thereport24.com
ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১৫ নভেম্বর ২০১৮, ৩০ কার্তিক ১৪২৫,  ৬ রবিউল আউয়াল ১৪৪০

অপবাদ

২০১৫ এপ্রিল ১৪ ১৪:৪৩:০১
অপবাদ ॥ সুমন সিফাত


কিছুদিন বাদেই স্কুলের বার্ষিক পরীক্ষা সুজনের। ভাল ছাত্রের সুনাম অক্ষুণ্ন রাখতে এবং ক্রমিক নম্বরের শীর্ষস্থানটি দখল করতে দিনে-রাতে সে আদাজল খেয়ে লেগেছে। তাইতো,আদাজলের ধমকে এই গভীর রাতেও সুজন ঘুমকে ভ্যাংচি কেটে পড়াশোনায় মন দিতে চাইছে। কিন্তু ঘুমের কি অপমান বোধ নেয়! কতটা পথ পাড়ি দিয়ে সকাল-দুপুর-সন্ধ্যা পেরিয়ে এ তল্লাটের সবার শরীর যখন বিছানায় চিৎপাৎ করতে সক্ষম হয়েছে, তখন এতটুকুন পুঁচকের কাছে হার মানা তার বেইজ্জতি বরাবর। বেইজ্জতি ঠেকাতে ঘুম খুব চেষ্টায় মাঝে মাঝে সুজনকে ঝিমুনি ধরিয়ে বার কয়েক ঝাঁকুনি দিতে পারলেও কোনভাবে তাকে পুরোপুরি ধরাশায়ী করতে পারছে না। মাথা সামনের দিকে খানিকটা ঝুঁকে একটা ঝাঁকুনি খেয়ে সুজন ফের চোখ টান টান করে দেহ কাট্ কাট্ করে মনকে শাসন করছে, পড়ায় মনোযোগী হচ্ছে। ইতোমধ্যে সে ঘুমের চোখে আচ্ছা করে বার কয়েক পানিও ছিটিয়েছে।
দেহ ও মনের বিপরীত ধর্মে যখন ঝিমুনি ও পড়ার ক্রিয়াকর্মে সুজন ব্যস্ত তখন ঘড়ির কাঁটা রাত একটা ছুঁই ছুঁই। আচমকা প্রচণ্ড শব্দে সুজনের শরীর-মন পড়া ও ঝিমুনি ছেড়ে মুহূর্তের জন্য চমকে স্থির ও সজাগ হয়। ঝিমুনির দায়ে সুজনের পড়াশোনার পড়া বাধা পেলেও শোনাটা তার ঠিকই হয়। তবে ঘুমের চক্রান্তে ঝিমুনির ঘোরে সৃষ্টি হওয়া প্রচণ্ড আওয়াজে সুজনের মনে হলো বাড়ির ছাদে বুঝি বোমা ফেটেছে। মুহূর্তে আতঙ্কিত চিন্তারা কোত্থেকে এসে ভন্ ভন্ করে ঘুরতে থাকে তার মাথাজুড়ে। সেই তালে তালে হৃৎপিণ্ড ব্যাচারীও দ্রুত তালে ধুঁকপুঁক করতে থাকে। আওয়াজের উৎপত্তি সম্পর্কে নিশ্চিত কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছতে পারে না সুজন। সেই সিদ্ধান্তহীনতার মাঝেও ভয়ে ভয়ে সে দ্রুত আরেকটি সিদ্ধান্ত নিতে পারলো, বই পড়া ছেড়ে ঘুমিয়ে পড়ার। দ্রুতগতিতে সে বইপত্র গুছিয়ে নানার কোল ঘেঁষে গুটিশুটি হয়ে শুয়ে পড়লো। ঘুম কষে এবার অপমানিত হলো তার স্নায়ুর কাছে। ঘুম স্নায়ুর উত্তেজিত এলোমেলো চিন্তা পথ অতিক্রম করে শত চেষ্টাতেও সুজনের চোখে পৌঁছতে পারলো না। এবার ঘুম সুজনকে সামান্য সহজ ঝিমুনিটুকুও ধরাতে ব্যর্থ হলো। কর্তা যখন নিজেই চাইছে ঘুম তাকে অধিকার করে এ আতঙ্কিত অবস্থা থেকে মুক্তি দিক, তখনও ঘুম অসহায় রয়ে গেল আগের মতোই। সময় যখন বেরসিক তখন উঁচুমানের রসিকাও রসিকতা ছেড়ে মৌন থাকতে বাধ্য হয়। অবশ্য এভাবে নির্ঘুমে আতঙ্কে নানার কোল ঘেঁষে সুজনের বেশিক্ষণ শুয়ে থাকতে হলো না। কিছুক্ষণ বাদে বাইরে থেকে পরিচিত কিছু কন্ঠস্বর উচ্চস্বরে যেন বোমা ফাটাল-
‘ও সেজচা! সেজচা! শিগগির ওঠো। মহিমদের বাড়ি ডাকাত পড়েছে। ডাকাতরা বোমা মেরেছে। মহিমের অবস্থা খুব খারাপ। ’
কয়েক ডাকে বাড়ির ছেলে, বুড়ো, মেয়ে-বৌ, নাবালক ধড়মড়িয়ে ঘুম থেকে জাগলো। হঠাৎ ঘুম থেকে জেগে মুহূর্তে কেউ ঘটনার গভীরে পৌঁছতে পারলো না। আহ্বানকারীদের কাছে নানা রকম প্রশ্নে ঘটনা বুঝতে সুজনের নানা-মামাদের কিছুটা সময় লেগে গেল। একমাত্র নির্ঘুম সুজন মুহূর্তে বিষয়টি বুঝে আতঙ্কে আরও চুপসে গেল। তাহলে ওই শব্দটা ডাকাতদের ফাটানো বোমার আওয়াজ ছিল! তার বুকের মধ্যে হাতুড়িপেটা শুরু হলো আরও দ্রুততালে। পাছে কেউ শব্দ শোনা সত্ত্বেও না ডেকে দেয়ার জন্য তাকে ভর্ৎসনা করে, ভীতু উপাধি দেয়, ভবিষ্যতে এ প্রসঙ্গ নিয়ে হাসি-তামাশা করে, সেই আশঙ্কায় সে আদ্যোপান্ত চেপে গেল। কিন্তু কিছু না বললেও আতঙ্কিত সুজন অন্য এক রোমাঞ্চে বড়দের পিছে পিছে ঠিকই এগিয়ে চললো ঘটনার কেন্দ্রাভিমুখে। ততক্ষণে ডাকাতরা মহিমদের বাড়ি ছেড়ে ঠিক কোন দিকে কতটি পগারপার হয়েছে কেও জানে না। সবাই মহিমদের বাড়ির দিকে অগ্রসর হচ্ছে, পালিয়ে যাওয়া ডাকাতদের পিছে নয়। মহিম সুজনের খালাত ভাই। তার মেজ খালার বড় ছেলে। তাদের বাড়ি পাড়া থেকে বেশ খানিকটা বিচ্ছিন্ন হয়ে নির্জনে পড়েছে, পূর্বপ্রান্তের একেবারে শেষ বাড়িটি তাদের। সেদিকে যেতে যেতে সুজন দেখলো পুরো পাড়ার মানুষ জেগে ওঠেছে। কিছুদূর যেতে না যেতেই আরও দেখলো একটি ভ্যানের উপর মহিম শুয়ে তারস্বরে উহ! আহ! করছে আর ভ্যানচালক ছদর তার চেয়েও উচ্চস্বরে লোককে হটিয়ে ভিড় ঠেলে দ্রুতগতিতে হাসপাতালে ছুটছে।


খালা বাড়ি পৌঁছে সুজন মানুষের সম্মিলিত কথা চালাচালিতে নিজের কানকে ধারকরূপে পেতে যে কথাগুলো সংগ্রহ করতে পারলো তা জোড়া দিলে এমন হয়- কিছুক্ষণ আগে বিশ-পঁচিশজন ডাকাত মহিমদের বাড়ি ঘেরাও করে। ডাকাতদের কয়েকজন প্রাচীর টপকে গেটের তালা ভেঙে শুরুতেই বেরোনোর পথ প্রশস্ত করে রাখে। তারপর ভেতরে ঢুকে তারা পূর্ব কোণার ঘরের দরজা ভাঙার চেষ্টা করলে সে শব্দে ভেতরে ঘুম ভাঙা মহিম আচমকা হুড়কো হাতে দরজা খুলে অন্ধকারে ডাকাতদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে, এলোপাতাড়ি উত্তম-মাধ্যম শুরু করে। ভীষণ অন্ধকারে মুহুর্মুহু বেতাল প্রহারের তালে টাল সামলাতে না পেরে ডাকাতরা খোলা গেট দিয়ে বাইরে বের হতে বাধ্য হয়। ততক্ষণে প্রচণ্ড হুলুস্থুলে বাড়ির সবাই জেগে ওঠে। যার যার স্বরে উচ্চমার্গের শব্দে চারদিক সরব করে তোলে-ডাকাত! ডাকাত! ডাকাতরা বিপদের পূর্বাভাসে দিশেহারা হয়ে পরিশ্রমের সম্মানী না পেয়েই, উপরন্তু বেধড়ক মার খেয়ে ব্যর্থতার গ্লানি ঢাকতে প্রস্থানের পূর্বে প্রচণ্ড আওয়াজে একটি বোমা ফাটায়। সে বিস্ফোরণে রহিমের পা মারাত্মকভাবে ঝলসে যায়, কাছে-দূরের অনেকে ঘুম থেকে জেগে শব্দের উৎস সম্পর্কে নিশ্চিত হতে চায়, সুজন ঝিমুনির মাঝে প্রচণ্ড সেই শব্দের আওয়াজে আতঙ্কে মনে-প্রাণে ঘুমাতে যায়।
এই এতটুকু সময়ের মধ্যে এতকিছু ঘটে গেছে শুনে সুজন ভীষণ অবাক হলো। একটি পড়া বাক্যের সাথে নিজের একটি বাক্য মিলিয়ে নিতে চেষ্টা করলো-রোম যখন পুড়ছিল, নিরো তখন বাঁশি বাজাচ্ছিল। কিন্তু ডাকাতরা যখন এ বাড়িতে হানা দিচ্ছিল তখন সে কী করছিল? ভাবতে গিয়ে ভয়ে তার গায়ে কাটা দিলো। সেই সাথে ভেবে অবাক হলো মহিম ডাকাতদের বেধড়ক পিটিয়েছে শুনে। মহিম খুব রাগী মানুষ সে জানে। পারতপক্ষে যখন সে ঘুমায় বাড়ির আশপাশে ছোট কেউ ঘেঁষে না। ঘুমের সময় সামান্য আওয়াজে ঘুম ভেঙে মহিম মারমুখো হয়ে খেঁকিয়ে ওঠে। তবে সে যে ঘুমের ব্যাঘাতে ডাকাতদেরকেও তাড়িয়ে মারার সাহস রাখে-এ সুজনের চিন্তার অতীত। রাতারাতি মহিম চরিত্রটা তার কাছে পূর্বের চেয়ে আরও ভয়ঙ্করী রূপ পেল।
সুজন অনেকক্ষণ ধরে বিভিন্নজনের মুখে ঘটে যাওয়া ঘটনার বর্ণনা একেক রঙে ভিন্ন ঢঙে বৈচিত্র্যপূর্ণ সুর ও স্বরে অনেকবার হাঁ করে শুনলো। এ যেন রূপকথার গল্প! সৌভাগ্যক্রমে এ গল্পের কোনো প্রধান চরিত্রে নিয়তি তাকে নিয়োজিত রাখেনি বলে বার বার সৃষ্টিকর্তাকে ধন্যবাদ দিতে ভুললো না। ভাগ্যিস! অনেক দিনের মতো আজ রাতে সে খালাত ভাই ফাহিমের সাথে এই ভূতুড়ে বাড়িতে দুর্ভাগ্যক্রমে অবস্থান নেয়নি। তাহলে কি না হতে পারতো! ঢুকেই হাতের কাছে তাকে পেয়ে ডাকাত হয়তো গলাটিপে ধরতো। আর মরে গেলেও সে মহিমের মতো ডাকাতের ওপর মারমুখী হতে পারতো না। নিকট ভবিষ্যতে কোনো দিন সে রাত্রি যাপনে এ বাড়ি নির্বাচনে সামান্য ভুল করবে না। ভুল যে করবে না তার প্রমাণস্বরূপ বাড়িতে লোক কমে যাওয়ার আগেই মামাদের সাথে সে বাড়ি ফিরে গেল। আগামীকাল সকালে আসবে ঠিক করলো।

শুয়ে শুয়ে ঘটনার পূর্বাপর বহুবার ভাবনায় জাবর কাটতে কাটতে এক সময় সুজন ঘুমিয়ে পড়লো। কিন্তু খুব সকালে ঘটনার কেন্দ্র প্রদক্ষিণের তীব্র ইচ্ছেতে ঘুম পরাজিত হয়ে পালিয়ে তাকে জাগিয়ে গেল। ঘুম-জাগা সুজন প্রাতঃকালীন পরিচ্ছন্নতাকে দায়সারাভাবে সেরে পড়ার নিয়মিত রুটিন ভেঙে ঘটনার কেন্দ্র প্রদক্ষিণে ছুট লাগালো।
বাড়িতে পৌঁছে সে অবাক না হয়ে পারলো না বহু লোকের ভিড় দেখে, মহিমের বোন আমেনা শ্বশুরবাড়ি থেকে ছেলেপুলেসহ ইতোমধ্যে এসে পৌঁছেছে, মহিমকে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জখম মারাত্মক না হওয়াতে প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে গভীর রাতেই ছদরের ভ্যানে ফেরত পাঠিয়েছে। বিস্ফোরণে ঝলসে যাওয়া মলম লাগানো নগ্ন হাঁটু নিয়ে বারান্দার একপাশে মহিম চুপচাপ শুয়ে আছে। মানুষের চিল্লাপাল্লায় বিরক্ত হচ্ছে কিনা বোঝা যাচ্ছে না, তবে এ মুহূর্তে সে নীরবতার ব্যাঘাতে কাউকে আঘাত করতে উদ্ধত হচ্ছে না।
এ মুহূর্তে বাড়িতে মহিলাদের ভিড় চোখে পড়ার মতো, উপস্থিত সংখ্যার বেশিরভাগই মহিলা। ডাকাতের ভয় তাদের আগ্রহকে কাবু না করলেও গত রাতে পুরুষকর্তাদের নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে হয়তো ঘটনাস্থলে আসতে তারা সাহস পায়নি। এখন দিনের আলোয় সে ঘাটতি পুষিয়ে নিচ্ছে। প্রতিদিনের সাধারণ অনুশাসনের বাধ্যতা ভেঙে একদিনের অসাধারণ পরমাণু পরিমাণ অবাধ্যতা দেখানো সামান্য সাংসারিক মানুষের জন্য বরাবরণ অসামান্য। সুজন তাদের সাথে সাথে বাড়িটিতে পাক খেয়ে পরিচিত স্থানে ডাকাতদের রেখে যাওয়া অপরিচিত কোন নিদর্শন পড়ে আছে কি না গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করতে লাগলো। জেনে নিলো ডাকাতরা কোন পথে প্রাচীরের মধ্যে ঢুকেছিল, ডাকাতির আগে কে কোথায় শুয়েছিল, মহিম কোন ঘরে ছিল, সে কি দিয়ে ডাকাতদের বেধড়ক পিটিয়েছে। পালিয়ে যাওয়া ডাকাতদের ফেলে যাওয়া ভারি শাবলটাও অনেক্ষণ ধরে দেখলো। রহস্য ও রোমাঞ্চে কিশোর বয়সীদের টান সবচেয়ে বেশি থাকে বোধহয়। সেই টানেই এ বয়সী সবার কম-বেশি রহস্যভেদী হতে চাই। গল্পের বই পড়া সুজন সে গোত্রের একজন, যে ধর্মে এখন সে গভীর অনুসন্ধানী হয়ে উঠেছে।
অনেক তথ্য লোকমুখে শুনে, দীর্ঘ অনুসন্ধানে নিজের মনের কাছে কিছু তথ্য মেনে, কতক অজানা রেখে কৌতূহলে শান দিতে দিতে সে ফিরে এলো তার পড়ার ঘরে। বই নিয়ে বসেও সে ব্যর্থ হলো গত রাতের মতো পড়ার প্রতি একনিষ্ঠ হতে। কেবলই কৌতূহল তাকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে রোমাঞ্চকর ভাবনার কাল্পনিক পথে।

এর মধ্যে অভিনব ডাকাত-গৃহস্থ সংঘর্ষের পরে ব্যর্থ ডাকাতির পরবর্তীতে একটি সফল চুরি সংঘটিত হয়ে গেল। চুরির ভেন্যু যথারীতি ব্যর্থ ডাকাতদের গৃহস্থ বাড়ি। ডাকাত ফিরে যাওয়ার পরবর্তী সকালে মাঝের ঘরের টেবিলের ড্রয়ারে মহিমের মেজ ভাই শামীম দু’হাজার টাকা রেখেছিল। টেবিল-ড্রয়ার সব যথাস্থানে সহি-সালামতে ঠিকঠাক থাকলেও টাকাগুলো চোরের কেরামতিতে গায়েব হয়েছে। পলাতক ডাকাতদের পরিকল্পনা ও পরিচয় উদ্ধারে বাড়ির আতঙ্কিত সদস্যরা তেমন আগ্রহ না দেখালেও চুরি ধরা পড়ার পর থেকে গা ঢাকা দেয়া চোরকে ধরা ও চুরির অর্থ ফেরত পাবার আশা ও উৎসাহ তাদের পুরোপুরি আছে। কারণ, তাদের অনুসন্ধিৎসু দৃষ্টিতে সন্দেহভাজন চোরের লিস্টে একটিমাত্র চরিত্র অনেক ভিড়েও ঘুরে-ফিরে বারে বারে আসছে। রেখে যাওয়া বিগত ত্রুটিপূর্ণ গতিবিধির সূত্রে যাকে চোর হিসেবে সাব্যস্ত করা গেছে। এখন তাকে হাতেনাতে পাকড়াও করার পালা।

চোরকে ধরতে ও চুরির মাল ফেরত পেতে শামীম রওনা হয়ে গেল। সন্দেহভাজন কিশোর চোর তখন পড়ার পাট সামনে রেখে ডাকাতির রহস্য উদ্ধারের পাটে ভীষণ মনোযোগী। শামীম সন্দেহের অনুসন্ধান ধাপে কিশোরের মনোযোগ ভেঙে সাঙ্কেতিক কিছু প্রশ্নের উত্তরে ত্রুটি মেপে, চোখ-মুখ নিরীক্ষণ করে খুঁজতে লাগলো চুরির শক্ত কোনো আলামত। কিশোরের চোখে-মুখে চৌর্যবৃত্তির কোন ছাপ না পেয়ে শামীম ধৈর্যহারা হয়ে সরাসরি অর্থ উদ্ধারে মন দিলো। কিশোরের লুকানো সম্পদ দেখতে চাইলো। প্রথমটায় অনুসন্ধানী শামীমের মনের অভিসন্ধি, চোখের তীক্ষ্ণ কৌতূহলী দৃষ্টি কিশোরটি পড়তে ব্যর্থ হলো, কিছু বাদে শামীম যখন তার অতি মূল্যবান একমাত্র গোপন ভাণ্ডার তালাবন্দী টিনের বাক্সটি দেখতে চাইলো তখন তার কৌতূহলী মনে জোর খটকা লাগলো। অন্য কেউ হলে অভিপ্রায় প্রায় পুরোটা না জেনে অতি সহজে তালা খুলতো না। ক্ষতির কোনো কারণ নেই এই বিশ্বাসে অসমবয়সী বন্ধুর মতো এ খালাত ভাইটির অনুরোধে সহজেই তালা খুলে গেল। বেরিয়ে পড়লো কিশোরের আশৈশব-কৈশোরের অতিযত্নে সংগৃহীত সম্পদগুলো। বড় ভাইয়ের দেয়া একটি মাউথ-অর্গান, গুচ্ছছুরির মতো দেখতে রং-বেরংয়ের একটি ইয়ো ইয়ো খেলনা, বিভিন্ন খেলোয়াড়ের কিছু ভিউকার্ড, চাচা চৌধুরীর তিনটি কমিক বই, ভিন্ন ভিন্ন দেশের কিছু মুদ্রা, বহু বছর আগে বাবার দেয়া এখনো অক্ষত একটি সুগন্ধি সাবান, ছোট ছোট কিছু আলপিন, আমের খোসা ছেলার একটি চাকু। এছাড়া অবশ্য আরেকটি মূল্যবান সম্পদ আছে বাক্সটিতে-একটি সেভিং বক্স। শামীম সেটা খুলে দেখলো-তার আসল কার্যকরী যন্ত্রাংশের অস্তিত্ব ফাঁকা করে ভেতরে কিছু নতুন টাকার কড়কড়ে নোট রাখা। এক, দুই, পাঁচ, দশ টাকার কয়েকটি নোট মিলিয়ে মোট পঞ্চাশ টাকা। হায়! হায়! তাহলে দু’হাজার টাকা গেল কোথায়? তন্ন তন্ন করে খুঁজেও যখন বাক্সে টাকার হদিস মিললো না তখন শামীম হতাশ হয়ে সুজনকে জিজ্ঞাসা না করে পারলো না- ‘মনা টাকাগুলো কোথায় রেখেছিস? দিয়ে দে, তোর মিষ্টি খাতি আমি কিছু টাকা দিবানি।’
শামীম নিজের অনিশ্চিত সন্দেহের দ্বিধা ঝেড়ে অর্থ আবিষ্কারের নিশ্চিত উপায় হিসেবে সুজনের দিকে কপোট বাক্যবাণ ছুড়লো-
‘অনেকে তোকে টাকা চুরি করতে দেখেছে।’
সুজন তাতে বিদ্ধ হওয়ার বদলে ভীষণ হকচকিয়ে গেল। শামীমের কথার পূর্ণ মানে খুঁজতে লাগলো। শামীমদের চুরি যাওয়া অর্থের চোর তাকে ভাবা হচ্ছে- এই অর্থ বুঝে সে আকাশ থেকে পড়লো। পতনের প্রচণ্ডতায় মুহূর্তে লজ্জা-অপমানে তার ফর্সা মুখটিতে রক্ত জমে উঠলো, বুকের মধ্যে প্রচণ্ড বেগে হাতুড়ি পেটা শুরু হলো। লজ্জিত সজল নেত্রে সে শামীমের চোখে চোখ না রাখতে পেরে মুখ দিয়ে মাত্র চারটি শব্দ বের করলো- ‘আমি টাকা চুরি করিনি।’
শামীম তার কথা বিশ্বাস করলো কিনা ভেবে ভেতরে ভেতরে তার অপমানিত মনটা আরও ভড়কে গেল। জিজ্ঞাসা করতে চাইলো-তাকে কে কে চুরি করতে দেখেছে? কিন্তু আত্মসম্মানের বৃহৎ জগতে তখন আবেগদের হুলুস্থুল তোলপাড়। তাবৎ বিশ্বের লজ্জা-ভয়-আশঙ্কা তার ওপর ভর করে অন্তরকে উদ্বিগ্ন করে মুহূর্তে যেন তাকে নির্বাক করে দিলো। সে চোর! টাকা চুরি করেছে! এ কিভাবে সম্ভব? কেও যে তাকে চোর ভাবতে পারে এমন তার কোনোদিনও মনে হয়নি। মনে মনে সবসময় সে ভাবে সবাই তাকে অন্য নজরে দেখে। তার নজিরও তো সে অহরহ পায়-মেজ খালাও তো প্রায় অন্যকে বলে-সুজনের মতো ছেলে হয় না, কোনো খাদ্যে ওর লোভ দেখি না, কখনো চেয়ে খায় না। টাকা পয়সাও চায় না, চুরি তো দূরে থাক।
সে কথায় উপস্থিত থাকা বেশির ভাগের দিকে সে কৌতূহলী দৃষ্টিতে আড়চোখে চেয়ে দেখেছে-কারও সম্মতি ছাড়া অসম্মতি দেখেনি। নিজের সে সুনাম সর্বজনবিদিত হিসেবে সে জানে, শোনে, মানে। ভেতরে ভেতরে তার গর্বের নাকটি সব-সময় সে কারণে উঁচু থাকে। বানিয়ে গল্প বলার অভ্যাস থাকলেও গল্পপড়া, বাকপটু গল্পবাজ সুজন কখনও সখনও দুটো একটা মিথ্যে বলে কিন্তু ভাল ছেলের মাপকাঠিতে নিজেকে অন্যের চেয়ে সবসময় সে অনেক উপরে দেখে। সেই পাহাড় পরিমাণ আত্মসম্মানে আঘাত তাকে দিশেহারা করে তুললো। তার মনের কাল্পনিক আকাশে ভেসে উঠলো প্রিয় মানুষের উজ্জ্বল মুখ ছাপিয়ে তাদের সন্দেহের বাঁকা দৃষ্টি। তার মরে যেতে ইচ্ছে করলো এই ভেবে— যদি অবান্তি আপুরা শোনে, বেড়াতে আসা পাশের ঘরে বসা তাকে অত্যাধিক স্নেহ করা ছোট মামার শ্যালিকা নাসরিন খালা নিশ্চয়ই এতক্ষণে কথাগুলো শুনেছে, বড় ভাইয়া তো শুনবেই আজ হোক কাল হোক, সে একসাথে অনেকগুলো টাকা চুরি করেছে। সে কল্পনায় ঘুরে-ফিরে আজন্ম গড়ে তোলা সকল সুনামের বদলে চুরির দায়ে বদনামে চতুর্দিকে প্রিয়-অপ্রিয় পরিচিতর দৃষ্টিতে সন্দেহের কটাক্ষ দেখতে পেল। তাদের মুখ থেকে নিঃসৃত গায়েবি শব্দ তার কানে বাজতে লাগলো-তুই চোর! হ্যাঁ, তুই-ই চুরি করেছিস!

সুজনকে সহজ পথে চুরি স্বীকার না করাতে পেরে, উপরন্তু কোনো ধরনের আলামত উদ্ধারে অকৃতকার্য হয়ে বাড়ি ফিরে গেল শামীম। যাবার সময় সুজনের মেজ ভাই শাফিনকে ডেকে বলে গেল সুজনকে নিয়ে কিছুক্ষণ পরে যেন তাদের বাড়ি যায়। সে চালপড়া আনতে যাচ্ছে। চালপড়া পদ্ধতিকে চোর ধরার আতঙ্কিত ভয়ঙ্কর উপায় হিসেবে সুজন জানে। যদিও সুজন কোনোদিন কারও চালপড়া খাওয়া দেখেনি, শুনেছে চালপড়া খাওয়ার সাথে সাথে চোরের মুখ দিয়ে গল গল করে রক্ত পড়ে। তার ভীষণ ভয় করতে লাগলো যদি কোনভাবে তার মুখ দিয়ে রক্ত পড়ে তাহলে সে তো চোর বনে যাবে। অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে নিজের মৃত্যুর আশঙ্কাও কল্পনায় দেখতে পেল। ভয়ে-আতঙ্কে-লজ্জায়-অপমান-অভিমানে ভেতর থেকে তার কান্না বেরিয়ে এলো। সে গোপনে ফুঁফিয়ে কাঁদলো।

পিতৃমাতৃহীন মামা বাড়ির আশ্রয়ে থাকা কিশোর ছেলের অসহায়ত্বের সুযোগ নিয়ে তার আত্মসম্মানের উচ্চ আভিজাত্যকে ধুলায় মিশিয়ে দিতে কমজোরী ঈমানদার মানুষের ষড়যন্ত্র জমে উঠলো। নতুন আরেকটি চুরি কিংবা ডাকাতির আয়োজন চলছে চুরির অর্থ ফেরত পাওয়ার জন্যে। অলক্ষ্যে একটি আত্মসম্মানী কিশোরের চরিত্র বিকাশের সবচেয়ে বড় সম্পদ আত্মসম্মান ডাকাতি হতে চলেছে। বোঝা যাচ্ছে, চোর-ডাকাত রাতারাতি তাদের কুপ্রবৃত্তির প্রভাবে দুর্বল গৃহস্থকেও তাদের দলে টেনে নামাতে পেরেছে। যদিও গৃহস্থরা সে নতুন পরিচয় প্রাপ্তির সম্ভাবনাকে বেখেয়ালে রেখে ভেতরে ভেতরে ভীষণ খেয়ালে জপে চলেছে-মাল যায় যার ঈমান যায় তার। চুরি, চোর ও চালপড়া বিষয়গুলো কানে মুখে ছড়াতে ছড়াতে আশপাশের অনেক লোক জানাজানি হলো। তাদের মধ্যে অতিআগ্রহী অনেকে চালপড়া খেয়ে চোর ধরার তামাশা দেখতে মহিমদের উঠানে ভিড় জমালো। উপস্থিতির চোখেমুখে চাপা গোপন উৎসাহ তাদের মুখগুলোর উজ্জ্বলতাকে স্বাভাবিকের চেয়ে বাড়িয়ে দিলো। দেখে মনে হলো বায়োস্কোপের গোপন ফুঁটোয় দুর্লভ ফ্রিতে চোখ রাখার সুবর্ণ সুযোগ এসেছে তাদের।
এদিকে চোর অপবাদ মাথায় নিয়ে মৃদু পায়ে মেজ ভাই শাফিনের সাথে সুজন খালাবাড়ির উদ্দেশে রওনা হলো। সবাই তার চুরির বিষয়টি জেনে গেছে সন্দেহে যাত্রাপথে অতিক্রম করা পরিচিত মানুষের চোখে চোখাচোখি না হলেও তাদের সন্দেহের বাঁকা দৃষ্টি কল্পনায় দেখতে পেল। নানা ভাবনা গুনতে গুনতে চোর-ডাকাতদের বেরিয়ে যাওয়া নির্দিষ্ট গেট দিয়ে একটি অনিশ্চয়তাকে সাথে নিয়ে তারা ভেতরে ঢুকলো। উৎসবের আয়োজন দেখে খুশি হওয়ার বদলে দুইভাই অভিভূত হয়ে গেলো। মুহূর্ত পরে অতি দ্রুততায় ঘটনা ঘটতে থাকলো-সুজনের চার বছরের বড় মেজ ভাই শাফিন গৃহস্থদের ওপর খেঁকিয়ে উঠলো-‘তোমরা এত লোক জড়ো করেছ কেন?’
প্রত্যুত্তরে ফাহিম চেঁচিয়ে বললো-‘তাতে কি হয়েছে? তোমার আঁতে ঘা লেগেচে নাকি?’
শাফিন রেগে তার দিকে তেড়ে গেল- ‘তামাশা দেখতে লোক ডেকেছিস, তাই না?’
ততক্ষণে শাফিনের চেয়ে বয়সে ছোট ফাহিম দেয়ালে হেলান দিয়ে উঁচু টেবিলে বসে থাকার সুবিধা নিয়ে তেড়ে আসা শাফিনের বুকে ডান পা উঁচিয়ে লাথি মারলো। প্রচণ্ড আঘাতের ধাক্কায় শাফিন চিৎপটাং হয়ে মেঝেতে পড়লো। ভূপাতিত ভাইকে দেখে আকস্মিক ঘটনার ভয়াবহতায় সুজন আতঙ্কে উচ্চস্বরে কান্না শুরু করলো।
শাফিন পতিত অবস্থা থেকে সবেগে আবার উঠতে যাওয়ার মুখে গৃহবাসী সবাই একজোটে মার মুখো হয়ে তার দিকে তেড়ে গেল। শুয়ে থাকা ভয়ঙ্করী মহিম পর্যন্ত ঝলসানো পা নিয়ে উঠে দাঁড়াল মারতে। সংখ্যালঘু শাফিন ততক্ষণে অসহায় হয়ে ভ্যাঁবাচ্যাঁকা খেয়ে নিরূপায় হলো। তার ওপর একাট্রা সবায় চড়, কিল, থাপ্পড় ও গালিগালাজ বর্ষণ করতে লাগলো। ছোট ভাইসহ তাকে গেটের বাইরে বের করে দিলো। উঠোন ভর্তি লোকজন চালপড়া খাওয়া না দেখে এই আকস্মিক তামাশা দেখে মজা পেল কিনা বুঝা গেল না। কিন্তু দুর্বলের পক্ষ কেউ নিলো না, মহিমদের বাধা কেউ দিলো না। অর্ধচন্দ্র ও প্রহারের লাঞ্ছনা নিয়ে গেটের বাইরে মামাবাড়ি ফিরতে ফিরতে দুই ভাই শুনতে পেল অনেক উত্তপ্ত গঞ্জনা। ভেতর বাড়িতে যে যার মতো করে নিজস্ব উচ্চমার্গীয় ভাষা দক্ষতায় এলোমেলো চেঁচিয়ে চলেছে। ফিরতে ফিরতে আঘাতে নীরব দুই ভাইয়ের কানে তার কিছু ভেসে এলো-
মহিম- ‘ঐ... বাচ্চার কান্না দেখে বুঝেছি ও টাকা চুরি করেছে। টাকা দেবে না বলে অভিনয় শুরু করেছে। দাঁড়া ওদের দেখাচ্ছি মজা।’
আমেনা- ‘… বাচ্চাদের খাওয়ায়ে খাওয়ায়ে মানুষ করলাম। আর চুরি করে আমাদের ওপর রুখে আসে। চোরের আবার বড় গলা। গলার টুটি ধরে ছিঁড়ে ফেলবো।’


অপমানিত শাফিন ফিরে এসে নানা-নানি-মামা-মামিদের বোঝানোর চেষ্টা করলো মহিমদের অন্যায় আয়োজনের কথা। নীরব সুজন তার খানিকটা ক্ষয়ে যাওয়া সম্মান রক্ষার্থে অভিমানী মনে ভেতরে ভেতরে মামাদের জোরালো প্রতিবাদের আশা করছিল। কিন্তু আশার গুড়েবালি দিয়ে তারা নীরব থেকে গেল। শুধু নীরবই নয়, সবাই নির্লিপ্ত থেকে গেল। মোটের ওপর সুজন মনে মনে চাইছিলো কেউ ডেকে তার মাথায় হাত বুলিয়ে বলুক-‘আমি জানি তুই চুরি করিসনি। ওরা তোকে সন্দেহ করে ঠিক করেনি।’
লাঞ্ছনা-গঞ্জনায় লোকমুখে অমীমাংসিত থেকে গেল একটি চুরির ঘটনা, লোকচোখে অনাবিষ্কৃত থেকে গেল একটি চোরের ঠিকানা। অবশ্য এ ডামাডোলে একটি কিশোর ছেলের আত্মসম্মানের গায়ে দুর্বল অপরিমাণদর্শী গৃহস্থরা গভীর আঁচড় কাটতে সক্ষম হলো। যে আঁচড়ের দাগ দগদগে হয়ে চরিত্রের গাঁজুড়ে ঠিক কোনদিকে কতটা জায়গা নেবে, কত দিন স্থায়ী হবে— তা এ মুহূর্তে বলা মুশকিল।

পাঠকের মতামত:

SMS Alert

সাহিত্য এর সর্বশেষ খবর

সাহিত্য - এর সব খবর