আজ দুই বছর হলো মাকে দেখি না। স্বপ্ন দেখিয়ে মা আমার চলে গেল বাবার কাছে। মা ছাড়া পৃথিবীতে বেঁচে থাকার কোনো মানে মাঝে মাঝে খুঁজে পাই না। প্রতিবছর মা ও বাবা দিবসে সবাই মাকে নিয়ে কত ভালো কথা ফেসবুকে লিখেন। কিন্তু আমি তো লিখতে পারি না। কারণ মা নিয়ে লিখতে বসলে আমার হাত চলে না। তাই এবার পণ করেছি দু’কলম হলেও লিখব। তাই তো মাকে নিয়ে আমার এ ছোট প্রয়াস।

মা, মা, এবং মা। প্রিয় এবং মূল্যবান শব্দ একটিই এবং একটিই মাত্র। শুধু প্রিয় শব্দই নয়, প্রিয় বচন- মা। প্রিয় অনুভূতি- মা। প্রিয় ব্যক্তি– মা। প্রিয় দেখাশশোনা– মা। প্রিয় রান্না -মা। প্রিয় আদর- মা। সব ‘প্রিয়’গুলোই শুধুমাত্র মাকে কেন্দ্র করেই সব প্রিয় স্মৃতি। কারণ মা-ই পৃথিবীতে একমাত্র ব্যক্তি যে কিনা নিঃশর্ত ভালোবাসা দিয়েই যায় তার সন্তানকে কোনো কিছুর বিনিময় ছাড়া।

মা আমাদের জান্নাত, মা জাহান্নাম। ইসলামের বয়ান। মাকে খুশি করলে জান্নাত, কষ্ট দিলে জাহান্নাম।

কুরআনে আছে, আমি মানুষকে তাদের পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহার করার জোর নির্দেশ দিয়েছি। যদি তারা তোমাকে আমার সাথে এমন কিছু শরীক করার জোর প্রচেষ্টা চালায়, যার সম্পর্কে তোমার কোন জ্ঞান নেই, তবে তাদের আনুগত্য করো না। আমারই দিকে তোমাদের প্রত্যাবর্তন। অতঃপর আমি তোমাদেরকে বলে দেব যা কিছু তোমরা করতে। (আনকাবুত:আয়াত- ৮)।

এরপরও আজকের সমাজে অনেক মাকে আমাদের মতো সন্তানরা মাতৃনিবাসে রেখে আসি। কারণ স্ত্রী-সন্তান নিজে স্বাধীন জীবন যাপন করা। এ সমস্ত সন্তানের পরকালে জায়গা হবে জাহান্নামে।

শেষে মাকে নিয়ে একটি সংগৃহীত কবিতা

"মিথ্যাবাদী মা"


“এতোটা দিন পেরিয়ে আজো মায়ের জন্য কাঁদি
কারণ আমার মা যে ছিলো ভীষণ মিথ্যাবাদী
বাবা যেদিন মারা গেলেন আমরা হলাম একা
সেদিন থেকেই বাঁক নিয়েছে মায়ের কপাল রেখা।

মা বলতো বাবা নাকি তারার ভিড়ে আছে
লেখাপড়া করি যদি নেমে আসবে কাছে।
তারায় তারায় বাবা খুঁজি – তারার ছড়াছড়ি
আমার মায়ের মিথ্যা বলার প্রথম হাতেখড়ি।

পাড়া পড়শী বলল এসে এই বয়সেই রাঢ়ি
একা একা এতোটা পথ কেমনে দিবে পাড়ি।
ভালো একটা ছেলে দেখে বিয়ে করো আবার
মা বললো ওসব শুনলে ঘেন্না লাগে আমার।
একা কেনো? খোকন আছে, বিয়ের কি দরকার
ওটা ছিলো আমার মায়ের চরম মিথ্যাচার।

রাত্রি জাগে সেলাই মেশিন, চোখের কোণে কালি
নতুন জামায় ঘর ভরে যায়, মায়ের জামায় তালি।
ঢুলু ঢুলু ঘুমের চোখে সুই ফোটে মা-র হাতে
আমি বলি শোও তো এবার, কী কাজ এতো রাতে?
মা বলতো ঘুম আসেনা, শুয়ে কী লাভ বল
ওটা ছিলো আমার মায়ের মিথ্যা কথার ছল।

স্কুল থেকে নিতে আসা গাড়ী ঘোড়ার চাপে
আমার জন্য দাঁড়ানো মা কড়া রোদের তাপে।
ঘামে মায়ের দম ফেটে যায়, দু চোখ ভরা ঝিম
ভ্যানিটি ব্যাগ খুলে আমায় দিতো আইসক্রীম
মায়ের দিকে বাড়িয়ে ধরে বলতাম একটা নাও
মলিন হেসে মা বলত- খাও তো বাবা খাও।
আমার আবার গলা ব্যথা ঠান্ডা খাওয়া মানা
ওটা ছিলো আমার মায়ের নিঠুর মিথ্যাপনা।

বড় হয়ে চাকুরী নিয়ে বড় শহরে আসি
টুকটুকে বউ ঘরে আমার বউকে ভালোবাসি।
পশ এলাকায় বাসা নিয়ে ডেকোরেটর ধরে
সাজিয়ে নিলাম মনের মতো অত্যাধুনিক করে।
মা তখনো মফস্বলে কুশিয়ারার ঢালে
লোডশেডিং এর অন্ধকারে সন্ধ্যা বাতি জ্বালে।
নিয়ন বাতির ঢাকা শহর আলোয় ঝলমল
মাকে বলি গঞ্জ ছেড়ে এবার ঢাকায় চল।
মা বললো এই তো ভালো খোলা মেলা হাওয়া
কেনো আবার তোদের ওই ভিড়ের মধ্যে যাওয়া
বদ্ধ ঘরে থাকলে আমার হাপানি ভাব হয়
ওটা ছিলো আমার মায়ের মিথ্যা অভিনয়।

তারপর আমি আরো বড় স্টেটস এ অভিবাসী
বিশ্ব ব্যাংকের বিশেষজ্ঞ সুনাম রাশি রাশি।
দায়িত্বশীল পদে আমার কাজের অন্ত নাই
মায়ের খবর নিব এমন সময় কমই পাই।
মা বিছানায় একলা পড়া খবর এলো শেষে
এমন অসুখ হলো যার চিকিৎসা নেই দেশে।
উড়ে গেলাম মায়ের কাছে অনেক দূরের পথ
পায়ে পড়ি বলি মাকে এবার ফিরাও মত।
একা একা গঞ্জে পড়ে কী সুখ তোমার বলো
আমার সঙ্গে এবার তুমি এ্যামেরিকা চলো।
এসব অসুখ এ্যামেরিকায় কোন ব্যাপার নয়
সাত দিনের চিকিৎসাতেই সমূল নিরাময়।
কষ্ট হাসি মুখে এনে বলল আমার মা
প্লেনে আমার চড়া বারণ তুই কি জানিস না?
আমার কিছু হয়নি তেমন ভাবছিস অযথা।
ওটাই ছিলো আমার মায়ের শেষ মিথ্যা কথা।

কদিন পরেই মারা গেলো নিঠুর মিথ্যাবাদী
মিথ্যাবাদী মায়ের জন্য আজো আমি কাঁদি।”

আমিরুল ইসলাম নয়ন, নির্বাহী সম্পাদক, দ্য রিপোর্ট২৪.কম