thereport24.com
ঢাকা, বুধবার, ১৪ নভেম্বর ২০১৮, ২৯ কার্তিক ১৪২৫,  ৫ রবিউল আউয়াল ১৪৪০

‘মাটির ময়না’য় লোকজ অনুষঙ্গ

২০১৫ এপ্রিল ১৪ ০২:২৭:৪৭
‘মাটির ময়না’য় লোকজ অনুষঙ্গ

সোমেশ্বর অলি, দ্য রিপোর্ট : বাংলা চলচ্চিত্রের সামগ্রিক আলোচনায় তারেক মাসুদের ‘মাটির ময়না’র নাম ঘুরে ফিরে আসে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দারুণ প্রশংসা ও পুরস্কার পেয়েছে চলচ্চিত্রটি। অনেকে ফ্রেম টু ফ্রেম সমালোচনা-প্রশংসা করেছেন। এ কারণেই ‘সিনেমা করতে আসা’ তরুণদের কাছে চলচ্চিত্রটি ‘মাস্ট সি’ স্ট্যাস্টাস পেয়েছে শুরুতেই। কী এমন আছে যার কারণে ‘মাটির ময়না’ এত আলোচিত? এ প্রশ্নের জবাবে বাঙালী সংস্কৃতির জায়গা থেকে ঘুরিয়ে বলা যায়, কী নেই?

পুরো সিনেমা ও তার বিষয়ানুষঙ্গ এ আলোচনার বিষয়বস্তু নয়। আমরা সংক্ষিপ্ত পরিসরে ‘মাটির ময়না’য় ব্যবহৃত লোকজ অনুষঙ্গের একটি চিত্র তুলে ধরব।

সমগ্র চলচ্চিত্রজুড়েই ছিলেন কাজী সাহেব। তিনি আনুর বাবা, যার চোখ দিয়ে আমরা পুরো সিনেমার ঘটনাবলী দেখি। এ হোমিওপ্যাথ চিকিৎসক কঠোর ধর্মাচারী। তিনি বিশ্বাস করেন না, মুসলমানরা মুসলমানদের ক্ষতি করতে পারে। সেই কাজীর ছেলে আনু মাদ্রাসায় পড়বে সেটাই স্বাভাবিক। বেশরিয়তি কাজে অংশগ্রহণের পর দিনই তাকে মাদ্রাসায় ভর্তি করা হয়। বেশরিয়তি কাজটি ছিল নৌকাবাইচ দেখতে যাওয়া।

এরপর বাড়ি থেকে কিছুটা দূরের মাদ্রাসার পরিবেশে নিজেকে খাপ খাইয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে আনু। সেখানে তার একজন ব্যতিক্রমী বন্ধু জোটে, নাম রোকন। রোকনের সঙ্গে পরিচয়ে গ্রামের স্মৃতি নাড়া দিয়ে ওঠে আনুর মনে। ফ্ল্যাশব্যাকে দর্শক দেখতে পান নৌকাবাইচ। কমিউনিস্ট চাচা মিলনের সঙ্গে আনু নদী তীরে দাঁড়িয়ে আছে। হাজার হাজার উৎসুক জনতা নদীর দুই ধারে। মিলনের হাত আনুর কাঁধে রাখা। আনু হাততালি দিচ্ছে। তার মনে উচ্ছ্বাস আর দৃষ্টি নদীতে। সারি সারি নৌকা ছুটে চলেছে। বাজছে ঢাল-ঢোল। নৌকাবাইচ দেখা শেষ হল। বাড়িতে তার জন্য অপেক্ষা করছে অন্য এক জীবন। কাজী সাহেব সেদিনই ছেলেকে ‘বিধর্মী’ কার্যকলাপ থেকে নিবৃত্ত করার মনস্থ করেন। তিনি ঘোষণা করেন, কালই ছেলেকে মাদ্রাসায় ভর্তি করে দেবেন। আনুর ডানা মেলা এভাবে বন্ধ হয়।

আরেকটি দৃশ্যে ঈদের ছুটিতে বাড়ি ফিরছে আনু। পথে চৈত্রসংক্রান্তির চড়ক মেলা বসেছে। সে আনমনে ঢুকে পড়ে মেলায়। নাগরদোলা, চড়ক তার চোখে পড়ে। আরও দেখে মাটির পুতুল। মনে পড়ে ছোট বোনের কথা। তার একমাত্র খেলার সাথী ছিল আনু। মাদ্রাসায় ভর্তি হওয়ার পর বোনটি একা হয়ে পড়ে। আনু বোনের জন্য রঙিন একটা পুতুলে কেনে। বাড়ি ফিরে তাকে পুতুলটি দেয়। বোন বেশ খুশি হয়। আনু সাবধান করে দেয় কিছুতেই বাবা যেন পুতুলটি দেখতে না পায়। ছোট্ট দুই শিশু ভাল করেই জানে এটা কাজী সাহেব বরদাস্ত করবেন না। কারণ পুতুলের কারিগর পুতুলে প্রাণ দেওয়ার ক্ষমতা রাখে না। তাই এটা বানানো তার কাজ নয়।

আনুর সুখ-দুঃখের গল্প আগ্রহভরে শোনে চাচা মিলন। তাকে নিয়ে এখানে ওখানে যান তিনি। এর ধারাবাহিকতায় পুঁথিপাঠের আসরে যাওয়ার সুযোগ হয় আনুর। রাতে বাড়ি পালিয়ে তারা পুঁথিপাঠ শোনে। চাচার হাত ধরে একদম সামনের সারিতে বসে আনু। আসরে হযরত ইব্রাহীমের (আঃ) একটি ঘটনা সুরে সুরে বর্ণনা করা হয়। মিলন ও আনুর চোখে দর্শকও কিছুক্ষণের জন্য হারিয়ে যায় বাংলার ঐতিহ্যবাহী পুঁথিপাঠে।

নৌকাবাইচ, চড়কমেলা, পুঁথিপাঠ ছাড়াও ‘মাটির ময়না’য় তুলে ধরা হয়েছে বাউলগান ও পালাগান। সওয়াল-জবাবের মাধ্যমে শরিয়ত-মারেফতের যুক্তি খণ্ডনের ব্যবহৃত হয়েছে— ‘যদি বেহেস্তে যেতে চাওগো প্রেম রাখিও অন্তরের ভিতর’ গানটি। এ ছাড়া গভীর ভাবসমৃদ্ধ ‘পাখিটা বন্দী আছে দেহের খাঁচায়’ গানটিও বেশ আলোচিত।

‘মাটির ময়না’ চলচ্চিত্রের ‘লোকজ অনুষঙ্গ’ এর ফিরিস্তি ও তার তাৎপর্য আরও বিশাল। গল্পের পাশাপাশি এ অনুষঙ্গগুলো চলচ্চিত্রটিকে করে তুলেছে একটা সময়ের চালচিত্র ও অনেক জীবন্ত, যা বাংলা চলচ্চিত্রের বিরল কয়েকটি দৃষ্টান্তের অন্যতম।

(দ্য রিপোর্ট/এসও/ডব্লিউএস/শাহ/এপ্রিল ১৩, ২০১৫)

পাঠকের মতামত:

SMS Alert

জলসা ঘর এর সর্বশেষ খবর

জলসা ঘর - এর সব খবর