thereport24.com
ঢাকা, মঙ্গলবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ১০ আশ্বিন ১৪২৫,  ১৪ মহররম ১৪৪০

বৈশাখের ঘনপল্লব, ঝড়, ভয়োল্লাস

২০১৫ এপ্রিল ১৩ ১৯:৩০:১৫
বৈশাখের ঘনপল্লব, ঝড়, ভয়োল্লাস ॥ বীরেন মুখার্জী

‘এসো হে বৈশাখ এসো এসো’-র বুঝে উঠার আগে কেশর ফোলানো চৈত্র রোদে না পুড়লে কিশোর বয়সে মজাটাই মাটি মনে হতো। ছুটির দিনে কিংবা স্কুল পালানো দিনগুলোতে পাটক্ষেতের আল ধরে দৌড়ানোর প্রতিযোগিতা ছিল বন্ধুদের মধ্যে। কচুরীপানার শাদা-বেগুনী ফুল সংগ্রহের প্রতিযোগিতায় বাড়ির পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া এককালের খরস্রোতা ফটকি নদীতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা মেতে থেকেছি। কিছুতেই চৈত্র কিংবা বৈশাখের তেজী রোদে ঘোরাঘুরি চলবে না, এতে শরীর খারাপ করবে— মায়ের এমন কড়া শাসন উপেক্ষিতই থাকত। কারণ কিশোর বয়সে শারীরিক অসঙ্গতির কোনো চিন্তাকে দুঃশ্চিন্তা মনে হতো না। চৈত্রের শেষ ভাগে যখন কাঠের বৃক্ষগুলো ঘনপল্লবে ছেয়ে যেত, তখন দেখতাম গাছের আমগুলোও বেশ ডাগর হয়ে উঠেছে। এ সময় আমাদের মজাটা ছিল অন্যরকম। দোলপূর্ণিমা শেষে পার্শ্ববর্তী গ্রামের বারুণী মেলা থেকে আম কাটার জন্য কিনে আনা চাকু (ছুরি) নিয়ে আমরা তৈরী। আর ঝড় হলে তো পোয়াবারো। বন্ধুরা যে যেখানেই থাকি না কেন, জড়ো হয়ে যেতাম মুহূর্তে, আমগাছের তলায়। আম কুড়াবার মজা বলে কথা। তবে বৈশাখের সামগ্রিক ভাবনাটা তখন তেমন মাথায় আসত না। অখণ্ড আনন্দ লাভই ছিল আসল কথা। কিন্তু বয়স বেড়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বৈশাখের অনুষঙ্গগুলো ধীরে ধীরে উপলব্ধিতে এসেছে। আচার, আচরণ থেকে শুরু করে জীবনানুষঙ্গের প্রতিটি বিষয়ই স্পর্শ করেছে। তবে সাহিত্যের পরিপ্রেক্ষিতে বৈশাখের নানামাত্রিক উপস্থিতির প্রাধান্য লক্ষ্য করেছি রবীন্দ্রসাহিত্যে। বৈশাখের বন্দনা, খরতাপ, প্রকৃতির বৈরিতা কিংবা আবাহন যা-ই বলি না কেন রবীন্দ্রনাথ যেভাবে প্রকৃতির বৈশাখকে মানুষের প্রাণে সঞ্চারিত করেছেন ভয়, আবেগ ও উদ্যাপনের বৈচিত্র্য দিয়ে তা এক কথায় অতুলনীয়। আবার বৈশাখের সঙ্গে বাঙালীয়ানার মেলবন্ধন অর্থাৎ সংস্কৃতির জায়গাটিও তিনি যথার্থভাবে চিহ্নিত করেছেন। বাঙালীর নিজস্ব সংস্কৃতি ও আত্মানুসন্ধানের ক্ষেত্রে বৈশাখের গুরুত্ব বলতে গেলে তিনিই সার্বিকভাবে তুলে ধরতে সক্ষম হয়েছেন।

প্রকৃতিতে বৈশাখের প্রসঙ্গ এলে বাঙালী যে উৎসবমুখর জাতি সে বিষয়ে সন্দেহ জাগে না। বাংলা নববর্ষ উদ্যাপন বাঙালী সমাজ ও সংস্কৃতির অন্যতম প্রধান অনুষঙ্গ হিসেবেই বিবেচিত হয়ে আসছে দীর্ঘদিন। কৃষিভিত্তিক সমাজব্যবস্থায় বেড়ে ওঠা বাঙালীর নববর্ষের অন্যতম আয়োজন বৈশাখী মেলাকে রবীন্দ্রনাথ দেখেছেন ভিন্নভাবে, গভীর পর্যালোচনায় তা তুলেও ধরেছেন সাহিত্যে। তথ্য মতে, বাঙালীর ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জাতিসত্তা ও নৃগোষ্ঠীর নববর্ষ অনুষঙ্গ আমানী, রাজপুণ্যাহ, হালখাতা, গাজনের গান ইত্যাদি ছাড়াও বাঙালীর একেবারে নিজস্ব উৎসব হিসেবে বৈশাখী মেলার প্রচলন ঘটে। গ্রামে-গঞ্জে অনুষ্ঠিত এসব মেলায় কৃষিজ পণ্য, কুঠির শিল্প দ্রব্য, মাটির তৈরী নানা তৈজসপত্র, খেলনা ও হস্তশিল্প দ্রব্য ইত্যাদি ক্রয়-বিক্রয়ের ধুম পড়ে যায়। মেলায় ষাঁড়ের লড়াই, মোরগ লড়াই, লাঠি খেলা, ঘোড়দৌড়, বলী খেলা, পুতুল নাচ, সার্কাস ইত্যাদি বিনোদন অনুষ্ঠানেরও আয়োজন হয়। যে কারণে গ্রাম্য মেলা বাঙালীর প্রাণের উৎস হিসেবে গণ্য। বছরের এই একটি দিন প্রত্যেক বাঙালী সব ধরনের কূপকণ্ডুকতা ঝেড়ে পরস্পর পরস্পরের সঙ্গে আলিঙ্গনাবদ্ধ হওয়ার সুযোগ পায়, যেখানে সম্প্রদায় কোনো বাধা নয়, মানুষকে মানুষ হিসেবেই বিবেচনা করা হয়। রবীন্দ্রনাথ ‘আত্মশক্তি’ প্রবন্ধে বলেছেন—

‘আমাদের দেশ প্রধানত পল্লীবাসী। এই পল্লী মাঝে মাঝে যখন আপনার বাড়ির মধ্যে বাহিরের বৃহৎ জগতের রক্তচলাচল অনুভব করিবার জন্য উৎসুক হইয়া ওঠে, তখন মেলাই তাহার প্রধান উপায়। এই মেলাই আমাদের দেশে বাহিরকে ঘরের মধ্যে আহ্বান। এই উৎসবে পল্লী আপনার সমস্ত সংকীর্ণতা বিস্মৃত হয়— তাহার হৃদয় খুলিয়া দান করিবার ও গ্রহণ করিবার এই প্রধান উপলক্ষ্য। যেমন আকাশের জলে জলাশয় পূর্ণ করিবার সময় বর্ষাগম, তেমনি বিশ্বের ভারে পল্লীর হৃদয়কে ভরিয়া দিবার উপযুক্ত অবসর মেলা।’

বলাবাহুল্য, একদিন নদীকেন্দ্রিক যে সভ্যতার জন্ম হয়েছিল তা গ্রামীণ সংস্কৃতির ভেতর দিয়েই বেগবান। আর ‘মেলা’ যে বাহিরকে ভেতরে এনে জনমনকে উল্লসিত, পরিতৃপ্ত করে তা রবীন্দ্রনাথের এ উপলব্ধির মাধ্যমেও স্পষ্ট। গবেষক ওয়াকিল আহমেদ বলেন, ‘পহেলা বৈশাখের সঙ্গে বাঙালীর আদি সংস্কৃতি যেমন, যাত্রা ও পালা, কবিগান, গাজির গান, আলকাপ, পুতুল নাচ, বাউল-মুর্শীদী-ভাটিয়ালী গান, লাইলী-মজনু, রাধা-কৃষ্ণ, ইউসুফ-জুলেখা ইত্যাদি পালা প্রদর্শনের আয়োজন করা হয় প্রত্যন্ত গ্রামে। অন্যদিকে বৈশাখের পৌরাণিক পরিপ্রেক্ষিত বিশ্লেষণে দেখা যায়, মাস হিসেবে বৈশাখের একটা স্বতন্ত্র পরিচয় আছে, যা প্রকৃতিতে ও মানবজীবনে প্রত্যক্ষ করা যায়। খররৌদ্র, দাবদাহ, ধু-ধু মাঠ, জলাভাব, কালবৈশাখীর ঝড়, ঝরাপাতা, গাছে গাছে নতুন পাতার আবির্ভাব, আমের কলি ইত্যাদি প্রকৃতি-পরিবেশের রূপ-রূপান্তরের সঙ্গে বাংলার মানুষের মন-প্রাণ-আত্মার যোগ আছে।’ ফলে বাঙালীমাত্রেই বৈশাখ নিয়ে পৃথক উপলব্ধি ও তার প্রকাশ রয়েছে।

এটা স্বীকার করতে হয়, বিবর্তিত বাস্তবতায় গ্রাম্য সংস্কৃতিতেও আগের মতো বৈশাখকে কেন্দ্র করে নির্মল আনন্দ লাভের সুযোগ সীমিত হয়ে পড়েছে। প্রাকৃতিক পরিবেশও যেমন তার রূপ পাল্টেছে তেমনি বিশ্বায়ন ও তথ্যপ্রযুক্তির সুবাদে গ্রামীণ এ সব সংস্কৃতিকে ‘করপোরেট সংস্কৃতি’ হিসেবে কাছে টেনে নিয়েছে মধ্যসত্ত্বভোগীরা। বাঙালীর নিজস্ব সংস্কৃতি যে বর্তমানে মিশ্র সংস্কৃতিতে পরিবর্তিত হয়ে পড়েছে, এসব তারই ইঙ্গিতবাহী। এ প্রসঙ্গে ব্যক্তি প্রসঙ্গের অবতারণার প্রয়োজন বোধ করছি। আজ থেকে চল্লিশ বছর আগেও চৈত্র মাসের শেষদিনে কালবৈশাখী ঝড় হতে দেখেছি। স্কুল থেকে প্রায় দেড় মাইল পায়ে হেঁটে বাড়ি ফিরতে বিকেল হয়ে যেত। খাওয়া শেষে দেখতে পেতাম বায়ু কিংবা নৈঋত কোণ কখনো ধূসর আবার কখনো বা গোধূলীর রক্তিমাভায় মাখামাখি। নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে দেখেছি উত্তরাকাশে মেঘ করলেই বলাকার সারিবদ্ধ উড়াল। প্রকৃতির এই নান্দনিক দৃশ্যাবলী বৈশাখেরই অনুষঙ্গ। ফলে বৈশাখ সম্পর্কে বলতে গিয়ে এসব দৃশ্য এড়িয়ে যাওয়ার কোনো সুযোগ থাকে না। বৈশাখ যদি হয় যাবতীয় পুরাতনকে ঝেড়ে ফেলে নতুনের আহ্বান তাহলে রবীন্দ্রনাথকেই স্মরণ করতে হয়—

‘তাপসনিঃশ্বাস বায়ে মুমূর্ষুরে দাও উড়ায়ে,
বৎসরের আবর্জনা দূর হয়ে যাক’।

আবার কাজী নজরুল ইসলাম কালবৈশাখীর কথা বলেছেন—
‘তোরা সব জয়ধ্বনি কর্!

তোরা সব জয়ধ্বনি কর্!!
ঐ নূতনের কেতন ওড়ে কাল্-বোশেখীর ঝড়।’

বস্তুত বাঙালী সমাজে নতুনকে বরণ করে নেওয়ার প্রবল আগ্রহ থেকেই বৈশাখকে ঘিরে নানা অনুষ্ঠানাদির আয়োজন হয়ে আসছে।

বাংলায় বৈশাখের উৎসব মানেই নববর্ষ পালনের সংস্কৃতি, এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকতে দেখা যায় হালখাতা ও খাজনা পরিশোধের তাগিদ। কিন্তু এর অনেক কিছুই পরিবর্তিত হয়েছে। জমিদারী প্রথা বিলোপের সঙ্গে সঙ্গে খাজনা আদায়ের প্রথাও বন্ধ হয়ে গেছে। তবে একথা মানতে হয়, বৈশাখের সংস্কৃতি বাঙালী জীবন ও সাহিত্যে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে। শৈশবে দেখেছি চৈত্রজুড়ে নানা অনুষ্ঠানমালা, যা বৈশাখকে আহ্বানেরই নামান্তর। চৈত্রমাস বসন্তকালের শেষ মাস আর বৈশাখে শুরু গ্রীষ্মকাল। প্রকৃতিতে গ্রীষ্মকাল শুরুর আগেই প্রচণ্ড দাবদাহে দগ্ধ হতে থাকে প্রকৃতি। কাজেই কৃষিজীবী মানুষের ভয়ভীতিও বাড়ে। উত্তপ্ত পৃথিবী নবজলধারায় কখন শীতল হবে, ফসলের কী হবে এই আশায় দিন গোনেন কৃষককূল। ক্রমে রুদ্ররূপ নিয়ে বৈশাখ আসে। তবে বৈশাখ যতটা রুদ্ররূপের ঠিক ততটাই মায়াময়। গাছে গাছে ঘনপল্লবের সঙ্গে রঙিন ফুল প্রকৃতিতে যে প্রশান্ত মায়ার বিস্তার ঘটায়, তা মানুষ নির্মলভাবে উপভোগের মধ্য দিয়ে অনুভব করে। বৈশাখের মায়াময় রূপটা অনুভবের জন্য কল্পনাপ্রবণ না হয়ে উপায় থাকে না।

বৈশাখে নতুন সুগন্ধি ধানে উঠোন ভরে যেতে দেখেছি কিশোর বয়সে। ঢেঁকিতে ধান ভানা এবং নতুন নতুন পিঠে আর ক্ষীর রান্নার দৃশ্যগুলো এখনো চোখে ভাসে। নতুন জামা গায়ে জড়িয়ে বাবার হাত ধরে ‘ভগবতী পূজা’ দেখতে যেতাম। এটা সনাতন সংস্কৃতির অংশ কিন্তু বাঙালী জীবনধারার বাইরের কিছু নয়। কেননা, বাঙালী তার জাতিসত্তায় অসাম্প্রদায়িক চেতনাকেই লালন করে। নববর্ষের প্রথম দিন বৈশাখের গনগনে সূর্যের তাপ কমে এলে, বিকেলে চুপিসারে বের হতেই উত্তরাকাশে দিগন্ত বরাবর কালো মেঘের চোখ রাঙানী দেখতাম। আকাশে মেঘ-বিদ্যুতের চমকে ভয়ে হু হু করে উঠত ভেতরটা। বৈশাখের ঝড়ে শিলা কুড়ানো আর বজ্রপাতের বিকট শব্দ এখনো কানে বাজে। এখন বুঝতে পারি জীবনের ওই টুকরো আনন্দের মধ্যে ধরা রয়েছে বৈশাখের রূপ-বৈভবের চেতনামিশ্রিত নতুন অনুভব। বৈশাখে প্রকৃতির ওই রূপ চিরন্তন, ওই রূপ জানান দেয় বাঙালী সংস্কৃতির, যা মানুষের বিশ্বাসের সঙ্গেই সম্পর্কযুক্ত।

তবে অস্বীকারের উপায় নেই, ঐতিহ্যকে ভিত্তি করে জাতীয় সংস্কৃতি সমৃদ্ধ ও শক্তিশালী হয়। বাঙালীর ধর্মের ভিন্নতা থাকা সত্ত্বেও মূল্যবোধ ও জাতীয় চেতনায় অভিন্ন ও সংস্থিত। তবে বাংলার ওই সংস্কৃতির এখন রূপবদল ঘটেছে। বাঙালীর নিজস্ব সংস্কৃতি এখন করপোরেট চরিত্রে মিশে মিশ্রসংস্কৃতি হিসেবে প্রবহমান। বিশ্বায়নের নামে অন্তঃসারশূন্য বাহ্যিক চাকচিক্যময় আগ্রাসী অপসংস্কৃতির কারণে বাঙালী আজ মোহাচ্ছন্ন। পণ্য সভ্যতার প্রসারে সংস্কৃতিতেও সংকট দানা বেঁধেছে। এতে আর যাই হোক, সংস্কৃতি চর্চা ও রক্ষা যে কঠিন হয়ে পড়বে তা বলাই বাহুল্য। এই বিভ্রান্তি থেকে নতুনপ্রজন্মকে মুক্ত করতে হলে আমাদের নিজেদের শেকড়সন্ধানী হওয়া বাঞ্ছনীয়। পাশাপাশি এটাও মনে করা অসঙ্গত নয় যে, কৃষিনির্ভর বাঙালী জাতির নববর্ষ কৃষি সংস্কৃতির ভিত্তিতেই হওয়া বাঞ্ছনীয়।


দোহাই
১. বাংলা নববর্ষের চেতনা, প্রবন্ধ : ওয়াকিল আহমদ

২. বাংলা নববর্ষের চেতনা, প্রবন্ধ : ওয়াকিল আহমদ
৩. প্রবল বৈশাখ : পণ্য সভ্যতায় শিল্প সংকট , প্রবন্ধ : সেলিম আল দীন
৪. লোকজীবন ও বৈশাখী মেলা, প্রবন্ধ : মোহাম্মদ সাইদুর
৫. বৈশাখ, প্রবন্ধ : আতোয়ার রহমান
৬. বাংলাদেশের উৎসব নববর্ষ, সম্পাদক : মোবারক হোসেন

বীরেন মুখার্জী : কবি, প্রাবন্ধিক ও সাংবাদিক

পাঠকের মতামত:

SMS Alert

মুক্তমত এর সর্বশেষ খবর

মুক্তমত - এর সব খবর



রে