thereport24.com
ঢাকা, বুধবার, ২১ নভেম্বর ২০১৮, ৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৫,  ১২ রবিউল আউয়াল ১৪৪০

ঢাকার ৫৫% পথখাবারেই জীবাণু

২০১৫ এপ্রিল ০৭ ০৩:১০:১৫
ঢাকার ৫৫% পথখাবারেই জীবাণু

প্রশান্ত মিত্র, দ্য রিপোর্ট : ব্যস্ততম এ নগরীতে চলতি পথে হাত বাড়ালে রাস্তার পাশেই মিলছে হরেক রকমের মজাদার খাবার। স্ট্রিটফুড বা পথখাবার হিসেবে পরিচিত এ সব খাবার সহজলভ্য এবং সস্তা হওয়ায় ব্যাপক জনপ্রিয়। স্বাস্থ্যঝুঁকির বিষয়টি উপেক্ষা করে শখ করে কিংবা প্রয়োজনে সব শ্রেণী-পেশার মানুষই এ সব খাচ্ছেন।

আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র বা আইসিডিডিআরবি’র এক গবেষণায় দেখা গেছে, রাজধানীর ৫৫ শতাংশ খাবারেই নানান ধরনের জীবাণু রয়েছে, যা স্বল্পমেয়াদে বা দীর্ঘমেয়াদে মানবদেহের জন্য ক্ষতির কারণ হতে পারে।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকায় ২০১৩ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০১৪ সালের অক্টোবরের মাঝামাঝি পর্যন্ত ফুটপাতের বিভিন্ন খাদ্যসামগ্রীর দোকানের ১১৫টি খাদ্য পরীক্ষা করে আইসিডিডিআরবি। প্রতিষ্ঠানটির গবেষণালব্ধ প্রতিবেদনে জানানো হয়, রাজধানী ঢাকার ৫৫ শতাংশ পথখাবারে নানা ধরনের ব্যাকটেরিয়া রয়েছে। প্রতিদিন একজন বিক্রেতা গড়ে প্রায় দেড় শ’ জনের কাছে পথখাবার বিক্রি করেন। বিক্রেতাদের ৮৮ শতাংশের হাতেই থাকে নানান জীবাণু।

আইসিডিডিআরবি’র গবেষকরা আট হাজার ভ্রাম্যমাণ বিক্রেতার কাছ থেকে নমুনা সংগ্রহ করে দেখেছেন অধিকাংশ খাবারে প্রচুর জীবাণু রয়েছে। আর প্রতিদিন একজন দোকানি গড়ে আট শ’ লোকের কাছে এ সব খাবার বিক্রি করছেন।

এ সব খাবারের মধ্যে রয়েছে, চটপটি-ফুচকা, ঝালমুড়ি, পিঠা, রুটি-পরোটা, পুড়ি-সিঙ্গাড়া-সমুচা, শরবত, আচার, চা, ছোলা, সিদ্ধ ডিমসহ উপাদেয় নানান আইটেম।

ঢাকার অন্যতম ব্যস্ত এলাকা গুলিস্তানে রাস্তার পাশেই বিক্রি হয় আখের রস, লেবু ও বেলের শরবত, বিভিন্ন ফলের শরবত। গরমে তৃষ্ণা মেটাতে চলার পথেই বরফ মেশানো এ সব শরবত পান করেন পথচারীরা।

বেলের শরবতের বিক্রেতা আশরাফ আলী ফিল্টারের পানি দিয়ে শরবত বানাচ্ছেন দাবি করলেও এর প্রস্তুতপ্রণালী স্বাস্থ্যসম্মত নয়। মগের মধ্যে পানি নিয়ে সামান্যটুকু বেল নিয়ে হাত দিয়ে গুলিয়ে শরবত বানিয়ে রাখছেন বরফ দেওয়া একটি বালতিতে। বালতির মধ্যেও হাত ডুবিয়ে নাড়া দিচ্ছেন। প্রতিগ্লাস দশ টাকা দামে এই শরবতই তুলে দিচ্ছেন ক্রেতার হাতে।

একই ধরনের চিত্র পাওয়া গেছে মতিঝিলে। এই অফিসপাড়ার একটি গলিতে ফুটপাতের উপর ভাতের কয়েকটি দোকান। এ সব দোকানে আশপাশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কাজ করেন এমন অনেক কর্মজীবী মানুষ দুপুরের খাবার সেরে নিচ্ছেন। কাপড় দিয়ে ঘিরে রাখা দোকানগুলোতে একসাথে ১০-১২ জন বসতে পারেন।

একটি বেসরকারি ব্যাংকে কর্মরত জাহিদুল ইসলাম দ্য রিপোর্টকে বলেন, ‘প্রত্যেক দিনই দুপুরের খাবারটা বাইরে খেতে হয়। নির্দিষ্ট বেতনে সবসময় সাধ ও সাধ্যের সমন্বয় ঘটানো সম্ভব নয়। তাই প্রয়োজন মেটাতে কম খরচে খেতে হলে এ সব হোটেলেই আসি।’

হোটেল মালিক শফিক মিয়া দাবি করেন, যতটা সম্ভব সবকিছু পরিষ্কার রাখেন তিনি।

দৈনিক প্রায় ২০০ কাপ চা বিক্রি করেন পান্থপথ মোড়ের চা বিক্রেতা আসলাম। পরিচ্ছন্নতার বিষয়টি উপেক্ষা করে চায়ের পাশাপাশি পলিথিনের ভেতর ঝুলিয়ে রাখা বিস্কুট বা কেক খেতে দেখা গেছে অনেককে।

সংসদ ভবনের সামনে ফুচকা-চটপটির অনেকগুলো দোকান। বিকেল বেলা ঘুরতে এসে মানুষজন শখের কারণে খাচ্ছেন এ সব চটপটি ও ফুচকা।

বন্ধুদের সাথে ফুচকা খেতে খেতে ড্যাফোডিল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সাজ্জাদ বলেন, এ সব খাবার কতটা স্বাস্থ্যকর তা নিয়ে প্রশ্ন থাকেই, কিন্তু আড্ডার মাঝে স্বাদের বিবেচনায় এ সব খাওয়া হয়।

আইসিডিডিআরবি’র সহযোগী বিজ্ঞানী এবং দীর্ঘমেয়াদী অসংক্রামক রোগতত্ত্ব ইউনিটের পরিচালক ডা. আলিয়া নাহিদ দ্য রিপোর্টকে বলেন, ‘বর্তমান সময়ে স্ট্রিটফুড বা রাস্তার খাবার শুধুমাত্র শখের খাবারই নয়। নিম্নবিত্ত থেকে উচ্চবিত্ত সব শ্রেণীর মানুষ প্রয়োজনেও খাচ্ছেন। বিশেষ করে স্বল্প আয়ের মানুষের জীবন বাঁচিয়ে রাখতে পুষ্টির যোগান দিচ্ছে এ সব খাবার। কিন্তু পথখাবারের সবচেয়ে বড় সমস্যা জীবাণু। কারণ খাবারটা কিভাবে তৈরি করতে হবে এ সংক্রান্ত কোনো প্রকার শিক্ষা ও জ্ঞান বেশিরভাগ দোকানিরই নেই। তারা ফুটপাথেই বসছেন। ফলে ধুলোবালি জীবাণু সহজেই মিশে যাচ্ছে।’

দেহের জন্য নিরাপদ নয় এমন খাবার গ্রহণের মাধ্যমেই বেশিরভাগ খাদ্য ও পানিবাহিত রোগ ডায়রিয়া, আমাশয়, টাইফয়েড, জন্ডিসসহ নানা রকমের দীর্ঘমেয়োদী অসুখ হতে পারে বলে জানান তিনি।

অন্যদিকে, এ সব খাবারের কাঁচামালেই যদি ভেজাল থাকে তাহলেতো আর ওই দোকানির কিছু করার থাকে না। তাই নিরাপদ কাঁচামালের নিশ্চয়তা এবং দোকানিদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা এবং জনসচেতনতার মাধ্যমেই রাস্তার খাবারের এই জীবাণুযুক্ত খাবার থেকে পরিত্রাণ পাওয়া সম্ভব।

এ সব পথখাবার নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব সিটি করপোরেশনের। জানতে চাইলে ঢাকা সিটি করপোরেশন উত্তরের (ডিএনসিসি) প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এ কে এম মাসুদ আহসান দ্য রিপোর্টকে বলেন, ‘পথখাবার দোকানগুলো ভ্রাম্যমাণ হওয়ায় এগুলো তদারকি করা কঠিন। তবে ফুডকার্ট তৈরির মাধ্যমে আমরা এ পথখাবার নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছি। এই ফুডকার্টগুলো পথখাবার বিক্রি করবে, তবে সেগুলো হবে মানসম্মত ও স্বাস্থ্যসম্মত। প্রথমত পরীক্ষামূলকভাবে একটি বেসরকারি কোম্পানির মাধ্যমে ১৫টি খাবারের গাড়ির ব্যবস্থা করা হয়েছে। গাড়িগুলো আগামী এপ্রিল মাসেই ঢাকার রাস্তায় নামবে বলে আশা করছি।’

ফুড এ্যান্ড এ্যাগ্রিকালচার অর্গানাইজেশন (এফএও) এবং ঢাকা সিটি করপোরেশনের যৌথ উদ্যোগে শিগগিরই খাবারের আরও দুই শ’ গাড়ি নামানো হবে জানিয়ে তিনি আরও বলেন, ‘স্বাস্থ্যসম্মত খাবার প্রস্তুত এবং পরিবেশনে এখন আমরা কর্মীদের প্রশিক্ষণ দিচ্ছি। এভাবে আস্তে আস্তে রাস্তার খাবারগুলো নিয়ন্ত্রণ করা হবে।

তবে এ জন্য সবার আগে জনসচেতনতা বাড়াতেই কাজ করা হচ্ছে বলেও জানান তিনি।

(দ্য রিপোর্ট/পিএম/এএসটি/এসবি/সা/এপ্রিল ০৭, ২০১৫)

পাঠকের মতামত:

SMS Alert

স্বাস্থ্য এর সর্বশেষ খবর

স্বাস্থ্য - এর সব খবর