thereport24.com
ঢাকা, শুক্রবার, ২১ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ৬ আশ্বিন ১৪২৫,  ১০ মহররম ১৪৪০

‘অনিরাপদ খাদ্য অনেক রোগের কারণ’

২০১৫ এপ্রিল ০৭ ১৫:৩২:৩৬
‘অনিরাপদ খাদ্য অনেক রোগের কারণ’

জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) জ্যেষ্ঠ জাতীয় উপদেষ্টা, স্বাস্থ্য অধিদফতরের সাবেক মহাপরিচালক শাহ মনির হোসেন। বিশ্ব স্বাস্থ্য দিবস ও অন্যান্য প্রসঙ্গে কথা বলেছেন তিনি। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন দ্য রিপোর্ট প্রতিবেদক প্রশান্ত মিত্র।

বিশ্ব স্বাস্থ্য দিবসের প্রতিপাদ্য ‘নিরাপদ পুষ্টিকর খাবার- সুস্থ জীবনের অঙ্গীকার এর বিশেষ কারণ ও তাৎপর্য কি? এর মাধ্যমে জনসাধারণকে বিশেষ কোনো তথ্য দেওয়া যাচ্ছে কী?

এবার বিশ্ব স্বাস্থ্য দিবসের বিষয়বস্তু হলো নিরাপদ খাদ্য এবং স্বাস্থ্যকর জীবন। বর্তমান অবস্থাতে এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটা বিষয়। অনিরাপদ খাদ্য আমাদের শরীরে অনেক রোগের কারণ। যেটাকে বলা হয় ‘ফুডবন্ড ডিজিস’। অনিরাপদ খাদ্যের কারণে স্বল্পমেয়াদে বিভিন্ন রোগ, যেমন- ডায়রিয়া, হেপাটাইটিস, টাইফয়েড হতে পারে। এ ছাড়া, খাদ্যে কোনো রাসায়নিক থাকলে দীর্ঘমেয়াদী প্রতিক্রিয়া হয় আমাদের শরীরে। যেমন- কিডনি বা লিভার নষ্ট হওয়াসহ ক্যান্সারও হতে পারে।

এ জন্য আমরা যা খাচ্ছি তা নিরাপদ রাখার জন্যে সকল মহলের প্রচেষ্টা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যারা খাদ্য তৈরি করছে, কৃষক থেকে আরম্ভ করে সংরক্ষণ, পরিবহন, বিক্রয় পর্যন্ত কাজগুলো যদি সঠিকভাবে না করা হলে খাদ্য অনিরাপদ হয়ে যায়। খাদ্য নিরাপদ রাখার জন্যে প্রতিটি ধাপে আমাদের তৎপর হতে হবে।

তারপরে যেটা আরেকটু গুরুত্বপূর্ণ, যা আমাদের সবারই খুব জোরেসোরে বলা উচিৎ যে, আমরা নিরাপদ খাদ্য কিনে আমরা যেন সেটাকে অনিরাপদ করে না ফেলি। আমরা বলি গুড হাইজেনিক প্র্যাকটিস। অর্থাৎ আমি খাদ্যকে সঠিকভাবে রান্না ও সংরক্ষণ করছি কিনা।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা প্রতিবছর একটা বিশেষ প্রতিপাদ্যের উপরে জোর দিয়ে থাকে। সারাবছর যেন একটা বিষয়ে লোকজনকে সচেতন করা যায়। অনেক সময় তারা মাতৃমৃত্যু, শিশু মৃত্যুর উপর প্রতিপাদ্য করে। এবার নিরাপদ খাদ্যকে বেছে নিয়েছে, কারণ এটা সময় উপযোগী। কারণ শুধু আমাদের দেশে নয়, সারা পৃথিবীতেই খাদ্য অনিরাপদ হচ্ছে।

কি কি উপায়ে খাদ্য অনিরাপদ হয়?

খাদ্য অনিরাপদ ২ রকম ভাবে হয়, একটা হলো- ভেজাল আরেকটা সংক্রমিত হওয়া। ভেজালটা কিন্তু ইচ্ছাকৃত। অর্থাৎ আমি জেনেশুনে অখাদ্যকে খাদ্যের সাথে মেশাচ্ছি। সেটাকে কন্ট্রোল করার জন্যে সঠিক আইনের পাশাপাশি, আইনের প্রয়োগ নিশ্চিত এবং ভেজালটাকে চিহ্নিত করা জরুরি।

এর বাইরেও সংক্রমিত হচ্ছে বিভিন্নভাবে। তবে এর জন্য সচেতনতা দরকার। যে খাদ্য তৈরি করছে তারও সচেতনতা দরকার। আরেকটা দিক হলো উৎপাদন। উৎপাদনে সার এবং কীটনাশক ব্যবহার খারাপ না। কিন্তু আমাকে জানতে হবে সর্বোচ্চ কতটুকু আমি ব্যবহার করব। আমি কীটনাশক প্রয়োগ না করলে তো আমার সব ধান নষ্ট হয়ে যাবে। সার দিয়ে আমি দ্বিগুণ ধান জন্মাব। এটা অন্যায়ের কিছু না। কিন্তু আমার কৃষকরা জানে না কতটুকু কীটনাশক দিতে হবে। সে হয়তো একবারের জায়গায় পাঁচবার দিয়ে দিচ্ছে। আমরা বলি গুড এগ্রিকালচার প্র্যাকটিস। এখানে প্র্যাকটিস না থাকার কারণে, কৃষকদের সঠিক প্রশিক্ষণ না থাকার জন্যে তারা এটা করছে।

ঠিক একইভাবে পোল্ট্রিতে, মাছের খামারে চাষের পুকুর থেকে আরম্ভ করে খাদ্যে সবজায়গায় এটা ব্যবহার হচ্ছে। কিন্তু রাসায়নিকটাকে সঠিকভাবে না দেওয়ার কারণে যে খাবারটা পাচ্ছি সেটাতে ভেজাল পাচ্ছি। এটার জন্য আমাদের দেশের পুরো ফুড চেইন অর্থাৎ, উৎপাদন থেকে বিক্রয় পর্যন্ত প্রতিটা স্তরে আমাদের যে ঝুঁকিগুলো আছে সেগুলো চিহ্নিত করতে হবে। আর সেজন্য তাদের কাজটা যেন সঠিক হয়, তাদের সচেতন করতে হবে এবং প্রশিক্ষিত করতে হবে।

আরেকটা ভাগে দেখা যায়, আমি যখন খাদ্যটা আমার কাছে কিনে নিয়ে আসব তখন যেন আমি এটাকে আর সংক্রমিত না করি। এখানেও সচেতনতা প্রয়োজন। যারা খাদ্য তৈরি করে অথবা আমরা যারা খদ্য খাই, তাদেরও সচেতন হতে হবে। যেমন- আমি বাজার থেকে মাছ কিনলাম, মুরগি জবাই করে তার মাংসটা নিলাম। এই মুরগি জবাইয়ের পর যে মাংস সেটার ভেতরে ব্যাকটেরিয়া থাকার খুব আশঙ্কা থাকে। কাঁচা মাছেও সেটা থাকতে পারে। আর আমি যে ফলটা কাঁচা খাব যেমন- টমেটো, শসা- সেটাও একই থলে করে নিয়ে বাসায় গেলাম। অর্থাৎ মাছ-মাংস থেকে আমি ব্যাকটেরিয়া সংক্রমিত করলাম কাঁচা ফলের মধ্যে। মাছ মাংস আমরা ধুয়ে রান্না করে খাব তাই কোন ব্যাকটেরিয়া থাকলে সেটা মরে যাবে। কিন্তু আমি কাঁচা ফলটা যদি সঠিকভাবে না ধুয়ে খাই সহজে সংক্রমিত হবে। আমরা এটাকে বলি গুড হাইজেনিক প্র্যাকটিস। যা সঠিকভাবে না করলে আমাদের ডায়রিয়া, হেপাটাইটিস, টাইফয়েড- এগুলো হওয়ার সম্ভাবনা খুব বেশি থাকে। ৩০ শতাংশ খাদ্যজনিত রোগই এ সমস্ত কারণে হয়ে থাকে।

আমাদের দেশে সাড়ে সাত কোটি মানুষের জন্য যে খাদ্য উৎপাদন তৈরি করতে হয়েছিল এখন সেখানে ১৬ কোটির জন্য উৎপাদন করতে হচ্ছে। ফুড সিকিউরিটি যদি আমরা না করি তাহলে তো যত কথাই বলি লাভ হবে না। খাদ্য আগে নিশ্চিত না হলে তত অনিরাপদ খাদ্য খাবে।

তাহলে ফুড প্রোডাকশন বাড়াতে গিয়ে সেফ ফুড প্রোডাকশন করতে হবে। এ জন্য যে সমস্ত অনুশীলন দরকার প্রয়োজনীয় কাজগুলো সঠিকভাবে করলেই উৎপাদন সঠিক হবে।

নিরাপদ খাদ্যের জন্য সরকারি কর্মকাণ্ড কেমন?

নিরাপদ খাদ্য দেখার জন্য কৃষি, মৎস্য, বিএসটিআই-এর মতো সরকারের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান আলাদাভাবে গড়ে উঠেছে। তবে এখানে যে যার মতো কাজ করলেই হবে না। একটা সমন্বয় দরকার। সব সংস্থাই কাজ করছে, নিরাপদ খাদ্যকে প্রাধান্য দিচ্ছে কম। কৃষি বিভাগের গুরুত্ব বেশি ফলন, কিন্তু নিরাপদ খাদ্য তাদের প্রাধান্য পাচ্ছে না। এমন করে স্বাস্থ্যের অনেক কাজ আছে, ফুড সেফটিকে প্রাধান্য দিতে পারি না। আমাদের দেশে মাতৃমৃত্যু, শিশুমৃত্যুসহ বহু গুরুত্বপূর্ণ কাজ করতে হচ্ছে। নিরাপদ খাদ্য গুরুত্বপূর্ণ হলেও প্রাধান্য পাচ্ছে না। এই প্রাধান্যের জন্য আমাদের শক্তিশালী কমিটির প্রয়োজন, যারা শুধু এই কাজটিই করবে।

এই বিষয়টিকে সামনে রেখে আমাদের নিরাপদ খাদ্য আইন-২০১৩ হয়েছে। এই আইনের ভেতর দিয়ে বাংলাদেশ ফুড সেফটি অথোরিটি তৈরির বিষয়টি উঠে এসেছে। সেই আইন অনুযায়ী সরকার এবং অথরিটি ১লা ফেব্রুয়ারি থেকে কার্যক্রম শুরু করে দিয়েছে। যা খুবই ভালো একটা পদক্ষেপ। স্বাধীন একটা কমিটি হয়েছে যারা শুধু নিরাপদ খাদ্য নিয়েই কাজ করবে। খাদ্য নিয়ে যারা কাজ করে তাদের সমন্বয় করবে। অর্থাৎ, আমাদের একটা পুরোপুরি বিভাগ তৈরি হয়েছে যারা শুধু খাদ্য নিরাপত্তা নিয়ে কাজ করবে। এটা পৃথিবীর সকল উন্নত দেশেই রয়েছে। হয়তো ৫-৭ বছর বা তারও পরে এর সুফল পাওয়া যাবে। কারণ সার্বিক পরিবর্তন আনতে সময় লাগবে। তবুও একটা পদ্ধতির মাধ্যমে নিরাপদ খাদ্যের জন্য এগিয়ে যাচ্ছি। আমি মনে করি, সরকারি কর্মকান্ড হিসেবে এটা খুব ভালো একটা অগ্রগতি।

এর বাইরে আর কিছু করার আছে কিনা?

অনিরাপদ খাদ্যের আরেকটা করণ ভেজাল। আমাদের কিছু ব্যবসায়ী বেশি মুনাফা করার জন্য নীতিবিবর্জিত হয়ে ব্যবসা করছে। তারা অখাদ্যকে খাদ্যের সাথে সংমিশ্রণ করছে। এখানে সচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে খুব ভালো ফলাফল পাওয়া যাবে না। সচেতনতায় হয়তো কিছুটা কমবে কিন্তু যার ভেতরে আছে, আমি বেশি মুনাফা করব তাকে কিন্তু আইনের মাধ্যমে ধরতে হবে। আমার শক্তিশালী রেগুলটরি সিস্টেম ডেভেলপ করতে হবে। এর মাধ্যমে আইনের প্রয়োগটা যেন সঠিকভাবে হয়।

পুথিবীর বড় দেশেও এমন ভেজাল করে কিন্তু সেখানে ভেজাল করে পার পেতে পারে না।

আইন, আইনের প্রয়োগ, ব্যবহার সবকিছুর সাথে সাথে জ্ঞানটাকেও বাড়াতে হবে। যারা খাদ্য তৈরি করছে তাদের প্রশিক্ষিত করে তুলতে হবে। আবার খাদ্য তৈরি করার পর সঠিক পদক্ষেপ না নেওয়ার কারণেও নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। সে দিকটাতেও সবাইকে সচেতন করতে হবে।

পারিবারিক, ব্যক্তিগতভাবে কী করা যায়?

রান্নার দুই ঘণ্টা পরে যদি আমরা খাবারটা গরম না করে খাই তাহলে সেখানে ব্যাকটেরিয়া গ্রো করার সম্ভাবনা থাকে। এগুলো ঠিকভাবে প্র্যাকটিস করলে অনেক রোগ যেমন ডায়রিয়া, কলেরা, টাইফয়েড কমানো সম্ভব। শিশুসহ সবার ক্ষেত্রে আমরা বলি, হাতটা যেন ধুয়ে নেওয়া হয়, যে কোন খাবার গ্রহণের পূর্বে।

দীর্ঘস্থায়ী খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে কী করা উচিৎ?

এই বিষয়গুলোকে সামনে রেখে নিরাপদ খাদ্য ও স্বাস্থ্যকর জীবন, একটি দিবসের মাধ্যমেই শেষ হওয়া উচিৎ নয়, সারাবছরব্যাপী এবং দেশব্যাপী এটা চলা উচিৎ। তাহলে খাদ্যের রোগ থেকে আমরা মুক্তি পেতে পারি। আরেক দিকে সচেতনতা বাড়াতে হবে। আমরা পথখাবার খাচ্ছি, কিন্তু কতটুকু পরিষ্কারভাবে তৈরি হচ্ছে, আমি কতটুকু পরিষ্কারভাবে খাচ্ছি সেটাও দেখতে হবে।

অনেকেই পথখাবার প্রয়োজনে খাচ্ছে, কিন্তু নিরাপদ নিশ্চিত করতে পারছি না। সার্বিকভাবে সামান্য পরিবর্তন হলে, সকল পর্যায়ে প্রশিক্ষিত করা গেলে এ ব্যাপারটা নিশ্চিত করা সম্ভব।

ভেজাল রোধে আইনগতভাবে ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি খাবারটা যেন দূষিত না করতে পারে সেদিকেও অধিক গুরুত্ব দেওয়া উচিৎ। সুতরাং খাবারকে দূষিত করা থেকে রক্ষা করতে হলে সচেতনতা, প্রশিক্ষণ, অভ্যাসগত পরিবর্তন প্রয়োজন।

(দ্য রিপোর্ট/পিএম/এইচএসএম/এনআই/এপ্রিল ০৭, ২০১৫)

পাঠকের মতামত:

SMS Alert

স্বাস্থ্য এর সর্বশেষ খবর

স্বাস্থ্য - এর সব খবর



রে