thereport24.com
ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ৫ আশ্বিন ১৪২৫,  ৯ মহররম ১৪৪০

 

বর্ষবরণ : পৃথিবীর সবচেয়ে পুরনো উৎসব

২০১৫ এপ্রিল ১৩ ২০:২২:৫২
বর্ষবরণ : পৃথিবীর সবচেয়ে পুরনো উৎসব ॥ সঞ্জয় সরকার

‘ওহে পান্থ!—

অতীতের সুখ দুঃখ ভুলে যাও তুমি
অই যে ব্রহ্মাণ্ড যুড়ে
সম্মুখে রয়েছে পড়ে
তোমার সে কর্মক্ষেত্র-মহারঙ্গ ভূমি।’

এটি নববর্ষকে কেন্দ্র করে কায়কোবাদের (১৮৫৭-১৯৫১) রচনা। কবিতার নামও ‘নববর্ষ’। কবিতাটিতে অতীত দুঃখ ভুলে সম্ভাবনাময় ভবিষ্যৎকে গ্রহণ করার আহ্বান শোনা যায়। নিষ্ফলা অতীত নিয়ে আক্ষেপ না করে আগামীর কর্মযজ্ঞে নেমে পড়ার এক আবাহনগীতি এ কবিতা। মহাকালের গহীন, অতল সরোবরে এ কবিতা কিন্তু সদ্য ফোটা পদ্ম; নবীনতর সাক্ষ্যমাত্র। এমন একটি কবিতার জন্য মানব সম্প্রদায়কে প্রতীক্ষার প্রহর গুনতে হয়েছে লক্ষ লক্ষ বছর। কবিতাহীন গদ্যময় দুঃসহ জীবন কেটেছে মানুষের কাল-কালান্তর। বলা হয়, রামের জন্মের ষাট হাজার বছর আগে বাল্মিকী রামায়ণ রচনা করেছিলেন আর এই বাল্মিকীর মুখ থেকেই প্রথম স্বতঃস্ফূর্ত ছন্দ তথা কবিতা বের হয়েছিল। আপন মুখনিঃসৃত ছন্দে বাল্মিকী নিজেই অভিভূত হয়েছিলেন। কিন্তু ষাট হাজার বছরও তো মহাকালের তুলনায় মহাসাগরের কাছে গরুর পায়ের খুরের গর্তে জমে থাকা জলে মতো।

ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় ইতিহাসের আদিপর্বে পৃথিবীতে মানুষ আজকের মতো এমন সুযোগ-সুবিধা সমৃদ্ধ ও সুরক্ষিত ছিল না বরং ছিল নিতান্তই অরিক্ষত। ক্ষুধায় তার অন্ন ছিল না, লজ্জা নিবারণের কাপড় ছিল না, রোদ, ঝড়, বৃষ্টিতে মাথার উপরে আচ্ছাদন ছিল না। এমনকি তার হাতের আঙ্গুলগুলিও আজকের মতো কলাকৌশল সমৃদ্ধ ছিল না। রবীন্দ্রনাথের ভাষায়—

“সে বর্বর, সে মূঢ়
তার অঙ্গুলি ছিল স্থূল, কলাকৌশল বর্জিত।”

অথচ মানুষ সেই প্রাগৈতিহাসিক, গুহাবাসী মহাসংগ্রামমুখর জীবনেই সময় গণনার সূত্রপাত ঘটায়। সময়ের প্রয়োজনে ও বিবর্তনে সেই গণনা পদ্ধতি উন্নত থেকে উন্নতর হয়েছে, প্রত্যাশিত নিয়মেই। প্রথমতঃ সূর্যের গতি বিশেষতঃ আহ্নিক গতিই মানুষকে সময় গণনায় উদ্বুদ্ধ করে থাকবে সম্ভবতঃ। পরবর্তীকালে চন্দ্রের গতি ও নক্ষত্র এই কাজে সহায়ক উপায়রূপে দেখা দেয়। ‘নববর্ষ’ উদ্যাপনের ঘটনা, সে অনেক পরের ইতিহাস।

পৃথিবী ৩৬৫ দিনে সূর্যকে প্রদক্ষিণ করে। এই প্রদক্ষিণকালকে একক ধরে নিয়ে বর্ষ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। প্রাচীনকাল থেকেই কাল পরিমাপের ক্ষেত্রে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বর্ষ গণনার রীতি অনুসৃত হয়ে আসছে। বর্ষ গণনায় প্রধানতঃ তিনটি পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়ে থাকে। ১. সৌরবর্ষ ২. চান্দ্রবর্ষ ৩. নাক্ষত্রবর্ষ। সৌরবর্ষ নির্ণিত হয়েছে সূর্যের বার্ষিক গতি অনুসারে। ৩৬৫ দিনে এক সৌরবর্ষ। পৃথিবীর অধিকাংশ দেশেই সৌরবর্ষকে কাল গণনার এককরূপে বিবেচনা করা হয়। চন্দ্রের গতি অনুসারে চান্দ্রমাস এবং বছর গণনার রীতি প্রচলিত। চন্দ্রের সংক্রমণকাল বিবেচনায় নিয়ে ৩৫৪ বা ৩৫৫ দিনে এক চান্দ্রবর্ষ হয়ে থাকে। সাধারণত মুসলিম দেশগুলিতে চান্দ্রবর্ষ গণনার রীতি প্রচলিত। নক্ষত্রের বিবেচনায় নাক্ষত্রবর্ষ গণনা করা হয়। ৩৬০ দিনে এক নাক্ষত্রবর্ষ। মহান ভারত্বতত্ত্ববিদ আলবেরুণী তাঁর গ্রন্থ কিতাব উল হিন্দ-এ উল্লেখ করেন, (গজনীর সুলতার মাহমুদের আমলে রচিত) প্রাচীন ভারতে যে কয়টি অব্দ প্রচলিত ছিল তা হল : বিক্রমাব্দ, শতাব্দ, বঙ্গাব্দ ও গুপ্তাব্দ। এ সব অব্দ সৌরবছরভিত্তিক। ওই গ্রন্থে তিনি এ বিষয়ে একটি স্মরণযোগ্য উক্তি করেন, “হিন্দুদের মাস হল চন্দ্র আর বছর হল সৌর” হিন্দুদের ধর্মীয় অনুষ্ঠানাদি একদিকে ঋতুভিত্তিক অন্যদিকে তিথিকেন্দ্রিক। যেমন বাঙালী হিন্দুদের দুর্গাদেবীর পূজা হতে হবে শরৎ ঋতুতে একই সাথে শুক্লপক্ষের সপ্তমী তিথিতে।

খ্রীষ্টাব্দ সৌরবছর। যীশুখ্রীষ্টের জন্মের তিন বছর পর থেকে খ্রীষ্টাব্দ গণনা করা হয়। খ্রীষ্টাব্দ এখন আন্তর্জাতিক অব্দ। পৃথিবীর অধিকাংশ দেশেই এই অব্দ প্রচলিত। হিজরী অব্দে গণনা রীতি চান্দ্রমাস অনুযায়ী। হযরত মোহাম্মদ (দঃ)-এর মক্কা থেকে মদীনায় হিজরতের মাস (৬২২ খ্রীষ্টাব্দ) থেকে এই অব্দ গণনা করা হয়। হযরত ওমর (রঃ) হিজরী সাল প্রবর্তন করেন। বাংলাদেশ মুসলিম বিজয়ের পর হিজরী সালের প্রচলন শুরু হয়। ইংরেজ আগমনের পূর্বে মুসলিম শাসনামলে হিজরী সালের ব্যাপক প্রচলন ছিল। আমাদের দেশে ইংরেজরাই খ্রীষ্টাব্দ প্রচলন করেন।

বাংলা অব্দের উৎস অনুসন্ধান : মুসলিম শাসনামলে হিজরী সালের ব্যাপক প্রচলন থাকলেও বাংলা সালেরও প্রচলন ছিল। বাংলা সাল ব্যবহারের আদি নিদর্শন পাওয়া যায় বারোভূঁইয়াদের অন্যতম ঈশা খাঁর একটি কামানে। তাতে লেখা ছিল “সরকার শ্রীযুত ইছাখাঁন মসনদ্দানী সন হাজার ১০০২।” এটি ১৫৯৫ খ্রীষ্টাব্দে খোদাই করা হয়।

বঙ্গাব্দের মূলভিত্তি হিজরী সাল। সম্রাট আকবর যখন (১৫৫৬ খ্রীষ্টাব্দ) সিংহাসনে আরোহণ করেন, তখন এই সাল প্রবর্তন করেন। সম্রাট আকবর প্রকৃতই বর্তমানে প্রচলিত বঙ্গাব্দ সরাসরি প্রবর্তন না করলেও সম্রাট প্রবর্তিত ‘তারিখ-ই- ইলাহী’’র আদলে স্থানীয়ভাবে পণ্ডিতগণ বাংলা সন প্রচলন করেছিলেন। আকবর ছিলেন বাস্তববাদী (Pragmatic) ও দূরদর্শী। তিনি বুঝেছিলেন হিজরী কিংবা ভারতীয় চন্দ্র-সূর্যভিত্তিক বর্ষপঞ্জি এই ষড়ঋতুর দেশে অচল।

সম্রাট আকবরের সিংহাসন আরোহণকালে ভারতীয় উপমহাদেশে বিভিন্ন সাল প্রচলিত ছিল। যেমন : লক্ষণাব্দ, বিক্রমাব্দ, শালিবাহন শাল, জালালী সাল, সেকান্দার সাল, শতাব্দ, গুপ্তাব্দ ইত্যাদি। এই সালগুলি উপমহাদেশের সর্বত্র প্রচলিত ছিল না। বিভিন্ন অঞ্চলে বিভিন্ন সাল প্রচলিত থাকায় কোনোটি সর্বজনীনতা পায়নি। প্রচলিত এ সব সালের মধ্যে কোনো কোনোটি চান্দ্রমাসের হিসাবে গণনা করা হতো। কিন্তু চান্দ্রবছরের তারিখ সৌরবছরের গণনায় প্রতি বছরে ১১ দিন পিছিয়ে পড়ে। সুতরাং শাহী-লেনদেন ও প্রজা-সাধারণের সুবিধার্থে একটি সৌরসাল প্রবর্তনের প্রয়োজনীয়তা প্রকট হয়ে পড়ে। রাজদরবারে বহুদিন ধরেই হিজরী সালের ব্যবহার ছিল। কিন্তু হিজরী সাল চান্দ্র অব্দ। তাই আকবর একটি নতুন সৌরসাল প্রণয়নের আদেশ জারী করেন। মোগল সাম্রাজ্যের ‘অর্যাবতে’ এবং ‘দক্ষিণাত্যে’ নতুন সালটি ‘ফসলী সন’ নামে পরিচিতি পায়। সালটি বঙ্গদেশে এসে বঙ্গাব্দরূপে প্রতিষ্ঠা পায়। সুবেবাংলায় খুব সম্ভবত রাজস্ব বিষয়ক পণ্ডিত রাজা টোডরমল ‘তারিখ-ই-ইলাহী’র প্রবর্তন করেন। স্থানীয় পরিবেশ, প্রতিবেশের সাথে সঙ্গতি রেখে সম্রাট আকবর প্রবর্তিত ‘তারিখ-ই-ইলাহী’ ই বাংলা সন বা বঙ্গাব্দে রূপান্তরিত হয়। সুতরাং বলা যায়, বাঙালী জাতির মতো বাংলা সনও একটি শংকর অব্দ। যার ভিত্তি হিজরী সন কিন্তু গণনা করা হয় সৌর পদ্ধতিতে। বর্ষগণনা শুরু হয় মেষাদি পদ্ধতিতে এবং প্রথম মাসের নাম হয় বৈশাখ। আকবর নামাতে ১ম থেকে ২৭ ইলাহীর বর্ষারম্ভের (বছর শুরুর) দিনগুলি নথিভুক্ত আছে। তাতে দেখা যায়, এ সব বছরে প্রতিটি বর্ষ শুরু হয়েছিল ১১ মার্চ থেকে (১৪ বার) ১০ মার্চ থেকে (১০ বার), ১২ মার্চ থেকে (৩ বার), অর্থাৎ ‘তারিখ-ই-ইলাহী’র শুরুর বছর থেকে ২৭তম বর্ষ শুরু হয়েছিল ১০ মার্চ থেকে ১১ মার্চের মধ্যে। পরবর্তীকালে এর পরিবর্তন ঘটে। ২৮তম বর্ষ শুরু হয় ২১ মার্চ ১৫৮৩ (হিজরী : সফর ২১, ৯৯৩)। আর ২৯তম বর্ষে এ সম্পর্কে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেওয়া হয় এবং নতুন অব্দের নামকরণ করা হয় ইলাহী। বঙ্গাব্দ ও ইলাহী মূলতঃ হিজরীর জাতক আর বঙ্গাব্দ ইলাহীর সহোদর। তাই ‘ইলাহী’ নিয়ে এত এলাহীকাণ্ড। আবার বঙ্গাব্দের তথ্যানুসন্ধানে ফিরে আসা যাক। বিশ্বকোষ গ্রন্থে উল্লেখ করা হয়— হোসেন শাহ নামে জনৈক রাজা বঙ্গাব্দ প্রচলন করেন, মতান্তরে জনৈক ফতে উল্লাহ সিরাজী বাংলা সালের প্রবর্তক (হোসেন সুফী সম্পাদিত— ‘ঢাকা পাচাস বারাস পাহলে)। বঙ্গাব্দের প্রচলন সম্পর্কে আরেকটি মত : ৫৯২-৫৯৩ খ্রীষ্টাব্দে গৌরেশ্বর শশাঙ্ক তার রাজধানী প্রতিষ্ঠা করলেন ভাগীরথীর পশ্চিমতীরে রাঢ় দেশের কানসোনা গ্রামে। বৈশাখ মাসের সেই শুভক্ষণ থেকে বঙ্গাব্দের নতুন বর্ষগণনা শুরু হল। বঙ্গাব্দ প্রচলনের সাথে সাথে সেকালে প্রচলিত স্থানীয় চান্দ্রমাসগুলিও সৌরমাসে পরিণত হয়। ফলে বৈশাখ, জৈষ্ঠ্য আষাঢ়, শ্রাবণ, প্রভৃতি নামগুলিও বঙ্গাব্দের বিভিন্ন মাসের নামরূপে গৃহীত হয়। বিভিন্ন মাসের নামের উৎস নিম্নরূপ :

‘বৈশাখ-বিশাখা নক্ষত্র, জৈষ্ঠ্য-জৈষ্ঠা নক্ষত্র, আষাঢ়-আষাঢ়া নক্ষত্র, শ্রাবণ-শ্রাবণা নক্ষত্র, ভাদ্র-ভাদ্রা নক্ষত্র, আশ্বিন-অশ্বিনী নক্ষত্র, কার্তিক-কৃত্তিকা নক্ষত্র। অগ্রহায়ণ-অগ্র (প্রথম)+হায়ণ (বৎসর) পৌষ-পুষ্যানক্ষত্র। মাঘ-মঘান নক্ষত্র, ফাল্গুন-ফাল্গুনী নক্ষত্র চৈত্র-চিত্রা নক্ষত্র।

বিভিন্ন নক্ষত্রের নামে মাসের নাম নির্ধারিত হয়। অগ্রহায়ণ মাসের নাম কোনো নক্ষত্র অনুসরণ করেনি। এককালে ফসল তোলার এই মাসকে বছরের প্রথম মাস রূপে বিবেচনা করা হতো। ‘অভিধান চিন্তামণি’ নামে এক প্রাচীন সংস্কৃত গ্রন্থে, বছরের বিভিন্ন মাসের তালিকা শুরু করা হয়েছে অগ্রহায়ণ মাসে দিয়ে)

সম্রাট আকবর প্রচলিত ‘তারিখ-ই-ইলাহী’ তথা হিজরী সনই বাংলা সালের মূলভিত্তি। এটিই ঐতিহাসিক সত্য। অন্যান্য সিদ্ধান্তগুলি নিতান্তই একেকটি মত মাত্র। এ সব মতের ভিত্তিমূলে বস্তুনিষ্ঠ তথ্য-প্রমাণ নেই। বঙ্গাব্দের উৎস সম্পর্কে আরও কিছু মত প্রচলিত আছে।

কিন্তু সে সব মত, কালান্তরে ভুল প্রমাণিত হয়েছে। সুতরাং সম্রাট আকবরই বাংলা সনের প্রবর্তক— এটিই ইতিহাসের সত্য। ভারতবর্ষের অন্যতম মহান বাঙালী জ্যোতিষপদার্থ বিজ্ঞানী ড. মেঘনাদ সাহার অভিমত এই ঐতিহাসিক সত্যকে বৈজ্ঞানিক ভিত্তি দিয়েছে। ড. মেঘনাদ সাহার মন্তব্য উদ্ধৃত করার লোভ সামাল দিতে পারছি না।In 1079 A.D. Sultan Jalaluddin Melik Shah of Iran introduced a salar calendar for Inran and this was introduced by Emperor Akbar in India in 1584 under the name Tarik-E-ilahi Akbar’s calender was used to date all events from his accession (1556 A.D.) and was official calendar during the reign of Jahangir and early part of Sahjahan’s reign when it fell into disuse. But it gave rise to number of hybrid eras like the Bengali san and the false era which are still in use.

খ্রীষ্টাব্দ, হিজরী বা বঙ্গাব্দ ছাড়া অন্যান্য অব্দ হারিয়ে গেছে কালের অতলান্তে। হিজরী সাল বাঙ্গালীর জীবনে ধর্মীয় আচার-আচরণে ব্যবহৃত অব্দ; আর খ্রীষ্টাব্দের ব্যবহার এর আন্তর্জাতিকতার খাতিরে। বঙ্গদেশে প্রচলিত অন্যান্য অব্দের অধিকাংশই কোন রাজ-রাজার নামযুক্ত কিংবা তাঁদের রাজ্যাভিষেক সম্পর্কিত। কিন্তু বাঙ্গালী জাতিসত্তা এবং তার সংস্কৃতির উদরে জন্ম নেওয়া সাল বঙ্গাব্দ। এখানে কোনো রাজা-মহারাজা নেই কোনো জমিদার নেই, কোনো সামন্ত মহাজন ফড়িয়া নেই। বাংলার শ্যামলপ্রকৃতি, তার সুপ্রাচীন সাংস্কৃতিক নরম পলিমাটি থেকে জন্ম নেওয়া সাল বঙ্গাব্দ। তাই এটি গণমানুষের সাল। আপামর বাঙ্গালী জনসাধারণের সাল। একই সাথে অসাম্প্রদায়িতক চেতনাঋদ্ধ সাল। সর্বজনীন সাল। কোনো খ্রীষ্টীয় অব্দ থেকে বাংলা সন পেতে আমর নীচের সূত্রটি ব্যবহার করতে পারি।

মনে করা যাক,

ক = নির্ণেয় বাংলা সাল; খ= প্রদত্ত খ্রীষ্টীয় সন।
তাহলে দেখা যায়,

ক= ৯৬৩ + (খ-১৫৫৬) [৯৬৩ হিজরী সাল ও ১৫৫৬ খ্রীষ্টাব্দ]

একটি উদাহরণ দেওয়া যাক—

খ= ২০১৫, তাহলে
ক আনুষঙ্গিক বাংলা সাল = ৯৬৩ + (২০১৫-১৫৫৬)

= ৯৬৩ + ৪৫৯
= ১৪২২ বাংলা সন

বর্ষবরণ দেশে দেশে কালে-কালে : মহাকাল করাল গ্রাসী। বিজ্ঞান কিছু শুরু হতে না হতেই তা শেষ করে দিতে চায়। মানবসত্তা মহাকালের বিপরীতমুখী। মানুষ কেবলই শুরুর উৎসবে মেতে উঠতে চায়। মানুষের এই অদ্ভুত, চমৎকার ইচ্ছারই রূপায়ণ হয়ে থাকবে নববর্ষ; তথা বর্ষবরণ উৎসব। ঠিক করে কোথায় মানবসমাজে প্রথম এই উৎসবে মেতে উঠেছিল তার কোনো কোষ্ঠীনামা নেই। আবার আজও এই উৎসব পালনের কোনো সর্বজনীন বিশ্ব ব্যবস্থা নেই। অজ্ঞাত অতীতে মানুষ প্রকৃতির রূপের ভিন্নতা দেখে, সময়কে ভাগ করে নিয়েছিল ঋতুতে। আর এই রূপ ভিন্নতার চক্রকার গতিও তারা লক্ষ্য করেছিল। একটি গণনাচক্রকে তারা ধরে নেয় বছররূপে। একটি বছর কালের অতলে হারিয়ে যেতে না যেতেই, তার সামনে আবির্ভূত হয় নতুন আরেকটি বছর। বছরের নতুন এই দিনটিকে সাদরে অভ্যর্থনা জানানোর আয়োজন সুপ্রাচীন কেবল নয়; বরং সম্ভবত এটিই পৃথিবীর ইতিহাসে মানব সমাজের সব চেয়ে পুরনো উৎসব।

পণ্ডিতদের ধারণা, আজ থেকে প্রায় চারহাজার বছর আগে বর্ষবরণ উৎসবের সূচনা হয়েছিল প্রাচীন ব্যাবিলনে। নববর্ষ উৎসব পালনে দেশ, কাল, জাতিভেদে ভিন্নতা থাকলেও মূল মনস্তত্ত্ব অভিন্ন। অর্থাৎ অতীতকে পেছনে ফেলে সম্ভাবনাময়, সমৃদ্ধ, আলোকিত ভবিষ্যতের প্রত্যাশা। ইতিহাস জানায়, খ্রীষ্টপূর্ব ২০০০ অব্দে চান্দ্রমাস অনুসারে বসন্ত ঋতুর প্রথম দিনে পালিত হতে নববর্ষ উৎসব। জুলিয়াস সিজার প্রবর্তিত ক্যালেন্ডার অনুযায়ী দিনটি ছিল ২৩ ও ২৫ মার্চের মধ্যে। প্রাচীন ব্যাবিলনে বসন্তকাল ছিল নতুন কুঁড়ি অঙ্কুরোদগমের কাল তথা ফসল উৎপাদনের উপযুক্ত সময়।

প্রাচীন মিশরীয়রা নীলনদের প্লাবনের সময়কে নববর্ষ উদযাপনের সময় হিসাবে বেছে নিয়েছিল। কেননা এ সময় বেশীরভাগ শ্রমজীবী মানুষ কর্মহীন হয়ে পড়ত এবং উৎসবে মেতে উঠার ফুরসৎ পেত।

প্রাচীন পারস্য বা ইরানে নববর্ষ উদযাপিত হতো বসন্তকালের প্রথম দিবসে। এখনও সেই প্রথাই বিদ্যমান। অজানাকাল থেকে এই উৎসব ‘নওরোজ’ নামে সুবিখ্যাত। নতুন বছরের প্রথম মাসকে বলা হয় ফাভারদিন। ফাভারদিনের প্রথম দিবসই ‘নওরোজ’।

মেসোপটেমিয়ায়ও নববর্ষ উদযাপিত হতো বসন্তকালে। মেসোপটেমিয়ায় এই উৎসব পালিত হতো ‘আকিতো’ নামে। ৬০০ খ্রীষ্টপূর্বাব্দ পর্যন্ত ওয়াইনের দেবতা ‘ডিউনিসাসের সম্মানে নববর্ষে মদ্যপান প্রথা প্রচলিত চিল প্রাচীন গ্রীসে। উৎসব উপলক্ষ্যে একটি সুশ্রী, সুসজ্জিত শিশুকে বা বাস্কেটে করে শোভাযাত্রা বের করা হতো।

দীর্ঘদিন রোমানরা নববর্ষ পালন করেছে মার্চের প্রথম দিন। পরে ৪৬ খ্রীষ্ট পূর্বাব্দে রোম সম্রাট জুলিয়াস সিজার নতুন ক্যালেন্ডার প্রবর্তন করলে নববর্ষ পালনের দিন ধার্য হয় প্রথম জানুয়ারি। রোমানদের প্রবর্তিত ইংরেজী মাস জানুয়ারির রয়েছে এক চমকপ্রদ জন্মকাহিনী। রোমান পুরাণ মতে ফটক ও দরজার দেবতার জানুস। জানুসকে স্বর্গের প্রহরীও বলা হয়। তার দু’টি মুখ। একটি জরাজীর্ণ প্রাচীন অন্যটি লাবণ্যময়। পুরাতনের বিদায় ও নবীনকে স্বাগত জানানোর মাস হিসাবে এটি গ্রহণ করা হয়।

ইংরেজী ক্যালেন্ডারের সূচনা রোমানদের হাতে। জুলিয়ান ক্যালেন্ডার সংশোধন করা হয় ১৫৪৫ খ্রীষ্টাব্দে পোপ ত্রয়োদশ গেগরীর সময়। গ্রেগরী জুলিয়ান ক্যানেন্ডার নিষিদ্ধ করে নতুন বর্ষপঞ্জী প্রবর্তন করেন ১৫৮২ সালে। এটি গ্রেগরীয়ান ক্যালেন্ডার হিসাবে সারাবিশ্বে স্বীকৃতি তথা আন্তর্জাতিক বর্ষপঞ্জী হিসাবে গৃহীত।

চীনা সভ্যতায় প্রচলিত ছিল চান্দ্রবর্ষ। চান্দ্রবর্ষ অনুসারে নববর্ষ পালিত হতো ১৭ জানুয়ারি থেকে ১৯ জানুয়ারির মধ্যে পূর্ণিমার দিন। এখনও এই নিয়ম প্রচলিত। বহু ভাষাভাষী ও সংস্কৃতির দেশ ভারতে নানাভাবে পালিত হয় নববর্ষ। বর্তমানে ইংরেজী সনের প্রথম দিন ১লা জানুয়ারি ভারতে প্রায় সর্বত্র নববর্ষ পালিত হলেও অন্যান্য ক্যালেন্ডার ও প্রথানুযায়ীও নববর্ষ পালনের রীতি প্রচলিত রয়েছে। মোঘল সম্রাট আকবরের সময় পারস্যের ‘নওরোজ’ উৎসব চালু হয়েছিল ভারতবর্ষে। কিন্তু তা সর্বভারতীয় নববর্ষের মর্যাদা পায়নি।

উত্তর ভারতের কোনো কোনো হিন্দু সম্প্রদায় ‘দিওয়ালী’ উৎসব পালন করে নববর্ষকে স্বাগত জানায়। দিওয়ালী অর্থ দীপাবলী বা আলোর উৎসব। অক্টোবরের শেষ দু’দিন এবং নভেম্বরের প্রথম দিন এ তিন দিন শহর, গ্রাম সেজে ওঠে লাখ লাখ মঙ্গল আলোয় বা মোম বাতিতে।

এবার বঙ্গদেশে ফেরা যাক। বাংলায় বছরের সূচনা দিবস ১লা বৈশাখ। কবে থেকে এর সূচনা তা নিয়ে মমভেদ আছে। কোনো কোনো পণ্ডিতের মতে, প্রাচীন বাংলায় প্রথম মাস ছিল অগ্রহায়ণ। কালের রূপ বদলেছে, মতও পাল্টে গেছে। অগ্রহায়ণের স্থলাভিষিক্ত হয়েছে বৈশাখ। এখন প্রথম বৈশাখ বাংলাদেশে সরকারী ছুটির দিন। অর্থাৎ জাতীয় মর্যাদায় অভিষেক ঘটেছে পহেলা বৈশাখের তথা নববর্ষ দিবসের।

ব্যবহারিক জীবনে ‘নববর্ষ তাৎপর্যময় দিন’ একটি বছর শেষে জীবনের সফলতা ব্যর্থতার হিসাব মেলানোর দিন। নতুন বছরে নতুন কিছু অর্জনের শপথ নেওয়ার দিন। জমিদারী প্রথা থাকাকালে, দিনটিকে খাজনা আদায়ের দিন হিসেবে জমিদারেরা ধার্য করেছিল। দিনটিকে শুভ বিবেচনায় ‘পুণ্যাহ’ বলা হতো। অর্থাৎ পূণ্য লাভের দিন। এ উপলক্ষ্যে, মিষ্টি বিতরণেরও প্রথা ছিল। এ উপলক্ষ্যে যুগসন্ধিক্ষণের কবি ভারত চন্দ্র রায়গুণাকরের কাব্যে ও পুণ্যাহর বর্ণনা পাওয়া যায় ‘পুণ্যাহ’। পূণ্যাহ’র দিন শেষ হয়নি। পূণ্যাহ’র রূপ বদলেছে মাত্র। ব্যবসায়ীদের কাছেও নববর্ষ পূণ্য লাভের দিন তারা এদিন হালখাতা খুলে বসে। গ্রাহক, ক্রেতা, খাতক আসে কিছু না কিছু টাকা জমা দিতে।

খ্রীষ্টীয় নববর্ষের সাথে একটি ধর্মীয় ভাব জড়িত থাকে। খ্রীষ্ট ধর্মাবলম্বীরা এদিন প্রার্থনা সভায় যোগ দেন। বাংলা নববর্ষের সাথে ধর্মীয় বিষয় জড়িত নেই। এটি মূলত সাংস্কৃতিক উৎসব। জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবার উৎসব। তাই এই উৎসবে সবাই মেতে উঠে। এই দিনটিতে বাঙালী জাতিসত্তা পৃথিবীকে তাঁর স্বতন্ত্র অস্তিত্বের জানান দিতে চায়। এমন একটি বর্ষবরণ উৎসব পৃথিবীতে প্রায় বিরল।

সাহিত্যে নববর্ষ : ভারতচন্দ্রের কাব্যে ‘পুণ্যাহ’র কথা পাওয়া গেলেও নববর্ষের কথা পাওয়া যায়নি। কবি ঈশ্বর চন্দ্র গুপ্ত বাংলা নববর্ষ নিয়ে কোনো কবিতা লিখেছেন কিনা— এমন তথ্য জানা যায়নি। কিন্তু নব্য-ইংরেজী শিক্ষার্থীদের ইংরেজী নববর্ষ পালনের অশোভন দৃশ্য নিয়ে কবিতা লিখেছিলেন।

“হিপ হিপ হুররে ডাকে হোল ক্লাস।
ডিয়ার ম্যাডাম ইউ টেক দিস গ্লাস।”

বাংলা নববর্ষকে নিয়ে প্রথম কবিতাটি সম্ভবত মাইকেল মধুসূদন দত্তের (১৮২৪-১৮৭৩)। তাঁর ‘চতুর্দশপদী কবিতাবলী’ গ্রন্থে ‘নতুন বৎসর’ নামে একটি কবিতা রয়েছে। কবিতার কয়েকটি চরণ—

‘ভূতরূপ সিন্ধু জলে গড়ায়ে পড়িল
বৎসর, কালের ঢেউ, ঢেউর গমনে।
নিত্যগামী রথচক্র নীরবে ঘুরিল
আবার আয়ুর পথে।’

এই সময় থেকেই বাংলা সাহিত্যে নববর্ষ নিয়ে কবিতা লেখার চল শুরু হয়। হেমচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় (১৮৩৮-১৯০৩), নবীন চন্দ্র সেন (১৮৪৭-১৯০৯) এবং কায়কোবাদ (১৮৪৭-১৯৫১) প্রমুখ কবি নববর্ষ নিয়ে কবিতা লিখেছেন। কায়কোবাদের কবিতাটি এই লেখার শুরুতেই উদ্ধৃত করা হয়েছে।

বাংলা বর্ষপঞ্জীর সংস্কার : ১৯৫২ সালে বিখ্যাত জ্যোতিপদার্থবিদ বিজ্ঞানী ড. মেঘনাদ সাহা, ভারতবর্ষে প্রচলিত প্রাচীন জ্যোতির্বিদ্যার ভিত্তিতে প্রণীত বিভিন্ন বর্ষপঞ্জীর আমূল সংস্কারের প্রস্তাব করেন। তিনি প্রস্তাব করেন আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞানের ভিত্তিতে বর্ষপঞ্জী প্রণয়নের। এই সুপারিশের ভিত্তিতে কিছু কিছু বর্ষপঞ্জীর সংস্কার সাধিত হয়। কোনো কোনো বাংলা বর্ষপঞ্জীর সংস্কারও সাধিত হয় পশ্চিমবঙ্গে। তবে বেশীরভাগ সনাতনপন্থী পঞ্জিকাকারগণ এই সুপারিশ গ্রহণ করেননি। তাঁরা প্রাচীন পদ্ধতিতেই পঞ্জিকা প্রণয়ন অব্যাহত রেখেছেন।

বিজ্ঞানী সাহার সুপারিশ সামনে রেখে বাংলাদেশেও বাংলা বর্ষপঞ্জী সংস্কারের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয় ১৯৬২-১৯৬৩ সালে। ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ ছিলেন এই সংস্কার কমিটির সভাপতি।

কমিটির সুপারিশ নিম্নরূপ :

১.বর্তমান বাংলা মাসের তারিখ গণনা দুস্কর। তাই ১৩৭১ (১৯৬৪) সালের বৈশাখ হইতে প্রতি বছর ভাদ্র মাস পর্যন্ত ৩১ দিন এবং আশ্বিন থেকে চৈত্র পর্যন্ত প্রতি মাস ৩০ দিনে গণনা করা হউক।

২.যেহেতু ১৩৬৯ অধিবর্ষ গণনা করা হইয়াছে, ঐ বর্ষ হইতে প্রতি ৪র্থ বৎসরে চৈত্র মাস ৩১ দিন, গণনা করা হউক।


বাংলা একাডেমীর উল্লেখযোগ্য সংস্কার হল— ১লা বৈশাখকে প্রাতিষঙ্গিক ইংরেজী সালের ১৪ই এপ্রিলকে বাংলা সনের ১ম দিবস হিসাবে ধার্য করা। এ কারণে বাংলা ও ইংরেজী তারিখের মধ্যে একটি সাযুজ্য স্থাপিত হয়েছে। তাই আমরা প্রতি বছরই ১৪ই এপ্রিল ১লা বৈশাখের উৎসব তথা বর্ষবরণ উৎসব পালন করে আসছি।

লেখক : শিক্ষক ও প্রাবন্ধিক

পাঠকের মতামত:

SMS Alert

মুক্তমত এর সর্বশেষ খবর

মুক্তমত - এর সব খবর



রে