আরিফ সোহেল, দ্য রিপোর্ট : বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনের অব্যাহত উন্নয়ন-অগ্রগতি ধারাবাহিক থাকলেও ২০১৫-১৬ বাজেটে তা দৃশ্যমান হয়নি। গত অর্থবছরের তুলনায় এবার মাত্র ৬৭ কোটি ৬৮ লাখ ৬৮ হাজার টাকা বেশি বরাদ্দ রাখা হয়েছে। সামগ্রিকভাবে যুব ও ক্রীড়া মিলিয়ে অনুন্নয়ন ও উন্নয়নে প্রস্তাবিত ‘ক্রীড়া-বাজেট’ ৮৩৪ কোটি ৭০ লাখ টাকা। ২০১৪-১৫ অর্থবছরে সংশোধিত বাজেটের পরিমাণ ছিল ৭৬৭ কোটি ১ লাখ ৩২ হাজার টাকা। উন্নয়নসূচক ধারার মানদণ্ডে এবারও ক্রীড়া বাজেট সাদামাটা। সেই অর্থে মোটা দাগের পরিবর্তন নেই। অথচ ক্রীড়াঙ্গন সম্পৃক্তায় গত বছরের বাজেটকালীন বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনের ভাবমূর্তি পৌঁছেছে আকাশ উচ্চতায়।

২০১৪-১৫ সালে বাজেট ছিল ২ লাখ ৫০ হাজার ৫ শ’ ৬ কোটি টাকা। এবার রাখা হয়েছে ২ লাখ ৯৫ হাজার ১ শ’ কোটি টাকা। সামগ্রিক বাজেটে এবার প্রস্তাবনায় বরাদ্দ বেশি রাখা হয়েছে ৪৪ হাজার ৫ শ’ ৫৪ কোটি। সেই বিবেচনায় গরপরতা বাড়ানো হয়েছে ক্রীড়া বাজেট। বলতে দ্বিধা নেই, ক্রিকেটের অগ্রগতি সারা বিশ্বেই ভূয়সী প্রশংসা কুড়িয়েছে। বাংলাদেশের ক্রিকেট দল খেলেছে বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনাল। পাকিস্তানের মতো বিশ্বসেরা দলকে করেছে হোয়াইটওয়াশ। অর্থমন্ত্রী নিজেও তার বাজেট বক্তৃতায় ক্রিকেট এবং ক্রীড়াঙ্গনের গুণকীর্তন করেছেন। ক্রীড়াবান্ধব প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও ক্রীড়াঙ্গনের প্রশংসায় পঞ্চমুখ। অথচ তার প্রতিফলন কিন্তু প্রস্তাবিত বাজেটে দেখা যায়নি। কারণ বাজেট বরাদ্দ বেশি হলে ক্রীড়াঙ্গন থেকে আরও বেশি কিছু পাওয়ার সম্ভাবনা ছিল। বাজেট প্রণয়নে যারা নিবেদিত তারা হয়তো ভুলেই গেছেন ২ শ’ প্লাস দেশের মধ্যে ক্রিকেট দিয়ে বাংলাদেশের অবস্থান কখনো ৮; কখনো ৯। যা অনেকের কাছেই রীতিমতো বিস্ময়কর।

বৃহস্পতিবার বাংলাদেশের ৪৪তম বাজেট প্রস্তাবনায় অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিত জাতীয় সংসদে জানিয়েছেন, যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের বাজেট রাখা হয়েছে অনুন্নয়ন ও উন্নয়ন ব্যয় মিলিয়ে সর্বমোট ৮৩৪ কোটি ৭০ লাখ টাকা। এর মধ্যে উন্নয়ন খাতে ৩২৯ কোটি ১৭ লাখ টাকা এবং অনুন্নয়ন খাতে ৫০৫ কোটি ৫৩ লাখ টাকা ধরা হয়েছে। এবারের বাজেটে এই মন্ত্রণালয়ের রাজস্ব আয় ধরা হয়েছে ৫৪৮ কোটি ৮৩ লাখ ৫৮ হাজার টাকা।

উল্লেখ্য, ২০১৪-১৫ অর্থবছরে সংশোধিত বাজেটে উন্নয়ন খাতের পরিমাণ ছিল ২৬৫ কোটি ৪৩ লাখ টাকা এবং অনুন্নয়ন খাতের পরিমাণ ছিল ৫০১ কোটি ৫৮ লাখ ৩২ হাজার টাকা। সব মিলিয়ে গত অর্থ বছরে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের সংশোধিত বাজেটের পরিমাণ ছিল ৭৬৭ কোটি ১ লাখ ৩২ হাজার টাকা। অর্থাৎ এবারের প্রস্তাবিত বাজেট গত বছরের সংশোধিত বাজেটের তুলনায় মাত্র ৬৭ কোটি ৬৮ লাখ ৬৮ হাজার টাকা বেশি।

অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিত জাতীয় সংসদে ক্রীড়াঙ্গনের ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। করেছেন বাংলাদেশ ক্রিকেট দলেরও প্রশংসা। সেই সঙ্গে ফুটবলের উন্নয়নে শিল্পপতি ও ব্যবসায়ীদের এগিয়ে আসার উদাত্ত আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি ফুটবলের জন্যে ১৫ কোটি টাকার একটি থোক বরাদ্দের ব্যবস্থা করবেন বলেও আশ্বাস দিয়েছেন। যদিও বাফুফের (বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন) দাবি ছিল ৩৯ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখার।

এবারের বাজেটে জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের মাধ্যমে ক্রীড়ার বিভিন্ন প্রকল্পের জন্য বাজেট রাখা হয়েছে ১১৭ কোটি ১৭ লাখ টাকা। বাংলাদেশ ক্রীড়া শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের (বিকেএসপি) বিভিন্ন অবকাঠামো উন্নয়ন ও প্রকল্প খাতে বাজেট ধরা হয়েছে ৪১ কোটি ৬৬ লাখ টাকা। জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের (এনএসসি) জন্য প্রস্তাবকৃত অর্থ ব্যয়ের খাতগুলো হচ্ছে সিলেট বিভাগীয় স্টেডিয়ামকে আন্তর্জাতিকমানের স্টেডিয়ামে উন্নীতকরণের লক্ষ্যে ২৮ কোটি ৭১ লাখ টাকা, প্রথম পর্যায়ে দেশের বিদ্যমান জেলা স্টেডিয়ামগুলো সংস্কার ও উন্নয়নের জন্য ৩৩ কোটি ৫১ লাখ টাকা, নীলফামারী ও নেত্রকোণা জেলা স্টেডিয়ামের উন্নয়ন এবং রংপুর বিভাগে মহিলা ক্রীড়া কমপ্লেক্স নির্মাণ প্রকল্পে ৫৪ কোটি ৯৫ লাখ টাকা।

অর্থমন্ত্রী জাতীয় সংসদে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত বাজেট বক্তৃতায় বলেছেন, ‘বিশ্ব ক্রিকেট অঙ্গনে বাংলাদেশ ক্রিকেট দল নিজেদের অপরিসীম শক্তি ও সামর্থ্যের স্বাক্ষর রেখে চলেছে। তারা চলতি বছর অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপে কোয়ার্টার ফাইনালে খেলার যোগ্যতা অর্জন করেছে। তারই ধারাবাহিকতায় সম্প্রতি পাকিস্তান দলকে ঘরের মাঠে ওয়ানডেতে পরাজিত করে সিরিজ জয়ের গৌরব অর্জন করেছে। বাংলাদেশের ক্রিকেটের অগ্রযাত্রায় নিঃসন্দেহে এটি একটি বড় মাইলফলক।’ ক্রিকেট দলের অদম্য ও আত্মপ্রত্যয়ী সকল খেলোয়াড়সহ সংশ্লিষ্ট সকলকে এ জন্য তিনি আন্তরিক অভিনন্দন জানিয়েছেন।

অর্থমন্ত্রী আরও বলেছেন, ‘বেকার যুবকদের দক্ষতা বৃদ্ধিমূলক প্রশিক্ষণ ও সহজ শর্তে ঋণ প্রদান করা হচ্ছে। দেশের গুরুত্বপূর্ণ স্টেডিয়ামসমূহের সংস্কার ও উন্নয়ন কার্যক্রম চলমান আছে। বিলুপ্তপ্রায় গ্রামীণ খেলাধুলা পুনরুজ্জীবিতকরণেরও উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় খেলা ফুটবল এবং এই খেলাটি গ্রামেগঞ্জে অনুষ্ঠিত হয়। খেলাটির উন্নয়নের জন্য বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। এই উদ্যোগকে সাফল্যমণ্ডিত করার জন্য আমি উদাত্ত আহ্বান জানাচ্ছি। এ জন্য দেশের শিল্পপতি ও ব্যবসায়ীদের সহযোগিতায় ১৫ কোটি টাকার একটি থোক সহায়তার ব্যবস্থা করেছি।’

যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের অধীনে বাংলাদেশ ক্রীড়া শিক্ষা প্রতিষ্ঠান (বিকেএসপি)-এর জন্য এবারের বাজেটে প্রস্তাবকৃত খাতগুলো হচ্ছে— বিকেএসপির বিদ্যমান ক্রীড়া সুবিধাবলির আধুনিকীকরণ ও তৃণমূল পর্যায়ে ক্রীড়া প্রতিভা অন্বেষণ ও নিবিড় প্রশিক্ষণ বাবদ ১৭ কোটি ৯৬ লাখ টাকা, বিকেএসপির আওতায় চট্টগ্রাম ও রাজশাহীতে ক্রীড়া স্কুল প্রতিষ্ঠা বাবদ ২৩ কোটি ৭০ লাখ টাকা। সর্বমোট এই খাতে ৪১ কোটি ৬৬ লাখ বাজেট ধরা হয়েছে।

আর বাজেটে সমাজকল্যাণ, যুব প্রশিক্ষণ ও যুব পুনর্বাসন কেন্দ্র স্থাপন ও যুব উন্নয়ন খাতে চলমান বিভিন্ন প্রকল্পের জন্য প্রস্তাব করা হয়েছে ১২৫ কোটি ৬০ লাখ টাকা। যা ব্যয় করা হবে যুব উন্নয়ন অধিদফতরের মাধ্যমে। যুব উন্নয়ন অধিদফতরের জন্য প্রস্তাবকৃত অর্থ ব্যয়ের খাতগুলো হচ্ছে— ইনোভেটিভ ম্যানেজমেন্ট অব রিসোর্স ফর পোভার্টি এলিভিয়েশন থ্রু কম্প্রিহেনসিভ টেকনোলজি (আইএমপিএসিটি) খাতে ১৬ কোটি ২৮ লাখ, ১১টি জেলায় নতুন যুব প্রশিক্ষণকেন্দ্র স্থাপন বাবদ ৭৪ কোটি ৪ লাখ টাকা। ২০১৫-১৬ অর্থবছরে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের অধীনে যে বিভিন্ন প্রকল্প, কর্মসূচি বাস্তাবায়নের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে তার মধ্যে উপরিউক্ত তিন খাতের অধীনে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে শেখ হাসিনা জাতীয় যুব কেন্দ্রের আধুনিকায়ন ও মানোন্নয়ন, বাংলাদেশ ক্রীড়া শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ইনডোর প্রশিক্ষণের জন্য বেইলম্যান হ্যাঙ্গার নির্মাণ শীর্ষক প্রকল্প, উত্তরবঙ্গের ৭টি জেলায় বেকার যুবকদের আত্মকর্মসংস্থানমূলক শীর্ষক প্রকল্প প্রভৃতি।

(দ্য রিপোর্ট/এএস/এইচএসএম/সা/জুন ০৪, ২০১৫)