দ্য রিপোর্ট ডেস্ক : বাংলা ভাষা, কলা ও সংস্কৃতির বিকাশে অবদান রাখার জন্য স্মরণ করা হয় অক্ষয়কুমার দত্তকে। ভারতে বিজ্ঞান আলোচনার অন্যতম এ পথপ্রদর্শক অন্ধবিশ্বাস ও কুসংস্কারের বিরুদ্ধে সব সময় সোচ্চার ছিলেন। উনিশ শতকের বাংলার নবজাগরণের অন্যতম পথিকৃৎ হিসেবে তিনি স্মরণীয়। এ সাংবাদিক ও লেখক ১৮২০ সালের এই দিনে (১৫ জুলাই) ব্রিটিশ ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলার নবদ্বীপের কাছে চুপী গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন।

তিনি পীতাম্বর দত্ত ও দয়াময়ী দেবী দম্পতির ছোট ছেলে। কলকাতার ওরিয়েন্টাল সেমিনারিতে প্রাথমিক শিক্ষা লাভ করেন। বাবার মৃত্যু ঘটলে স্কুল ছেড়ে কর্মজীবন বেছে নিতে হয়। কিন্তু বাড়িতে গণিত, ভূগোল, পদার্থবিদ্যা, উদ্ভিদবিদ্যা প্রভৃতি বিষয়ে গভীরভাবে অধ্যয়ন করেন। ইংরেজি, বাংলা, সংস্কৃত, ফার্সি ও জার্মান ভাষায় তিনি পাণ্ডিত্য অর্জন করেন।

সংবাদপত্রে লেখালেখির মাধ্যমে অক্ষয়কুমারের লেখক জীবন শুরু। ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত সম্পাদিত ‘সংবাদ প্রভাকর’ পত্রিকায় নিয়মিত লিখতেন। মূলত ইংরেজি সংবাদপত্রের প্রবন্ধ বাংলায় অনুবাদ করতেন। ১৮৩৯ সালে তত্ত্ববোধিনী সভার অন্যতম সভ্য মনোনীত হন ও কিছুদিন সভার সহ-সম্পাদকও ছিলেন। ১৮৪০ সালে তত্ত্ববোধিনী পাঠশালার ভূগোল ও পদার্থবিদ্যার শিক্ষক নিযুক্ত হন। ১৮৪২ সালে নিজস্ব উদ্যোগে বিদ্যা‌দর্শন নামের মাসিক পত্রিকা চালু করেন। তবে পত্রিকাটি বেশিদিন বের হয়নি। ততদিনে লেখক হিসেবে বেশ খ্যাতিলাভ করেন।

অক্ষয়কুমার ১৮৪৩ সালে ব্রাহ্মসমাজ ও তত্ত্ববোধিনী সভার মুখপত্র তত্ত্ববোধিনী পত্রিকার সম্পাদক হন। ১৮৫৫ সাল পর্যন্ত পত্রিকাটি সম্পাদনা করেন। এই পত্রিকায় তার প্রকাশিত প্রবন্ধে সমসাময়িক জীবন ও সমাজ সম্পর্কে নির্ভীক মতামত (জমিদারি প্রথা, নীলচাষ ইত্যাদি সম্পর্কিত মতামত) প্রকাশ পেত। এ সব লেখা পরে বই আকারে প্রকাশিত হয়। তার প্রথম বই ভূগোল (১৮৪১) তত্ত্ববোধিনী পাঠশালার জন্য তত্ত্ববোধিনী সভার উদ্যোগে প্রকাশিত হয়েছিল। দ্বিতীয় বই ‘বাহ্যবস্তুর সহিত মানব-প্রকৃতির সম্বন্ধ বিচার’ (১ম ভাগ ১৮৫২; দ্বিতীয় ভাগ ১৮৫৩)। এর পর চারুপাঠ (১ম ভাগ ১৮৫২, ২য় ভাগ- ১৮৫৪, ৩য় ভাগ- ১৮৫৯), ধর্মনীতি (১৮৫৫), পদার্থবিদ্যা (১৮৫৬), ভারতবর্ষীয় উপাসক-সম্প্রদায় (১ম ভাগ- ১৮৭০, ২য় ভাগ- ১৮৮৩) ইত্যাদি বই প্রকাশিত হয়। চারুপাঠ শিশুপাঠ্য হিসেবে এক সময় জনপ্রিয় ছিল।

১৮৪৩ সালের ২১ ডিসেম্বর দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং আরও ১৯ জন বন্ধুর সঙ্গে রামচন্দ্র বিদ্যাবাগীশের কাছ থেকে ব্রাহ্মধর্মে দীক্ষা নেন অক্ষয়কুমার। তারাই ছিলেন প্রথম দীক্ষিত ব্রাহ্ম। তিনি ছিলেন তত্ত্ববোধিনী সভার সক্রিয় কর্মী। তবে পাশ্চাত্যের বিজ্ঞান ও শিল্পকলার প্রতি তার বিশেষ টান ছিল। ১৯ শতকের ফরাসী দর্শন দ্বারা প্রভাবিত ছিলেন। ধর্মীয় গ্রন্থ বেদে বর্ণিত আত্মা ও বিশ্বব্রহ্মাণ্ড সম্পর্কে বহু ব্রাহ্ম ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করেন। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর দ্বারা প্রভাবিত হয়ে সামাজিক সংস্কারমূলক আন্দোলনে শরিক হন। ধর্ম ও দর্শনের পরস্পরবিরোধী তত্ত্বের বেড়াজালে পড়ে পরবর্তীতে ব্রাহ্মসমাজ ও তত্ত্ববোধিনী পত্রিকা পরিত্যাগ করেন।

অক্ষয়কুমার বার বার মত ও আদর্শ পরিবর্তন করেন। মধ্য বয়সে ফরাসী দর্শন দ্বারা প্রভাবিত হয়ে একাত্মাবাদ গ্রহণ করেন। কিন্তু বৃদ্ধ বয়সে প্রার্থনার প্রয়োজন অস্বীকার করেন। পরিণত হন বৈজ্ঞানিক যুক্তিবাদে বিশ্বাসী অজ্ঞেয়বাদীতে।

বিখ্যাত কবি সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত ছিলেন তার নাতি। বালিগ্রামে 'বোটানিক গার্ডেন' নামের বাড়িতে শেষ জীবন অতিবাহিত করেন। সেখানে ১৮৮৬ সালের ১৮ মে মারা যান।

সূত্র : উইকিপিডিয়া।

(দ্য রিপোর্টে/এফএস/এনআই/জুলাই ১৫, ২০১৬)