thereport24.com
ঢাকা, রবিবার, ১৮ নভেম্বর ২০১৮, ৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৫,  ৯ রবিউল আউয়াল ১৪৪০

পহেলা বৈশাখ

২০১৫ এপ্রিল ১৪ ১৪:২০:০৭
পহেলা বৈশাখ ॥ ইফরান আলম

আজ পহেলা বৈশাখ। বন্ধুদের সাথে রমনার বটমূলে যাবে রাফি। সবাই মিলে সারাদিন ঘুরবে। আগে থেকেই প্ল্যান করা।

সকাল সকাল উঠে পড়লো ও। বন্ধুরা একসাথে পান্তা-ইলিশ খাবে বলে সকালের নাস্তাও করেনি রাফি। তাড়াহুড়োতে মা'য়ের সাথে কথাও হয়নি। বলা হয়নি, ‘মা যাই’।

বাসা থেকে বেড়িয়ে সরাসরি চলে গেল ক্যাম্পাসে। সামিন, মাহিন, সাজিদ, সোমা, মাইশা সবাই অপেক্ষা করছিল। রাফি এলেই রমনার বটমূল।

রাফিকে বাসায় না পেয়ে কিছুটা চিন্তিত হলেন মা। যদিও তিনি রাফির প্ল্যান আগে থেকেই জানতেন। সেদিন খাবার টেবিলে মাকে জানিয়ে রেখেছে রাফি।

রমনায় পান্তা ইলিশ খাওয়ার পর বন্ধুদের সাথে নববর্ষের উৎসবে মেতে ওঠে রাফি। বেলা বাড়ার সাথে সাথে রমনায় বাড়তে থাকে মানুষের ভিড়। বেলা যত বাড়ছে বাঙ্গালী সংস্কৃতির উৎসব পরিণত হতে থাকে এক মিশ্র সাংস্কৃতিক উৎসবে।

দুপুরের খাবারের পর বৈশাখী কনসার্ট। তারপর লং ড্রাইভে যায় ওরা। যদিও ওদের কারও ড্রাইভিং লাইসেন্স নেই।

ওরা সবাই এক এক করে ড্রাইভ করছিল। প্রথমে মাহিন। তারপর সোমা। সোমার পর মাইশা এবং মাইশার পর রাফি, সামিন ও সাজিদ ।

মাইশা যখন ড্রাইভ করছিল ঠিক তখনই বেজে উঠল রাফির মোবাইল।

রাফির মা’য়ের কল। রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে রাফির মা বললেন, ‘বাবা কই তুই? বাড়ি আসবি কখন?’ রাফি শুধু বলল, ‘এইতো মা আসছি।’

ফোনটা কাটার পর কিছুটা চিন্তিত দেখাচ্ছিল ওকে। মা কি আরও কিছু বলতে চেয়েছিল। কয়েকদিন ধরে মায়ের শরীরটাও ভাল যাচ্ছে না। ডাক্তার বলেছেন তাকে একা না রাখতে। একা থাকলে তার চিন্তা বাড়ে। বি পি টা বাড়তে থাকে সমান বেগে। পরে ভাবলো অযথা চিন্তা করছে সে। বাবার আজ ছুটির দিন। বাবাতো সাথেই আছে।

বন্ধুদের আনন্দ নষ্ট হবে ভেবে তাদেরকে কিছু বুঝতে দিল না। ওরা আবার ওদের মতো মজা করতে থাকল। বাড়ি থেকে বার বার কল আসে বলে ওরা সবাই ওদের মোবাইল বন্ধ করে নিল। রাফির মোবাইলও একপ্রকার জোড় করেই বন্ধ করে দিল।

রাত বাড়ছে। গাড়ি এখন বাড়ির পথে। দিনটা বেশ ভালই কাটলো। জীবনে এমন আনন্দ যদি প্রতিদিন থাকতো। রাফি ভাবতে ভাবতে মোবাইলটা অন করলো। মায়ের খোঁজ অনেকক্ষণ নেওয়া হয়নি। মা বোধ হয় এর মধ্যে অনেকবার কল করে থাকবে। না পেয়ে না জানি প্রেসার আবার বেড়ে যায়।

মোবাইল অন হতেই ম্যাসেজ টোন। রাফির বাবা পাঠিয়েছে,‘জলদি বাড়ি আয়।’

চমকে উঠে রাফি। কোন এক ভয়ে তার মন স্যাৎ করে ওঠে। বাবা সাধারণত তাকে কল করে না। সব খবরাখবর মাকে দিয়েই নেয়ান। সাথে সাথে বাবার মোবাইলে কল করে রাফি । কিন্তু মোবাইল বন্ধ। রাফি আর কিছুই ভাবতে পারে না। স্টেয়ারিংটা তার হাতেই ছিল। সোজা ঘুরিয়ে বাড়ির পথে। গেট তালা বন্ধ।

পাশের বাড়ির শফিক আংকেল রাফিকে দেখে বললেন, ‘তোমার বাড়ির সবাই সিটি হাসপাতালে। তোমার মায়ের শরীরটা বোধ হয় একটু বেশি খারাপ।’ তারপর আরও কী যেনো বলছিলেন। রাফি কিছুই শুনতে পেলো না। সোজা গাড়ি ঘুরিয়ে হাসপাতালে। বন্ধুরা বারবার জিজ্ঞেস করছে কী হয়েছে। রাফির মুখে কোনো উত্তর নেই।

হাসপাতালে গিয়ে চাচা-চাচি, মামা-মামি ও অন্যান্য কাজিনদের দেখতে পেল। কিন্তু কাউকেই স্বাভাবিক মনে হচ্ছিল না । বাবা এক পাশে দাঁড়িয়ে কাঁদছেন।

রাফি দৌড়ে বাবার কাছে গেল। ‘ কি হয়েছে ?’ জিজ্ঞেস করতেই রাফিকে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কেঁদে ফেললেন।

বাবাকে কখনো কাঁদতে দেখেনি রাফি। সেই বাবা কাঁদছেন। হাউমাউ করে কাঁদছেন। তাহলে মা কি... ভাবতে পারে না রাফি। কোনো এক ভয়ে রাফির চোখ থেকেও ফোঁটায় ফোঁটায় জল গড়িয়ে পড়লো।

রাফির চাচা বললেন , ‘তোর মা আর নেই। তোর বাবা একটু বাইরে গিয়েছিলেন। তখনই অঘটনটা ঘটলো। সেন্সলেস আবস্থায় পড়েছিলেন। তোর বাবা সাথে সাথেই হাসপাতালে নিয়ে আসে। কিন্তু ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে।’

কথাটা শোনামাত্র হাত পা ঠাণ্ডা হয়ে গেলো রাফির। কিছুই যেনো বিশ্বাস হচ্ছে না। অন্যকোনো রথে সে যেনো ভেসে যাচ্ছে। আবছা আবছা মা যেনো বলছে- ‘বাবা রাফি, কাঁদিস না। আমি তো তোকে খুঁজতেই বেড়িয়েছিলাম। শরীরটা খুব ভারি লাগছিলো। তাই ওটা রেখে এসেছি। কাঁদিস না বাবা।’

মাথা ঘুরে মাটিতে পড়ে গেলো রাফি। কথা বলার শক্তি হারিয়ে ফেলল ও। রাফির মনে হলো পায়ের নিচ থেকে মাটি সরে যাচ্ছে । বারবার মনে হতে থাকে-

আজ যদি রাফিও অসুস্থ মায়ের পাশে থাকতো তাহলে হয়তো আজ রাতের পরিসমাপ্তি অন্যরকম হতে পারত ।

পাঠকের মতামত:

SMS Alert

সাহিত্য এর সর্বশেষ খবর

সাহিত্য - এর সব খবর