খাদেমুল ইসলাম, দ্য রিপোর্ট : সৈয়দ গোলাম জিলানী। দেশের ফুটবল সম্পর্কে যারা সামান্য খোঁজখবর রাখেন তাদের কাছেও নামটা অজানা নয়। বয়সভিত্তিক পর্যায়ে বাংলাদেশকে সাফে প্রথম শিরোপা এনে দিয়েছেন এই কোচ। গত সপ্তাহে সিলেটে অনূর্ধ্ব-১৬ সাফ চ্যাম্পিয়নশিপ জয়ের কারিগর তিনি। ডাগআউটে দাঁড়িয়ে পর্যবেক্ষণ করেছেন সবকিছু। দিয়েছেন সময়োপযোগী নির্দেশনা। নিঃসন্দেহে এই অর্জন তার ক্যারিয়ারে সেরা। তবে এই কোচ মনে করছেন বাংলাদেশ জাতীয় দলের কোচিংয়ের সুযোগ পেলে ব্যক্তিগত কোচিং ক্যারিয়ারে পরিপূর্ণতা আসবে।

খেলোয়াড়ী জীবনে সৈয়দ গোলাম জিলানী ক্যারিয়ার শুরু করেছেন ১৯৮৬ সালে। সেই থেকে ৩ বছর খেলেছেন আরামবাগ ক্রীড়াচক্রে। এরপর একে একে খেলেছেন প্রিমিয়ার লিগের ক্লাব ব্রাদার্স ইউনিয়ন, ফরাশগঞ্জ স্পোর্টিং ক্লাব ও ভিক্টোরিয়া স্পোর্টিং ক্লাবে। বাংলাদেশ জাতীয় দলে খেলার সুযোগ না হলেও বয়সভিত্তিক পর্যায়ে প্রতিনিধিত্ব করেছেন দেশের। অনূর্ধ্ব-১৬ ও অনূর্ধ্ব-১৯ পর্যায়ে খেলেছেন লাল-সবুজের প্রতিনিধি হয়ে।

ব্যক্তিগত জীবনে ৩ ভাই ও ২ বোনের মধ্যে দ্বিতীয় সৈয়দ গোলাম জিলানী। পরিবারের একমাত্র সদস্য হিসেবে যুক্ত ফুটবলের সঙ্গে। রেলওয়েতে চাকরি করতেন বাবা। তার উৎসাহেই ফুটবলের সঙ্গে ঘরবসতি তার। অবশ্য তার বাবা মারা গিয়েছেন ২০০১ সালে। বাংলাদেশের ফুটবল ইতিহাসে অন্যতম সফল এই কোচের এক ছেলে ও এক মেয়ে আছে। মেয়ে জ্যোতি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে এবং ৮ বছর বয়সী ছেলে সিয়াম পড়াশুনা করছে দ্বিতীয় শ্রেণীতে। অবশ্য ছেলে-মেয়ের কেউেই বাবার পথ ধরে ফুটবলে আসতে চায় না। পরিবারের অন্য কারো ফুটবল নিয়ে খুব একটা আগ্রহ নেই।

মাঠের খেলা ছেড়ে দেওয়ার পরই সৈয়দ গোলাম জিলানী ফুটবল ছেড়ে যাননি। অনেকের মতো ব্যবসায় মনযোগ দেননি। নেমেছেন কোচিং পেশায়। ব্রত হয়েছেন ফুটবলার তৈরিতে। কোচিংয়ের হাতেখড়ি ১৯৯৯ সালে। তৃতীয় বিভাগের ক্লাব কদমতলা সংসদ থেকে কোচিং শুরু করেছেন। প্রথমবারই সফল তিনি। কদমতলা সংসদকে তৃতীয় বিভাগ চ্যাম্পিয়ন করে তুলে নিয়ে এসেছিলেন দ্বিতীয় বিভাগে।

এরপর ২০০১ সালে ভিক্টোরিয়া স্পোর্টিং ক্লাবের কোচ হিসেবে যোগ দিয়েছিলেন জিলানী। প্রথম বিভাগ ও প্রিমিয়ার ডিভিশনে ২ বছর দলটি খেলেছে তার অধীনে। ২০০৮ সালে ‘বি’ লিগের দল রহমতগঞ্জ মুসলিম ফ্রেন্ডস সোসাইটির কোচ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। মাঝে ২০০১ থকে ২০০৪ সাল পর্যন্ত সাভারস্থ বাংলাদেশ ক্রীড়া শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে (বিকেএসপি) তৃণমূল কোচিংয়ের দায়িত্বও পালন করেছেন।

বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের কোচ হিসেবে কাজ করছেন কুমিল্লার এই সাবেক ফুটবলার। ফেডারেশনে দায়িত্ব পালনকালে বিভিন্ন সময়ে বয়সভিত্তিক দলের কোচিং পরিচালনা করেছেন। ২০০৬ সাল থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত ছিলেন জাতীয় দলের সহকারী কোচের দায়িত্বে। এরপর দায়িত্ব পালন করেছেন মহিলা দলের প্রধান কোচ হিসেবেও।

এ সব দায়িত্বের মাঝেই ব্যক্তিগত দক্ষতা অর্জনে এএফসি ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বিভিন্ন কোর্স করেছেন জিলানী। এ সব কোর্স সম্পন্ন করতে জাপান, জার্মানসহ অনেক দেশ ভ্রমণ করেছেন তিনি। যেমনই একাডেমিক জ্ঞান অর্জন করেছেন, তেমনি ক্যারিয়ারে সাফল্যের ধারা অব্যাহত রেখেছেন। যার সবশেষ স্বাক্ষর রেখেছেন সাফ অনূর্ধ্ব-১৬ চ্যাম্পিয়নশিপে।

কোচিংয়ে নিজের ক্যারিয়ারের মূল্যায়ন ও ভবিষ্যত পরিকল্পনা সম্পর্কে জিলানী বলেছেন, ‘একেবারে শুরু থেকেই আমি যে দলেই দায়িত্ব পালন করেছি, কোথাও খারাপ করিনি। তবে নিঃসন্দেহে অনূর্ধ্ব-১৬ সাফ চ্যাম্পিয়নশিপটাই ক্যারিয়ারের সেরা অর্জন। এখন ভবিষ্যতে যদি কখনও জাতীয় দলের দায়িত্ব পাই তবে কোচিং ক্যারিয়ারের পরিপূর্ণতা অর্জিত হবে।’

সৈয়দ গোলাম জিলানী মনে করছেন, বাংলাদেশের এই কিশোর দল বাছাইয়ে ফেডারেশনেরও ভূমিকা ছিল যথেষ্ট। সেইলর অনূর্ধ্ব-১৫ ফুটবল চ্যাম্পিয়নশিপের প্রথম পর্বে ৮ ভেন্যু থেকে শুরুতে ২০০ জন খেলোয়াড় বাছাই করা হয়েছে। সেখান থেকে পরে ৬০ জন এবং শেষ পর্যন্ত তা ৩২-এ নামিয়ে আনা হয়েছিল। সারা দেশ থেকে প্রতিভা বাছাইয়ের এই উদ্যোগের ফল হিসেবেই এতদূর সাফল্য অর্জন সম্ভব হয়েছে অভিমত দিয়েছেন জিলানী।

জিলানী বলেছেন, ‘দেশের বিভিন্ন প্রান্তে এখনো যথেষ্ট প্রতিভা ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। বাফুফে যথাযথ ‍ভূমিকা নিলে এ সব প্রতিভা একত্রিত করা সম্ভব। তবে আমাদের সীমাবদ্ধতা আছে। এরপরও এবার যেমন অনূর্ধ্ব-১৬ দল বাছাইয়ের আগে সেইলর-বাফুফে অনূর্ধ্ব-১৫ জাতীয় চ্যাম্পিয়নশিপ করা হয়েছে, এভাবে প্রত্যেকটি প্রতিযোগিতার আগে পরিকল্পিতভাবে এমন টুর্নামেন্ট আয়োজন করে খেলোয়াড় বাছাই করা যায়। বাফুফের কোচরাও বেশ দক্ষ। তাদের দায়িত্ব দিলে সব পর্যায়েই অনেক ভাল দল গঠন সম্ভব।’

কোচ হিসেবে সাফজয়ী কিশোর দলটিকে কাছ থেকে পর্যবেক্ষণ করেছেন। বাংলাদেশের ভবিষ্যত ফুটবলে অবদান রাখতে তাদের প্রতি কোচ হিসেবে আপনার উপদেশ কি? জানতে চাইলে জিলানী বলেছেন, ‘এই ফুটবলারদের ক্যারিয়ার মাত্র শুরু। এখনো তাদের টেকনিক্যাল অনেক কিছু শেখার বাকি। কিন্তু এই টুর্নামেন্টের পর অনেক খেলোয়াড়কেই ক্লাব ডাকছে। আমি তাদের বলেছি তোমরা এখনই ক্লাবে যাবে না। আগে নিজেদের তৈরি কর। বাফুফে সভাপতিও বলেছেন, তোমাদের ৫০ হাজার বা এক লাখ টাকা দিতে চাই না। আমি চাই তোমরা কোটি টাকার মানের ফুটবলার হিসেবে তৈরি হবে। আমারও তাদের কাছে এই উপদেশ থাকবে। এখনই টাকার পেছনে দৌড়াবে না। আগে নিজেদের গড়, তবে টাকাই তোমার পেছনে দৌড়াবে।’

সাফে বাংলাদেশ জাতীয় ‍ফুটবল দল প্রথম শিরোপা জিতেছে ২০০৩ সালে। ২০১০ সালে এসএ গেমসে চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল যুব দল। বয়সভিত্তিক পর্যায়ে এবারই প্রথম সর্বোচ্চ সাফল্য পেয়েছে বাংলাদেশ। অনূর্ধ্ব-১৬ সাফ চ্যাম্পিয়নশিপের তৃতীয় আসরে শিরোপাজয়ী ভারতকে দুইবার হারিয়ে সাফল্যের মুকুট পরেছে। এই সাফল্যের নেপথ্যের কারিগর সৈয়দ গোলাম জিলানী। এখন তার নির্দেশনায় ক্ষুদে ফুটবলাররা হয়ে উঠবে আগামীর বাংলাদেশের আশ্রয়স্থল। এমনটিই প্রত্যাশা সংশ্লিষ্টদের।

(দ্য রিপোর্ট/কেআই/এএস/সা/আগস্ট ২৪, ২০১৫)