thereport24.com
ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ৫ আশ্বিন ১৪২৫,  ৯ মহররম ১৪৪০

ইরানী পোলাও

২০১৫ এপ্রিল ১৪ ০৭:১৮:৩০
ইরানী পোলাও ॥ কৃষণ চন্দর

অনুবাদ : ড. মুফতী মুহাম্মদ গোলাম রব্বানী

আজকের রাতটি শুধুই আমার। কারণ, আজ পকেটে টাকা নেই। যখন পকেটে অল্প কিছু টাকা পয়সা থাকে তখন রাতটি আমার মনে হয় না। তখন রাত মেরিন ড্রাইভে লাফিয়ে লাফিয়ে চলা গাড়ির মতে মনে হয়। ঝলমলে ফ্ল্যাটের মতো মনে হয়। কিন্তু, আজকের রাতটি শুধুই আমার নিজের। আকাশের সব তারা যেন আমার। বোম্বাই [মুম্বাই] এর সব সড়ক আমার আপন। যখন পকেটে অল্প কটি টাকা থাকে তখন পুরো শহর আমার উপর চেপে বসেছে বলে মনে হয়। সব কিছুই আমাকে বাঁকা চোখে দেখে, ধমকায়, সরে বসতে বাধ্য করে। সামান্য প্যান্ট থেকে শুরু করে আকর্ষণীয় রেডিও প্রোগ্রাম পর্যন্ত সব কিছুই বলতে থাকে আমার থেকে সরে যাও, দূর হও। তবে যেদিন পকেটে এক পয়সাও থাকে না তখন পুরো শহর আমার জন্যই তৈরি করা হয়েছে বলে মনে হয়। এ শহরের প্রতিটি পাথরে, গলির মোড়ে বিদ্যুতের খুঁটিতে যেন লেখা রয়েছে, Ôএটি ক্ষুধার্ত এক লেখক বিষণ-এর জন্য তৈরি করা হয়েছে।Õ এ দিনে না হাজতে যাওয়ার ভয় থাকে, না এক্সিডেন্টের ভয় থাকে। হোটেলে খাওয়ার সম্ভাবনা নেই। থাকি ভাবনাহীন ব্যাপক উপবাসের নেশায় মত্ত। অনুভূতিসত্তা মাইলের পর মাইল ছড়িয়ে যায়। এ রাতে আমি নিজে চলি না, এ রাতে বোম্বাইয়ের রাস্তাগুলো আমাকে উড়িয়ে নিয়ে চলে। গলির মোড়ে, বাজারের কোণে, বড় বড় অট্টালিকার অন্ধকার পার্শ্ব আমাকে আহ্বান জানায়, এদিকে এসো। আমাদের দিকেও ফিরে তাকাও। আমাদের সাথে মিশে যাও। দোস্ত! তুমি আট বছর যাবৎ এ শহরে বসবাস কর, তারপরও অচেনা লোকের মতো কেন চলে যাচ্ছো? এদিকে এসো, আমাদের সাথে হাত মিলাও। এ রাত আমার। আজ রাতে কারো ভয় নেই মনে। ভয়তো তারই হয় যার পকেট ভারী হয়। এ শূন্য পকেটের দেশে ভারী পকেটধারীদের ভয় থাকাই উচিত। আমার কাছে কিইবা আছে যে ছিনিয়ে নিবে?

শুনেছি সরকার আইন তৈরি করে রেখেছে, যার আলোকে রাত বারটার পর রাস্তায় ঘুরাফিরা করা নিষিদ্ধ। কেন? কী ব্যাপার? রাত বারটার পর বোম্বাই-এ কী হয় যা আমার কাছে লুকিয়ে রাখতে চায়। আমি অবশ্যই খোঁজ নিব। যা হওয়ার হবে। আজ অবশ্যই ঘুরব, আর আমার বন্ধুদের সাথে হাত মিলাব। এ সব ভেবে পিটরি কলি মিশনের সামনের রাস্তা পেরিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের খেলার মাঠে ঢুকে গেলাম। উদ্দেশ্য ছিল মাঠের মাঝ দিয়ে অন্য প্রান্ত টেলিগ্রাম অফিসের সামনে দিয়ে বের হব, সেখান থেকে ফ্লোরা ফাউন্টেন যাব। কিন্তু, মাঠ পেরিয়ে যাওয়ার সময় আমি দেখি এক কোণায় কয়েকটি ছেলে গোল হয়ে বসে আছে আর তালি দিতে দিতে গান গাইছে-

তেরা মেরা পেয়ার হো গিয়া

তেরা মেরা

মেরা তেরা

তেরা মেরা পেয়ার হো গিয়া...

দু’তিনটে ছেলে তালি বাজাচ্ছে, এক ছেলে মুখ দিয়ে বাঁশির সুর করার চেষ্টা করছে, এক ছেলে মাথা দুলিয়ে এক কাঠের বাক্সের মাধ্যমে তবলার আওয়াজ বের করছে, সবাই আনন্দে দুলছে আর মোটা, চিকন, উঁচু-নিচু কণ্ঠে গেয়ে চলেছে। আমি কাছে গিয়ে জিজ্ঞাসা করলাম, Ôকী ভাই! কার সাথে প্রেম হলো?Õ

তারা গান বন্ধ করে এক মুহূর্ত আমাকে দেখায় ব্যস্ত হয়ে গেল। জানি না মানুষের কাছে আমি দেখতে কেমন? তবে এটুকু বুঝি, এক মুহূর্ত দেখার পর লোকেরা আমার সাথে খোলামেলা হয়ে যায়। আমার সাথে এতো আন্তরিক হয়ে যায় যে, জীবনের গোপন কথা, তার সংক্ষিপ্ত জীবনের সমস্ত ঘটনাবলী, তার জীবনের সব দুঃখ-ব্যথা আমার কাছে ব্যক্ত করা শুরু করে দেয়। আমার চেহারায় কোনো বড়ত্ব নেই। অদ্ভুত কিছু নেই। কোনো ভয়ার্ততা, ভাবগাম্ভীর্যতা নেই। আমার পোশাকে কোনো শান-শওকত নেই। সেই ভাব নেই যা কালো আচকানা আর গোলাপ ফুলে ফুটে উঠে, কিংবা শার্ক আচকান স্যুট পরিধান হয়ে থাকে। পায়ে সাধারণ স্যান্ডেল, তার উপরে খদ্দরের পায়জামা, তার উপরে খদ্দরের শার্ট, যা অধিকাংশ সময় পিঠের দিকে থেকে ময়লা থাকে। কারণ, একে তো কুঁড়ে ঘরে মাটিতে ঘুমানোর অভ্যাস আমার, দ্বিতীয়ত, আমার আরেকটা খারাপ অভ্যাস হলো, কোথাও বসলে দেয়ালে হেলান দিয়ে বসা। এটা ঠিক, আমার জীবনে ময়লা দেয়ালের পালা বেশি আসে। ঝকমকে দেয়াল অনেক কম-ই পাই। বেচারা অধিকাংশ সময় কাঁধের দিক থেকে ছিঁড়ে যায়। আর অনেক সময় জোড়াতালি দিয়ে সেলাই করা দেখা যায়। ছেঁড়া-পুরাতন কাপড় সেলাই করার বার বার চেষ্টা করা হয়। কেননা সবাই তো আর নতুন সেলাই করা কালো আচকান আর পকেটে গোলাপ ফুল পরিধান করতে পারে না। এই জোড়াতালির সেলাই আর ওই নতুন সেলাইয়ের মাঝে এতো পার্থক্য কেন? এটা ঠিক, সবাই এক রকম হয় না। সবাই একই গড়নের, আকৃতির হয় না। বোম্বাই-এ দিনরাত নানা চেহারা দেখি, ভিন্ন ভিন্ন লক্ষ চেহারা দেখি। কিন্তু একী! তাদের সবার কাঁধেই সেলাই করা সুতা। লক্ষ লক্ষ সুতা ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন জীবনকে একটা পর্যায়ে পৌঁছানোর ব্যর্থ চেষ্টা করে যায়।

এক সাহিত্য সমালোচক আমার ছোটগল্প পড়ে মন্তব্য করেছেন, ‘আমি এ সব গল্পে মানুষের কোনো চেহারা দেখতে পাই না।’ এটাই আমার সমস্যা। আমি আমার গল্পের চরিত্রের চেহারার মুখাকৃতির বর্ণনা দেই না। তাদের কাঁধের সেলাই সুতা চোখে ভেস উঠে। সেই সেলাই সুতা তার ভেতরকার অবস্থা তুলে ধরে। তার দিবারাত্রির টানাপোড়েন, তার প্রতিদিনকার মেহনতের চিহ্ন জানিয়ে দেয়। যা ছাড়া জীবনধর্মী কোনো উপন্যাস, সামাজিক কোনো গল্প পরিপূর্ণতা পায় না এ জন্য আমি খুশী। আমার চেহারা দেখে কেউ আমাকে কেরানী, কেউ তরকারি বিক্রেতা, কেউ চিরুনি বিক্রেতা অথবা নাপিত মনে করে। তবে আজ পর্যন্ত কেউ মন্ত্রী বা পকেটমার মনে করেনি আমাকে।

লক্ষ কোটি সাধারণ মানুষের একজন হতে পেরে আমি খুশী। পারস্পরিক পরিচয়পর্ব ছাড়াই খুব দ্রুত একজনের সাথে আন্তরিক হয়ে যেতে পারি। এখানেও এক মুহূর্তের পরীক্ষা পর্ব শেষে তারা আমার দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসি দিল। এক ছেলে আমাকে বলল, এসো ভাই! তুমিও এখানে বসে যাও। যদি গাইতে চাও তাহলে গাও।

এতটুকু বলে এই হালকা পাতলা ছেলেটি তার মাথার চুল ঝাকি দিয়ে পিছনে নিয়ে গেল। তার কাঠের বাক্সের তবলা বাজাতে লাগলো। আমরা সবাই মিলে আবার গাইতে লাগলাম-

তেরা মেরা

মেরা তেরা

পেয়ার হো গিয়া...

একপর্যায়ে এই হালকা গড়নের ছেলেটি তবলা বাজানো বন্ধ করে দিল। তার এক সাথী যে তার মাথা দু’হাঁটুতে ঠেকিয়ে উপরে বসে ছিল, তাকে টোকা দিয়ে বলল, এই মধুবালা! তুই গাচ্ছিস না কেন?

মধুবালা তার মাথা অনেক কষ্টে হাঁটু থেকে উঠালো তার চেহারা মধুবালা নায়িকার মতো সুন্দর ছিল না। থুতনি থেকে ডাত হাতের কনুই পর্যন্ত আগুনে পোড়ার দাগ ছিল। তার মুখে কষ্টের চিহ্ন ফুটে ছিল। তার গোলাকৃতির চেহারার মাঝে ছোট ছোট দুটি চোখ দুটো কালো তিলকের ন্যায় অত্যন্ত পেরেশানী নিয়ে জ্বল জ্বল করছিল। সে তার ঠোঁট ভ্যাংচিয়ে তবলা বাদককে বলল, সালা, আমাকে আমার মতো থাকতে দে। আমার পেট ব্যথা করছে। ব্যথা করছে কেন? সালা! আজও তুই ইরানী পোলাও খেয়েছিস মনে হয়?

মধুবালা অনেক কষ্টে মাথা দোলালো। হ্যাঁ, তা-ই খেয়েছিলাম। সালা! খেয়েছিস কেন?

কী করব? আজ শুধু তিন জোড়া জুতা পালিশ করেছি।

আরেক ছেলে যাকে বয়সে তাদের মাঝে বড় মনে হচ্ছিল, যার থুতনিতে অল্প দাড়ি গজিয়েছে, কানপট্টির চুল গালের দিকে বেড়ে যাচ্ছে, তার নাক চুলকিয়ে বলল, এই মধুবালা! ওঠ, মাঠে দৌড়া। চল, আমিও তোর সাথে দৌড়াব। দুই চক্কর দিলে পেট ব্যথা শেষ।

না রে, আমাকে ছাড়।

আরে না, ওঠ, নাইলে এক থাপ্পড় খাবি।

মধুবালা হাত জোড় করে বলল, কাকু! বাদ দে, আমি তোর কাছে মিনতি করছি। এ পেট ব্যথা ঠিক হয়ে যাবে। উঠবি? আমাদের সঙ্গ খারাপ করছিস কেন?

কাকু হাত বাড়িয়ে মধুবালাকে উঠালো। তারা দুজনে বিশ্ববিদ্যালয় মাঠে চক্কর দেয়া শুরু করল। প্রথমে কিছুক্ষণ দৌড়রত ছেলেদের দিকে তাকিয়ে ছিলাম। যখন আমার কাছের ছেলেটি মাথা চুলকিয়ে বলল, সালা! কী মুসিবত! ইরানী পোলাও খেলে সমস্যা, না খেলেও সমস্যা।

আমি বললাম, ‘ভাই পোলাও তো অনেক মজার জিনিস। তা খেয়ে পেটে ব্যথা হবে কেন?’ আমার কথায় সবাই হেসে উঠলো। এক ছেলে যার নাম পরে জেনেছি কুলদীব কুর, সে তখন একটি ছেঁড়া কটি ও ছেঁড়া হাফপ্যান্ট পরিধান করে ছিল, আমার দিকে তাকিয়ে হেসে বলল, ‘মনে হচ্ছে তুমি ইরানী পোলাও কোনো দিন খাওনি।’

কুলদীব কুর তার কটির বোতাম খুলতে খুলতে আমাকে বলল, ইরানী পোলাও এদের বিশেষ পরিভাষা, এদের দেয়া নাম। এটি তারা প্রতিদিন খায় না। তবে যেদিন যে ছেলে জুতা কম পালিশ করে অথবা যে দিন তার কাছে কম পয়সা থাকে সে দিন তাকে ইরানী পোলাও-ই খেতে হয়। এ পোলাও সামনের ইরানী রেস্তোরাঁয় রাত বারোটার পর পাওয়া যায়। যখন সব কাস্টমার খাবার খেয়ে চলে যায়। সারাদিন কাস্টমাররা ডবল রুটির অর্ডার দিয়ে রুটির অনেক টুকরা প্লেটে রেখে-ই চলে যায়, ডবল রুটির টুকরা, গোশত, হাড় চুষে ফেলে দেয়া অংশ, ভাত, ডিম ভাজির গুড়া, আলুর টুকরা এ সব উচ্ছিষ্ট খাবার একসাথে জমা করে এর একটা মিশ্রণ তৈরি করা হয়। তা দু আনা প্লেট বিক্রি করা হয়। ইরানী রেস্তোরাঁর পেছন দরোজা দিয়ে তা পাওয়া যায়। আর এটাই ইরানী পোলাও। এটি সাধারণত এই এলাকার গরিব লোকেরাও খায় না। তারপরও প্রতিদিন দু’তিন শ’ প্লেট বিক্রি হয়। এর ক্রেতাদের অধিকাংশই মুচি, ফার্নিচার পরিষ্কারকারী, ট্যাক্সি ডেকে দেয়া লোকগুলো অথবা আশপাশের বিল্ডিং-এর বেকার শ্রমিক। আবার নির্মাণাধীন বিল্ডিং-এর মজুরি না পাওয়া শ্রমিকরাও এর কাস্টমার হয়ে থাকে।

আমি কুলদীব কুরকে বললাম, তোমার নাম কুলদীব কুর কেন? কুলদীব তার কটি খুলে ফেলল। এখন সে খুব আরাম করে শুয়ে আছে। তার কালো পেটে হাত বুলাচ্ছে। সে আমার প্রশ্ন শুনে ঘাসের উপর লুটোপুটি খেতে লাগলো। হাসি থামার পর তার এক সাথীকে বলল, ‘আমার বাক্সটা একটু এনে দাও তো।’

তার সাথী বাক্স এনে দিল। কুদীব কুর তার বাক্স খুললো। এর ভেতর পালিশ করার জিনিসপত্র ছিল। পালিশের কৌটার উপরে কুলদীব কুরের ছবি লাগিয়ে রাখা ছিল। তারপর সে তার আরেক সাথীকে বলল, তুমি তোমার বাক্স খোল। সে-ও তার বাক্স খুলল। সেই বাক্সে পালিশের ছোট-বড় যত কৌটা ছিল সে গুলিতে নায়িকা নার্গিসের ছবি ছিল। যা পত্রিকা-ম্যাগাজিনের পাতা থেকে কেটে লাগানো হয়েছে।

কুলদীব কুর বলল, ‘এই সালা নার্গিসের পালিশ করে। নিম্মী আর ওই সুরাইয়া পালিশ করে। আমাদের যতজন আছে প্রত্যেকেই কোনো না কোনো সিনেমার নায়িকার ছবি কেটে তার কৌটায় লাগিয়ে দেয় এবং সেই নামে-ই পালিশ করে।’

শালার গ্রাহক এ সব কাজে অনেক খুশী হয়। আমরা তাদের জিজ্ঞাসা করি, স্যার! কোন করব? নার্গিস, সুরাইয়া নাকি মধুবালা? গ্রাহক যে নায়িকাকে পছন্দ করে তার পালিশ চায়। তখন আমরা সেই ছেলের কাছে পাঠিয়ে দেই- যে নার্গিস পালিশ করে বা নিম্মী কিংবা অন্য কোনো নায়িকার পালিশ করে। আমরা আট ছেলে আছি। এদিকে চার্চ গেট থেকে বাসস্ট্যান্ডের পিছনে আমরা বসি। যার কাছে সে নায়িকার পালিশ আছে সেটি এখন তার নাম। এতে আমাদের ব্যবসা ভাল চলে। কাজ করায়ও মজা আসে।

আমি বললাম, তোমরা আবার বাসস্ট্যান্ডের নিচে ফুটপাতে, ইরানী রেস্তোরাঁর সামনে বস, তখন পুলিশ কিছু বলে না?

কুলদীব কুর উপুড় হয়ে শুয়ে ছিল, এখন সে চিৎ হয়ে শুয়ে তার হাতে আংটিকে এক আঙুল থেকে বের করে নাচালো। মনে হচ্ছে বায়ুমণ্ডলে উপরের দিকে নিক্ষেপ করেছে। সে বলল, ওই সালারা কী আর বলবে?

তাদেরকে পয়সা দিতে হয়। এখানে এই মাঠে যারা ঘুমায় তাদেরও টাকা দিতে হয়। আরে টাকার ব্যাপার। কুলদীব এ টুকু বলে আবার শূন্যে আংটি ছুঁড়ে মারার মতো ভাব করলো, আর আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকলো। আবার দু’হাত খুলে দেখলো। আসলে দু’হাত-ই খালি। কুলদীব খুব আকর্ষণীয় ভঙ্গিতে তিক্ত হাসি দিলো। আর কিছু না করে আবার উপুড় হয়ে শুয়ে পড়লো।

নার্গিস আমাকে জিজ্ঞাসা করল, তুমি এদিকে দাউরে পালিশ কর, তাই না? আমি তোমাকে ইয়াজদা হোটেলের সামনে মনে হয় দেখেছি।

আমি বললাম, হ্যাঁ, আমাকেও এক রকম পালিশওয়ালা-ই মনে কর।

‘এক রকম ‘কেন? কুলদীব কুর উঠে বসল।

সে আমার দিকে ঘুরে তাকিয়ে দেখলো। সালা সোজা কথা বল। তুমি কী কাজ কর।

সে আমাকে সালা বলায় খুশী হয়েছি। যদি অন্য কেউ বলতো তাহলে এক চড় দিয়ে বসতাম। তবে এ ছেলে যখন আমাকে শালা বলল তখন আমি খুশীই হলাম। কেননা এখানে ‘শালা’ শব্দটি গালি হিসেবে ছিল না। ভ্রাতৃত্বের বন্ধনের জন্য এ শব্দটি ব্যবহার করেছে। তারা আমাকে তাদের ভাই হিসেবে গ্রহণ করেছে। তাই আমি বললাম, ভাই আমিও এক ধরনের পালিশ ওয়ালা। তবে আমি শব্দ পালিশ করি। কখনো আবার পুরানো চামড়া ঘষে মেজে দেখি এর পুরাতন ভাজে কী লুকিয়ে আছে।

নার্গিস ও নিম্মী সমস্বরে বলে উঠলো, তুমি শালা আবার ঘড়বড় করে ফেলছো। সাফ সাফ বল তুমি কী কর?

আমি বললাম, আমার নাম বিষণ। আমি পত্রিকায় গল্প লিখি।

‘ও তুমি তাহলে বাবু’ নিম্মী বলল।

নিম্মী ছোট ছেলে। গোল চক্করে যারা বসা ছিল তাদের মধ্যে সবচেয়ে ছোট। কিন্তু তারা চোখে মেধার স্ফুরণ দেখা যাচ্ছিল। আবার সে যেহেতু পত্রিকাও বিক্রি করতো তাই তার মাঝে আমার ব্যাপারে অনেক আগ্রহ তৈরি হয়ে গেল। সে আমার কাছে চলে এলো। সে বলল, কোন পত্রিকায় লেখেন? ফেরী প্রেস, সেন্ট্রার টাইমস, বোম্বাই কার্নিক্যাল, আমি সব পত্রিকায়ই চিনি।

সে আরও এগিয়ে আমার কাছে চলে এলো।

আমি বললাম, আমি শাহেরাহ পত্রিকায় লিখি।

সাহেরাহ এটা আবার কোনো নিউজ পেপার?

দিল্লি থেকে ছাপা হয়।

‘দিল্লির ছাপা খানা থেকে, ও?’ নিম্মী আমাকে ভালভাবে দেখলো।

‘আদব লতীফ পত্রিকাতেও লিখি।’ আমি কিছুটা আশ্চার্যান্বিত করার লক্ষ্যে বললাম।

কুলদীব কুর হাসতে লাগলো। কী বললে, বদবে খলতীফ-এ লেখ। সালা এটা তো মনে হচ্ছে কোনো ইংরেজি সিনেমার নায়িকা। বদবে খলতীফ। হা হা হা। এই নিম্মী তুই তোর নাম পাল্টিয়ে বদবে খলতীফ রাখ। খুব ভাল নাম মনে হয়।

হা হা হা করে যখন সবার হাসি গমক শেষ হলো তখন আমি গাম্ভীর্যতার সাথে বললাম, বদবে খলতীফ নয়, আদব, আদব লতীফ। লাহোর থেকে প্রকাশ হয়। খুব ভাল পেপার।

নার্গিস মাথা হেলিয়ে বলল, হ্যাঁ, সালা। আদব লতীফ-ই হোক। আমার কী? আমি এগুলো বিক্রি করে তো আর টাকা পয়সা কামাই করি না।

আমারও একই অবস্থা। অধিকাংশ সময় এতটুকুই পাই যতটুকু তোমরা কামাই কর। অধিকাংশ সময় কিছুই পাই না। যখন শব্দগুলো সাজানো শেষ করি, পালিশ শেষ হয় তখন পত্রিকা কর্তৃপক্ষ ‘ধন্যবাদ’ জানিয়ে বিনা পয়সায় লেখা নিয়ে যায়। আর তার পত্রিকা বা ম্যাগাজিনকে আলোকিত করে তুলে।

তুমি শুধু শুধু ব্রেন নষ্ট কর কেন? আমাদের মত পালিশ কেন করছ না। সত্যি বলছি, তুমিও চল এসো আমাদের ভ্রাতৃবন্ধনে। তোমারই আগ্রহ অনুযায়ী তোমার নাম বদবে খলতীফ-ই রাখা হবে। হাত বাড়াও। আমি কুলদীব কুরের সাথে হাত মিলালাম। কুরদীব কুর বলতে লাগলো, তবে প্রতিদিন চার আনা পুলিশকে দিতে হবে।

যদি কোনো দিন চার আনা উপার্জন না হয়, তাহলে?

তাহলে আমরা জানি না। কারো থেকে ধার করবে, চুরি করবে, ডাকাতি করবে কিন্তু সেন্ট্রিকে চার আনা দিতেই হবে। মাসে আবার দুদিন হাজতে থাকতে হবে।

আরে, এটা আবার কেন?

এটা আমরা জানি না। সেন্ট্রিকে আমরা প্রতিদিন চার আনা করে দেই, প্রত্যেক পালিশন ওয়ালা-ই দেয়, তারপরও সেন্ট্রিরা প্রতি মাসে দুবার আমাদের ধরে নিয়ে যায়। এটাই তাদের নিয়ম। তারা বলে, আমরা কী করব?

আমি বললাম, ঠিক আছে, দুদিন না হয় হাজতে কাটালাম।

এবার কুলদীব কুর বলল, ‘তোমাকে মাসে একবার কোর্টে যেতে হবে। তোমাকে কোর্টে চালান করা হবে। কমিটির লোকদের পক্ষ থেকে তোমাকে কোর্টে যেতে হবে। সেখানে দু’তিন টাকা তোমাকে দিতে হবে কোর্ট খরচ বাবদ।

তা আবার কেন? সেন্ট্রিকে যখন প্রতিদিন চার আনা দিচ্ছি-ই তাহলে এগুলো আবার কেন?

আরে দোস্ত! সেন্ট্রিকেও তো তার কার্যক্রম দেখাতে হবে না? আরে বুঝিসনা সালা বদবে খালতীফ?

আমি চোখ টিপে কুলদীব কুরকে বললাম, ‘শালা বুঝি’। আমরা দুজনেই হাসতে লাগলাম। ইতোমধ্যে মধুবালা আর কাকু মাঠ চক্কর শেষ করে ঘর্মাক্ত হয়ে ফিরে এলো।

আমি মধুবালাকে জিজ্ঞাসা করলাম, তোমার পেটব্যথা কমেছে?

মধুবালা বলল, ব্যথা শেষ, তবে এখন খুব খিদে পেয়েছে।

নার্গিস বলল, আমারও।

‘তাহলে কী আবার ইরানী পোলাও চলবে?

আবার পেট ব্যথা। আবার মাঠে চক্কর দেয়া, তারপর আবার ক্ষুধার যন্ত্রণা?’ কুলদীব কুর অত্যন্ত ব্যঙ্গ করে বলল।

নিম্মী বলল, আমি দু’পয়সা দিতে পারি।

আমি বললাম, এক আনা আমার পক্ষ থেকে। সবাই মিলে চার আনা চাঁদা উঠালো। নিম্মকে ইরানী পোলাও আনার জন্য পাঠানো হলো, সেই সবচেয়ে ছোট ছিল।এ ছাড়াও ইরানী রেস্তোরাঁর বাবুর্চি তাকে পছন্দও করে। হতে পারে নিম্মীকে দেখে চার আনায় দু’প্লেটের স্থলে তিন প্লেট দিয়ে দিতে পারে। কমপক্ষে দু’প্লেট উপচিয়ে ভরে তিন প্লেটের সমান খাবার দিয়ে দিবে।

যখন নিম্মী চলে গেল তখন আমি জানতে চাইলাম, ‘তোমরা কী প্রতিদিন এখানেই ঘুমাও?’

‘মধুবালা ছাড়া সবাই এখানে ঘুমায়।’ কাকু আরও বলল, মধুবালা তার বাড়িতে চলে যায়। কিন্তু সে আজ যায়নি। আমি মধুবালাকে জিজ্ঞাসা করি তোমার বাড়ি আছে?

‘হ্যা, সায়েন এলাকায় একটি বস্তি ঘর আছে। সেখানে মা থাকেন।’

‘আর বাবা?’

মধুবালা বলল, ‘বাপ? বাপের খবর জানি না। সামনের বিল্ডিয়ের কোনো সাহেব হয়তো হবে।’

এবার সবাই চুপ। মনে হচ্ছে কেউ তাদের গালে থাপ্পড় মেরেছে। ছেলেরা যারা আশ্রয়হীন, গৃহহীন, নামহীন, যারা তাদের জীবনে অধরা ভালবাসাকে সিনেমার গানের দ্বারা পূর্ণ করার চেষ্টা চালায়।

আর ভাবতে পারছি না। না, তা হতে পারে না।

তেরা মেরা পেয়ার হো গিয়া। কোথায় তোমার পিয়ার ভালবাসা, হে আমার বাবা, হে আমার মা। হে আমার ভাই তুমি কে? তুমি কে ছিলে? কেন আমাকে এ দুনিয়ায় নিয়ে এসেছো? কঠিন দয়ামায়াহীন অট্টালিকাগুলোর টাইলস করা ফুটপাতে ধাক্কা খাওয়ার জন্য ফেলে রেখেছো?

এক মুহূর্তের জন্য এ সব ছেলেদের আর্তনাদিকণ্ঠ অজানা ভয়ে নিস্তব্ধ হয়ে থাকলো। খুব শক্ত করে একে অপরের হাত ধরলো। যেন তাদের কোনো আশ্রয় নেই ঠাঁই নেই। যেন এ শহরের বড় বড় ভবন সব ফুটপাত, সব পথিক তাদেরকে ঠেলে যাচ্ছে। আর তাদের বাধ্য করছে তারা যেন রাতের অন্ধকারে পরস্পরের হাত ধরে রাখে। আমার কাছে তাদেরকে ভয়ার্ত ও নিষ্পাপ মনে হচ্ছিল, যেন সাদাসিদে বালক কোনো অচেনা কূলকিনারাহীন জঙ্গলে হারিয়ে গেছে। এ সব কারণেই মাঝে মাঝে এটিকে শহর ভাবতে পারি না। যেখানে এ সমাজেরই নাম পরিচয়হীন সন্তান রাস্তার আঁকে বাঁকে রাস্তা হারিয়ে তার পথ খুঁজে ফিরে। যখন পথ খুঁজে পায় না তখন চোখ বন্ধ করে এক গাছের নিচে বসে যায়।

আর ভাবতে পারছি না। না, তা হতে পারে না।

বোম্বাই তো আর জঙ্গল না। এটা একটি শহর সবাই বলে এটির একটি মিউনিসিপ্যাল কর্পোরেশন আছে। এর একটি প্রশাসনিক কাঠামো আছে। একটি নীতি মালা আছে। এর গলি আছে, বাজার আছে, শপিংমল আছে, রাস্তা আছে, বাড়ি-ঘর আছে। সব কিছুই পারস্পরিক সম্পর্কযুক্ত। যেমনিভাবে একটি সভ্য সুন্দর শহরে সব কিছু পরস্পরে জড়িয়ে থাকে।

এ সব আমি জানি। এ শহরের রাস্তা, বাড়ি-ঘর সব চিনি। এ শহরকে আমি ইজ্জত করি, সম্মান করি। তবে এ সব ইজ্জত-সম্মান, ভালবাসা সত্ত্বেও আমি কেন দেখি-এ বোম্বাই শহরে অনেক গলি আছে যা থেকে বের হওয়ার কোনো রাস্তা নেই, অনেক রাস্তা আছে যার কোনো গন্তব্য নেই। কত শিশু দেখি যাদের কোন ঘর নেই। হঠাৎ এ নীরব চিন্তা ভেঙে দিল নিম্মী। সে দৌড়াতে দৌড়াতে আমাদের সামনে হাজির হলো। তার হাতে ইরানী পোলাও-এর তিনটি প্লেট। তা থেকে গরম গরম সুগন্ধিযুক্ত ধোঁয়া উড়ছিল। যখন প্লেটগুলো ঘাসের উপর রাখলো তখন দেখি নিম্মীর চোখে অশ্রু।

‘কী হলো?’ কুলদীব কুর প্রশ্ন করল।

নিম্মী অগ্নিঝরা কণ্ঠে বলল, ‘বাবুর্চি খুব জোরে এখানে কামড় দিয়েছে।’ নিম্মী তার বাম গাল আমাদের দিকে দেখার জন্য বাড়িয়ে দিল। আমরা দেখলাম বাম গালে অনেক বড় দাগ।

কুলদীব কুর বাবুর্চিকে গালি দিতে গিয়ে বলল, হারামজাদা...

তবে এতটুকুই। তারপর সবাই ইরানী পোলাও খেতে হুমড়ি খেয়ে পড়লো।

..............................

[কৃষণ চন্দর :

কৃষণ চন্দর তাঁর বেশিরভাগ লেখায় সমাজের নিচুতলার মানুষের কথা, সমাজের নানা বৈশিষ্ট্যের মানুষের কথা তুলে আনার চেষ্টা করেছেন। কৃষণ চন্দর জন্মেছিলেন ১৯১৪ সালের ২৬ নভেম্বর তৎকালীন অবিভক্ত ভারতবর্ষের পশ্চিম পাঞ্জাবের গুজরানওয়ালা জেলার ওয়াজিরাবাদ নামক এক ছোট শহরে। যদিও তিনি এক চিঠিতে তাঁর জন্মস্থান লাহোর বলে উল্লেখ করেছেন। তাঁর পুরো নাম কৃষণ চন্দর শর্মা। জন্মসূত্রে তিনি কাশ্মীরী ব্রাহ্মণ। তখনকার দিনে সাধারণত মেয়েরা হিন্দী ভাষার চর্চা করত, কিন্তু পুরুষেরা শিক্ষা গ্রহণ করত উর্দু ভাষাতে। তাই কৃষণ চন্দরকেও উর্দু ভাষার মাধ্যমেই শিক্ষা গ্রহণ করতে হয়। সাহিত্য-সাধনার পথে বাধা ছিল মায়ের চোখরাঙানি আর বাবার কঠোর নির্দেশ। এ সব অমান্য করেই স্কুল-জীবন থেকে অতি গোপনে তাঁর সাহিত্যচর্চা শুরু।

কলেজ জীবনেই তাঁর প্রথম গল্প ‘য়র্কান’ (কামলা) ‘রিয়াসত’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। লাহোরের পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনি এমএ এবং এলএলবি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। ১৯৩৬ সালে তাঁর রম্যরচনা ‘হাওয়াই কিলা’ তৎকালীন প্রগতিশীল পত্রিকা ‘হুমায়ূঁ’-তে প্রকাশিত হলে রচনাটি সম্পাদক কর্তৃক প্রশংসিত হয়। কিছুদিন পর ওই পত্রিকাতেই তাঁর গল্প ‘ঝিলম মে নাও পর’ প্রকাশিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তিনি লেখক হিসেবে পরিচিতি পেয়ে যান।

১৯৩৬ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় ‘প্রগতি লেখক সংঘ’। এ বছরই লেখক হিসেবে কৃষণ চন্দরের আবির্ভাব। লখনৌয়ে অনুষ্ঠিত প্রগতি লেখক সংঘের প্রথম সম্মেলনে সভাপতিত্ব করেন মুন্সী প্রেমচন্দ, সাজ্জাদ জহির ছিলেন সাধারণ সম্পাদক। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, আল্লামা ইকবাল ও কাজী নজরুলের আশীর্বাদে ধন্য হয়েছিল এ সম্মেলন। এ সংঘের পতাকাতলে উর্দু ও হিন্দি যে সাহিত্যিকরা সমবেত হয়েছিলেন তাঁদের মধ্যে কৃষণ চন্দর, রাজেন্দ্র সিং বেদী, ইসমত চুঘতাই, আহম্মদ আলী, আলী আব্বাস হুসায়নী, মুলুকরাজ আনন্দ, সাদাত হোসেন মান্টো, খাজা আহমদ আব্বাস, শওকত সিদ্দিকী, গোলাম আব্বাস, আহমদ নদিম কাসমী প্রমুখের নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

কৃষণ চন্দরের প্রথম প্রকাশিত গল্প-সংকলন ‘তিলিসম্-এ-খেয়াল’। প্রথম উপন্যাস ‘শিকস্ত’, এটি রচনা শুরু হয় ১৯৪০ সালে। বস্তুত, প্রথম গল্প থেকেই কৃষণ চন্দরের মানবতাবাদী সেক্যুলার দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশিত হয়েছে। এরপর তিনি একে একে অজস্র গল্প ও উপন্যাস লিখে উর্দু এবং হিন্দি সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করে তোলেন। সারা ভারতেই তাঁর খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে। বাংলা ও ভারতীয় বিভিন্ন ভাষা ছাড়াও রুশ, জার্মান, ইংরেজি, চেক, হাঙ্গেরি, পোলিশ, চীন ও জাপানি ভাষায় তাঁর সাহিত্য অনূদিত হয়েছে। উর্দু ও হিন্দি ভাষায় তাঁর ৩০টি ছোটগল্প সংকলন এবং ২০টি উপন্যাস প্রকাশিত হয়েছে।

কৃষণ চন্দরের গল্পগ্রন্থগুলির মধ্যে ‘তিলিসম্-এ-খেয়াল’, ‘টুটে তারে’, ‘পুরানে খুদা’, ‘অন্নদাতা’, ‘তিন গুন্ডে’, ‘অজন্তা সে আগে’, ‘নয়ে আফসানে’, ‘মজাহিয়া আফসানে’, ‘মিস নৈনিতাল’, ‘কাশ্মীর কি কহানী’, ‘নয়ে গুলাম’, ‘কিতাব কা কফন’, ‘কালা সুরাজ’, ‘হম্ বহশী হ্যাঁয়’ ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। তাঁর উপন্যাসগুলোর মধ্যে ‘শিকাস্ত’, ‘যব খেত জাগে’, ‘গদ্দার’, ‘কাগজ কি নাও’, ‘কার্নিওয়ালা’, ‘বাওন পাত্তে’, ‘আয়নে একেলে হ্যাঁয়’, ‘আধা রাস্তা’, ‘তুফান কি কালিয়াঁ’ প্রভৃতি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। শিশুদের জন্য রচিত ‘দাদর পুলকে বাচ্চে’, ‘লাল তাজ’, ‘উল্টা দরখ্ৎ’, ‘চিড়িয়া কি আলিফ লায়লা’ শিশু-সাহিত্যের সীমানা ছাড়িয়ে মহৎ সাহিত্যের মর্যাদা লাভ করেছে। এ ছাড়া রয়েছে তাঁর শৈশব স্মৃতিচারণমূলক রচনা ‘ইয়াদোঁ কি চিনার’। ‘দরওয়াজা’ তাঁর উল্লেখযোগ্য নাটিকা সংকলন। তাঁর রম্যরচনা সংকলনগুলির মধ্যে ‘দেওতা আওর কিষাণ’, ‘নজারে’, ‘এক গাদ্ধে কি সর্গুজাশ্ৎ’ বিশেষ উল্লেখের দাবি রাখে। তাঁর রম্যরচনাগুলি একাধারে হাস্য-কৌতুক ও ব্যঙ্গ-বিদ্রূপে সমুজ্জ্বল। মানবতাবাদ ও বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে তাঁর অবদানের জন্য ১৯৬৬ সালে সোভিয়েত ল্যান্ড নেহেরু কমিটি কৃষণ চন্দরকে তাদের প্রথম সাহিত্য পুরস্কারে ভূষিত করে। এরপর ১৯৬৯ সালে তিনি ভারত সরকারের ‘পদ্মভূষণ’ উপাধি লাভ করেন।

এই মহান সাহিত্যিক মৃত্যুবরণ করেন ১৯৭৭ সালের ৮ মার্চ, মুম্বাইতে নিজের ঘরের লেখার টেবিলে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে। মৃত্যুর পূর্ব মুহূর্তেও তিনি লিখছিলেন। মৃত্যুর কিছুদিন আগে প্রকাশিত হয় তাঁর শেষ উপন্যাস ‘ফুটপাত কে ফারিশতে’ (ফুটপাতের দেবদূতেরা) ‘বিসুইঁ সাদী’ পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয়। -তথ্যসূত্র : ইন্টারনেট]

পাঠকের মতামত:

SMS Alert

সাহিত্য এর সর্বশেষ খবর

সাহিত্য - এর সব খবর



রে