রেজোয়ান আহমেদ, দ্য রিপোর্ট : আন্তর্জাতিক ও বাংলাদেশ অ্যাকাউন্টিং স্ট্যান্ডার্ড (আইএএস ও বিএএস) পরিপালন না করেই শেয়ারবাজার থেকে প্রায় ৪০০ কোটি টাকা সংগ্রহ করতে যাচ্ছে একমি ল্যাবরেটরিজ। এর মাধ্যমে আর্থিক প্রতিবেদনে প্রকৃত আয়ের চেয়ে সম্পদ ও আয় বেশি দেখিয়েছে কোম্পানিটি। এ ছাড়া এ কোম্পানি কিছু কিছু ক্ষেত্রে প্রচলিত আইনও লঙ্ঘন করেছে। কোম্পানির প্রাথমিক গণপ্রস্তাব (আইপিও) ড্রাফট প্রসপেক্টাসের তথ্য পর্যালোচনা করে অনিয়মের এসব চিত্র পাওয়া গেছে।

এ কোম্পানিতে বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ সুরক্ষা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন বাজার সংশ্লিষ্টরা।

উল্লেখ্য, বুকবিল্ডিং পদ্ধতিতে একমি ল্যাবরেটরিজের ‘কাট অফ প্রাইস’ নির্ধারিত হয়েছে ৮৫.২০ টাকা। এই দরে ৩ কোটি শেয়ার ইস্যুর মাধ্যমে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে ২৫৫ কোটি ৬০ লাখ টাকা সংগ্রহ করবে কোম্পানিটি। অপরদিকে ‘কাট অব প্রাইসের’ ১০ শতাংশ কম দরে অর্থাৎ ৭৭ টাকায় ২ কোটি শেয়ার ছেড়ে প্রাথমিক গণপ্রস্তাবের (আইপিও) মাধ্যমে ১৫৪ কোটি টাকা সংগ্রহ করবে। আগামী ১১ এপ্রিল থেকে কোম্পানির আইপিও আবেদন শুরু হবে এবং ২১ এপ্রিল পর্যন্ত এ আবেদন গ্রহণ করা হবে।

তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, একমি স্পেশিয়ালাইজড ফার্মাসিটিক্যালসকে একীভূতকরণে ২০১৩ সালের ২৬ নভেম্বর একমি ল্যাবরেটরিজ ১০ টাকা অভিহিতমূল্যে ৫৯ লাখ ৭০ হাজার শেয়ার ইস্যু করে। কিন্তু কোম্পানি কর্তৃপক্ষ ইপিএস গণনায় ৩১ জানুয়ারি ২০১৪ তারিখ বিবেচনায় নিয়ে ইপিএস গণনা করেছে। এর মাধ্যমে কোম্পানিটি শেয়ারপ্রতি আয় (ইপিএস) ০.০২ টাকা বেশি দেখিয়েছে।

এ ছাড়া বিএএস-৩৩ অনুযায়ী কোনো বছরের শেষে যে পরিমাণ শেয়ার থাকবে তার ওয়েটেড দিয়ে ইপিএস গণনা করতে হয়। ২০০৯-১০ হিসাব বছর শেষে একমির শেয়ার সংখ্যা ছিল ১ কোটি ও ওই বছরে কোম্পানিটির মুনাফা হয়েছিল ২২ কোটি ৭৮ লাখ টাকা। এ হিসাবে ২০০৯-১০ হিসাব বছরে একমি’র ইপিএস হয় ২২.৭৮ টাকা। কিন্তু কোম্পানি কর্তৃপক্ষ ১.৯৬ টাকা বেসিক ইপিএস দেখিয়েছে।

এসব বিষয়ে অগ্রণী ব্যাংকের মহাব্যবস্থাপক মো. মনোয়ার হোসেন (এফসিএমএ, সিপিএ, এফসিএস, এসিএ) দ্য রিপোর্ট টুয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, বিএএস-৩৩ অনুযায়ী বোনাস শেয়ার প্রদান করা হলেও পূর্বের বছরের বেসিক ইপিএস হিসাবে তা বিবেচিত হবে না। এমনটি করা হলে ইপিএস গণনা ভুল হবে।

হেলাল উদ্দিন (এফসিএমএ) দ্য রিপোর্টকে বলেন, বিএএস-৩৩ অনুযায়ী বছরের শেষে যে শেয়ার থাকে তার ওয়েটেড দিয়ে ইপিএস গণনা করতে হয়। এক্ষেত্রে ২০০৯-১০ অর্থবছরের জন্য ২০১০-১১ অর্থবছরে বোনাস শেয়ার ইস্যু করলেও তা ২০০৯-১০ অর্থবছরের ইপিএস গণনায় বিবেচিত হবে না। তবে রিস্টেটেড ইপিএস এর ক্ষেত্রে হয়। কিন্তু বেসিক আর রিস্টেটেড ইপিএস ভিন্ন।

বিএএস-১৬ অনুযায়ী ভূমি উন্নয়ন (ল্যান্ড ডেভোলপমেন্ট) সম্পদ অবচয়যোগ্য। কিন্তু একমি ল্যাবরেটরিজ এই সম্পদের কোনো অবচয় চার্জ করেনি। এর মাধ্যমে কোম্পানিটি নিয়মিতভাবে সম্পদ ও মুনাফা বেশি দেখিয়ে আসছে।

এ বিষয়ে হেলাল উদ্দিন বলেন, বিএএস অনুযায়ী ল্যান্ড ডেভোলপমেন্টের উপর অবচয় চার্জ করতে হয়। এক্ষেত্রে কোনো কোম্পানি যদি এটি না করে থাকে তাহলে তারা অ্যাকাউন্টিং স্ট্যান্ডার্ড লঙ্ঘন করেছে।

শুধু ভূমি উন্নয়ন সম্পদের ক্ষেত্রেই নয়, অন্যান্য ক্ষেত্রেও অবচয় কম চার্জ করে মুনাফা বেশি দেখিয়েছে একমি।

কোম্পানিটি ২০১৩-১৪ অর্থবছরে ভবনের ক্রয় মূল্যের ওপরে ৫ কোটি ৪৬ লাখ টাকার অবচয় চার্জ করেছে। এর মধ্যে নতুন বা যোগ হওয়া ভবনের ওপরে মাত্র ৩১ লাখ টাকা অবচয় চার্জ করা হয়েছে। কিন্তু এই সম্পদের ওপরে ১ মাসের অবচয় করলেও ৪৯ লাখ টাকা হয়।

অপরদিকে মেশিনারিজের ক্ষেত্রে নতুন ক্রয়কৃত সম্পদের ওপরে ১২ লাখ টাকা অবচয় চার্জ করা হয়েছে। এক্ষেত্রেও ১ মাসের কম চার্জ করা হয়েছে। এই সম্পত্তির ওপরে ১ মাসে অবচয় চার্জ হয় ৮১ লাখ টাকা।

এ ছাড়া ইউটিলিটিজের ওপরে ৫ কোটি ২৩ লাখ টাকা অবচয় হয়েছে। কিন্তু কোম্পানি কর্তৃপক্ষ করেছে ৫ কোটি ২০ লাখ টাকা ব্যয় দেখিয়েছে অবচয় হিসাবে। এক্ষেত্রে কোম্পানিটি ৩ লাখ টাকা অবচয় কম চার্জ করেছে। এ ছাড়া নতুন সম্পদের ওপরে অবচয় ধরেনি।

আবার বিএএস-১২ অনুযায়ী অ্যাকাউন্টিং বেসিস ও টেক্স বেসিস হিসাবের মধ্যে স্বল্পমেয়াদি পার্থক্য সৃষ্টির কারণে ডেফার্ড টেক্স গণনা করতে হয়। কিন্তু একমি কর্তৃপক্ষ ২০০৯-১০ অর্থবছর পর্যন্ত এই ডেফার্ড টেক্স গণনা করেনি।

উপরন্তু একমিতে ৮৫.২০ টাকা করে বিনিয়োগ করলে বিনিয়োগকারীরা শেয়ারপ্রতি ১৪.৫৪ টাকা করে কম সম্পদ পাবেন। ২০১৩-১৪ অর্থবছর শেষে কোম্পানিটির শেয়ারপ্রতি সম্পদের মূল্য দেখানো হয়েছে ৬৬.১৬ টাকা। এক্ষেত্রে ৮৫.২০ টাকা করে বিনিয়োগ করলে আইপিও পরবর্তীতে কমে হবে ৭০.৬৬ টাকা।

এদিকে শ্রম আইন অনুযায়ী ২০০৬ সাল থেকে একটি কোম্পানির নিট মুনাফার ৫ শতাংশ শ্রমিক ফান্ড হিসাবে জমা করতে হয় এবং সেখান থেকে দুই-তৃতীয়াংশ প্রতিবছর শ্রমিকদের মধ্যে সমানহারে বিতরণ করার বিধান রাখা হয়েছে। ২০০৯-১০ অর্থবছর পর্যন্ত এটি বাস্তবায়ন করেনি কোম্পানিটি।

এ বিষয়ে কোম্পানির প্রধান অর্থ কর্মকর্তা (সিএফও) জাহাঙ্গীর আলম কোনো মন্তব্য করবেন না বলে জানিয়েছেন।

(দ্য রিপোর্ট/আরএ/এমকে/এইচ/মার্চ ২৪, ২০১৬)