thereport24.com
ঢাকা, শুক্রবার, ২১ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ৬ আশ্বিন ১৪২৫,  ১০ মহররম ১৪৪০

সাংবিধানিকভাবে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষক

২০১৫ মার্চ ২৬ ১৪:১১:০২
সাংবিধানিকভাবে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষক

বিচারপতি কামাল উদ্দিন হোসেন

সংবিধানের আক্ষরিক অর্থে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীনতার ঘোষক ও মর্মার্থে জাতির জনক। স্বাধীনতার ঘোষকের কথা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মৃত্যুর আগে পর্যন্ত কেউ তোলেন নি। তার মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ডের পর কেউ কেউ তুলেছেন তবে তির্যকভাবে। সুতরাং এ ধরনের জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে বিভ্রান্তি দূর হওয়া আবশ্যক। সংবিধান ঠিকভাবে পড়লে এই বিভ্রান্তির কোনো অবকাশ থাকে না। সাংবিধানিকভাবে সব সংশোধনের পরও বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণাদাতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, স্থান ঢাকা, কাল ২৬ মার্চ ১৯৭১ সাল। আমি সম্পূর্ণ সাংবিধানিক আলোচনার মধ্যে আমার বক্তব্য সীমাবদ্ধ রাখব। তবে তার আগে একটা ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট হিসেবে বলতে হয় বিংশ শতাব্দীর চল্লিশের দশকে নেতাজী সুভাষ বসু যখন কুখ্যাত হলওয়েল স্তম্ভ অপসারণের আন্দোলন করেন সেই আন্দোলনের কর্মী হিসেবে শেখ মুজিব ছিলেন। ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান আন্দোলনেও জড়িত ছিলেন। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর ১৯৪৮ সাল থেকে বাংলা ভাষাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষার মর্যাদাদানের আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন সক্রিয়ভাবে। ১৯৫৪ সালে প্রাদেশিক নির্বাচনে মুসলিম লীগের বিরুদ্ধে যুক্তফ্রন্টের কর্মী, ১৯৫৭ সালে আতাউর রহমান খানের নেতৃত্বে গঠিত আওয়ামী লীগের প্রাদেশিক মন্ত্রিসভায় শিল্পমন্ত্রীর পদ বরণ, ১৯৫৮ সালে আইয়ুব খানের সামরিক শাসন প্রবর্তনের পর বিভিন্ন পর্যায়ে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে অংশগ্রহণ, ১৯৬৬ সালে তার বিখ্যাত পূর্ব পাকিস্তানের স্বাধিকার ৬-দফা দাবি, আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় শেখ মুজিবকে জড়ানোর প্রতিবাদে ১৯৬৯ সালের গণ-অভ্যুত্থান, উক্ত মামলা থেকে মুক্তি ও জনসমাবেশে তাকে বঙ্গবন্ধু অভিধা প্রদান এবং ১৯৭০ সালে পাকিস্তানের প্রথম ও শেষ নির্বাচনে শেখ মুজিবের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগের ঐতিহাসিক বিজয়ের কথা মনে রাখতে হবে। পরবর্তী ঘটনার বিবরণ আমরা মুজিবনগরে ঘোষিত স্বাধীনতার ঘোষণা Proclamation of Independence থেকে পাব যা আজকের সংবিধানের অঙ্গ হয়ে গেছে। তাছাড়া বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের সাত মার্চের ঐতিহাসিক গুরুত্বপূর্ণ ডাক ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম আমাদের স্বাধীনতার সংগ্রাম’, এবং তার পরিণামে সার্বিক অসহযোগ ও হরতালের উল্লেখ করতে হয়। এবার সংবিধানে বর্তমান আকারে যা আছে তাই দেখা যাক, অর্থাৎ পঞ্চম সংশোধনীর পরেও যা দাঁড়িয়েছে। সংবিধানের প্রস্তাবনার প্রথম পরিচ্ছেদে আছে :

‘আমরা বাংলাদেশের জনগণ ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দের মার্চ মাসের ২৬ তারিখে স্বাধীনতা ঘোষণা করিয়া জাতীয় স্বাধীনতার জন্য ঐতিহাসিক যুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীন ও সার্বভৌম গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত করিয়াছি।’

এখানে স্বাধীনতার ঘোষক কোনো একজন ব্যক্তি নন বরং আমরা, বাংলাদেশের জনগণ, আবার ঘোষণার তারিখ ২৭ মার্চ নয়, ২৬ মার্চ ১৯৭১ সাল। এর অর্থ দাঁড়ায় সংবিধানে এখানে মুজিবনগরে প্রকাশিত ঘোষণাপত্রকে উল্লেখ করা হচ্ছে এবং এই ঘোষণার মূল বিষয় সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে। তাই মুজিবনগরে গৃহীত ১০ এপ্রিল স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রের প্রাসঙ্গিক অংশ তুলে ধরতে হয়। প্রথমে মূল ইংরেজি, পরে তার অনুবাদ। ঘোষণাপত্রের প্রাসঙ্গিক অংশ :

THE PROCLAMATION OF INDEPENDENCE

Mujibnagar, Bangladesh

Dated 10th day of April, 1971

WHEREAS free elections were held in Bangladesh from 7th December 1970 to 17th January, 1971 to elect representatives for the purpose of framing a Constitution;

AND WHEREAS at these elections the people of Bangladesh; elected 167 out of 169 representatives belonging to Awami League;

AND WHEREAS General Yahya Khan summoned the elected representatives of the people to meet on the 3rd March, 1971, for the purpose of framing of Constitution;

AND WHEREAS the Assembly so summoned was arbitrarily and illegally postponed for an indefinite period;

AND WHEREAS instead of fulfilling their promise and while still conferring with the representatives of the people of Bangladesh, Pakistan authorities declared an unjust and treacherous war;

AND WHEREAS in the facts and circumstances of such treacherous conduct Banga Bandhu Sheikh Mujibur Rahman the undisputed leader of 75 million of people of Bangladesh, in due fulfilment of the legitimate right of self determination of the people of Bangladesh, duly made a declaration of independence at Dhaka on March 26, 1971, and urged the people of Bangladesh to the honour and integrity of Bangladesh;

AND WHEREAS in the conduct of a ruthless and savage war Pakistani authorities committed and are still continuously committing numerous acts of genocide and unprecedented tortures, amongst others on the civilian and unarmed people of Bangladesh;

AND WHEREAS the Pakistan Government by levying an unjust war and committing genocide and by other repressive measures made it impossible for the elected representatives of the people of Bangladesh to meet and frame a Constitution, and give to themselves a Government;

AND WHEREAS the people of Bangladesh by their heroism, bravery and revolutionary fervour have established effective control over the territories of Bangladesh;

We the elected representatives of the people of Bangladesh, as honour bound by the mandate given to us by the people of Bangladesh whose will is supreme, duly constituted ourselves into a Constituent Assembly, and having held mutual consultations, and in order to ensure for the people of Bangladesh equality, human dignity and social justice,

declare and constitute Bangladesh to be a Sovereign People's Republic and thereby confirm the declaration of independence already made by Banga Bandhu Sheikh Mujibur Rahman and

We further resolve that this Proclamation of Independence shall be deemed to have into effect from 26th day of March, 1971,

সংবিধানের প্রস্তাবের সঙ্গে মিলিয়ে ঘোষণাপত্রের তর্জমা ও ব্যাখ্যার পূর্বে বলতে হয় এই ঘোষণাপত্র বা Proclamation of Independence -কে সংবিধানের ৪র্থ তফসিলের ৩য় অনুচ্ছেদে অঙ্গীভূত করা হয়েছে। তাছাড়া এর বরখেলাফকে রাষ্ট্র সার্বভৌমত্বের বিরুদ্ধাচরণ গণ্য করে 123A Penal Code- -এ দ-নীয় অপরাধ ধার্য করা হয়েছে। যার প্রাসঙ্গিক অংশ হচ্ছে : Whoever, Within or Without 1 [Bangladesh], with intent to influence, or knowing it to be likely that he will influence, any person or the whole or any section of the public, in a manner likely to be prejudicial to the safety of 1 [Bangladesh], or to endanger the sovereignty of l [Bangladesh], in respect of all or any of the territories lying within its borders, shall by words, spoken or written, or by signs or visible representation, condemn the creation of l [Bangladesh] 4 [in pursuance of the Proclamation of Independence on the tweenty-sixth day of March, 1971], or advocate the curtailment or abolitition of the sovereignty of 1 [Bangladesh] in respect of all or any of the territories lying within its borders, whether by amalgamation with the territories of neighbouring States or otherwise, shall be punished with rigorous imprisonment which may extend to ten years and shall also be liable to fine.

বাংলাদেশের সুপ্রিম কোর্ট বহু রায়ে স্বাধীনতার এই ঘোষণাপত্রকে রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের একটি আকর দলিল বলে গণ্য করেছেন। এইবার আমরা সাংবিধানিক বিষয়বস্তুর ব্যাখ্যায় যেতে পারি। শুরু হচ্ছে ‘আমরা’ বলে আবার তারপর ‘বাংলাদেশের জনগণ’ বলে তার অর্থও স্পষ্ট করা হয়েছে। আমরা যে বাংলাদেশের জনগণ আমরা ‘স্বাধীনতা ঘোষণা’ করলাম। কবে তা করা হলো? সেটা ২৬ মার্চ ১৯৭১ সাল। এই স্বাধীনতা ঘোষণার পরিণাম পরের বাক্যাংশে বলা হয়েছে যে ‘স্বাধীন ও সার্বভৌম গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ’ প্রতিষ্ঠা করেছি। কীভাবে তা হয়েছে তাও বলা হয়েছে। সেটা হলো জাতীয় স্বাধীনতার জন্য ঐতিহাসিক যুদ্ধের মাধ্যমে। এই প্রক্রিয়াকে আন্তর্জাতিক আইনের ভাষায় বলা হয় জাতীয় আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার প্রতিষ্ঠা। এই সংবিধান রচিত হয়েছে স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পর নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের নিয়ে গঠিত গণপরিষদের দ্বারা, যা চূড়ান্তরূপ পেয়েছে ৪ নভেম্বর ১৯৭২ সালে। তা হলে ২৬ মার্চ ১৯৭১ সালের ঘোষণা কোথায় এবং একজন ঘোষকের কথা যে বলছি সেগুলি কোথায়? অবধারিতভাবে আমাদের স্বাধীনতা ঘোষণার আকর দলিলে যেতে হয়; যাকে ইংরেজিতে বলা হয়েছে Proclamation of Independence, যা ঘোষিত হয় মুজিবনগরে ১০ এপ্রিল ১৯৭১ সালে যেখানে কেবল স্বাধীনতার ঘোষণা নয়, স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ সৃষ্টি ও স্বাধীনতা ঘোষণার আদি পুরুষ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের নাম স্পষ্ট করে বলা হয়েছে। সেটা বুঝতে হলে এই ঘোষণাপত্রের বাংলা ভাবার্থ দিতে হয়। ঘোষণাপত্রের শিরোনাম, তারিখ ও স্থানের উল্লেখের পর বলা হয়েছে ৭ ডিসেম্বর ’৭০ থেকে ১৭ জানুয়ারির নির্বাচনের কথা যার উদ্দেশ্য সংবিধান রচনা। নির্বাচনে বাংলাদেশের জনগণ ১৬৯-এর মধ্যে ১৬৭ জন প্রতিনিধি নির্বাচন করে, যারা আওয়ামী লীগের সদস্য; জেনারেল ইয়াহিয়া খান ৩ মার্চ ১৯৭১ সালে সংবিধান রচনার জন্য নির্বাচিত প্রতিনিধিদের সম্মেলন ডাকেন। সেই আহূত সংসদকে স্বেচ্ছাচার ও অবৈধভাবে মুলতবি করা হয়; প্রতিশ্রুতি পূরণ না করে আলোচনা চলাকালে, পাকিস্তান কর্তৃপক্ষ অন্যায় ও বিশ্বাসঘাতী যুদ্ধ ঘোষণা করে; এই বিশ্বাসঘাতকতামূলক আচরণের পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশের ৭৫ মিলিয়ন জনগণের অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশের জনগণের বৈধ আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার প্রতিষ্ঠার ন্যায্য অধিকার পরিপূরণে ২৬ মার্চ ১৯৭১ সালে ঢাকায় নিয়মিত স্বাধীনতার ঘোষণা প্রদান করেন, এবং বাংলাদেশের জনগণকে বাংলাদেশের মর্যাদা ও সংহতি রক্ষার জন্য আহ্বান জানান; পাকিস্তানি কর্তৃপক্ষ নৃশংস ও বর্বর যুদ্ধ চালিয়ে বাংলাদেশের নিরস্ত্র বেসামরিক অধিবাসীদের ওপর গণহত্যা ও বিভিন্ন প্রকার নজিরবিহীন নির্যাতন চালাচ্ছে; এই গণহত্যা নির্যাতন ও নিপীড়নের জন্য জনপ্রতিনিধিগণের পক্ষে সম্মিলিত হয়ে একটি সংবিধান রচনা করে নিজেদেরকে একটি সরকার দেওয়া অসম্ভব হয়ে পড়েছে; এমতাবস্থায় বাংলাদেশের জনগণ তাদের সাহস, বীরত্ব ও বৈপ্লবিক প্রবণতায় বাংলাদেশের ভূভাগে তাদের কার্যকর নিয়ন্ত্রণ কায়েম করেছে; আমরা বাংলাদেশের নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিগণ জনগণের প্রদত্ত ম্যান্ডেট পালনে অঙ্গীকারাবদ্ধ, যে জনগণের অভিপ্রায় সর্বোচ্চ সেজন্য আমরা আমাদের নিয়ে গণপরিষদ গঠন করে আলাপ-আলোচনা করেছি, এবং বাংলাদেশের জনগণের জন্য সমতা, মানব মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে; বাংলাদেশকে একটি সার্বভৌম গণপ্রজাতন্ত্রী প্রজাতন্ত্র ঘোষণা ও সংগঠন করছি এবং এতদ্বারা ইতঃপূর্বে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কর্তৃক প্রদত্ত স্বাধীনতার ঘোষণাকে সমর্থন করছি... এই ঘোষণাপত্র ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ থেকে কার্যকর বলে গণ্য হবে। আইনে এই প্রক্রিয়াকে লেজিসলেশন বাই রেফারেন্স বলা হয়। আর একবার সরলার্থে বলা যায়, ঘোষণাপত্রে প্রকৃতপক্ষে বাংলাদেশের জনগণ তাদের নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক আইন ও নীতি অনুসারে আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকার প্রতিষ্ঠা করে স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র পত্তন করে। এই ঐতিহাসিক ঘটনা প্রতিষ্ঠিত করতে তারা তখনকার সাড়ে ৭ কোটি জনগণের অবিসংবাদিত জননেতা শেখ মুজিবুর রহমানের স্বাধীনতার ঘোষণাকে সমর্থন করেন। এইভাবে প্রথমে জনগণ, তারপর নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি, সবশেষে জননেতা একসারিতে যুক্ত হয়ে স্বাধীন বাংলাদেশের বাঙালিরা জাতি বা নেশন হলো, যার অর্থ একটি ঐতিহাসিকভাবে বিবর্তিত জনগোষ্ঠী আপন রাষ্ট্র সৃষ্টি করল। একেই বলে আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা ও বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার মূল পার্থক্য এখানে। পাকিস্তান ভারতের মতো ইংরেজ সরকার কর্তৃক ১৯৪৭ সালের Indian Independent Act- অপঃ-এর মাধ্যমে সার্বভৌমত্ব গণপরিষদের ওপর হস্তান্তরিত হয়ে অর্জিত হয় কিন্তু বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত হয় স্বাধীনতাযুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র বাংলাদেশের পত্তনে। প্রতিষ্ঠা করল বাংলাদেশের জনগণ অর্থাৎ বাঙালিরা। এই যে স্বাধীনতার প্রক্রিয়া তা ঘটনা পরম্পরায় এমনভাবে সন্নিবেশিত যে এই প্রক্রিয়ার মধ্যে যে একজনের নাম আসে তিনি জনগণের নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। এই হলো প্রকৃত জননেতা। প্রক্রিয়াটি এমন যে অন্য কোনো ব্যক্তি বা নেতার নাম আসতে পারে না এবং স্বাভাবিকভাবে আসেও নি। তাই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের নাম স্বাধীনতার ঘোষণাদাতারূপে সংবিধান সন্নিবেশিত হয়ে আছে। এই সংবিধানের প্রাধান্য অক্ষুণœ রাখা এবং এর রক্ষণ, সমর্থন ও নিরাপত্তা বিধান আমাদের পবিত্র কর্তব্য। ঘোষণাপত্রের প্রক্রিয়ায় কয়েকটি মূল ঘটনার যে উল্লেখ রয়েছে সেগুলির মধ্যে ১৯৭০-এর নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নিরঙ্কুশ বিজয়, জেনারেল ইয়াহিয়ার সংসদের অধিবেশন ডেকে আকস্মিকভাবে মূলতবি ঘোষণা, নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা চলাকালে অন্যায় ও বিশ্বাসঘাতকতামূলক যুদ্ধ চাপিয়ে দেওয়া আর জনগণের ওপর নির্মম বর্বর নজিরবিহীন নির্যাতন ও গণহত্যা, যার প্রতিক্রিয়ায় নির্বাচিত অবিসংবাদিত জননেতার স্বাধীনতার ঘোষণা এই সব ঘোষণাপত্রে উল্লিখিত আছে। তবে এর সঙ্গে সাত মার্চের রমনার বিশাল জনসমাবেশে শেখ মুজিবের ঐতিহাসিক ডাক : ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’ অবশ্যই উল্লেখ হয় এই জন্য যে, এই ডাকের ফলে যে অসহযোগ আন্দোলন শুরু হয় তা অভূতপূর্ব। এর ফলে ইয়াহিয়ার সামরিক সরকারের বিরুদ্ধে যে সর্বাত্মক অসহযোগ সূচিত হয় তাতে সামরিক স্বৈরাচারী শাসকের ক্ষমতা সেনানিবাসে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে। ফল দাঁড়ায় পাকিস্তান সেনাবাহিনী দখলদার বাহিনী বা অকুপেশন আর্মিতে পর্যবসিত হয়। বস্তুত সাত মার্চ থেকে পঁচিশ মার্চের কালরাত্রি পর্যন্ত শেখ মুজিবের নির্দেশে সরকার চলতে থাকে। এই পরিপ্রেক্ষিতে ছাব্বিশ মার্চ ১৯৭১-এ বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণা। এই ডাক একমাত্র তিনিই দিতে পারেন। কেবল ডাক দিলে তো হয় না, সেই ডাকের পিছনে ডাক দেবার ক্ষমতা বা অথরিটিও চাই। সবই ছিল শেখ মুজিবের কাছে। এবার কালের দিক থেকে বিচার করা যাক। সংবিধানে বলা হয়েছে ২৬ মার্চ ১৯৭১ সাল, তাহলে আমরা সাংবিধানিকভাবে ২৭ বা অন্য কোনো দিনের উল্লেখ করতে পারি না। বাস্তবে স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রের তারিখ ১০ এপ্রিল ১৯৭১, তাহলে ২৬ মার্চ কীভাবে হয়? হয় এই জন্যে যে ঘোষণাপত্রের শেষে বলা হয়েছে যে ঘোষণাপত্র বা Proclamation of Independence ২৬ মার্চ ১৯৭১ সাল থেকে কার্যকর হয়েছে গণ্য করা হবে। এইভাবে ঘোষণাপত্র শেখ মুজিবের স্বাধীনতা ডাকের দিনকেই সমর্থন ও অনুমোদন করে। তাহলে সাংবিধানিকভাবে স্বাধীনতা ঘোষণার দিন আমরা ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ ছাড়া আর কোনো তারিখ বলতে পারি না। স্থান সম্বন্ধে দেখতে গেলে দেখতে পাব ঘোষণাপত্র ঘোষিত হয়েছে মুজিবনগরে, আর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব ঘোষণা দিয়েছেন ঢাকা থেকে, যা ঘোষণাপত্রেই বলা আছে। সাংবিধানিকভাবে স্থানের কোনো গুরুত্ব দেওয়া হয় নি। স্বাধীনতার ঘোষণা প্রথমে ২৬ মার্চ তারিখে দেন শেখ মুজিব ঢাকাতে, যা সমর্থিত হয় ১০ এপ্রিল মুজিবনগরে। সাংবিধানিকভাবে প্রথমে ঘোষণা ঢাকায়, এর সমর্থন ও অনুমোদন মুজিবনগরে, আর কোনো স্থানের অনুপ্রবেশের অবকাশ নেই, সুতরাং চট্টগ্রাম বা অন্য কোনো স্থানের অবস্থান সংবিধানের অন্তর্গত নয়। সংবিধানের প্রস্তাবনার প্রথম অনুচ্ছেদে বাংলাদেশের জনগণের জাতি হিসেবে আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার বা জরমযঃ Right of self determinationএর ঘোষণা ও প্রতিষ্ঠার কথা দুই-ই বলা আছে। তবে আমরা পাই প্রথম অংশে ঘোষণা, দ্বিতীয় অংশে প্রতিষ্ঠার কথা আছে, আছে একটি জাতির স্বাধীন ও সার্বভৌম আত্মবিকাশের কথা। আইনে এই দুরূহ দায়িত্ব পালন করে জনগণ তাদের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের দ্বারা আর প্রতিনিধিদের মুখপাত্র হয়ে আসেন তার স্বীকৃত নির্বাচিত নেতা। এইখানে গণতন্ত্রের এক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, সেটা হচ্ছে জনতা ও নেতার সম্পর্ক অর্থাৎ তিনিই নেতা, যিনি জনগণের আস্থাভাজন এবং আস্থা প্রকাশের স্বীকৃত আইগত দিক হচ্ছে নির্বাচন। সংবিধানে তাই বলা হয়েছে জনগণ অর্থাৎ জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিগণ স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছেন এবং তারা ঘোষণা দিচ্ছেন এর পূর্বে জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের নেতা অর্থাৎ জনগণের নেতা যে স্বাধীনতার ডাক দিয়েছে তাকে অনুমোদন করে। এইভাবে নেতা-জনতা বা জনতা-নেতা এক হয় আইনের চোখে। সুতরাং আইনের দিক থেকে যদি কোনো এক ব্যক্তি স্বাধীনতার ডাক দেওয়ার অধিকারী হন বা লিগ্যাল অথরিটি যদি কারও থাকে তিনি হবেন জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের নেতা। আর অন্য কোনো ব্যক্তির সেই অধিকার গ্রহণের অবকাশ নেই। তা হলে সাংবিধানিকভাবে স্বাধীনতার ঘোষক একমাত্র বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। এর পরিপন্থী কিছু বলা সংবিধান লঙ্ঘনের শামিল। সংবিধানের আক্ষরিক অর্থে আমরা পেলাম স্বাধীনতার ঘোষক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। এইবার সংবিধানের মর্মার্থ বা ইংরেজিতে যাকে বলে স্পিরিট অব লÑ সেই অর্থে আমরা কি পাই? আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র ১৭৭৬ সালে যখন ইংরেজ সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে স্বাধীনতাযুদ্ধের পর স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করল, এই স্বাধীন রাষ্ট্রের প্রথম সংবিধান রচয়িতাদের বলা হত family founding fathers বা প্রতিষ্ঠাতা জনকবৃন্দ। এই রেওয়াজ বা কনভেনশন গত দু’শ’ বৎসর ধরে অন্যান্য রাষ্ট্রের ব্যাপারে প্রয়োগ করা হচ্ছে। আমাদের বর্তমান সংবিধান ত্রয়োদশ সংশোধনসহ একাধিকবার স্থগিত থাকার পরও সেই ১৯৭২ সালে স্বাধীনতাযুদ্ধের পর কাঠামোগতভাবে প্রায় ১৯৭২ সালে স্বাধীনতাযুদ্ধের পর যে প্রথম সংবিধান রচিত হয় তা আজও বলবৎ আছে, এবং দ্বাদশ সংশোধনীর পর কাঠামোগতভাবে প্রায় ১৯৭২ সালের অসংশোধিত সংবিধানের অবস্থায় ফিরে গেছে। এই সংবিধান রচিত হয় যে গণপরিষদের দ্বারা এর সদস্যরা হচ্ছেন ১৯৭০ সালে ঐতিহাসিক নির্বাচনের মাধ্যমে নির্বাচিত সদস্যবৃন্দ এবং এরাই ১০ এপ্রিল ’৭১ সালে মুজিবনগরে নিজেদের গণপরিষদ গঠন করে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করেন এবং সেই সঙ্গে আমরা আগেই দেখেছি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের স্বাধীনতা ঘোষণাকে Confirm অনুমোদন করেন। সবদিক থেকে এই গণপরিষদের সদস্যবৃন্দকে প্রতিষ্ঠাতা জনক বলা যায়। আবার এই প্রতিষ্ঠাতা জনকবৃন্দের নেতা ছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। প্রথমে নির্বাচনের সময়ে আওয়ামী লীগের নেতা হিসেবে তিনি নির্বাচিত সদস্যদের নেতা, মুক্তিযুদ্ধের সময়ে Proclamation of Independenceএর বলে প্রেসিডেন্ট ও সংবিধান রচনার সময়ে প্রধানমন্ত্রীরূপে এই ফাউন্ডিং ফাদারদের নেতা। সংবিধানের মর্মার্থে তিনি জাতির জনক। আজকাল অনেকে, এমন কি যারা তার কাঠোর সমালোচক তারাও শেখ মুজিবকে ফাদার অব নেশন বা জাতির জনক বলছেন। তাহলে সংবিধানের আক্ষরিক অর্থে একদিকে বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার ঘোষক, মর্মার্থে পাচ্ছি তিনি ফাউন্ডিং ফাদারদের নেতা। দুটোকে জড়িয়ে আমরা পাচ্ছি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।

পাঠকের মতামত:

SMS Alert

স্বাধীনতার অহংকার এর সর্বশেষ খবর

স্বাধীনতার অহংকার - এর সব খবর



রে