thereport24.com
ঢাকা, বুধবার, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ৪ আশ্বিন ১৪২৫,  ৮ মহররম ১৪৪০

সূর্যের দিকে তাকাতে গিয়ে

২০১৫ এপ্রিল ১৪ ০০:৫৫:১০
সূর্যের দিকে তাকাতে গিয়ে

তৌহিদুল ইসলাম মিন্টু

‘বৈশাখের মাঠের ফাটলে
এখানে পৃথিবী অসমান।
আর কোনো প্রতিশ্রুতি নেই।
কেবল খড়ের স্তূপ প'ড়ে আছে দুই-তিন মাইল,
তবু তা সোনার মতো নয়,
কেবল কাস্তের শব্দ পৃথিবীর কামানকে ভুলে
করুণ নিরীহ, নিরাশ্রয়।’

—এমন বাস্তবতার ভেতরে জীবনানন্দ দাশের শব্দ ছুঁয়ে এভাবেই শুরু করা যেতে পারে বৈশাখ বন্দনা। আলোর উল্লম্ফনের ভেতরে, পুবের আকাশের দরোজা খুলে নতুন দিনের সূর্যকে সাথী করে আবারও এসেছে বৈশাখ। যেভাবে এসেছিল একবছর আগেও। প্রকৃতির সব রুদ্ররূপ নিয়ে হাজির হয়েছে নতুন বৈশাখ। বরাবরের মতো এবারও বৈশাখের কাছে প্রত্যশা— সব গ্লানি ও জীর্ণ-জ্বরা ধুয়ে মুছে নিয়ে যাক, শুচি হোক ধরা।

কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, একদিনেই কি সব গ্লানী মুছে যায় কিংবা যাবে? আগের ঘটনার পুনরাবৃত্তি থেকে বেরুতে পারলেই না ধীরে ধীরে মুছে যাবে পুরোনো গ্লানি, জীর্ণ-জ্বরা। তাই দরকার পুরোনো হিংসা হানাহানি ভুলে যাওয়া। দরকার নেতৃত্বের নতুন উদ্যোগ। এই মুহূর্তে আমরা স্মরণ করছি কবি আজীজুল হক কে, যার একটি কাব্যময় ভাবনা আমাদের চেতনাকে শাণিত করে দারুণভাবে। তিনি বলছেন— ‘ঠিক এই মুহূর্তে আমি ভাবছি না আমার শত্রুকে/বরং জন্মাবধি সেই ভাইকে/সূর্যের দিকে তাকাতে গিয়ে যার চোখ ঝলসে গেল,/বরং বন্ধুকে/যার আলিঙ্গন দুটি গুলিবিদ্ধ বাহুর মত কবোষ্ণ/ও সুদীর্ঘ,/এবং মাকে/যিনি ঘাসের সবুজে মিশে নিজেই বাংলাদেশ হয়ে গেলেন।’ সেই মাতৃসম দেশের প্রেমকে সবার আগে অগ্রাধিকার দিতে হবে আমাদের।

এ কথা নির্বিবাদে সত্য যে, গ্লানি ঘুচুক বা নাই ঘুচুক, নতুন বছরে যুক্ত হবে নতুন নতুন প্রাণ, নতুন সজীবতা, নতুন ভালবাসা। পৃথিবীর আর সব ভাষাভাষী মানুষের মতো আমরাও চাই সেই সজীবতা নিয়ে এগিয়ে যেতে। এগিয়েও যাচ্ছি। এই এগিয়ে যাওয়ারই অংশ বৈশাখ উদযাপনের ভিন্ন এক মাত্রা। মাত্র দুই যুগের ব্যবধানে নতুন মাত্রা যুক্ত হয়েছে বৈশাখে। বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার রমনাকে ঘিরে উৎসবের যে নতুন আয়োজন শুরু হয়েছিল সেদিন তা আজ ছড়িয়ে পড়েছে শহর থেকে গ্রামে। এই দিন দেশময় যে ঐকতান চলে তার আমেজ বাংলাদেশের আর সব ধর্মীয়, জাতীয় উৎসবকে ছাপিয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশে ধর্মীয় বা রাজনৈতিক ভিন্নতা থাকলেও বৈশাখী উৎসবকে ঘিরে সব পথ, সব মত এক মোহনায় মিলিত হয়। তাই এই উৎসবকে ঘিরে কেনা-কাটা এখন নতুন রূপ নিয়েছে। ঈদ বা পূজাকে সামনে রেখে যে ধরনের কেনা-কাটা চলে বাংলা নববর্ষ উপলক্ষ্যেও এখন সে কেনা-কাটা শুরু হয়েছে। মধ্য বা নিম্নবিত্ত গৃহস্থের জন্য এটা যেমন বাড়তি আনন্দের তেমনি এখন বাড়তি বোঝাও বটে। প্রতিবছরই গৃহকর্তাকে যোগাড় করতে হচ্ছে পোশাক কেনার বাড়তি টাকা। সীমিত আয়ের মানুষের জন্য যা বেশ কষ্টসাধ্য। তাই বাড়তি এই খরচ যোগাড়ের জন্য প্রয়োজন উৎসব ভাতা। ঈদ বা পূজায় যেভাবে উৎসব ভাতা দেওয়া হয়— পহেলা বৈশাখকে সামনে রেখে সরকারের পক্ষ থেকে সেভাবে উৎসব ভাতা প্রদান এখন সময়ের দাবি। সরকার শুরু করলেই বেসরকারি পর্যায়ে তা চালু হবে। যোগ হবে বৈশাখের নতুন আনন্দ। জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠায় যা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

আজ থেকে ৪৫৯ বছর আগে দিল্লির সিংহাসনে বসে ভিন্নভাষী সম্রাট আকবর যে উদ্যোগ নিয়েছিলেন তারই ফসল আজকের পহেলা বৈশাখ। তাই বাংলাদেশে বসবাসরত ভিন্ন ভাষাভাষী মানুষের জন্য বাঙালীর দায় একটু বেশীই। বৈশাখ উদযাপনের পাশাপাশি বাঙালী হিসেবে আমাদের সজাগ থাকতে হবে এ দেশের ভিন্ন ভাষাভাষী মানুষের প্রতি। পাহাড়ী কিংবা সমতলে যে সব ভিন্ন নৃ-গোষ্ঠীর মানুষ রয়েছেন তাদের নিজস্ব সংস্কৃতির প্রতি কোনো রকম কটাক্ষ বা অবহেলা না হয়।

পৃথিবীর মানচিত্র বদলের সাথে সাথে বদলে যাচ্ছে সংস্কৃতি। বিলীন হয়ে যাচ্ছে অনেক ভাষা। অনেক সংস্কৃতি। বিপরীতে বাংলা ভাষা ক্রমশ শক্তিশালী হয়ে উঠেছে। ভাষা সমৃদ্ধ হলেও সংস্কৃতি বিভাজিত হয়ে যাচ্ছে বাঙালীর। ভারতের অংশে বাঙালীদের সঙ্গে বাংলাদেশের বাঙালীদের সংস্কৃতির বিভাজন ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে উঠছে। উভয়ের পোশাক আচার-আচরণ কিংবা শব্দ উচ্চারণের ভিন্নতা সহজে বোঝা যায়। পশ্চিমবঙ্গে একদিন পরে পালিত হয় পহেলা বৈশাখ। সেখানে যুক্ত হয় ধর্মীয় আবেশ। বাংলাদেশে তা স্পর্শ করে না। ধর্মীয় বিভাজন ঝেড়ে ফেলে বাংলাদেশের সব মানুষ মিলিত হন রমনার বটমূলে বা নিজ গ্রামের হাটের কোনো মেলায়।

সংস্কৃতির এই বিভাজনে স্বাধীন বাংলাদেশের বাঙালী হিসেবে হয়ত আমরাই এগিয়ে যাব। তবে খেয়াল রাখতে হবে পশ্চিমবঙ্গের বাঙালীরা যেন ভারতীয় হিন্দী সংস্কৃতির বলয়ে বন্দী হয়ে বাঙালীত্ব থেকে বিচ্যুত না হন।

সকলকে নববর্ষের শুভেচ্ছা! শুভ নববর্ষ!

লেখক : সম্পাদক, দ্য রিপোর্ট টুয়েন্টিফোর ডটকম

পাঠকের মতামত:

SMS Alert

চির সুন্দর হে এর সর্বশেষ খবর

চির সুন্দর হে - এর সব খবর



রে