thereport24.com
ঢাকা, বুধবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ১১ আশ্বিন ১৪২৫,  ১৫ মহররম ১৪৪০

নিয়ন্ত্রণে আসছে না ভেজাল বেকারি, স্বাস্থ্যঝুঁকিতে ভোক্তা

২০১৫ এপ্রিল ০৭ ০৪:৪৯:২৬
নিয়ন্ত্রণে আসছে না ভেজাল বেকারি, স্বাস্থ্যঝুঁকিতে ভোক্তা

প্রশান্ত মিত্র, দ্য রিপোর্ট : রাজধানীর বিভিন্ন বেকারিতে তৈরি হচ্ছে অস্বাস্থ্যকর বেকারি পণ্য। এ সব ভেজাল রোধে কর্তৃপক্ষ নিয়মিত অভিযান চালালেও পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হচ্ছে না। আইন লঙ্ঘন করেই অসাধু ব্যবসায়ীরা অতিরিক্ত লাভের আশায় অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে তৈরি নিম্নমানের বিস্কুট, কেক ও মিষ্টিজাতীয় খাবার ভোক্তার হতে তুলে দিচ্ছেন, যা খেয়ে লিভার ও কিডনিতে সমস্যাসহ ক্যানসারের মতো মারাত্মক রোগে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা বেড়ে যায় বলে জানান বিশেষজ্ঞরা।

বিভিন্ন অভিযানের সময় দেখা যায়, বিভিন্ন বেকারি কারখানায় উৎপাদিত কেক, বিস্কুট, পাউরুটি তৈরি হচ্ছে কাপড়ের রং ও কৃত্রিম সুগন্ধ মিশিয়ে। এ ছাড়া হাইড্রোজ ও নিষিদ্ধ ঘন চিনিও মেশানো হয়। মিষ্টিতে ব্যবহৃত হয় স্যাকারিন, ময়দা, চালের গুঁড়া ও টিস্যু পেপার। স্যাকারিন, বিভিন্ন রং ও পচা ডিম দিয়ে তৈরি হচ্ছে ক্রিমরোল। বাসি পাউরুটি পুনরায় প্রক্রিয়াজাত করে টোস্ট বিস্কুট বানানো হচ্ছে। মালটোভা বিস্কুট ও মালটোভা কেক বানানো হচ্ছে মালটোভা ফ্লেভার ও রং দিয়ে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও অস্ট্রেলিয়ার ওলোংগং বিশ্ববিদ্যালয় যৌথভাবে বাংলাদেশের চার ধরনের খাবার মিষ্টি, বিস্কুট, পাউরুটি ও আইসক্রিমে ভেজাল নিয়ে গবেষণা করে। এতে দেখা যায়, রাজধানীর ২৪ শতাংশ বিস্কুট ভেজাল। পাশাপাশি এগুলো অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে তৈরি হচ্ছে। এ ছাড়া ৫৯ শতাংশ আইসক্রিম স্বাস্থ্যসম্মত নয়। চানাচুর ও বেকারিসামগ্রী মচমচে ও সুস্বাদু করতে পোড়া মবিল দিয়ে ভাজা হয়।

বিএসটিআই ও ভ্রাম্যমাণ আদালত বলছে, এ সব অবৈধ বেকারিতে নিয়মিত অভিযানের ফলে ভেজাল বেকারির প্রকোপ কমেছে কিন্তু এখনো পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি। এ সব বেকারির অধিকাংশই বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্স এ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশনের (বিএসটিআই) লোগো নকল করে খাবার প্যাকেটজাত করছে।

বিএসটিআইর আইন অনুযায়ী বেকারির ছাদ, মেঝে, জানালা, দরজা ও অন্যান্য অংশ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখার কথা থাকলেও নিয়ম মানার প্রবণতা কম। পণ্যের মোড়কে কী কী উপাদান আছে তা এবং উৎপাদন ও মেয়াদ শেষের তারিখ উল্লেখ বাধ্যতামূলক হলেও করা হয় না। এ সব বেকারিতে গুণগতমানও রক্ষা করা হচ্ছে না।

ঢাকার সূত্রাপুরের আনোয়ার বেকারিতে তৈরি হয় বিস্কুট, কেক আর পাউরুটি। তাদের পণ্যে ক্ষতিকারক রং ও রাসায়নিক মেশানো হয় না বলে জানান বেকারির মালিক আব্দুর রব মুন্সী। সরেজমিন দেখা যায়, কারখানাটি পরিচ্ছন্ন নয়। ভেতরে ঢুকতেই দরজার পাশে এক কর্মী গোসল করছে আর তার পাশেই তেল চিটচিটে কেকের খাঁজ ঠিকঠাক করছেন অন্য কর্মীরা। মেঝেতে ডিমের ভাঙা খোসা ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে আছে। ভেতরে নোংরা টেবিলের ওপর কিছু কেক উন্মুক্ত অবস্থায়ই পড়ে থাকতে দেখা গেছে। মেঝেতে টাইলস বসানো হলেও পরিষ্কার ছিল না। বিস্কুটের উপকরণ মেশিনে প্রস্তুত করে খাঁজে ঢেলে চুলাতে দিচ্ছেন। তবে শ্রমিকরা খালি হাতে এবং খালি গায়েই এ সব করে যাচ্ছেন।

মালিক আব্দুর রব মুন্সী বলেন, ‘আমাদের পণ্য প্রস্তুত করতে ডালডা, তেল, ডিম, দুধ, চিনি, খাবার ইস্ট, ময়দা ব্যবহার করা হয়। বিষাক্ত কোনো জিনিস বা রং ব্যবহার করা হয় না। আমাদের বিএসটিআইয়ের অনুমোদন রয়েছে।’

বেকারি পণ্য যে কোন দোকানে সরবরাহের পর মেয়াদোত্তীর্ণ হলে বেকারি ফেরত নেয়, এ সব এনে আপনারা কী করেন- এমন প্রশ্নের পরিপ্রেক্ষিতে একই বেকারির শ্রমিক নুরুল ইসলাম বলেন, ‘বাতিল মাল ফেরত আনলে এগুলো ফেলে দেওয়া হয়।’

তবে রব মুন্সী বলেন, ‘চাহিদা এবং অর্ডার অনুযায়ী প্রতিদিন পণ্য সরবরাহ করা হয়। মেয়াদোত্তীর্ণ কোনো মালামাল আমরা ফেরত নেই না।’

এদিকে বিএসটিআই থেকে কোনো খোলা বেকারি পণ্য বিক্রয়ের অনুমোদন না দিলেও বেকারি কর্তৃপক্ষ বাজারে খোলাভাবেই কেক ও বিভিন্ন ধরনের পাউরুটি বিক্রি করতে দেখা যায়।

এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পুষ্টি ও খাদ্যবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. গোলাম মাওলা দ্য রিপোর্টকে বলেন, ‘অস্বাস্থ্যকর পরিবেশই দেশের বেকারিগুলোর মূল সমস্যা। নিয়মানুযায়ী বেকারি কারখানার শ্রমিকদের খাদ্য প্রস্তুতের সময় মুখে মাস্ক, গায়ে এ্যাপ্রোন ও হাতে গ্লাভস পরে খাবার বানানো উচিত। কিন্তু দু-একটি ছাড়া বেশীরভাগ বেকারিতে এই দৃশ্য চোখে পড়ে না।’

তিনি বলেন, ‘বেকারিতে খাবার সঠিকভাবে সংরক্ষণ না করার জন্য খাবারে পচন ধরে ফাঙ্গাস পড়ে। বেশীরভাগ বেকারিতে খাদ্য তৈরিতে যে উপাদানগুলো ব্যবহৃত হচ্ছে তা অত্যন্ত নিম্নমানের। খাবার আকর্ষণীয় করতে প্রাকৃতিক রংয়ের পরিবর্তে ব্যবহার করা কৃত্রিম রং, হাইড্রোজসহ যে কোনো রাসায়নিক ব্যবহার করাও ঠিক নয়।’

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কিছু বেকারির পণ্যের মান বাড়লেও অস্বাস্থ্যকর যে সব বেকারি রয়েছে ভোক্তা না জেনে সে সবও খাচ্ছে। এ সব অস্বাস্থ্যকর খাবার গ্রহণের ফলে পেটের পীড়া, লিভার ও কিডনিতে সমস্যাসহ ক্যানসারের মতো মারাত্মক রোগে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা বেড়ে যায় বলে জানান তিনি।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের (উত্তর) প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এ কে এম মাসুদ আহসান দ্য রিপোর্টকে বলেন, ‘ভেজাল খাদ্য রোধে আমরা প্রতিনিয়তই বাজার মনিটরিং করে থাকি। আমাদের নির্দিষ্ট টিম প্রতিনিয়তই বাজারের পণ্য, বেকারি, হোটেলগুলো পর্যবেক্ষণ করে। পর্যবেক্ষণের সময় কোনো ত্রুটি ধরা পড়লে সঙ্গে সঙ্গেই জরিমানাসহ আইনানুগ ব্যবস্থা নিয়ে থাকে। আর কোনো পণ্য সন্দেহ হলে এগুলো সংগ্রহ করে ল্যাবে পরীক্ষা করা হয়। পরীক্ষায় ভেজাল ধরা পড়লে আইন অনুযায়ী মামলা ও আর্থিক জরিমানা করা হয়।’

বিএসটিআই এর পরিচালক (সিএম) কমল প্রসাদ দাস বলেন, ‘চলতি অর্থবছরে (২০১৪-১৫) এ পর্যন্ত আমরা ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে বিভিন্ন ভেজাল পণ্যের বিরুদ্ধে ৮৮৩টি মামলা করেছি। ২ কোটি ১৯ লাখ ৮৮ হাজার টাকা জরিমানাসহ ৩৮ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া ৫২টি প্রতিষ্ঠান আমরা সিলগালা করেছি। ভেজাল নিয়ন্ত্রণে আমরা সব সময়েই তৎপর রয়েছি।’

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিয়মিত অভিযানে ভেজাল বেকারি কমছে জানিয়ে র‌্যাবের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ আল-আমীন দ্য রিপোর্টকে বলেন, ‘সর্বশেষ দুই মাস আগে মিরপুরের পল্লবী এলাকায় ১০টি বেকারিতে অভিযান চালিয়েছি। এতে দেখা গেছে, ৫ বছর আগে যে সব বেকারি অনেক নিম্নমানের ছিল সেগুলোর অবস্থা অনেকটা উন্নতি হয়েছে। আগে যে সব বেকারিতে হাত দিয়ে পণ্য প্রস্তুত করা হতো এখন সেগুলোতে মেশিন পাওয়া গেছে। ১০টি বেকারির ৮টিরই মেঝেতে টাইলস করা ছিল। আর কোনোটিতেই হাইড্রোজ পাওয়া যায়নি। তবে একটার অবস্থা নাজুক ছিল বলে সিলগালা করা হয়েছে।’

গণমাধ্যমের প্রচারণা ও আইনের প্রয়োগের ফলে গত ৫ বছরে বেকারির গুণগতমান যথেষ্ট বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে শতভাগ গুণগতমান নিশ্চিত করতে তাদের প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকবে বলে জানান আল-আমীন।

(দ্য রিপোর্ট/পিএম/এইচ/এসবি/এজেড/এপ্রিল ০৭, ২০১৫)

পাঠকের মতামত:

SMS Alert

স্বাস্থ্য এর সর্বশেষ খবর

স্বাস্থ্য - এর সব খবর



রে