২০১৪ সালে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হওয়া ১৭টি কোম্পানির মধ্যে ৬টির অবস্থা নাজুক হয়ে পড়েছে। ৬টি কোম্পানিরই শেয়ারপ্রতি মুনাফা কমে এসেছে। এছাড়া কয়েকটি কোম্পানির উৎপাদন বন্ধ, ব্যবসায় লোকসান, বিনিয়োগের তুলনায় মুনাফার পরিমাণ কমে গেছে।

কোম্পানিগুলো হল- হামিদ ফেব্রিকস, ওয়েস্টার্ন মেরিন, সুহৃদ ইন্ডাস্ট্রিজ, খুলনা প্রিন্টিং অ্যান্ড প্যাকেজিং, এমারেল্ড অয়েল ও মোজাফ্ফর হোসাইন স্পিনিং মিলস।

প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, ২০১৪ সালে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হওয়া কোম্পানিগুলোর মধ্যে খুলনা প্রিন্টিং ও এমারেল্ড অয়েলের উৎপাদন বন্ধ রয়েছে। আর সুহৃদ ইন্ডাস্ট্রিজের ৩ শিফটের উৎপাদন কমে এখন এক শিফটে হয়। সরেজমিনে কোম্পানিগুলোর এ অবস্থা দেখা গেছে। তবে মূল্য সংবেদনশীল তথ্য হওয়া সত্ত্বেও এমারেল্ড অয়েল ও সুহৃদ ইন্ডাস্ট্রিজ কর্তৃপক্ষ এ বিষয়গুলো গোপন রেখেছে। আর উৎপাদন বন্ধ সত্ত্বেও বিক্রয় ও মুনাফা হচ্ছে বলে মিথ্যা আর্থিক হিসাব প্রকাশ করছে এমারেল্ড অয়েল।

লভ্যাংশ দেওয়া বন্ধ হয়ে গেছে ওয়েস্টার্ন মেরিন, সুহৃদ ইন্ডাস্ট্রিজ ও খুলনা প্রিন্টিং অ্যান্ড প্যাকেজিংয়ের। ফলে এই ৩ কোম্পানির ‘জেড’ ক্যাটাগরিতে অবনমন হয়েছে।

এদিকে ৬ কোম্পানিরই ইপিএস কমে এসেছে। এরমধ্যে সুহৃদ ইন্ডাস্ট্রিজ ও খুলনা প্রিন্টিং অ্যান্ড প্যাকেজিং লোকসান গুনছে। আর ওয়েস্টার্ন মেরিন শিপইয়ার্ড কর্তৃপক্ষ আর্থিক হিসাব প্রকাশ করে না। ফলে কোম্পানি ব্যবসায়িক অবস্থা আড়ালে রয়েছে।

নিম্নে ২০১৪ সালে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হওয়া দুর্বল হয়ে আসা ৬ কোম্পানির চিত্র তুলে ধরা হল-

কোম্পানির নাম

ইস্যু দর

বর্তমান দর

আইপিও ইপিএস

সর্বশেষ ইপিএস

লভ্যাংশ

রিটার্ন

ক্যাটাগরি

উৎপাদন

হামিদ ফেব্রিকস

৩৫

২৭.৯

৫.৫৮

১.০১

১৫% নগদ

৪.২৯%

‘এ’

আছে

ওয়েস্টার্ন মেরিন

৩৫

৩৯.৯

২.০৯

হিসাব প্রকাশ বন্ধ

লভ্যাংশ নাই

০০%

‘জেড’

আছে

সুহৃদ ইন্ডাস্ট্রিজ

১০

৯.৯

১.০৯

লোকসানে

লভ্যাংশ নাই

০০%

‘জেড’

কমে এসেছে

খুলনা প্রিন্টিং

১০

৭.৯

২.৮২

লোকসানে

লভ্যাংশ নাই

০০%

‘জেড’

বন্ধ

এমারেল্ড অয়েল

১০

২৭.১

২.৩৯

০.০৭ (৬ মাস)

১০% বোনাস

১০%

‘এ’

বন্ধ

মোজাফ্ফর হোসাইন

১০

২৯.৩

২.৭৮

১.৭২

৫% নগদ

৫%

‘বি’

আছে


দেখা গেছে, রবিবারের (১৬ এপ্রিল) লেনদেন শেষে এই ৬ কোম্পানির মধ্যে হামিদ ফেব্রিকস, সুহৃদ ইন্ডাস্ট্রিজ ও খুলনা প্রিন্টিং অ্যান্ড প্যাকেজিংয়ের শেয়ার দর ইস্যু মূল্যের নিচে রয়েছে। এরমধ্যে আবার সুহৃদ ইন্ডাষ্ট্রিজ ও খুলনা প্রিন্টিং অ্যান্ড প্যাকেজিংয়ের শেয়ার দর অভিহিত মূল্যের নিচে রয়েছে।

হামিদ ফেব্রিকস : কোম্পানিটি ৫.৫৮ টাকা ইপিএস দেখিয়ে শেয়ারবাজারে প্রতিটি শেয়ার ৩৫ টাকা করে ইস্যু করে। তবে শেয়ারবাজারে আসার পরে সর্বশেস ২০১৫-১৬ অর্থবছরে হয়েছে ১.০১ টাকা। এই হিসাবে কোম্পানির ইপিএস কমেছে ৪.৫৭ টাকা বা ৮১.৯০ শতাংশ। যে কোম্পানি শেষ বছরে ১৫ শতাংশ হারে প্রতিটি শেয়ারে ১.৫ টাকা লভ্যাংশ দিয়েছে। যা ৩৫ টাকা হিসাবে বিনিয়োগকারীরা রিটার্ন পেয়েছে ৪.২৯ শতাংশ।

ওয়েস্টার্ন মেরিন শিপইয়ার্ড : প্রতিষ্ঠানটির ২০১৪-১৫ হিসাব বছরের জন্য যথাসময়ে পরিচালনা পর্ষদের সভায় কোম্পানির আর্থিক প্রতিবেদন উপস্থাপন করতে না পারায় লভ্যাংশ ও এজিএম সম্পন্ন করা হয়নি। এজিএম আয়োজনে স্বাভাবিক সময় পেরিয়ে যাওয়ার পর কোম্পানি নিবন্ধকের এখতিয়ারভুক্ত সময়ও পেরিয়ে যায়। এখন এজিএম করতে আদালতের নির্দেশনা লাগবে। যা এখনো নিতে না পারায় ২০১৫-১৬ অর্থবছরের এজিএম এবং লভ্যাংশ আটকে রয়েছে।

সুহৃদ ইন্ডাস্ট্রিজ : ১.০৯ টাকা ইপিএস নিয়ে শেয়ারবাজারে আসা কোম্পানিটি এখন লোকসানে গুনছে। শেষ ৬ মাসে (জুলাই-ডিসেম্বর) শেয়ারপ্রতি লোকসান হয়েছে ০.০৮ টাকা। যাতে কোম্পানির লভ্যাংশ ঘোষণা করতে পারছে না।

খুলনা প্রিন্টিং অ্যান্ড প্যাকেজিং : বিক্রয় বেশি ও অফিস না থকে নিয়ে শেয়ারবাজারে আসার আগের আলোচনায় উঠে আসে কোম্পানিটি। এরপরে ভ্যাট ফাঁকি দেওয়া নিয়ে পড়ে আইনি জটিলতায়। চিটাগাং পোর্টে কোম্পানিটির কাঁচামাল আটকে দেয় এনবিআর কর্তৃপক্ষ। যার আলোকে উৎপাদন বন্ধ করার ঘোষণা দেয় কোম্পানি কর্তৃপক্ষ।

এমারেল্ড অয়েল : বেসিক ব্যাংকের ঋণ জটিলতায় কোম্পানির উৎপাদন বন্ধ হয়ে গেছে। সরেজমিনে এমারেল্ড অয়েলের শেরপুরে কারখানায় গিয়ে দেখা গেছে উৎপাদন কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। যেখানে শুধুমাত্র ১ জন নিরাপত্তারক্ষী ১ জন তত্ত্বাবধায়ক উপস্থিত ছিলেন। অন্যদিকে রাজধানীর বিজয় নগরে অবস্থিত কোম্পানির করপোরেট অফিস প্রায় সময় বন্ধ পাওয়া যায়। এ ছাড়া প্রতিষ্ঠানটি আর্থিক হিসাব প্রকাশেও মিথ্যার আশ্রয় নেয় বলে নিরীক্ষকের নিরীক্ষায় বেরিয়ে এসেছে। তবে প্রতিষ্ঠানটি এসব বিষয় গোপন রেখেছে। আর প্রতিবছর বিক্রয় ও মুনাফা দেখাচ্ছে এবং বোনাস শেয়ার দিচ্ছে।

মোজাফ্ফর হোসাইন স্পিনিং মিলস : শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্তির ৪ বছরের মধ্যে কোম্পানি ‘বি’ ক্যাটাগরিতে নেমে গেছে। ইপিএস কমে এসেছে ১.০৬ টাকা বা ৩৮ শতাংশ। আগের বছরের ১৫ শতাংশ লভ্যাংশ ২০১৬ সালে মাত্র ৫ শতাংশে নেমে এসেছে।

আইপিওতে অনুমোদন দেওয়ার ক্ষেত্রে বিএসইসিকে সচেতন হওয়ার জন্য অনেক আগে থেকে আহ্বান করা হচ্ছে বলে জানান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিন্যান্স বিভাগের অধ্যাপক আবু আহমেদ। কোন কোম্পানিকে আইপিও অনুমোদন দেওয়ার কোম্পানির ভবিষ্যত কেমন হবে তা আগে অবশ্যই গুরুত্বসহকারে দেখা দরকার বলে উল্লেখ করেন। তবে এখনো অনেক কোম্পানি মিথ্যা আর্থিক হিসাবের মাধ্যমে শেয়ারবাজার থেকে টাকা তুলে নিচ্ছে। যা তালিকাভুক্তির পরে উন্মোচিত হচ্ছে।

কোন কোম্পানির ব্যবসায়িক ফলাফলের সাথে বিএসইসির কোন সম্পর্ক নেই বলে জানান প্রতিষ্ঠানটির মূখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক এম সাইফুর রহমান। যেসব কোম্পানি আইপিওতে আসার সব শর্ত পূরণ করে সেসব কোম্পানিকে অনুমোদন দেওয়া হয়। এক প্রশ্নের জবাবে জানান, আইপিও পরবর্তীতে কোন কোম্পানি ফলাফল খারাপ করলে তার জন্য বিএসইসি না ওই কোম্পানির ব্যবস্থাপনা দায়ী।

(দ্য রিপোর্ট/আরএ/এপি/এনআই/এপ্রিল ১৬, ২০১৭)