thereport24.com
ঢাকা, শনিবার, ১৭ নভেম্বর ২০১৮, ৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৫,  ৮ রবিউল আউয়াল ১৪৪০

২৪ কবির বোশেখের কবিতা

২০১৫ এপ্রিল ১৩ ২১:৩৪:৩৮
২৪ কবির বোশেখের কবিতা

ওবায়েদ আকাশ
পালাবার মতো নির্জনতায়

ব্রিজের ওপর থেকে ঝাঁপিয়ে পড়লে
মাঝামাঝি তোমাকে দেখায়
ছেঁড়া রোদে প্রশ্নবিদ্ধ ঘাটে
ঝুলে আছো পাখিকুলে নিবিড় প্রশ্রয়ে
কেউ একজন ভাবছেন-এসব
কিছুর দীর্ঘ পূর্বাপর
আগুন আগুন বলে চিৎকার করে
কেউবা অরণ্যে ঢালছেন আগুনের
লালা
আর যারা হালখাতার প্রস্তুতি নিয়েছেন
প্রাত্যহিক হিসেবের খাতায়
মহাজনের পাহাড় সমুদ্র খরায়
মধ্যদিনের গলিত আকাশ- মুহুর্মুহুই
ঝরছে
এবার ঝাঁপিয়ে পড়ে পালাবার মতো
দোটানায়
খরচৈত্রে দেখা হলো পাখিদের
মুখোমুখি
ঝড় জলোচ্ছ্বাস দাহে পাখিদের
স্বাস্থ্যকর ওড়াউড়ি নিয়ে
কেউ কোনো প্রশ্ন তোলেনি তো
সর্বাত্মক এই প্রাকৃতিক বিবর্তনে
পাখিকুলে এমন নৈঃশব্দ্য
কত আর মেনে নেয়া যায়?
এ প্রকার দৃশ্যে-
বহুকাল ধরে তোমার এ নাম
শীর্ষস্থান অটুট রেখেছে


নান্নু মাহবুব

মৌরিগ্রাম

মৌরিগ্রামের দুপুররাতে বাস থেকে শালবনে নেমে গুটিগুটি হেঁটে পৌঁছে গেলাম
তোমাদের পাড়ায়, দূর থেকে চোখে পড়লো আলোর চতুর্ভুজ।

কিভাবে যে কিনে আনলাম শালপাতায় মোড়ানো সকাল আর হাওয়ার ফুলকি
তারপর দিনমান কেটে গেল উত্তরদক্ষিণমুখী ট্রামে ট্রামে, জোড়াসাঁকোঘাটে
পুরানো লোহার রেলিঙ ছুঁয়ে ভেতরে উঁকি দিয়ে বাঁধানো হলুদ ছবি, রবিবাবু,
নিচে পুরানো পুরানো গাছে বসে-থাকা অধ্যাপনা, শ্যামবাজারের ফলপাহাড়ে
রঙের বন্যা, বৃষ্টিভেজার দু’বুক-জুড়ে ঠিকরে-পড়া বরইআগুন পালটে দাঁড়াই।

আর তখনই তোমাদের এই গ্রামের মধ্যে নিয়নতারায় জ্বলছে বিরাট চতুর্ভুজে
নাট্যশালা। তুমিও নেই আমিও নেই ছাদপিছলি চাঁদ একাকী পুরানো আর
পলেস্তরা।
খসে পড়ছে চাঁদ, একটি-দু’টি গুঁড়ো এসে পড়ছে পায়ে পায়ে।

শান্ত দেওয়াল শ্যাওলামাখা, সামনে তোমার স্নানদৃশ্য, গামছা দিয়ে জল
গড়াচ্ছে নিতম্বিনী, হেমেনবাবুর সৌদামিনী তাকিয়ে আছে ঠিক অপাঙ্গে।

প্রভাতী কবিতার সাথে দু’একটি লিটল ম্যাগাজিন চুপসে চুপসে জল
গড়াচ্ছে দানায় দানায়, ফোটায় ফোটায়, ঘরের কোণায় হারমোনিয়াম, সন্ধ্যাপিদিম,
তেলেভাজা, মৌরিগ্রাম, শালপাতায় মোড়ানো এক চন্দ্রগ্রাম, অন্ধকারে।




আবুল হাসান মুহম্মদ বাশার
ঝড়

এক হাজার তিনটা দিন আজ আমি এখানে দাঁড়িয়ে-
এক বৃক্ষ ছাড়া কে আর এমন করে দাঁড়ায়!
আমি বুঝতে পারছি-
আমার শেঁকড় গজিয়ে যাচ্ছে,
আমার ডালপালা আমাকে আবৃত করে
আমার চারপাশের মাটি স্পর্শ করেছে,
আমার একান্ত আঁধারে আজ
পক্ষীশিশুর সাথে জড় হয়েছে দানবেরাও ।

আমি জানতাম একদিন গাঢ় সবুজ ছিলো আমার হৃদয়ের রঙ,
ভীষণ সবুজও জানি মাঝে মাঝে আঁধারের খুব কাছে যায়,
তবু যেন এ আঁধার সবুজের বাড়াবাড়ি নয়-
এ ঠিক অনন্ত অমাবশ্যায় রাতের আকাশ-
যাকে তুমি দূর থেকে মেঘ বলে ভাবো,
আর ভাবো- মেঘতো যাবেই ভেসে মেঘেদের মত,
খেয়ালী হাওয়ার খোঁজে আজ কতদিন,
ক্লান্ত তুমি জানি তবু ভয় পাও- হতে পারে
আমি মেঘ নই, সত্যিকার বৃক্ষ কোন এক,
যাকে উপড়ে ফেলতে হাওয়াই যথেষ্ট নয়
প্রলয়ের রঙ মাখা ঝড় চাই, ঝড়।




আল হাফিজ

পিপাসার দাগ

লাজুক লতার বনে একদা কি কেউ
গান গেয়ে ডেকেছিলো ডাহুক গলায়
ডেকেছিলো জোছনার ঝিলিমিলি বেশে
হেসে হেসে জোনাকিরা ঢেলেছিলো আলো।

কালো তিল গালে তার টোল শোভা হাসি
বাঁশি হয়ে বেজেছিলো আনকোরা দিনে
জেগেছিলো মায়া চাঁদ আকাশের বাড়ি
ফাঁড়ির পুলিশ যার রাখেনি খবর!

নবীন বরণ জোশে কলেজ বেলায়
জামদানী বেনারসী ছড়াতো সুবাস
ঈদে চাঁদে মাঝে মাঝে খোলামেলা ছাদে
উড়ে উড়ে জ্বলে যেতো যাদুর চেরাগ!

বোকা বোকা কতিপয় পোকা সেই আলো
ভালোবেসে ফেঁসেছিলো বহুকাল আগে
সেই সব স্মৃতিবই বেদনার রঙে
ভেসে ওঠে মন পোড়া গোধুলী বেলায়।

ছুঁয়োনা ছুঁয়োনা স্মৃতি- হাহাকার ওঠে
ঠোঁটে জমে নিরাকার পিপাসার দাগ
রাগ নয়, দাগ আজ উতলা উনুন।
শীতের শরীর ছুঁয়ে পোহায় জীবন।




আরণ্যক টিটো
প্রতিআবাহন

মানবের দেখা পাইনি বহুদিন!
তবে,
অনেক মানবের মাঝে পাই তার দেখা! জনে জনে বলি : মানব, কেমন আছো ? পাইনা উত্তর!
এসো সভ্যতা , এসো প্রবিত্র! এসো, খেলি... ঘাসের চাদরে... শুয়ে... বসে... দাঁড়িয়ে... এমনই মধুর ভঙিতে...
করি, মানবিকচাষ!
দেখুক পাখিরা, হাসুক ফুলেরা, লাজে উড়ে যাক প্রজাপতি, আ ড়া লে আ ড়া লে চিমটি কাটুক, মৌমাছির শ্যালিকারা,
ফুলের দেবরেরা, নদীর ননদিরা!
তবু
ভরাবো পৃথিবী, সবুজে সবুজে, মমতায়, নিবিড় বন্ধনে। এসো, ভয় নেই...
সবিতার যোনি থেকে বেরিয়ে এসেছে যে পৃথিবী আমি তারই সন্তান —
এসেছি নগ্নতা, এসেছি পবিত্র, আমাকে বরন কর, ঘাসের চাদরে, শুয়ে... বসে... দাঁড়িয়ে...
মধুর ভঙিতে...
পৃথিবী চায়না, পারমানবিকখেলা। এসো, পরমগুহায় খেলি, পরমের খেলা; করি জীবনের চাষ, .....

একটি গোলাপের অবদমনে শুরু হয় দিন,
গোলাপের গোঙানিতে ঘুম থেকে জেগে উঠে কবি, শিল্পের কান্নায় জেগে উঠে প্রতিশিল্পে !
এসো সভ্যতা, এসো পবিত্র! খেলি, ঘাসের চাদরে... শুয়ে... বসে... দাঁড়িয়ে... এমনই মধুর ভঙিতে... প্রতিশিল্পে ...

সভ্যতাধীরাজ! সাবধান।
দেখোরে বাহার, কেমন রেখেছি খাড়া, সাড়েতিন ইঞ্চি, যেনবা উদ্যত কাটারাইফেল! তোমাকে বরনে, শুয়ে...... বসে........ দাঁড়িয়ে....



সুরাইয়া ইসলাম

অনাগত

আমি এমনই এক অদ্ভুত পথের যাত্রী
যে পথে আবেগের রক্তজ্ববারা এলোপাথাড়ি পড়ে থাকে
শুধুই কারও পায়ের তলায় পিষ্ট হবে বলে।
শেকড়ের সন্ধানে পরগাছা ছাড়াতে ছাড়াতে
ক্লান্ত হয় হাতের সবকটি আঙুল
তবুও খুঁজে পাই না সম্পর্কের অতীত ইতিহাস।
বড়জোর বুনোঝুপড়ি থেকে দুটি কাঠগোলাপ
অস্ফুটস্বরে বলে ওঠে- ‘ফিরে যাও....
গুছিয়ে নাও তোমার হৃদয়ের পাণ্ডুলিপি
এ পথে কোন আগন্তুকের নগ্ন পায়ের চেহারাও
কেউ দেখেনি কোনো কালে।’
তবে আমি যে অনাগত সৃষ্টির মা হতে চলেছি
সেতো রহস্যময় কুয়াশা বৈ কিছু নয়।
এখানে কখনো সন্ধ্যা হয় না
বিকেলের কাব্য শেষ হতে না হতেই রাত্রি নেমে আসে
প্রসব যন্ত্রণার চেয়েও বিশ্রী সেই রাত
তুমি ফিরে যাও...
বছরের প্রথম হাওয়ার মতো আমার কান ঘেঁষে
ফিরে যায় সেইসব বুনোসংকেত
ঘোঁটপাকা অন্ধকারে স্পষ্ট হয় নতুন এক তৃষ্ণার্ত মুখ,
শিরোনাম হয়ে সেঁটে যায় সাধের পাণ্ডুলিপিতে
আর আমি ফ্যালফ্যালিয়ে তাকিয়ে থাকি দূরে- দূরে
সন্ধ্যার অপেক্ষায়..



মাশুক শাহী

রাধা


সে আমাকে কিছুই দেয়নি,
দিয়েছে শুধুই জল।
জল দেখে ভেবেছে, সে
সবই আমার ছল।
হৃদ-গভীরে নীলের কষ্ট,
পাতে তুষের বিছানা।
সখি, বল, আমারে বল,
কেমনে সহিব, নিঠুর যাতনা।

বাঁশির সুর অন্তর ধরে,
করে ভীষণ টানাটানি।
জাতকুলমান সব ভেসে যায়,
চারিদিকে কানাকানি।
বর্ষাদিনে বৃষ্টি হয়ে,
গিয়েছি যমুনা ঘাটে।
সেইক্ষণ থেকে সুখের সূর্য
অস্ত গিয়েছে পাটে।

দ্বিধার আগুনে পুড়তে পুড়তে,
চলেছি বাঁশির দিকে।
ভোরের আলো হাসতে থাকে,
রাত হয়ে আসে ফিকে।
কিছু না নিয়ে -কিছু না দিয়ে,
ঘরে ফিরে আসি আমি।
হায় ঈশ্বর! দরজা খুলেই, চোখ তুলে দেখি,
মেঘমাখা মুখে, হাসিমাখা চোখে
আমাকে দেখছে স্বামী
আমাকে দেখছে স্বামী!



ফাহাদ চৌধুরী
ব্রেইন-ওয়াশ

আমার মাথার ভিতর ক্রমশ বড় হচ্ছে একটা ভ্রুণ, বোলো না
যে আমি তোমাকে সতর্ক করি নাই, আমিও ছিলাম বীতস্পৃহ
বলেছিলাম রমণে মথিত করোনা মগজ, বলছিনা আমাদের
করোটি-সংসর্গের ইতিবৃত্ত, বলছি শুধু মুছে যাওয়া কৌমার্য,
দূষিত মানস-বোধের ধসে পড়া, যখন করোটির দেয়াল বেয়ে
হরণের চিহ্ন এঁকে এঁকে ঝরেছে বিমিশ্র চেতনার লঘু অপস্বেদ,
আমার জঠর অবধি অসুখ, আমি বিনিদ্র নই, কিংবা জাগরুক
মেঘবন্দী করোটির আকাশ, মগজের গর্ভে ফুটেছে প্রেতফুল, তার
বিভা তেতো বিবমিষা জাগায়, ফুলের আলোয় ঝলসানো রঙান্ধ
চোখ, ছিঁড়ে আসে শরীরের দেয়াল, অনুভুতিহীন ঝরে লালাস্রাব
আমাদের প্রয়োজন ছিল মুখ নিঃসৃত স্পার্ম প্রতিরোধী কনডোম







তোফায়েল পারভেজ

দগ্ধ গ্রাম

বিষন্নতার ট্রেন যাচ্ছে দগ্ধ গ্রামের ওপর দিয়ে।
বৃক্ষ খুঁজছে আবাস হারানো পাখি।
দমকা বাতাসে ছাই উড়ে উড়ে আকাশ কেমন মলিন।
যত্রতত্র পড়ে থাকা স্বপ্নের মৃতদেহগুলো-
ওরা কথা বলতো, ওদের ছিলো সাজানো সংসার।
যাতায়াত ছিলো দূর দূরান্তে।
তাদের আশ্রয় দেবার মতো বুকে-
বাবুই পাখির বাসাও নেই।

বাতাসের হা হা স্বরে ছাইয়ের ওপর থেকে
শুধু ছাই সরে যায়।





শফিউল আজম মাহফুজ
নাভিমূল

যত-ই দূরে যাই
ফিরে আসি বারবার, ফিরে আসি বৃত্ত আঁকা পথে।
কোথাও শান্তি নাই।
তাই-
ফিরে আসি নিজ নাভিমূলে-
ফিরি নিজ কুলে।

তোমরাও কি এমনই বারবার যাও ফিরে,
নিজ নিজ নাভিমূলে?

সব দেখা শেষে, সব হাঁটা শেষে
যখন খুলি নিজ নাভিমূল...
বিষ্ময়ে তাকিয়ে দেখি এ-তো নইআমি,
নও তুমি, নয় কোন বিচ্ছিন্ন নাভিমূল
এ-তো যেন ভেদাভেদহীন—
এক অবিকল স্বপ্নলোক,
এক অবিচ্ছিন্ন মানবকুল।





রাবেয়া সুলতানা

গল্প ভুলে

সহজ কথায় সহজ ভাষায়
মাতবি যদি আয়
পাড়া জুড়ে ঢল নেমেছে
বেদের রূপকথায়।

আয়রে ওলি, আয়রে পাখি
নাচবি যদি আয়
কথা ছিল গল্প বলার
ভাড়ার নিয়ে আয়।

মোমের পুতুল মোমের দেশে
নাচছে যেন ওই
চাঁদের আলোয় ভুবন মাতে
মুখে কথার খই।

বাগান জুড়ে ফুলপরীরা
গাইছে যেন গান
ফুলপাখিরা চুপটি করে
বাদ্যে আনো তান।

কথা ছিল গল্প শোনার
গল্প গেলো কই
পথ ভুলে সব নেচে গেয়ে
করছে যে হইচই।





জেবুননেসা হেলেন
বাউল বাতাস

মনোলোভা রঙ আর কান্নার ফুলে সেজেছে নববর্ষ
রক্তের লাল স্রোতে হিমোগ্লোবিন চামড়ার নিচে
ঢেকে রাখে রঙ্গিন কারুকাজ।
বয়ে চলা স্রোতে উত্তাল দেশজুড়ে
ইট ককটেল অনল গ্রেফতার স্বার্থের ঝনঝন-
মুরালি মুড়কী নিমকি মচমচ ভাজে
রাজনৈতিক সারগাম।

শাদা চড়ে বসে লালে, লাল আচড় কাটে শাদায়
নারীর ওড়না শাড়ির শাদা লালের সোনালি সূর্যের
আলোর ব্লক বাটিক আজকাল কালো শোক বিষয়ক
জলতরঙ্গ পাঞ্জাবীতে বুটিদার ফ্যাশন এন্ড আর্ট।
এরপরও মৃদু বাউল আধপাগলা বাতাস
চোখের পাপড়িতে আবেশি স্পর্শ আঁকে-
উহ! আহ! ইস! এতো জলো রক্ত...
পণ্ড ইলিশ হলো স্বার্থের ঘরকন্যায়।

১৪২২ দরজায় কড়া নেড়ে বলে-
এসো বৈশাখ রঙ মাখি। আর আমি?
তীব্র ঝাঁকুনি দিয়ে বলি-
বাংলা মাগো আর কত চুপিচুপি কাঁদবে?
এবার জেগে ওঠো,
স্নান করে আপন আলোর মায়াবী বিস্তারে
অন্ধ মাতৃত্ব ভুলে
তপ্ত রোদের সার্সিতে চুমু দাও...





অঞ্জন শরীফ

আশা

ভোরের আলোয় ঘুম ভাঙে প্রতিদিন
ঘুমের মতো যদি ভুল ভাঙে প্রতিটি ঘরে
স্বপ্নের মায়াজালে বন্দি হবো না কোনদিন
যদিও জানি মানুষ অবলীলায় বন্দি হয় ভুলের শিকলে
ভোরের আলোকে তবু নির্ভয়ে বলি
এমন আশা যাবে না বিফলে।






সৈয়দ আহসান কবীর
মেঘফলাচার

আকাশ গাছের কথা শুনেছো কখনো
যে গাছে মেঘফল দোল খায় ইচ্ছেমতো...

আমি বৈশাখী ঝড়ে ঘন অন্ধকারে
কুড়িয়েছি সে ফল রাশি রাশি
মিষ্টি আচার বানাবো বলে,
অথচ মেঘচারী, খেচর, পাখি
উড়ে গিয়েও ছুঁতে পারেনি
শ্রাবণের পর শ্রাবণ প্রতীক্ষায় থেকেছে
পাকা টসটসে মেঘফলের দিকে চেয়ে
হয়তো একদিন খসে পড়বে সে ফল
রসালো বিন্দু হয়ে।

আমি আশার বাণীতে শক্ত করেছি দল
মেঘফলাচার বিলাবো বলে।
অথচ অবিশ্বাসে তারা ফাঁকি দিয়ে
খেয়েছে কাঁচা ফল
নিজেরাই মেঘফল হবে ভেবে।

তারপর একদিন আবারও ফুটেছে ফুল
ধরেছে মেঘফল, চুয়ে পড়েছে মেঘরস
এবং হয়েছে নিঃস্ব-
আচারের নিপুণ কারিগরের অভাবে।

আকাশ গাছের কথা আকাশে আকাশে
যেখানে মেঘফল দোল খেতো ইচ্ছেমতো।




মাসুদ পথিক

গুতুমমাছ

বদ্ধ কাদায় লুকিয়ে থাকে কীউপায়ে
গুতুমমাছ, আমি তা জানি...অথবা
পেটের ভেতর
যৌগ-আকৃতির কৃমির প্রতিকূল
আবাস!
যারা যারা শিখে নিয়েছে মৃত্যু হতে
পালিয়ে বাঁচার রণকৌশল, তারা কী
চাষার গোত্রের কেউ না?
তবে আমার সহোদর ভাই যে, এবং
নিজেই করি আবহমান যাপন;
রক্ত-সূত্রে বহূদূর পর্যন্ত যায় বুকে
দেয়া হামা এই পরিচয়বাহি বাস্তু-কলা,
কেননা কাস্তের নিচে বুক পেতে
শস্যের যতো বিগত জীবন পৃথিবীকে
দিয়ে গেছে
আগাছারও প্রণোদন, তার জন্য
আমি কেঁদেছি কতো জানি না
অথবা শুষ্ক মাটির গহিনেও টিকে
থাকার সংগ্রাম নিয়ে কতোদূর যাবে
গুতুম,
খুঁড়ে তোলা মাটির দলায় চোখ বুজে
ভাবি
অতএব দেখলাম বিলের তলায় মাছ
ধরার নেশা ছেড়ে ঘরে ফেরার পথে
হারানদের ছাড়াবাড়িতে একলব্য
শৈশব, আশ্চর্য খেলার হাতে ওঠে
আসা ছিন্ন হাড়;
হাড় থেকে দাদার কবর বেশি দূর
নয়; কিংবা আমার বুকেই লুকিয়ে
চলি ওই মেধাবী আঘাত
পাটের দেশে রক্তিম-ইতিহাস চাষার
সংগ্রামে ভরে কতো মনোপলি
ব্যালুজ
যা কোনো ভাবেই মুছা যায় না
'সুফলা' নামি মৃত্যুর কাছ থেকে ...




সৈয়দা কানিজ সুলতানা
ঝরা পাতার গান

ঝরা পাতার গান শুনে কি
দেখেছিলে কেউ?
আমার ছিল একটা নদী
তার ভেতরে ঢেউ।

রাত-বিরাতে জ্যোৎস্না বিলাই,
ফুলের গন্ধ মৌ
কৃষ্ণ ঘরে গহীন কোণে
কোন্‌ সে কথা রোও

নবীন মেঘের সনে আমি
পেলাম খুঁজে নীল,
তুমি আমার কূল-কিনারা
অথই জলের ঝিল।





তহীদ মনি

দিনরাত্রির কোলাহল

তবু বৈকালিক ভ্রমণ শেষে ধুমায়িত চায়ের কাপে
খেলা করে সকাল বেলার আলো, সবে আগ্নেয় লাল থেকে
সোনালি রঙ ধরা সূর্য, কি চমৎকারই না ছিল
সেই সব দিন রাত্রির সাম্পান! আয়ুর হাড়িতে তখনো খেলছে
বর্ষার বিল থেকে সদ্য ধরে আনা শিঙ- মাগুরের ঝাঁক।
আহ্ কি উচ্ছলতা! টুকরো টুকরো স্মৃতি জোড়া দিতে দিতে
নতুন কোন নকশী কাঁথার সুখ নতুন কৃষাণীর চোখে-মুখে।

এখনো যে কোনো দিনের চেয়ে-
এখনো যে কোনো পাওয়ার চেয়ে-
এখনো যে কোনো ভালোলাগার চেয়ে-
এখনো যে কোনো স্বপ্নের চেয়ে--
দুধশাদা পবিত্র সেইসব ক্ষণ, চিরকালের ঘরে।

অংক কষে কষে নতজানু মাথা, পুরু লেন্সের ভেতর
অবিনাশী লোভ, প্রাসাদ, প্রসাদ জমা ব্যাংক-বৈশাখী
আমকুড়ানো এক দুপুরের চেয়ে কি দামী হতে পারে?
অথচ নির্লজ্জ মোহের উদ্ভট তাপমাত্রায় উত্তপ্ত হয় আমাদের
জীবন বোধ! হাসনা, বিশ্বাস করো সব বর্তমান ফেলে এখনো
বিলের খাল পেরিয়ে কোনো বর্ষা-ঝরা দিনে ভাবি এবার
নৌকা নিয়ে লাল জামাপরা ভেজা শরীরে আসবে মেয়েটি
হাসবে মাঠের কোণে দাঁড়িয়ে- ধরবে পানির স্রোতে ভাসা মাছ...
এসব কোনো মানে থাকে না, প্রাসাদ-নগর ফেলে সেই
বেশ ভালো কাদামাখা বিকেল, ধানের ঘ্রাণ
পাটের ক্ষেতে, সরিষা ফুলের দোলা আর খড়ের গাদার আসর।




অনাবৃত লেখনীর আর্তচিৎকার
রেজা কারিম
[কবি ফররুখ আহমদকে নিবেদিত]

আবার শুকিয়ে গেছে গাছে গাছে সবুজাভ পাতা ফেটে চৌচির চৈত্রের মাঠ নদীর মোহনা খেলে নাতো আর ঢেউয়ের খেলা কেটে গেছে রাত তবুও এখনো হয়নি সকাল বসন্ত কাক গায় নাতো গান বয়রা বাতাসে সুর তোলে নাতো ভোরের আযান আজকে হৃদয় নরকের নদী অন্ধ বধির বোবা
কই আছো তুমি কবি লুকিয়ে থেকো না আর এসো এই চৈত্রের মাঠে শিমুল তুলার হাটে জাগাও আবার মেঘের ছোঁয়ায় ধূসর রোদের প্রাণ
নৃশংস রাত থেকে বের করে আনো জোনাকির আলো
অশরীরী আত্মায় ভরে গেছে জোছনার ত্বক সোডিয়াম জ্বলে তার তলে জ্বলে ক্ষুধার পিদিম বুকের পাটায় ভর দিয়ে হাঁটে কাবিলের ভ্রুণ পৃথিবী এখন নুহের জাহাজ কুকুর কুকুরি মানে না পবিত্রতার লেশ নুহের আদেশ ফাটানো মাকাল মুনাফিক গাল বকরির পাল খায়তো রাখাল আদিম স্বাদের নিষিদ্ধতায় ব্যস্ত সবাই সূর্যের পিঠে পর্দা পড়েছে লজ্জায়
ঘামের লবণে কতটুকু স্বাদ সাগরের ফেনা জানে নাতো তার রহস্য আর ইতিকথা ধূসর রোদের পেট থেকে বেয়ে পড়ে আজ ঘৃণা জানালায় ঝোলে রক্তশিরায় ডুবানো গোশত মাতৃগাছের কোটরে রক্তনদী আঁকে জরায়ুর ভ্রুণ ভাত সুখাদ্য নয় তার চেয়ে ভালো কৃষ্ণআগুন
কবি ঝাঁঝ তোলো আবার কন্ঠে তোমার প্রেমের সমাধি কাঁদে বারবার প্রেমের ডাহুক তুমি
তুমি জানো সেই একটি বাণীর মর্মার্থ আরো তাই দেরি নয় ডাকো, পাঞ্জেরি! যে এ
যুগের বাইছে তরী তাঁকে দাও সেই সাত সাগরের ফুল ফুলের ঘ্রাণেই ভেঙে যাক তার জীবনের যতো ভুল।





এনাম রেজা

ধূসর গোধূলি

ক’টি দিনের শেষ বয়সে
প্রিয় মানুষগুলো ছায়া তার শরীরের চেয়ে
অনেক বড় হয়ে সাথে চলে।
কিছু সময় আগেও আমার ছায়া গুটিয়ে গিয়ে
আমার পায়ে পায়ে পা জড়িয়ে ছিল
এখন আমার ছায়ার চেয়ে আমি অর্ধেক।
আর কিছুটা সময় পেরোলেই ছায়া পথভ্রষ্ট হবে
নেমে আসবে গোধূলির ধূসরতা
পৃথিবীর পথে রয়ে যাব আমি-
ছায়াহীন প্রিয় মানুষ এবং ধূসর গোধূলি।






রাইফ ইফতিখার
বুক পকেটের কথা
চোখ রেখেছি গ্রহান্তরের উদাস ভেজা দিনে
মন রেখেছি ছায়ার সাথে তেপান্তরের কোণে।
চমকে উঠে খুব খুঁজেছি আকাশ চোখে কার
বুকের মাঝে সওদাগরের বিষাদ দরবার।

রেখে গেলাম প্রাণের মাঝে মিছিল তোলা ঢেউ
এই নগরের শূন্যতাতে হারিয়ে যাওয়া কেউ।
খুব অচেনা নীলের মাঝে আকাশচারী পাখি
সে জানেনি আজও আমি পথের হদিশ রাখি।

কেউ জানেনি কারোর কথা, নিয়ন আলোর ভাষা
কার বুকেতে "স্বপ্ন" নামের ভ্রম বেঁধেছে বাসা।
তাই আমিও তুলছি আবার একতারাতে টান
সোনার কাঠি ,রূপোর কাঠি- ঘুম ভাঙানির গান।






ইকবাল মাহফুজ

যখন ডাকতে এসেছিলে

তুমি যখন ডাকতে এসেছিলে
দুয়ারে তখন শতাব্দীর জীর্ণতা
তুমি যখন দরোজায় রেখে হাত
কড়া নেড়েছিলে, সব সংকীর্ণতা-
ঝরে ঝরে গেল বাতাসের সাথে
তুমি এসেছিলে কোন অন্ধকারের রাতে।

তুমি এসেছিলে, বলেছিলে ফের যদি
দুয়ার আগলে দাঁড়িয়ে থাকে ঘোর
তুমি বলেছিলে আঁধার তাড়াতে নাকি
তোমার কাছে আছে মন্ত্র, ভোর-
হাসানোর কাতুকুতু তুমি জানো!
তুমি কি এখন ভুলে গেছ সেই গানও।

তুমি বলেছিলে-
তুমি নাকি খুব রোদের কৌতুহল
এসোনা আবার, আসুক রৌদ্রজল!

শেখ মেহেদী হাসান
বন্দী সভ্যতা

গহীন অরণ্যে গর্জে ওঠে হিংস্র পশু জানোয়ার
ধোঁয়াটে সন্ধ্যায় ফোঁস ফোঁস শব্দ নখর নিঃশ্বাসে,
মানুষে পশুতে বসতি ফেলে অভিন্ন অন্ধকারে-
সারারাত শিকারে, দমফাটা রুদ্ধশ্বাস রুধিরে;
মায়াময় ইশারায় মানব-মানবী মায়াজালে
পশুরা প্রকাশ্যে আদিম আবেগে অশান্ত, অশিষ্ট
কঙ্ক কামতায় মাতে উন্মুক্ত, উদ্ধত হলাহলে!
দাঁড়িয়ে দাঁড়কাক অদ্ভুত অরাজক ভাবাবেগে,
সভ্যতার শিয়ালেরা ভাগাড়ে ভীষণ ভিড় করে
বুনো বাতাসের বন্যতায় বসন মেলে ছবি-
মদে মত্ত মাতাল মদ্যপ শকুনের সৎকারে!

উর্বর বসতি, বেলাভূমে উকুনের চাষ হয়
যান্ত্রিক যন্ত্রনায় মাটি কাঁদে বিরক্ত বেদনায়
হন্তারক, হায়েনা, নেকড়ে, নেড়ি, নীরব নির্বাক-
সুসভ্য মানব পশু লাশ কাটে রক্ত লালসায়!

কাপুরুষ কঙ্কাল হাঁটে যেন হাইওয়ে হাওরে
ফুটন্ত গোলাপের গতর খুবলে খায়- হাভাতে
হারামিরা; সুগন্ধ সৌরভ ঢাকে দুর্গন্ধ দেয়ালে!

সভ্যতা নীরবে নির্বাসিত কালাপানি কালাধারে
নির্বাত রুদ্ধদ্বারে শেকলে আবদ্ধ, বন্দি-বাথানে।





শম্পা প্রদীপ্তি

সবুজ পাতা ডাকে কাছে

কোথা যাবে জানে না সে
কাল কালবোশেখির টানে ঘুরেছিলো বিশ্ব-
শুধু এটা আছে মনে
আর বেজেছিলো দা-মা-মা মনের মাঝে,
বিশ্ব দেখার লোভে নেচে ছিলো নেত্র!
মনে আছে, নিমেষে নিরাভরণ রক্ত পলাশ গাছে
বুকের রক্ত পড়েছিল নিমেষে।
জীর্ণ কুটির নিস্তেজ দেহে করেছিলো ক্রন্দন
মায়ের কোল চিরে আসা নিমের ডালের চাপে।
কার যেন ছেড়াকাঁথা উড়ে এসে জড়িয়ে ধরেছিলো
আবার একা করে উড়ে ছিলো আকাশের দিকে।
মনে আছে, মনে আছে চক্রাকারে ঘুরে ঘুরে
নিশীথ ডাকা প্যাঁচাটা পড়েছিলো আছড়ে!
তথচ আজ সকাল নির্বিকার!

আজ সকালে নির্বিকার মনে জেগে উঠেছে ঊষা
রক্তজবা চোখ মেলে হাসছে ঝিলিক দিয়ে
পথ চিনে দিলো তাকে, সামনে সবুজ কচি পাতারা
হাওয়ায় দুলে ডাকছে কাছে।




সাহিদা রহমান মুন্নী
ইচ্ছেগুলো

বৈশাখের এক শেষ সন্ধ্যায়,
থাকবো তোমার সাথে -
ঘুরবো দু’জন দিনের আলোয়,
হাতটা রেখে হাতে ।

ফুলের রঙে রঙিন করে,
রাখবো ধরে সময়টা -
গ্রাম্য কোন বাঁশির সুরে,
রাখবো ভরে হৃদয়টা ।

বৈশাখের এই স্নিগ্ধ হাওয়ায়,
দুলবে যুগল তনু-মন -
আমার হয়ে থাকবে তুমি,
তোমার আমি সারাক্ষণ !

ইচ্ছেগুলো মন বাগানে,
ফুল হয়ে আর ফুটলো না -
তোমায় পাবার ইচ্ছে ছিল,
আজও তাতো মিটলো না !

বৈশাখ আসে বৈশাখ মাসে,
বৈশাখ চলে যায় -
ইচ্ছেগুলো বারমাস থাকে,
হৃদয়ের আঙিনায় !!

পাঠকের মতামত:

SMS Alert

সাহিত্য এর সর্বশেষ খবর

সাহিত্য - এর সব খবর