thereport24.com
ঢাকা, শুক্রবার, ২১ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ৬ আশ্বিন ১৪২৫,  ১০ মহররম ১৪৪০

নীল পাঞ্জাবি

২০১৫ এপ্রিল ১৪ ১৪:৩৯:৩৮
নীল পাঞ্জাবি ॥ হাবীবাহ্ নাসরীন

ছেলেটি রান্নাঘরের খুঁটি ধরে দাঁড়িয়ে আছে। রান্নায় ব্যস্ত মায়ের নিখুঁত হাতে সম্পন্ন করা কাজগুলোকে নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা ছাড়া এই মুহূর্তে তার আর কোনো কাজ নেই। স্কুল ছুটি হয়ে গেছে সেই দুপুর বারোটায়। ছুটির পরে তিন কিলোমিটার পথ হেঁটে আসতে আসতে পেটের ক্ষুধা একেবারে মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। আজ তাই ফিরে এসেই একপেট গুড়মুড়ি খেয়ে নিয়েছে। ক্ষুধা আপাতত নেই।

রান্নাঘরের খুঁটি ধরে দাঁড়িয়ে থাকার একটা কারণ অবশ্য আছে। ছেলেটির ছোট্ট হৃদয়ে একটা ভালোলাগার জিনিস জায়গা দখল করে নিয়েছে। জিনিসটা তার চাই। এই বয়সী শিশুরা সাধারণত যেকোনো জিনিস পাওয়ার জন্য বাবার কাছে বায়না ধরে। ছেলেটির তো বাবা নেই, তাই মায়ের কাছেই বলতে আসা।

যে কথাটা বলার জন্য এতক্ষণ ধরে দাঁড়িয়ে আছে, তা মাকে বলতে পারছে না। পেটের ক্ষুধাটা থাকলেও নাহয় একটা কথা ছিলো। ক্ষুধার ছুঁতোয় মাকে সেই কথাটাও জানিয়ে দেয়া যেতো। মা যেন আজ আগে থেকেই টের পেয়ে গিয়েছিলেন! তা না হলে আসার সাথে সাথেই ক্ষুধা নিবারণের বন্দোবস্ত কীভাবে করলেন? থালাভর্তি গুড়-মুড়ি!

বাবা নেই, তাই মায়ের সঙ্গে আশ্রয় হয়েছে নানাবাড়িতে। নানীও বেঁচে নেই। বৃদ্ধ নানা শেষ বয়সে এসে নির্ভরশীল হয়ে পড়েছেন তার এই অকালবিধবা মেয়েটির ওপর। রান্না থেকে শুরু করে সংসারের সব কাজ মাকে একাই করতে হয়। তার ওপর আবার অভাবের সংসার। উপার্জনক্ষম কোনো লোক নেই। নুন না আনতেই পান্তা ফুরিয়ে যায়, এমন অবস্থা।

ছেলেটি আরো কিছুণ উশখুশ করে কথাটা মাকে বলতে যাবে এমন সময় পাশের বাড়ি থেকে এক মহিলা এলেন। তিনি এসে মাকে পাওনা টাকা ফেরত দেয়ার জন্য তাগাদা দিলেন। সময়মতো টাকা ফেরত দিতে না পারার কারণে একটু যেন গালমন্দও করলেন! দু-এক দিনের মধ্যে সব টাকা ফেরত দিতে হবে।

মা রান্নার হাঁড়ি চুলায় চাপিয়ে পাথর হয়ে বসে থাকেন। তার চোখের লবণাক্ত পানি তরকারির উষ্ণ ঝোলের সঙ্গে মিশে একাকার হয়ে যায়। ছেলেটি তখনও দাঁড়িয়েছিলো। এবার খুঁটি ছেড়ে দিয়ে উঠোনে চলে আসে। কিছু করতে না পেরে শুধু শুধু কাছ থেকে দাঁড়িয়ে মায়ের কান্না দেখার মতো এমন অসহায়ত্ব আর কীসে আছে! মায়ের এমন কষ্ট, এর ভেতরে নীল পাঞ্জাবির কথা সে কেমন করে বলবে! আজ স্কুলে গিয়ে সেলিমের পরনে যেটা দেখে এসেছে। ওহ কী গাঢ় রং! কী চোখ ধাঁধানো বোতামগুলো!

এই হয়েছে আরেক সমস্যা। সেলিম ধনী পরিবারের ছেলে। সে যা খুশি তা-ই কিনতে পারে, পরতে পারে। আর পিতৃহীন দরিদ্র পরিবারের ছেলে সে, সেলিমের সমকক্ষ হয় কী করে! ছেলেটি তবু বোঝে না। তার অপরিণত বয়সের কচি হৃদয়টা বারবার বিদ্রোহী হয়ে উঠতে চায়। মায়ের দুঃখ বোঝে না এমন নয়। তবু অনেক আশা নিয়ে মায়ের পেছনে গিয়ে দাঁড়িয়েছিলো। যেমন করেই হোক, মা নিশ্চয়ই কিনে দেবে। একটা তো শুধু নীল পাঞ্জাবি!

শেষমেশ হতাশ হয়েই ফিরে আসতে হলো। মায়ের চোখে পানি দেখলে তার আর কিছুই ভালো লাগে না। ভাবে, বড় হয়ে মায়ের সব দুঃখ আমি দূর করে দেবো, নিশ্চয়ই দূর করে দেবো! মায়ের চোখের পানিতে নিজের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র চাওয়া পাওয়া সব বিসর্জন দিয়ে দেয়। ছেলেটি ছোট হলেও বুদ্ধিমান, বিচক্ষণ আর দারুণ মেধাবী। দারিদ্র্য তাকে এই বয়সেই কঠোর বাস্তববাদী করে তুলেছে।

সেই রাতেই ঘুমের ঘোরে ছেলেটি স্বপ্ন দেখে। ঝলমলে বোতাম লাগানো নীল রঙের পাঞ্জাবি পরা ছেলেটাই তো সে! আর যার হাত ধরে ঘুরে বেড়াচ্ছে, সেই লোকটি কে? লম্বা, ফর্সা, মুখে কালোদাড়ি মতো লোকটা বাবা নয়তো! বাবা কি তবে ফিরে এসেছে! বাবা! বা-বা!! বা-আ-বা!!! ঘুম ভেঙ্গে যায়। ঘরভর্তি অন্ধকারে শুয়ে থেকে বুকের কোথায় যেন গভীর শূন্যতা অনুভব করে ছেলেটি। ঘরের পাশে আমগাছটার মগডালে বসে উহু উহু করে কেঁদে ওঠে একটি রাত্রিজাগা পাখি। সেই সকরুণ সুরে মধ্যরাতের নিস্তব্ধতা ভেঙ্গে খান খান হয়ে যায়।

অনেক বছর পরের কথা। ছেলেটি এখন অনেক বড়। সমাজের মান্যগণ্য ব্যক্তিদের একজন। আজ তার বড় ছেলে মুহিনের এসএসসি পরীক্ষার ফল প্রকাশ হয়েছে। বাবার মতোই মেধাবী হয়েছে মুহিন। শিক্ষাবোর্ডের মেধা তালিকায় স্থান করে নিয়েছে। সুসজ্জিত ড্রয়িং রুমে বন্ধুবান্ধব, আত্মীয়স্বজন সবার সাথে হাসিমুখে কথা বলছে। ঝলমলে সোনালি রঙের বোতাম দেয়া নীল পাঞ্জাবিতে দারুণ মানিয়েছে তাকে। মুহিনের বাবা নিজের ছেলেবেলার অপূর্ণ শখ ছেলেকে দিয়ে পূর্ণ করিয়ে নিয়েছেন। ভালোলাগা, ভালোবাসা কি তবে এভাবেই স্থানান্তারিত হয়ে এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে জায়গা দখল করে নেয়! এখন তিনি ছেলেকে যখন তখন নীল পাঞ্জাবি কিনে এনে দেন। গাঢ় নীল রঙের মাঝে সোনার জলে ধোয়া বোতামগুলো জ্বলজ্বল করে জ্বলতে থাকে...।

পাঠকের মতামত:

SMS Alert

সাহিত্য এর সর্বশেষ খবর

সাহিত্য - এর সব খবর



রে