thereport24.com
ঢাকা, শনিবার, ১৭ নভেম্বর ২০১৮, ৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৫,  ৮ রবিউল আউয়াল ১৪৪০

কবির যুদ্ধযাত্রা : রাজপথ থেকে রণাঙ্গন

২০১৫ মার্চ ২৬ ০১:২৬:১৯
কবির যুদ্ধযাত্রা : রাজপথ থেকে রণাঙ্গন

ড. তপন বাগচী

মুক্তিযুদ্ধে আমাদের কবিরা সজাগ-সক্রিয় ছিলেন কেউ কলম হাতে, কেউ অস্ত্র হাতে। কবি শামসুর রাহমান ঢাকা থেকে পালিয়ে গ্রামে গিয়ে রচনা করেন ‘বন্দিশিবির থেকে’। ছদ্মনামে তাঁর কবিতা যুদ্ধের সময় প্রকাশিত হয় কলকাতার পত্রপত্রিকা থেকে। কবি মোহাম্মদ মনিরুজ্জামানও লিখেছেন অজস্র কবিতা। কবি আল মাহমুদ যুদ্ধের সময় কলকাতায় গিয়ে আশ্রয় নিলেও মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে সেই সময়ে কোনো কবিতা লিখেছেন বলে আমাদের জানা নেই। কবি সৈয়দ আলী আহসান, কবি মহাদেব সাহা, কবি নির্মলেন্দু গুণ, কবি আসাদ চৌধুরী, কবি সুব্রত বড়ুয়া শব্দসৈনিক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।

এর চেয়ে এগিয়ে গিয়ে আমাদের অনেক কবি সরাসরি যুদ্ধ করেছেন অস্ত্র হাতে। কবি রফিক আজাদ আর কবি মাহবুব সাদিক তো টাঙ্গাইলে কাদেরিয়া বাহিনীর সক্রিয় যোদ্ধা ছিলেন। কবি আবু কায়সার ও মাহবুব হাসানও ছিলেন সশস্ত্র যোদ্ধা। আর কিশোরগঞ্জে সশ্রস্ত যুদ্ধ করেছেন কবি আবিদ আনোয়ার। সত্তর দশকের অন্যতম প্রধান কবি তিনি। কবিতার জন্যে পেয়েছেন বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার; বিজ্ঞানসাহিত্যের জন্য যুবক বয়সেই পেয়েছেন রাষ্ট্রপতি পুরস্কার; সাহিত্যের বিভিন্ন শাখায় অবদানের জন্য স্বাধীনতার রজত জয়ন্তী উপলক্ষ্যে সৈয়দ নজরুল ইসমলাম পদক, মুক্তিযোদ্ধা-কবি হিসেবে পেয়েছেন রাইটার্স-এর স্মারক পদক; এবং ছড়া-সাহিত্যের জন্য সুকুমার রায় সাহিত্য পুরস্কার। রসায়নের ছাত্র হয়েও কেবল লেখক ও বিজ্ঞান জার্নালের সম্পাদক হওয়ার সুবাদেই যুক্তরাষ্ট্রের মিসৌরি বিশ্ববিদ্যালয়-কলাস্বিয়ায় সাংবাদিকতায় উচ্চশিক্ষার জন্য বিশ্ব ব্যাংকের বৃত্তিলাভকেও আমরা তার লেখালেখিরই একটি পুরস্কার হিসেবে ধরে নিতে পারি। আরও বিস্ময়কর ঘটনা মিসৌরি বিশ্ববিদ্যালয়ে সাংবাদিকতার মতো বিষয়ে ৪৮ ক্রেডিট আওয়ারে মোট ৪-এর মধ্যে ৩.৯৩৮ জিপিএ প্রাপ্তি। এই একাডেমিক কৃতিত্বের জন্য এবং সাংবাদিকতা-সংক্রান্ত গবেষণাকর্মের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় সাংবাদিকতা বিশেষজ্ঞ সমিতি (ন্যাশনাল জার্নালিজম স্কলারশিপ সোসাইটি অব আমেরিকা) ১৯৮৭ সালে তাঁকে সম্মানসূচক সদস্যপদ দান করেছে। তাঁর ইংরেজি স্ক্রিপ্টনির্ভর অনুষ্ঠানের জন্য বাংলাদেশ বেতার দুই দুইবার (২০০৫ ও ২০০৮ সালে) কমনওয়েল্থ ব্রডকার্স্টিং এ্যাসোসিয়েশন পুরস্কার পেয়েছে।

আমি ১৯৯৭ সালে পাক্ষিক ‘অন্যদিন’ পত্রিকায় কন্ট্রিবিউটর হিসেবে কাজ শুরু করি। ফেব্রুয়ারির শেষের দিকে মুক্তিযোদ্ধা লেখকদের নিয়ে একটি প্রতিবেদন রচনার উদ্যোগ নিই। পঞ্চাশের দশকের কবি শামসুর রাহমান ও আল মাহমুদ, ষাটের কবি রফিক আজাদ ও মাহবুব সাদিক এবং সত্তরের কবি আবিদ আনোয়ারের সাক্ষাৎকার গ্রহণের পরিকল্পনা করি। রাহমানভাই আমাকে বলেন, ‘তুমি যে অর্থে মুক্তিযোদ্ধা বলছ, আমি তা নই। আমি অস্ত্রহাতে যুদ্ধ করি নাই, কবিতা হাতে যুদ্ধ করেছি।’ রাহমানভাই সাক্ষাৎকার দিলেন না। আমার পরিকল্পনার কথা জেনে ষাটের দশকের টাঙ্গাইলের আরেক কবি-সাংবাদিক আমাকে ডেকে বললেন, “তোমার প্রতিবেদনের পরিকল্পনাটি ভাল। কিন্তু আমিও যে মুক্তিযুদ্ধ করেছি, আমার সাক্ষাৎকারও তো নিতে পারো।” তিনি চাকরি করতেন এমন একটি পাক্ষিক কাগজে, যাতে আমি একসময় অল্পবিস্তর লেখালেখি করেছি। কিন্তু তাঁর মুক্তিযোদ্ধা পরিচয়টি না-জানা থাকায় বরং লজ্জা পেয়ে যাই। আমি তাঁকে কয়েকটি প্রশ্ন-লেখা একটি কাগজ দিই এবং সাক্ষাৎকারটি লিখিত আকারে দিতে অনুরোধ করি। তিনি পরের দিন বাসায় যেতে বলেন। ইতোমধ্যে আমি মাহবুব সাদিককেও লিখিত প্রশ্নমালা দিয়েছি। তিনি পরের দিন বইমেলা থেকে তাঁর উত্তর সংগ্রহ করার কথা বলেন। সেই কবি-সাংবাদিকের বাসা থেকে তাঁর লিখিত বক্তব্য সংগ্রহ করে মেলায় আমি মাহবুব সাদিকের বক্তব্য সংগ্রহের জন্য যাই। মেলায় একটু খুঁজেই দেখা পাই সাদিকভাইয়ের। তিনি লিখিত সাক্ষাৎকারের কপিটি আমার হাতে তুলে দেন। তারপর দু’জনে মেলায় ঘুরতে থাকি। একসময় তিনি বলেন, “আর কারো কি জবাব পেয়েছেন?” আমি বলি, “হ্যাঁ, আপনাদের আরেক কবিবন্ধু লিখে দিয়েছেন।” ওই কবির নাম শুনেই তিনি চমকে উঠলেন। বললেন, “দেখি ও কী লিখেছে?” আমি পকেট থেকে কথিত কবি-সাংবাদিকের কাছ থেকে পাওয়া কাগজখানা দিই। তিনি তৎক্ষণাৎ পড়ে আমাকে ফেরত দেন এবং নিজের লেখাটা আমার কাছ থেকে নিয়ে একটু দেখতে চান। বলার ভঙ্গিটা এমন যেন ওতে আরও কিছু তথ্য যোগ করবেন। আমি লেখাটি বাড়িয়ে দিতেই তিনি ছোঁ মেরে নিয়ে ছিঁড়ে টুকরো টুকরো করে মেলার ঘাসে ছড়িয়ে দিলেন। এবং মেলার গেটের দিকে দ্রুত বেগে পা ছোটালেন। আমি পেছন পেছন দৌড়ে যাই। তিনি মেলার বাইরে চলে গেলেন এবং বাসার দিকে ছুটলেন। সাদিকভাইকে কখনো উত্তেজিত হতে দেখি নি। আমার কোনো আচরণে এই প্রতিক্রিয়া হবে ভাবতে পারিনি। আবার প্রকৃত কারণটাও বুঝতে পারছি না। তাই তাঁর সামনে গিয়ে দাঁড়াই। তিনি এবার শাস্ত ভঙ্গিতে বলেন, “ও যদি মুক্তিযোদ্ধা হয়, তাহলে নিজেকে মুক্তিযোদ্ধা পরিচয় দিতে চাই না। তাই আমার সাক্ষাৎকার ছিঁড়ে ফেলেছি। যান এ-ব্যাপারে আর আমি কথা বলব না। পারলে রফিক আজাদকে জিজ্ঞেস করুন।” সাদিকভাই চলে গেলেন। আমি ওই কবি-সাংবাদিকের আগবাড়িয়ে সাক্ষাৎকার দেওয়ার রহস্য বুঝতে পারলাম। অগত্যা, আমি ওই প্রতিবেদন রচনা থেকে বিরত থাকার চেষ্টা করি। কিন্তু আমার মাধ্যমে মুক্তিযোদ্ধা পরিচয়কে জানান দিতে চাওয়া ওই কবি-সাংবাদিক ক্ষেপে রইলেন। ঝোঁপ বুঝে কোপ দিতেও ছাড়েননি তিনি। আমি একসময় কবি রফিক আজাদের কাছেও ওই ঘটনার কথা পাড়ি। তাঁর সাথে উনি যুদ্ধে ছিলেন কি না জানতে চাই। রফিক ভাই বলেন, “দেখো ভাই, যারে ক্ষমা করে দিছি। তার কথা বলা উচিত হবে না। এটা আমার নীতিতে নাই। তুমি অন্য কারো কাছ থেকে জেনে নিও।” আমার বুঝতে আর বাকী থাকে না মুক্তিযুদ্ধে তাঁর অবস্থান কী ছিল। কিন্তু আজ সেই বিষয়ে বলার জন্য নয়, শামসুর রাহমানের কথা বলার জন্যই ওই ঘটনা মনে পড়ল। কবি শামসুর রাহমান মুক্তিযুদ্ধে অস্ত্র হাতে অংশ না-নিলেও তিনি প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা। আর যাঁরা মুক্তিযুদ্ধের সময় ভারতে আশ্রয় নেওয়াকে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ হিসেবে জাহির করেন কিন্তু প্রতিক্রিয়াশীলদের হাত শক্তিশালী করেন তাঁদের মুক্তিযোদ্ধা বলতে আমার বিবেকে বাঁধে। তাঁদের মুক্তিযোদ্ধা বললে তো ভারতে আশ্রয় নেওয়ার কারণে আমার মতো ৩/৪ বছরের বালককেও মুক্তিযোদ্ধা বলতে হবে।

মুক্তিযুদ্ধে কোনো অবদান না-রেখে এমনকি বিরোধিতা করেও কেউ কেউ মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে নিজেকে জাহির করে। আমি ওই ঘটনার পরে কবি মাহবুব সাদিক আর কবি আবিদ আনোয়ারকে অনেকবার বলেছি তাঁদের স্মৃতিকথা লেখার জন্য। মাহবুব সাদিক আশ্বাস দিয়ে চলেছেন এখনো। আর আবিদ আনোয়ার বলতেন, “বিচ্ছিন্ন অনেক ঘটনা লিখেছি ও পত্রিকায় ছাপিয়েছি। বইয়ের রূপ দিতে সময় লাগবে”। আমি বলতাম, “বাকি অংশ লিখে বই করে ফেলুন।” এতদিন পরে বেরুল আবিদ আনোয়ারের ‘আমার মুক্তিযুদ্ধ : রাজপথ থেকে রণাঙ্গন’ (আগামী প্রকাশনী, ঢাকা ২০১৫) নামের সেই স্মৃতি-ইতিহাস। এই গ্রন্থটি ৪টি কারণে গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমত এটি একজন বড় কবির রচনা, দ্বিতীয়ত এটি ইতিহাসের বয়ান, তৃতীয়ত মুক্তিযুদ্ধের বিবরণ, চতুর্থত এটি এক যোদ্ধাকবির আত্মসাক্ষ্য।

কবি আবিদ আনোয়ার কেবল কবি নন, ছড়াকার-গীতিকার তো বটেই, প্রাবন্ধিক ও কথাসাহিত্যিক হিসেবেও খ্যাতিমান। তাঁর স্মৃতিমূলক গদ্য যে আকর্ষণীয় হয়ে উঠবে, তা লেখাই বাহুল্য। কবির ব্যক্তিগত তথ্য জানার জন্য পাঠকের ব্যাকুলতা থাকে, কিন্ত সেই ব্যক্তিগত তথ্য যদি আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে সম্পর্কিত হয়, তখন তা জাতীয় সম্পদে পরিণত হয়। এই গ্রন্থে মুক্তিযুদ্ধের পটভূমি সম্পর্কে রয়েছে কবির নিজস্ব ব্যাখ্যা। এই গ্রন্থ যেহেতু তাঁর একান্ত অভিজ্ঞতার কথন, তাই ইতিহাস থেকে তিনি টীকাটীপ্পনী খুঁজতে যাননি, নিজের দেখা এবং তাঁর ব্যাখ্যাই হয়ে উঠেছে ইতিহাসের উপকরণ।

আমরা জাসদ গঠনের যে পটভূমি জানি, আবিদ আনোয়ার তাকে অন্বিত করেছেন মুক্তিযুদ্ধেরও আগের একটি ঘটনার সঙ্গে। ছাত্রসমাজের পক্ষ থেকে বঙ্গবন্ধুকে তাঁর এই উপাধি দেওয়ার কয়েকমাস পরে ছাত্রলীগের জাতীয় সম্মেলন হয়। এতে প্রধান অতিথি হিসেবে আসেন সদ্যকারামুক্ত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব। সেদিন আসম আবদুর রব দাবী তুলেছিলেন—পূর্বপাকিস্তানের স্বাধীনতাই বাঙালী জাতির একমাত্র পথ। তিনি স্লোগান দিয়েছিলেন, ‘স্বাধীন জনগণতান্ত্রিক পূর্ব বাংলা কায়েম করো’—এই দাবীর প্রতি সমর্থন দেন শাহাজাহান সিরাজ, কাজী আরেফ, হাসানুল হক ইনু, মার্শাল মণি, মাহবুবুল আলম ও আরও অনেকে। কিন্তু স্বায়ত্তশাসনের দাবী নিয়ে আরও কিছুদিন অপেক্ষা করার পক্ষে ছিলেন শেখ ফজলুল হক মণি, তোফায়েল আহমেদ, আব্দুল কুদ্দুস মাখন, নূরে আলম সিদ্দিকী প্রমুখ। এই নিয়ে বিতর্ক হলে আসম আব্দুর রব সম্মেলনস্থল থেকে বেরিয়ে এলে তাঁর সঙ্গে বেশীর ভাগ নেতাকর্মী বের হয়ে আসেন। ছাত্রলীগের দ্বিধাবিভক্তি তখনই ঘটে! কবির এই পর্যবেক্ষণ তো ইতিহাসেরই অংশ। স্বাধীন দেশের ছাত্রলীগের বিভক্তি এবং জাসদের জন্ম তো এই মতানৈক্যকে ঘিরেই। প্রকৃত বিভাজনটা পরে হয়েছে, এই যা সত্য। আবিদ আনেয়ার তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেবল একজন মেধাবী ছাত্রই নন, ফজলুল হক হল ছাত্রলীগ শাখার নেতৃস্থানীয় কর্মী এবং স্বাধীনতার পর ছাত্রসংসদের সাহিত্য সম্পাদক এবং পরে ভারপ্রাপ্ত ভিপি হিসেবে যথেষ্ট রাজনীতি-সচেতন ব্যক্তি। তাঁর পর্যবেক্ষণের গুরুত্ব তাই অস্বীকার করার সুযোগ নেই।

স্বাধীনতার ঘোষণা নিয়ে এই দেশে অনাকাঙ্ক্ষিত বিতর্ক চলছে। আবিদ আনোয়ারের মতে, ২রা মার্চ ছাত্রজনতার পক্ষ থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলাভবনে ডাকসু ও ছাত্রলীগের নেতৃবৃন্দের পতাকা উত্তোলন, স্বাধীনতার ইশতেহার পাঠ এবং ‘আমার সোনার বাংলা’কে জাতীয় সঙ্গীত হিসেবে ঘোষণা দেওয়া এবং গাওয়ার মধ্য দিয়ে স্বাধীনতার প্রথম আনুষ্ঠানিক ঘোষণা জারী হয়েছে। এটিই ইতিহাসের সত্য। এখন ২রা মার্চ, ৭ই মার্চ, ২৫শে মার্চ, ২৬শে মার্চ, ২৭শে মার্চ— কোন দিনকে স্বাধীনতার ঘোষণার দিন হিসেবে ঠিক করা হবে, তা জানেন ইতিহাসবিদগণ।

প্রকৃত যুদ্ধ শুরু হওয়ারও আগে ১৩ মার্চ ডাকসু ও ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় নেতাদের নির্দেশে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জন হল এলাকার প্রতিটি বিজ্ঞান গবেষণাগার থেকে রাসায়নিক দ্রব্য অপসারণ করা হয় প্রকাশ্য দিবালোকে। যাঁরা আসল কাজটি করেছিলেন তাঁদের নেতৃত্বে ছিলেন রসায়ণ বিভাগ থেকে আবিদ আনোয়ার, আলাউদ্দিন আহমেদ (যিনি পরবর্তীকালে পর্যায়ক্রমে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য, সংসদ সদস্য এবং প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষাবিষয়ক উপদেষ্টা হন), গোলাম কিবরিয়া (যিনি বর্তমানে জার্মানিতে ন্যাটোর সদর দফতরে কর্মরত) এবং প্রাণরসায়ণ বিভাগের আনোয়ার হোসেন (যিনি কর্নেল তাহেরের ছোটভাই, এখন প্রাণরসায়ণ বিভাগের অধ্যাপক এবং কিছুকাল আগে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ছিলেন)। সে-সব রাসায়নিক দ্রব্য পাঠানো হয়েছিল জিঞ্জিরার এক গোপন আস্তানায় যেখানে প্রকৌশলবিদ্যায় পারদর্শী ছাত্রনেতা, বর্তমান তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনুর নেতৃত্বে বোমা তৈরী হতো। এই ঘটনাকে সঙ্গত কারণে অনেকেই মুক্তিযুদ্ধের প্রথম অপারেশন বলে গণ্য করেন। জিঞ্জিরায় তৈরী সেই বোমা দিয়ে ঢাকায় বেশ কয়েকটি অপারেশন পরিচালিত হয় পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগেই।

এপ্রিলের প্রথম দিকেই আবিদ আনোয়ার ভারতে যান প্রশিক্ষণের জন্য। সঙ্গে ছিলেন ক্যাপ্টেন মতিউর রহমান, আলাউদ্দিন আহমেদ ও ক্যাপ্টেনের ভাই হাবিবুর রহমান। ভারতযাত্রার চমৎকার ও লোমহর্ষক বিবরণ তিনি দিয়েছেন। এর আগে তাঁর হবু শ্বশুর ডা. জামাতউল্লাহর বাড়িতে পাকি মিলিটারিরা আগুন দিলেও বাড়ির পোষা অস্ট্রেলিয়ান জাতের কুকুর বাঘার আক্রমণে প্রাণ দিতে হয় দু’জন মিলিটারিকে, আহত হয় আরও কয়েকজন। শেষে অবশ্য তাদের ব্রাশ ফায়ারে বাঘাকেও প্রাণ দিতে হয়েছিল। সেই বাঘাকেও তিনি মুক্তিযোদ্ধার সম্মান দিয়ে বলেছেন, “আমি আমার হবু স্ত্রীকে সান্ত্বনা দিতে-দিতে বলেছিলাম : আমরা নিরস্ত্র বলে মানুষ হয়েও যা পারছি না তোমাদের বাঘা তা পেরেছে। এমন একটি কুকুর হয়ে জন্ম নিলেও এখনি ওদের সাথে যুদ্ধ শুরু করতে পারতাম।”

মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে ফজলুল হক হলের তাঁর দুই রুমমেট আব্দুল কুদ্দুস মাখন ও মাহবুব জামানের কথা বলেছেন। প্রথমজন ছাত্রলীগের নেতা এবং শেষেরজন ছাত্রইউনিয়নের নেতা ও ডাকসুর প্রাক্তন জিএস।

আগরতলার লিচুবাগান ক্যাম্পে পৌঁছার পর অনাকাঙ্ক্ষিত কারণে তাঁর নিজের, আলাউদ্দিন আহমেদ ও ক্যাপ্টেন মতিউর রহমানের বন্দিত্ব বরণ, আব্দুল কুদ্দুস মাখন ও আসম আব্দুর রবের আগমনে বন্দিত্ব থেকে মুক্তি, পলাশী নৌকমান্ডো প্রশিক্ষণ ক্যাম্পে আংশিক প্রশিক্ষণ এবং চাকুলিয়া ক্যাম্পে স্পেশাল কমান্ডো হিসেবে পূর্ণাঙ্গ প্রশিক্ষণের কথা লিখেছেন তাঁর বইতে। প্রশিক্ষণ শেষে কলকাতার ব্যারাকপুর ক্যান্টনমেন্টে গমন করেন। এরপর দ্বিতীয় ট্রানজিট কল্যাণী বিশ্ববিদ্যালয় মেডিকেল কলেজ ও তৃতীয় ট্রানজিট গোহাটি হয়ে ত্রিপুরার হেজামারায় তিন নম্বর সেক্টরের হেডকোয়ার্টারে আসেন। তারপর বাংলাদেশে প্রবেশ করে বেশ কয়েকটি অপারেশনে অংশ নেন। আবিদ আনোয়ারের বড় কৃতিত্ব ধুলদীয়া রেলসেতু অপারেশনে নেতৃত্ব দান। এই অপারেশনের বিস্তৃত পরিকল্পনা এবং বাস্তবায়নের খুঁটিনাটি বিবরণ রয়েছে আলোচ্য গ্রন্থে। এরপর মানিকখালী রেলকালভার্ট অপারেশন, কালিয়াপাচড়া চিনিকল-এলাকা থেকে পাকিসেনাদের বিতাড়ন এবং ট্রুপ কমান্ডার থেকে আঞ্চলিক কমান্ডারের পদমর্যাদায় উন্নীত হওয়ার পরে ধুলদীয়ায় আঞ্চলিক ক্যাম্প স্থাপন ও পরবর্তী যুদ্ধ পরিচালনার ইতিবৃত্ত বর্ণিত হয়েছে এতে। বীরত্ব এবং দক্ষতার জন্য তিনি কিশোরগঞ্জ মহকুমা মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্পের কমান্ড্যান্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তাঁর সেই পদে খণ্ডকালীন দায়িত্বে ছিলেন ক্যাপ্টেন মতিউর রহমান ও লে. সাদেক। বেশ কিছুদিন ভারতীয় কাউন্টারপার্ট ছিলেন ক্যাপ্টেন চৌহান। এই ক্যাম্পের ‘চেয়ারম্যান’ পদ তৈরী করে তাঁর দায়িত্ব দেওয়া হয় মুজিব বাহিনীর আঞ্চলিক প্রধান এ্যাডভোকেট মোঃ আব্দুল হামিদকে, বর্তমানে যিনি মহামান্য রাষ্ট্রপতি।

স্মৃতিকথায় আমিত্ব থাকবে। এই স্মৃতিকথায়ও তা রক্ষিত হয়েছে। কিন্তু অন্যদের কৃতিত্বকে অস্বীকার করার প্রবণতা নেই আবিদ আনোয়ারের মধ্যে। মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিকথা যাঁরা লিখেছেন, তাঁদের অনেকের লেখাতেই অন্যদের অবদানের তথ্য জানা যায় না। এ ব্যাপারে আবিদ আনোয়ার উদার ও সৎ। আর এই গ্রন্থের কৃতিত্ব এখানেই। এই গ্রন্থে পরিশিষ্ট হিসেবে ছাপা হয়েছে ‘মুক্তিযোদ্ধার সংজ্ঞা ও সংখ্যা’ নামে ‘প্রথম আলো’তে প্রকাশিত একটি উপসম্পাদকীয় যাতে রয়েছে আবিদ আনোয়ারের কিশোরগঞ্জ মহকুমা মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্প পরিচালনার বর্ণনা, এর ঋণাত্মক প্রতিক্রিয়ায় ‘ডেইলি স্টার’-এ প্রকাশিত সৈয়দ ফাত্তাউল আলিমের একটি ইংরেজি রচনা এবং সাপ্তাহিক বিচিত্রা’য় প্রকাশিত ‘নিউইয়র্ক টাইমস বনাম মার্কিন সরকার’ নামের একটি চাঞ্চল্যকর তথ্যসমৃদ্ধ প্রবন্ধ যার লেখক আবিদ আনোয়ার।

কবি আবিদ আনোয়ার সশস্ত্র যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েছিলেন। কবির কলম সরিয়ে রেখে দেশের স্বাধীনতার জন্য অস্ত্র হাতে নিয়েছিলেন। জীবনবাজী রেখে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ার এই বীরত্বকে আমরা শ্রদ্ধা জানাতে চাই। রাজপথ থেকে রণাঙ্গনে কবির এই যাত্রাকে আমরা ভালবাসা দিয়ে বরণ করতে চাই। কিশোরগঞ্জ অঞ্চলকে শত্রুমুক্ত করার জন্য তিনি যে ত্যাগ ও বীরত্ব প্রদর্শন করেছেন, তার বিবরণ আমাদের জাতীয় ইতিহাসেরই অংশ।

লেখক : কবি, গবেষয়ক ও উপপরিচালক, বাংলা একাডেমি, ঢাকা



পাঠকের মতামত:

SMS Alert

মুক্তমত এর সর্বশেষ খবর

মুক্তমত - এর সব খবর