূপায়নের সঙ্গে শিল্পমানের সম্পর্ক।

এ প্রসঙ্গে ইন্টারন্যাশনাল থিয়েটার ইন্সটিটিউটের সাম্মানিক সভাপতি রামেন্দু মজুমদার বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের নাট্যচর্চার নবজাগরণ ঘটেছিল। স্বাধীনতার চার দশকে নানাভাবে মুক্তিযুদ্ধ এসেছে আমাদের নাটকে। সব নাটক যে শিল্পোত্তীর্ণ হয়েছে সেটা বলা যাবে না। আবার কিছু নাটক অসাধারণ শিল্পমান বজায় রেখে মুক্তিযুদ্ধকে তুলে এনেছে। নাটকে ভিন্ন ভিন্ন ব্যাখা তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে। আবার মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসও তুলে ধরার চেষ্টা হয়েছে।’

আশা-নিরাশার প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘চার দশকের মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক নাট্যচর্চা যেমন সমৃদ্ধ হয়েছে তেমনি আমাদের স্বপ্ন বিস্মৃতও হয়েছে। আমাদের প্রত্যাশা বেড়েছে। আমরা মনে করছি আরও শৈল্পিকভাবে নাটকে মুক্তিযুদ্ধ আসতে পারে। এ প্রজন্মের অনেক নির্দেশকের হাতে মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক নাটকের নবরূপায়ণ ঘটছে।’

আরণ্যক নাট্যদলের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা মামুনুর রশীদ বলেন, ‘এ বিষয়টি নিয়ে বলতে গেলে দীর্ঘ কথা বলতে হবে। চার দশকের নাট্যচর্চার কথা দু-তিন লাইনে বলা যাবে না। আমি শুধু বলব চার দশকের বাংলাদেশের নাট্যচর্চায় হতাশা যেমন রয়েছে আবার সম্ভাবনা তৈরি করেছে। প্রত্যাশা-প্রাপ্তির হিসেব মেলাতে গেলে প্রাপ্তির পাল্লাই ভারী হবে।’

‘চার দশকের নাট্যচর্চা নিয়ে এখন অহংকার করা যায়’— এমনটাই মনে করেন নাগরিক নাট্য সম্প্রদায়ের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা সদস্য আতাউর রহমান। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের নাট্যচর্চা একটা অহংকার করার মতো পর্যায়ে এসেছে। তবে ৪৪ বছরে নাট্যচর্চায় মুক্তিযুদ্ধ কতোটা শিল্পোত্তীর্ণ হতে পেরেছে সেই বিচার করাটা কঠিন। মুক্তিযুদ্ধ একটি মহাকাব্য। তার সবটুকু কোনো কালেই নাটকে তুলে আনা যাবে না। ভিন্ন ভিন্ন গল্প নিয়ে এখন মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক নাটক তৈরি হচ্ছে। এভাবেই মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক নাট্যচর্চা আরও সমৃদ্ধ হচ্ছে।’

মুক্তিযুদ্ধের নাটকের আঙ্গিক নিয়ে থিয়েটার আর্ট ইউনিটের প্রধান সমন্বয় ও নাট্যনির্দেশক ড. মোহাম্মদ বারী বলেন, ‘মঞ্চনাটকে মুক্তিযুদ্ধ এসেছে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে। সরাসরি মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নিয়ে নাটক হয়েছে। আবার কিছু খণ্ড গল্প নিয়েই নাটক হয়েছে। ভিন্ন ভাবনা থেকেও নাটক হয়েছে।’

শিল্পমানের সঙ্গে তিনি বলেন, “সব নাটক যে শৈল্পিকভাবে সফল হয়েছে তা বলা যাবে না। মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক নাটক যতটুকু শিল্পমান বজায় রাখা প্রয়োজন ছিল। সেখানে কিছুটা ঘাটতি রয়েছে। আমি এ বিষয়ে তৃপ্ত নয়। তবে ‘কোর্ট মার্শাল’, ‘বৌবসন্তি’, ‘পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়’সহ বেশ কিছু নাটক রয়েছে যেগুলো বেশ শৈল্পিকভাবে মুক্তিযুদ্ধকে তুলে আনতে পেরেছে।”

মুক্তিযুদ্ধের নাটক নিয়ে হতাশাও কম নয়। শিল্পমানের প্রশ্নে ঢাকা থিয়েটারের সঙ্গে যুক্ত তরুণ নাট্যকার ও নির্দেশক রূবাইয়াৎ আহমেদ বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক নাটকের সংখ্যা বিচার করলে হয়ত অনেক পাওয়া যাবে। কিন্তু শিল্পমান বিচার করতে গেলে বেশীরভাগ নাটকই উত্তীর্ণ হতে পারেনি। মুক্তিযোদ্ধা নাট্যকর্মীদের হাতে বাংলাদেশের মঞ্চনাটকের গোড়াপত্তন হলেও মঞ্চে মুক্তিযুদ্ধ উল্লেখযোগ্য শৈল্পিক মান ও প্রণোদনা নিয়ে উপস্থাপিত হয়নি। হাতেগোনা কয়েকটি ব্যতিক্রম ছাড়া বাকিগুলো মঞ্চে নন্দনতাত্ত্বিক বিচারে ন্যুনতম মান রক্ষায় ব্যর্থ হয়েছে।’

মণিপুরি থিয়েটারের সভাপতি শুভাশিস সিনহা বলেন, “মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক নাটকগুলো অনেক বেশী স্লোগাননির্ভর হয়ে পড়েছে। স্বাধীনতার পরবর্তী সময়ের নাটকগুলোতে স্লোগানের প্রভাব অনেক বেশী। মুক্তিযুদ্ধ যেহেতু রাজনৈতিক লড়াই ছিল। এটাই স্বাভাবিক। কারণ স্লোগান থেকেই তো মুক্তিযুদ্ধ। তবে মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে মানবিক, সামাজিক অনেক ঘটনা ছিল। যেগুলো নাটকে কম এসেছে। সাম্প্রতিক সময়ের নাটকে আবার সেখান থেকে বের হওয়ার চেষ্টা করছে। ‘লাল জমিন’, ‘বিদেহ’, ‘কোর্ট মার্শাল’, ‘বৌবসন্তি’সহ অনেকগুলো নাটকে সেটা দেখা গেছে। ফলে নানা রকম পরীক্ষা-নীরিক্ষার মধ্য দিয়ে মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক নাটকের চর্চা হচ্ছে। সেখানে শিল্পমান খুঁজতে গেলে সাফল্য-ব্যর্থতা দুটোই রয়েছে।”

(দ্য রিপোর্ট/পিএস/ডব্লিউএস/মার্চ ২৬, ২০১৫)

পাঠকের মতামত:

SMS Alert

জলসা ঘর এর সর্বশেষ খবর

জলসা ঘর - এর সব খবর



রে