thereport24.com
ঢাকা, মঙ্গলবার, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ৩ আশ্বিন ১৪২৫,  ৭ মহররম ১৪৪০

কীটনাশকের ব্যবহার বেড়েছে ৩২৮%

সবজিতে বাড়ছে ক্যান্সার ঝুঁকি

২০১৫ এপ্রিল ০৭ ০০:২৫:১৩
সবজিতে বাড়ছে ক্যান্সার ঝুঁকি

প্রশান্ত মিত্র, দ্য রিপোর্ট : মাত্রাতিরিক্ত কীটনাশক দিয়ে উৎপাদিত শাকসবজি ও অন্যান্য কৃষিপণ্য মানবদেহে ক্যান্সার ও উচ্চ রক্তচাপের মতো জটিল রোগ সৃষ্টি করছে বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা।

পরিবেশবাদীদের অভিযোগ, কৃষিতে পরিমাণ মতো কীটনাশক ব্যবহারের অনুমোদন থাকলেও মাঠে কি হচ্ছে তা যথাযথভাবে নজরদারি করা হচ্ছে না।

এ পরিস্থিতির মধ্যেই অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও পালিত হচ্ছে বিশ্ব স্বাস্থ্য দিবস। ৭ এপ্রিল মঙ্গলবার এ দিবস। এবারে দিবসটির প্রতিপাদ্য ‘নিরাপদ-পুষ্টিকর খাবার, সুস্থ জীবনের অঙ্গীকার’।

কিন্তু কৃষি সম্পসারণ অধিদফতরের কর্মকর্তাদের দাবি, তাদের তদারকিতে কীটনাশক প্রয়োগ নিয়ন্ত্রণে এসেছে। বরং এ বিষয়ে কৃষকের অসচেতনতাকেই দায়ী করছেন তারা।

কৃষি অধিদফতরের তথ্যানুযায়ী, গত এক দশকে সার্বিকভাবে বিষাক্ত কীটনাশকের ব্যবহার বেড়েছে ৩২৮ শতাংশ। প্রতি হেক্টরে বেড়েছে পেয়েছে ৫৯৮ শতাংশ, যার বার্ষিক আমদানি মূল্য প্রায় ১৭১.৪৩ মিলিয়ন মার্কিন ডলার।

কৃষিপণ্যে মাত্রাতিরিক্ত কীটনাশকের ব্যবহার প্রসঙ্গে পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলনের (পবা) সাধারণ সম্পাদক আব্দুস সোবহান দ্য রিপোর্টকে বলেন, পৃথিবীর অন্যান্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশে সবজিতে কীটনাশক ব্যবহারের তীব্রতা অনেক বেশি। সরকারিভাবে নিষিদ্ধ এলড্রিন ও এনড্রিনের মতো বিভিন্ন রাসায়নিক কীটনাশক বাজারে বিক্রি অব্যাহত রয়েছে। অনেক কীটনাশক লেবেল ছাড়া বা মিথ্যা লেবেল দিয়ে কৃষকদের কাছে বিক্রি করা হচ্ছে।

তিনি জানান, বাংলাদেশ থেকে সবজি রফতানি কমে যাওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ হচ্ছে, অতিমাত্রায় কীটনাশক ব্যবহার। উপজেলা এবং জেলা পর্যায়ে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের কর্মকর্তা থাকলেও আদৌ মাঠে গিয়ে কৃষককে সচেতন করে তোলার মতো কোনো কার্যক্রম পরিচালনা করতে দেখা যায় না।

এ জন্য কৃষিবিদরা যে সকল জৈব বালাইনাশক আবিষ্কার করছে তা কৃষকের কাছে নিয়ে যাওয়া এবং কৃষকদের সচেতন করে তোলার প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি।

কীটনাশকের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ, ইন্ট্রিগ্রেটেড পেস্ট ম্যানেজমেন্ট পন্থার ওপর ভিত্তি করে উপযুক্ত বিকল্প বিকশিত না হলে এর ব্যবহার ভবিষ্যতে আরও বাড়ছে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন সোবহান।

তবে কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের (হর্টিকালচার উইং) উপ-পরিচালক ড. মো. আজহার আলী দ্য রিপোর্টকে জানান, ‘কৃষকের কাছে যাওয়ার জন্য, তাদের মধ্যে সচেতনতা বাড়ান, প্রযুক্তিগত সহায়তাসহ সকল ধরনের সুবিধা দেওয়ার একমাত্র কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরেরই পুরোপুরি সক্ষমতা রয়েছে। মাঠপর্যায়ে বিশুদ্ধ খাদ্য নিশ্চিত করতে তাদের প্রতিনিধিগণ সবসময়ই কাজ করে যাচ্ছেন। ইতোমধ্যেই কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর এবং হটেক্স ফাউন্ডেশনের মধ্যে একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। চুক্তি অনুযায়ী ফুড এ্যান্ড এ্যাগ্রিকালচার অর্গানাইজেশনের (এফএও) সহযোগিতায় কৃষকদের সচেতন করে তোলাসহ তাদের প্রশিক্ষিত করা হচ্ছে।

তিনি জানান, জৈব সার ও প্রাকৃতিকভাবে সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনা (আইপিএম) প্রকল্প বাস্তবায়নের চেষ্টা করা হচ্ছে। শেষ চেষ্টা হিসেবে কীটনাশক ব্যবহারের কথা বলা হয়ে থাকে।

ড. মো. আজহার আলী বলেন, ‘আমাদের সামগ্রিক চেষ্টা হিসেবে কীটনাশক ব্যবহারের হার কমছে। তবে অভ্যাসের পরিবর্তনতো আর এক দিনেই সম্ভব নয়। নিরাপদ খাদ্যের ধারণাটিই নতুন। পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসতে সময় লাগবে।’

কৃষিতে জৈব কীটনাশক ব্যবহার প্রসঙ্গে কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের (বালাইনাশক প্রশাসন) সহকারী উপ-পরিচালক মোহাম্মদ শাহ আলম বলেন, ‘আমরা খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করেছি। এখন নিরাপদ এবং পুষ্টিকর খাদ্য নিয়ে কাজ করছি। আর অনিয়ন্ত্রিত কীটনাশক প্রয়োগ অবশ্যই নিরাপদ খাদ্যের অন্তরায়। এ জন্য আমরা প্রথমত জৈব কীটনাশকের ওপর জোর দিচ্ছি। ইতোমধ্যে আমরা ১৬টি জৈব কীটনাশক ব্যবহারের জন্য অনুমোদন দিয়েছি। শেষ চেষ্টা হিসেবে আমরা কেমিক্যাল কীটনাশক প্রয়োগের কথা বলছি।’

তিনি বলেন, ‘যে সব কীটনাশক বাজারে রয়েছে তার প্রত্যেকটার গায়ের লেবেলে কি পরিমাণ প্রয়োগ করতে হবে তা লেখা থাকে। লেবেলগুলো আমাদের এখান থেকেই অনুমোদন করে নেওয়া হয়। ওয়ার্ল্ড হেলথ অর্গানাইজেশন (ডব্লিউএইচও) এবং ফুড এ্যান্ড এ্যাগ্রিকালচার অর্গানাইজেনশনের (এফএও) নির্ধারিত মান অনুযায়ী অনুমোদন দিয়ে থাকি। আমাদের দেশে ব্যবহৃত ২৫৪টি কেমিক্যাল বালাইনাশকের সবগুলোই আন্তর্জাতিকমানের এবং সবগুলোই বিদেশ থেকে আমদানি করা সম্পূর্ণ পরিবেশবান্ধব।’

‘এরপরও সারাদেশ থেকে স্যাম্পল এনে আমাদের ল্যাবে পরীক্ষা করা হয়। এ পর্যন্ত ডিডিটি, এনড্রিন, ডায়াএন্ড্রিন, নেনজিন হেড্রাক্লোরাইডসহ ১২টি বালাইনাশক আমরা নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছি,’ জানান মোহাম্মদ শাহ আলম।

কীটনাশকের অত্যধিক প্রয়োগ সম্পর্কে তিনি আরও বলেন, ‘এ বিষয়ে সচেতনতার জন্য থানা পর্যায়ে কৃষকদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। এক্ষেত্রে কিছু অসাধু ব্যবসায়ী কৃষকদের ভুল কীটনাশক প্রয়োগে প্রভাবিত করে থাকে। দুর্ভাগ্যের বিষয় হল, ফসলে কোনো সমস্যা হলে নিকটস্থ কৃষি অফিসে কৃষকদের যোগাযোগ করতে বলা হলেও তারা যাচ্ছে কীটনাশকের দোকানে।’

স্বাস্থ্যঝুঁকি

কীটনাশক ও সারের অত্যধিক প্রয়োগের ফলে মানবদেহে কি প্রভাব পড়তে পারে জানতে চাইলে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মাটোলজি বিভাগের অধ্যাপক সায়েদুর রহমান দ্য রিপোর্টকে বলেন, ‘মাত্রাতিরিক্ত বিষ প্রয়োগ এবং প্রয়োগের নির্ধারিত সময়ের পর সরবরাহ না করা হলে বিষ সবজিতে থেকে যায়। যা গ্রহণ করলে মানবদেহের সেলগুলো ভেঙে পড়ে। ভোক্তারা বিভিন্ন ধরনের স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতির সম্মুখীন হয়। এর প্রভাবে মানবদেহে ক্যান্সার, উচ্চ রক্তচাপ, চামড়ার রোগ এবং দীর্ঘমেয়াদে কিডনি রোগসহ বিভিন্ন জটিল রোগের সৃষ্টি হতে পারে। দীর্ঘস্থায়ী কীটনাশক বিষক্রিয়ায় শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ অকার্যকরও হয়ে যেতে পারে।’

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরে নেই জৈব কীটনাশকের পরীক্ষাগার

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর জৈব কীটনাশকের ওপর গুরুত্ব দিলেও এ নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার মতো তাদের নিজস্ব কোনো ল্যাব নেই।

এ বিষয়ে মোহাম্মদ শাহ আলম বলেন, ‘আমাদের এখনো ‘মাইক্রোবায়োলজিক্যাল পেস্টিসাইডের’ বলয় গড়ে ওঠেনি। আমরা ইতোমধ্যে এ জাতীয় ১৬টি কীটনাশক ব্যবহার শুরু করতে পেরেছি, অথচ আমাদের একটি নিজস্ব ল্যাব নেই। এখন এ জাতীয় যাবতীয় কাজকর্ম আমরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মাইক্রোবায়োলজির ল্যাব ব্যবহার করছি।

পর্যায়ক্রমে সকল বাধা অতিক্রম করে সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় শিগগিরই কৃষিতে নিরাপদ খাদ্য বলয় গড়ে তোলা সম্ভব হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।

(দ্য রিপোর্ট/পিএম/এএসটি/এসবি/সা/এপ্রিল ০৭, ২০১৫)

পাঠকের মতামত:

SMS Alert

স্বাস্থ্য এর সর্বশেষ খবর

স্বাস্থ্য - এর সব খবর



রে