নূরুজ্জামান তানিম, দ্য রিপোর্ট : ২০০০ সালে পুঁজিবাজারের তালিকাভুক্ত বেশ কয়েকটি কোম্পানির শেয়ারের দর কারসাজি করে বাড়ানোতে অভিযুক্ত মো. কুতুবউদ্দন আহমেদের বিচার বিশেষ ট্রাইব্যুনালে শুরু হতে যাচ্ছে। তৎকালীন সময়ে তিনি বাংলাদেশ ও সৌদি আরবের যৌথ মালিকানায় পরিচালিত প্রতিষ্ঠান সৌদি বাংলাদেশ ইন্ডাস্ট্রিয়াল এ্যান্ড এগ্রিকালচারাল ইনভেস্টমেন্ট কোম্পানি লিমিটেডের (সাবিনকো) ব্যবস্থাপনা পরিচালক ছিলেন। ওই বছরের জুন থেকে জুলাই মাস পর্যন্ত কারসাজি করে শেয়ারের দর কৃত্রিমভাবে বৃদ্ধি করার অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় তার বিরুদ্ধে মামলা করে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ এ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)।

২০০১ সালের ২১ অক্টোবর অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ আদালতে এ মামলা করা হয়। বিএসইসির পক্ষে তৎকালীন পরিচালক মো. মিজানুর রহমান বাদী হয়ে মামলাটি করেন। এর পর দীর্ঘ ১৪ বছর অতিবাহিত হলেও মামলাটি নিষ্পত্তি হয়নি। তবে পুঁজিবাজার বিশেষ ট্রাইব্যুনাল প্রতিষ্ঠা হওয়ার ফলে মামলাটি দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ আদালতে স্থানান্তর করা হয়। মঙ্গলবার সকালে মামলাটির প্রয়োজনীয় নথিপত্র মহানগর দায়রা জজ আদালত থেকে ট্রাইব্যুনালে পৌঁছে। ফলে পুঁজিবাজার বিশেষ ট্রাইব্যুনালে আরও একটি নতুন মামলা অন্তর্ভুক্ত হল। নতুন এ মামলার নম্বর দেওয়া হয়- ২২/২০১৫।

এদিকে অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ আদালত থেকে ট্রাইব্যুনালে মামলাটি স্থানান্তরের সময় ২৯ সেপ্টেম্বর (মঙ্গলবার) আসামির হাজিরার দিন ধার্য করে দেওয়া হয়। তবে এদিনে আসামি আদালতে উপস্থিত হননি। তাই বিশেষ ট্রাইব্যুনালের বিচারক (জেলা ও দায়রা জজ) হুমায়ুন কবীর আগামী ৫ অক্টোবর পরবর্তী দিন ধার্য করেন।

এ সময়ে বিএসইসির প্যানেল আইনজীবী মাসুদ রানা খান উপস্থিত ছিলেন। পরে আসামিপক্ষের আইনজীবী উপস্থিত হন।

আসামিপক্ষের আইনজীবী এস এম আবুল কালাম আজাদ দ্য রিপোর্টকে বলেন, ‘মঙ্গলবার মহানগর দায়রা জজ আদালতে মামলাটির শুনানি অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল। তবে সেটা না হয়ে বিশেষ ট্রাইব্যুনালে পাঠানো হয়। তাই ট্রাইব্যুনালে আসতে দেরি হয়েছে। আমরা আদালতের কাছে ৮ অক্টোবরের পর যে কোনো দিন চেয়ে আবেদন করেছি। তবে আদালত আগামী ৫ অক্টোবর পর্যন্ত সময় মঞ্জুর করেছেন।’

এ মামলার নথি সূত্রে জানা গেছে, আসামি মো. কুতুবউদ্দন আহমেদ সৌদি বাংলাদেশ ইন্ডাস্ট্রিয়াল এ্যান্ড এগ্রিকালচারাল ইনভেস্টমেন্ট কোম্পানি লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক থাকাকালীন টেক্সটাইল খাতের ডাইনামিক টেক্সটাইল, ফার্মাসিউটিক্যাল খাতের বেক্সিমকো ফার্মা, সিমেন্ট খাতের মেঘনা সিমেন্টসহ বেশ কয়েকটি কোম্পানির শেয়ার অস্বাভাবিকভাবে কেনাবেচা করেন। এতে বাজারে কৃত্রিমভাবে শেয়ারের দর বেড়ে যায়। ওই সময়ে তিনি এবং তার প্রতিষ্ঠান সাবিনকোর নামে ১৪টি ব্রোকারেজ হাউসের মাধ্যমে স্বাভাবিক নিয়ম লঙ্ঘন করে শেয়ার কেনাবেচা করেন। যেমন— তিনি একই দিনে যে ব্রোকারেজ হাউস থেকে শেয়ার কিনেছেন, ঠিক তাৎক্ষণিক অন্য ব্রোকারেজ হাউসে তা বিক্রি করেছেন। এমনকি একই ব্রোকারেজ হাউসে শেয়ার কিনে তা ওই সময়ে বিক্রি করেছিলেন। এতে শেয়ারগুলোর চাহিদা বৃদ্ধি পায় এবং দর বেড়ে যায়।

যার পরিপ্রেক্ষিতে ওই বছরের ২১ ডিসেম্বর তদন্ত কমিটি গঠন করে বিএসইসির তৎকালীন চেয়ারম্যান মনির উদ্দিন আহমেদ। গঠিত কমিটির সদস্যরা হলেন— তৎকালীন নির্বাহী পরিচালক মনসুর আলম, পরিচালক ফরহাদ আহমেদ ও শুভ্র কান্তি চৌধরী। গঠিত কমিটি ৩০ এপ্রিল তদন্ত রিপোর্ট জমা দেন।

ওই রিপোর্ট উল্লেখ করা হয়, কুতুবউদ্দিন আহমেদ ডাইনামিক টেক্সটাইলের শেয়ার ২০০০ সালের ১, ৩, ৪, ৬ জুন আজম সিকিউরিটিজ ও ইমতিয়াজ সিকিউরিটিজ থেকে কিনেন। আর একই দিনগুলোতে তিনি ওই শেয়ারগুলো আজম সিকিউরিটিজ ও নবারুন সিকিউরিটিজে বিক্রি করেন।

এদিকে তিনি বেক্সিমকো ফার্মার শেয়ার ৮, ১৬, ১৮, ১৯, ২৩ জুলাই আজম সিকিউরিটিজ, ইমতিয়াজ সিকিউরিটিজ, এসসিএল সিকিউরিটিজ ও নবারুন সিকিউরিটিজ থেকে কিনেন। অপরদিকে একই দিনে তা আজম সিকিউরিটিজ, ইমতিয়াজ সিকিউরিটিজ, এসসিএল সিকিউরিটিজ থেকে বিক্রি করেন।

এ ছাড়া মেঘনা সিমেন্টের শেয়ার তিনি ৮ জুন এসসিএল সিকিউরিটিজ থেকে কিনে তা ওই হাউস থেকে বিক্রি করেন। আর ২৬ জুলাই আজম সিকিউরিটিজ থেকে কিনে তা এসসিএল সিকিউরিটিজ থেকে বিক্রি করেন।

প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, ২০০০ সালের জুন থেকে জুলাই পর্যন্ত কুতুবউদ্দিন ও তার প্রতিষ্ঠান সাবিনকোর নামে মোট ২৮ লাখ ৭৬ হাজার ৬৮০টি বেক্সিমকো ফার্মা ও ডাইনামিক টেক্সটাইলের শেয়ার কেনেন। প্রথম পর্যায়ে তারা ডাইনামিক টেক্সটাইলের শেয়ার কিনেন। এতে ওই শেয়ারসহ টেক্সটাইল খাতের অন্যান্য কোম্পানির শেয়ারের দর বৃদ্ধি পায়। পরে তারা ফার্মাসিউটিক্যাল খাতের বেক্সিমকো ফার্মার শেয়ারে বিনিয়োগ শুরু করে। তখন শেয়ারবাজার অস্বাভাবিক হয়ে উঠে।

ফলে তদন্ত কমিটি প্রতিবেদনে মন্তব্য করে যে, সৌদি বাংলাদেশ ইন্ডাস্ট্রিয়াল এ্যান্ড এগ্রিকালচারাল ইনভেস্টমেন্ট কোম্পানি লিমিটেডের বিরুদ্ধে সিকিউরিটিজ অধ্যাদেশ, ১৯৬৯-এর ১৭(এ), সি, ডি, ই(২)(৩)(৪)(৫) ধারা লঙ্ঘন করেছে। একই সঙ্গে সিকিউরিটিজ এ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (মার্চেন্ট ব্যাংক পোর্টফোলিও) প্রবিধানমালা ১৯৯৬-এর প্রবিধান ৩৩, উপ-প্রবিধান ১-এর (ক, চ, ছ, জ) লঙ্ঘন করেছে। এ ছাড়া প্রতিষ্ঠানটিকে দেওয়া রেজিস্ট্রেশন সার্টিফিকেটের ৬নং শর্ত লঙ্ঘন করেছে।

পাশাপাশি কুতুবউদ্দিন আহমেদের বিরুদ্ধে সিকিউরিটিজ অধ্যাদেশ, ১৯৬৯-এর ১৭(এ), ডি, ই(৩)(৪)(৫) লঙ্ঘন করেছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

উল্লেখ্য, ২০০১ সালের ২৩ অক্টোবর বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ এ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) তৎকালীন পরিচালক মো. মিজানুর রহমান বাদী হয়ে মামলাটি করেন। ২০০২ সালের ৪ জুন মামলার একমাত্র আসামি সৌদি বাংলাদেশ ইন্ডাস্ট্রিয়াল এ্যান্ড এগ্রিকালচারাল ইনভেস্টমেন্ট কোম্পানি লিমিটেডের (সাবিনকো) তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক কুতুবউদ্দিনকে অন্তর্বর্তীকালীন জামিন দেয় আদালত। ২০০৭ সালের ৪ জুলাই মামলার অভিযোগ দাখিল করা হয়। এরপর ২০০৯ সালের ২১ জুলাই মামলাটির বাদী পরিবর্তন হয়। নতুন বাদী হন তৎকালীন আইন বিভাগের পরিচালক মাহবুবুর রহমান।

(দ্য রিপোর্ট/এনটি/এইচএসএম/সা/সেপ্টেম্বর ২৯, ২০১৫)