thereport24.com
ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ৫ আশ্বিন ১৪২৫,  ৯ মহররম ১৪৪০

‘কৃষিতে বেশি বিষ ও সারই খাদ্য অনিরাপদ করছে’

২০১৫ এপ্রিল ০৭ ১৭:৪৬:৫৬
‘কৃষিতে বেশি বিষ ও সারই খাদ্য অনিরাপদ করছে’

‘নিরাপদ পুষ্টিকর খাবার, সুস্থ জীবনের অঙ্গীকার’ প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে সারাবিশ্বের মতো বাংলাদেশেও মঙ্গলবার বিশ্ব খাদ্য দিবস পালিত হচ্ছে। ভেজাল খাদ্যের ভিড়ে নিরাপদ খাদ্য বর্তমানে বাংলাদেশের একটি আলোচ্য বিষয়। বাংলাদেশে নিরাপদ খাদ্যের অবস্থান নিয়ে আলোচনা করতে দ্য রিপোর্ট মুখোমুখি হয় ইব্রাহিম মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ ও বারডেম হাসপাতালের মাইক্রোবায়োলজি বিভাগের প্রধান জালালউদ্দিন আশরাফুল হকের। তিনি বলেন, ‘আমাদের কৃষিতে বেশি পরিমাণ বিষ ও সারের ব্যবহারই বর্তমানে খাদ্যকে অনিরাপদ করছে।’

নিরাপদ খাদ্য সম্পর্কে আপনার অভিমত-

নিরাপদ খাদ্য নিয়ে আলোচনা করলে প্রথমে আমাদের দেখতে হবে, সবার কাছে খাদ্য পৌঁছাচ্ছে কিনা। খাদ্য পৌঁছালে সেই খাদ্য নিরাপদ কি অনিরাপদ তখন প্রশ্ন আসে। খাদ্য না পেলে নিরাপদের বিষয়টি অভুক্তের কাছে মূল্যহীন। সে জন্য যথেষ্ট পরিমাণ খাদ্য দরকার। আমাদের দেশে যদিও এখন খাদ্যাভাব নেই। সকলের কাছে পর্যাপ্ত খাদ্য পৌঁছাচ্ছে কিনা সেটা বলা মুশকিল কিন্তু মোটামোটি সবাই খাদ্য পাচ্ছে। দেশে একজন প্রাপ্ত বয়স্ক মানুষ ২-৩ হাজার ক্যালোরি পাচ্ছে কিনা সেটা বলা মুশকিল। খাদ্য কম পেলে সেটাও এক ধরনের অনিরাপদতা।

সাধারণত খাদ্য নিরাপদ বলতে সংক্রামক জীবাণু, খাদ্যবাহী বা পানিবাহিত যে রোগগুলো সেগুলোর জীবাণুমুক্ত খাদ্যকে বুঝায়। কিন্তু গত ২০ বছর আগে ডায়রিয়ায় যে পরিমাণ লোক মারা যেত এখন আর মারা যায় না। কারণ এর জন্য এখন চিকিৎসা বেরিয়েছে। তবে হারে কম হলেও এখনো মানুষ ডায়রিয়ায় ভুগছে। কারণ লোকদের মধ্যে এখন অনেক সচেতনতার সৃষ্টি হয়েছে। আমরা শিখে গেছি হাত ধুয়ে খেতে হয়, পঁচা-বাসি খেতে হয় না।

তারপরেও আমরা নোংরা জিনিস খাচ্ছি কেন? খাচ্ছি তখনই, যখন খাদ্যটা পাওয়া যায় না। যে খাওয়াটা পাচ্ছে না সেই খাচ্ছে। যেমন- রাস্তার পাশে খেতে হচ্ছে একজন রিক্সাওয়ালার। এখন কথা হচ্ছে ওই খাবারটাকে আমরা কতটুকু নিরাপদ করতে পারি?

কলেরা দিয়ে আগে গ্রামের পর গ্রাম উজাড় হয়ে যেত, এখন আর তা হয় না। কারণ সচেতনতা, লোকের মধ্যে শিক্ষার হার বেড়েছে। তাহলে নিরাপদ খাদ্যের পেছনে অর্থনৈতিক উন্নতি, পড়ালেখাটা এবং সরকারের দায়িত্ব জড়িত।

আরেকটা জিনিস টাইফয়েডতো এখনো আমাদের দেশে আছে। কিন্তু আগের তুলনায় অনেক কম। জন্ডিসটাও পানি বাহিত, কিন্তু জন্ডিস ভাইরাসজনিত। এখন পানিটা যদি আমরা ফুটিয়ে খাই, তাহলে ব্যাকটেরিয়া বলেন আর ভাইরাস বলেন সবই চলে যাবে। এখানেও অর্থনৈতিক ব্যাপার জড়িত, পানিটা ফুটাবে কে? যার আগুন আছে সেইতো ফুটাবে।

সরকারি দায়িত্ব বলতে…

ওয়াসার পানি সরবরাহ করছে যা কোন ব্যক্তির একার পক্ষে সম্ভব না, সরকারের পক্ষে সম্ভব। সরকার খাদ্য নিরাপদের দায়িত্ব নিলে দেখা যাবে আশি ভাগ সমস্যাই সমাধান হয়ে যাবে, আর বাকিটা বুঝাতে হবে।

তাহলে অর্থনৈতিক অনগ্রসরতা নিরাপদ খাদ্যের অন্তরায়?

অর্থনৈতিক উন্নতি যদি করা যায়, তাহলে এই ধরনের অনিরাপদ খাদ্য, পানি থেকে আমরা মুক্তি পাব সহজেই। গত ২০-৩০ বছরে আমাদের অনেক অর্থনৈতিক উন্নতি হয়েছে, এ জন্য পানিবাহিত রোগ কমে গেছে, অনিরাপদ খাদ্যের ধারাবাহিকতাটা কমে গেছে। গ্রামের মধ্যেও লোকজনের মধ্যে শিক্ষার হার বেড়েছে। তারা জানে এটা খেতে হয় না। কিন্তু অভাবের জন্য খেতে হয়। দরকার সুষ্ঠু ও নিরাপদ খাদ্যের এক্সেসটা করে দেওয়া। এ জন্য অর্থনৈতিক উন্নতিটা জরুরি।

নিরাপদ খাদ্যের প্রধান অন্তরায়-

পানিবাহিত, খাদ্যবাহিত, জীবাণুগঠিত অনিরাপদ ছাড়াও অনিরাপদ খাদ্যের প্রধান কারণ, আমাদের বাড়তি খাদ্য উৎপাদনের যে প্রচেষ্টা চলছে তাতে আমরা বেশি রাসায়নিক সার ও বিষ ব্যবহার করছি। এটা অনিরাপদ খাদ্যের সবচেয়ে বড় কারণ। তৃতীয় বিশ্বেও যেখানে আমাদের মতো শিক্ষার হার কম সেখানে ব্যাপারটা খুবই ভয়ানক।

তাহলে আপনি কীটনাশক ব্যবহার না করতে বলছেন।

উন্নত বিশ্বেও কীটনাশক ব্যবহার করা হচ্ছে। তবে নিরাপদ মাত্রায়। নিরাপদ মাত্রায় ১ লিটার দেওয়ার কথা থাকলে, তা না দিয়ে আমরা যদি মনে করি, কীট যখন মারবো ভাল করেই মারি। আমরা ২ লিটার দিয়ে দিলাম। এই যে বেশি মাত্রায় কীটনাশক প্রয়োগ হচ্ছে, এগুলো খাদ্যের সঙ্গে আমাদের শরীরে ঢুকছে। খাদ্যের ফলন বাড়ছে ঠিকই কিন্তু ক্যামিকেলগুলো আমাদের শরীরে ঢুকছে।

বৃষ্টির সাথে এবং বন্যার সাথে ফসলি জমির এই কীটনাশক জলাশয়ে যাচ্ছে, তখন এটি মাছের শরীরেও প্রবেশ করছে। গরু ঘাস খাচ্ছে, সে গরুর দুধ মাংসও খাচ্ছি। এটা একটা চক্রায়মান প্রক্রিয়া। সবই কীটনাশকযুক্ত। আজকে ডায়রিয়া, কলেরা হলে মানুষ দেখতে পায়। কিন্তু এই কীটনাশক নীরব ঘাতক হবে। যা এখন বুঝতে পারছি না। হয়তো ১০-২০ বছর পরে এর খারাপ দিকটা, খারাপ ফলগুলো আমাদের শরীরে দেখা যাবে।

এই পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াটা কেমন হতে পারে?

সব ধরনের কেমিকেলেরই একটা পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া থাকে। যা পরিণামে বেশি হলে ক্যান্সারও হতে পারে। তবে ক্যান্সারটা এক দিনে হয় না। আস্তে আস্তে এই কেমিকেলগুলো আমাদের শরীরে জমা হচ্ছে, একটা সময় দেখা যাবে এর প্রভাবে একটা বিশেষ ধরনের বা কয়েক ধরনের ক্যান্সার হতে পারে।

এ থেকে উত্তরণের উপায় কী।

সচেতনতার পাশাপাশি সরকার এবং জনগণের সমন্বিত উদ্যোগ দরকার। কীটনাশকতো ব্যবহার করতেই হবে। কিন্তু সহনসীল, নিরাপদ মাত্রায় করতে হবে। নিয়ন্ত্রিত মাত্রায় নির্দিষ্ট সময়ে এ সব প্রয়োগ করতে হবে। এ জন্য সচেতনতা বাড়াতে এবং কৃষককে ট্রেনিং দেওয়ানোর উদ্যোগ সরকারকেই নিতে হবে।

নিরাপদ খাদ্যে আর কি বাধা রয়েছে বলে মনে করেন।

খাদ্য অনিরাপদে আমাদের দেশে আরেকটা বড় বাধা উদ্বৃত্ত খাদ্যের প্রিজারভেশন সিস্টেম। এই প্রিজারভেসনটার জন্য নানান ধরনের প্রিজারভেটিভ ব্যবহার হচ্ছে। সর্বজনবিদিত হচ্ছে ফরমালিন, যা সরাসরি ক্যান্সারের জন্য দায়ী।

এ ছাড়া বিশেষ করে পচনশীল জিনিস যেগুলো যেমন— মাছ, মাংসে ফরমালিন বেশি দিচ্ছে। এগুলো আমরা খাচ্ছি এর প্রতিক্রিয়া যে কী, একমাত্র ভবিষ্যৎ বলতে পারে। এগুলোরও একটা সহনশীল মাত্রা রয়েছে। মাত্রাটা নিশ্চিত করবে সরকার, যার জন্য আইন করবে, জনসচেতন করবে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, তুমি যা কিনবা লেবেল দেখে কিনবা। যেটা অনিরাপদ সেটা খেও না। কিন্তু এই লেবেল যিনি লাগাচ্ছেন তিনিই এর সত্যতা বলতে পারেন। আবার লেবেলটা বুঝে কয় জন? আমাদের সর্বত্রই অসততা রয়েছে যা একটা বড় সমস্যা। কাল কি হবে সেটা বিবেচনা না করে আজকের লাভটাই বড় করে দেখি।

কীটনাশক রাসায়নিক নিয়ন্ত্রণের উপায় কী।

প্রিজারভেটিব, কীটনাশক, রাসায়নিক ব্যবহার নিয়ন্ত্রণের ভেতরে আনতে হলে সরকারের, জনসাধারণের, গণমাধ্যমের দায়িত্ব আছে। আমি মনে করি বাংলাদেশ অত্যন্ত সচেতন একটা দেশ। লেখাপড়া না জনলেও অত্যন্ত সচেতন মানুষ এরা। এ দেশের দীর্ঘ একটা রাজনৈতিক ইতিহাস আছে। মানুষগুলো মননের দিক থেকে খুব সচেতন। যার কারণে, ভারতের চেয়েও আমাদের শিশুমৃত্যুর হার অনেক কম। এ দেশের মানুষকে যদি ব্যাপারটা বলা হয়, হয়তো আজকে শুনছে না কিন্তু ৫ বছর পরে হলেও শুনবে, বুঝতে পারবে।

তবে এ সমস্ত ব্যবসায়ে যারা জড়িত, যারা বিত্তবান নিজেরা নিরাপদ খাদ্য খাচ্ছে তারাই শুনতে চাইবে না। সাধারণ মানুষ আইন মানে, আইনভাঙ্গে সেই লোক যে আইন ভেঙ্গে বাঁচতে পারে। এ দেশে যারা বড় ব্যবসা করছে, সার কীটনাশক ব্যবসা করছে, তারাই উদ্বুদ্ধ করছে বেশি মাত্রায় কীটনাশক, রাসায়নিক প্রয়োগের জন্য। আসলে দায়িত্বটা সমাজের সকলের।

রাস্তার খাবার প্রসঙ্গে যদি একটু বলেন।

অনেকের ধারণা, রাস্তার পাশের খাওয়া বেশি অনিরাপদ। কিন্তু সম্প্রতি এক গবেষণায় দেখা গেছে, ফাস্টফুডের খাদ্যে রাস্তার খাদ্যের চেয়ে বেশি টাইফয়েডের জীবাণু। ব্যাকটেরিয়ারতো অসুখের সংখ্যায় পৌঁছার জন্য একটা সময় লাগে। রাস্তায় খাবার প্রিজার্ভ করে না। দিনেরটা দিন বেচে ফেলছে। বড় দোকানিদের ফ্রিজ আছে, তারা এক দিনেরটা তিন দিন বিক্রি করে। যেখানে ব্যাকটেরিয়া মাল্টিপ্লাই করে ইনফেকশন করে ফেলে।

আরেকটি পরীক্ষায় দেখা গেছে, আমাদের দেশের গরুগুলো সবলভাবে সুস্থভাবে প্রতিপালিত হয় না। অনেক গরুই যক্ষ্মার জীবাণু দ্বারা আক্রান্ত, কিন্তু সেই হারে আমাদের যক্ষ্মা হয় না। যে হারে আমাদের দেশের গরুর যক্ষ্মা আছে, সে হারে দুধ, মাংস খেয়ে আমাদের যক্ষ্মা হয় না। রান্নার সংস্কৃতির কারণে আমরা অনেক সেইভ।

খাদ্য কীভাবে জীবাণুতে খাবার আক্রান্ত হচ্ছে?

খাদ্য আমাদের মুখ দিয়ে শরীরের ভেতরে ঢুকছে। খাদ্য ভেতরে পৌঁছলেই সেটায় কলেরা হবে না। সেখানে কলেরার জীবাণু থাকতে হবে। কিছু ব্যাকটেরিয়া আছে, যেগুলো খাদ্য পৌঁছলে ওখান থেকে টক্সিন তৈরি হয়, সেটা খেলে ডায়রিয়া হয়। পুকুরের পানিটা দিয়ে খাবারটা ধুয়া হচ্ছে সেখানে কলেরার জীবাণু থাকতে পারে। যার টাইফয়েড হয়েছে। তার পায়খানার সাথে অনেকদিন টাইফয়েডের জীবাণু যেতে পারে। যার মলের সাথে জীবাণু যাচ্ছে সে হাতটা ভালভাবে না ধুয়ে খাবার তৈরি করলো সেখান থেকে জীবাণু খাবারে চলে যায়। এভাবেই জীবাণু দ্বারা আক্রান্ত হতে পারে।

কোন ধরনের খাবার বেশি দূষিত?

বেশি দূষিত হয়, যে খাবারগুলো পানির সাথে বেশি যুক্ত। বিশেষ করে রাস্তার পাশে বা বাসার শরবত জাতীয় জিনিস। যা গরমের মধ্যে বেশি খাই। শরবতের পানি যদি দূষিত হয় সেখানে কলেরা, টাইফয়েড, ডায়রিয়ার জীবাণু থাকতে পারে। এ ছাড়া যে খাবার আমরা গরম করে খাইনা- লাচ্ছি, শরবত, আখের রস সেগুলোর মধ্যে বেশি জীবাণু থাকতে পারে। যেগুলো বেশি ফুটিয়ে খাই সেখানে জীবাণু থাকলেও মরে যায়।

আর সালাদ, যেগুলো কাঁচা খাই, ফল-সবজি। এগুলো পরিষ্কার পানি দিয়ে ধুয়া উচিত।

বিশুদ্ধ খাবারের ব্যাপারে আমাদের দেশে সচেতনতার হার কেমন?

এ নিয়ে গবেষণা নেই, তবে মনে হয় আমাদের দেশে মধ্যবিত্ত এবং শিক্ষিতরা সবাই সচেতন। গ্রামের লোকরাও সবাই অসচেতন নয়। হয়তো অভাবের কারণে সচেতনতার পরেও সঠিকটা ব্যবহার করতে পারে না। আমি মনে করি সচেতনতা সকল মানুষের মধ্যে কম-বেশি আছে। শিক্ষিত লোকের মধ্যে সচেতনতা বেশি। তবে অশিক্ষিতরাও জানে ময়লা খাবার খেতে হয় না।

গণমাধ্যম হিসেবে, সকলকে জানাতে আপনাদের উদ্যোগটা ভাল। যতবেশি আলোচনা হবে ততবেশি জানবে। ভাল এবং খারাপের দ্বন্দ্ব থাকবে। তবে আলোচনা হওয়া উচিত, সামাজিক, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেরও এই উদ্যোগ নেওয়া উচিত। জানা উচিত নিরাপদ খাদ্য আমাদের খেতে হবে এবং দিতে হবে। ব্যক্তিগত দায়িত্ব থেকে রাষ্ট্রীয় দায়িত্বটাই বেশি।

(দ্য রিপোর্ট/পিএম/এইচএসএম/এইচ/এপ্রিল ০৭, ২০১৫)

পাঠকের মতামত:

SMS Alert

স্বাস্থ্য এর সর্বশেষ খবর

স্বাস্থ্য - এর সব খবর



রে