মো. শামীম রিজভী

দ্য রিপোর্ট

১৫ আগস্ট জাতীয় শোক দিবস বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৪২তম শাহাদাত বার্ষিকীর অনুষ্ঠানে অথবা শোক মিছিলে ‘জঙ্গি’ হামলার আশংকা আগে থেকেই করেছিল গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা।

গোয়েন্দা সূত্রে জানা যায়, নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠনগুলো এদিনে শোক মিছিল বা অনুষ্ঠানে হামলা করার পরিকল্পনা করেছিল এমন তথ্য গোয়েন্দাদের কাছে আগেই এসেছিল। তাই আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করেছিল। ৩২ নম্বরসহ পুরো ধানমণ্ডিতে সন্দেহজনক বাসা ও হোটেলে তারা তল্লাশি চালায়। কিন্তু সোমবার মধ্য রাতের আগে তাদের কাছে সুনির্দিষ্ট কোন তথ্য ছিল না। মঙ্গলবার ভোর রাতে তথ্য পাওয়ার পর পান্থপথের হোটেল ওলিও ইন্টারন্যাশনালে অভিযান পরিচালনা করে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা। পুলিশ সদর দফতর থেকে পুলিশের সকল ইউনিটে নির্দেশনা আসে নিরাপত্তা জোরদার করার জন্য। সে অনুযায়ী ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) যে জঙ্গি তৎপরতা প্রতিরোধে সকল প্রস্তুতি গ্রহণ করে। জঙ্গিরা হামলার জন্য বিশেষ দিনটি বেছে নিয়েছে কারণ তারা সহজ লক্ষ্যগুলি পাবে এবং কর্মসূচিতে ক্ষমতাসীন দলের নেতা-কর্মীরা সমবেত থাকবে।

গোয়েন্দাদের কাছ থেকে আরও জানা যায়, যদি নিষিদ্ধ সংগঠনের বড় অনুষ্ঠানে হামলার লক্ষ্য ব্যর্থ হয়, তাহলে তারা এ মাসেই যে কোনও সময়ে আক্রমণের আরও পরিকল্পনা করতে পারে। ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার দিনও তাদের পরবর্তী হামলার পছন্দের দিন হতে পারে। ১৭ আগস্ট সিরিজ বোমা বিস্ফোরণের দিনেও জঙ্গি হামলার আশংকা ছিল আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর। তাই এ সকল হামলা প্রতিরোধে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের হাই অ্যালার্ট করে দেওয়া হয়েছিল আগেই। মাসিক ক্রাইম কনফারেন্সে ডিএমপি কমিশনারও পুলিশের সকল ইউনিটকে সতর্ক হয়ে যেতে বলেন, যাতে করে রাজধানীতে কোন ধরনের হামলার ঘটনা না ঘটে। কারণ আগস্ট মাস এলেই নিষিদ্ধ সংগঠনের সদস্যরা বেশি সক্রিয় হয়ে নিজেদের অবস্থান প্রকাশ করতে চায়। নিষিদ্ধ সংগঠনের সদস্যরা মনে করে ১৫ আগস্ট জাতীয় শোক দিবস, ১৭ আগস্ট সিরিজ বোমা হামলা ও ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার ঘটনা যেহেতু এই মাসে, সেহেতু আগস্টে কোন বড় জঙ্গি হামলা করলে জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে তারা বেশি প্রচারণা পাবে।

ডিএমপি সূত্রে জানা যায়, সন্দেহজনক বাসা বা হোটেল তল্লাশির সময় নিউমার্কেট থানার ওসি আতিকুর রহমানের নেতৃত্বে পুলিশের একটি টিম ৩২ নম্বর রোডের পেছনে শুক্রাবাদ ও পান্থপথ এলাকায় অভিযান চালায় সোমবার মধ্যরাতের দিকে। পান্থপথের হোটেল ওলিও ইন্টারন্যাশনারলের নিচ তলায় এসে পুলিশ জানতে পারে ওই হোটেলের ১৩ জন বর্ডার রয়েছে। ম্যানেজার জসিমকে সঙ্গে নিয়ে পুলিশ প্রতিটি কক্ষ তল্লাশি করে। ৩ তলায় ৩০১ নম্বর কক্ষে দরজায় নক করার সঙ্গে সঙ্গে ভেতর থেকে বলা হয়, ‘এখন অনেক রাত, কাল সকালে কথা হবে’। ওসি তখন দরজার পাশের জানালাটি খোলার অনুরোধ করেন। ভেতর থেকে জানালাটি খুললে ওসি বাইরের বিদ্যুতের সুইচ অন করে দেন। এতে তিনি দেখতে পান- ভেতরে একজন যুবক কালো রঙের ট্রলি ব্যাগ হাতে নিয়ে জানালার দিকে এগিয়ে আসছে। ওসি তখন বাইরে থেকে দরজা লক করে দেন। মুহূর্তের মধ্যে তিনি বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের জানান। হোটেলের রেজিস্ট্রার বই ঘেঁটে ওসি জানতে পারেন, গত ১৩ আগস্ট খুলনা থেকে খাইরুল নামে ওই যুবক হোটেলে ওঠে। তবে রেজিস্ট্রার বইয়ের স্বাক্ষরের স্থানে সাইফুল ইসলাম নামে স্বাক্ষর করা।

হোটেলটির মালিক নুরুল ইসলাম দ্য রিপোর্টকে জানান, রাতে থেকেই পুলিশ তৎপর ছিলো। রবিবার সন্ধ্যা সাড়ে সাতটার দিকে শের-ই-বাংলানগর থানার ওসি পাশের হোটেল ওলিও হ্যাভেনে আর নতুন কোন অতিথি তুলতে না করেন। সে সময় তিনিও তার হোটেলে নতুন অতিথি তোলা বন্ধ করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তার হোটেলটি কলাবাগান থানা এলাকায় পড়ায় তিনি তখন তাৎক্ষনিক কোন সিদ্ধান্ত নিতে পারেননি। সোমবার রাতে হোটেলের ম্যানেজার তাকে জানান যে হোটেলের এক অতিথির চলাচল সন্দেহজনক এবং ওই অতিথির কক্ষে উঁকি দিয়ে বৈদ্যুতিক তার দেখা গেছে। পরে পুলিশ আসলে ব্যাপারটি জানানো হয়।

হোটেল ওলিও ইন্টারন্যাশনাল ও ওলিও হ্যাভেন নামের দু’টি হোটেলেরই মালিক হোটেল এরাম ইন্টারন্যাশনালের মালিক মুক্তিযোদ্ধা ফিরোজ চৌধুরী। হোটেল ওলিও গত মার্চ মাস থেকে লিজে চালাচ্ছেন নুরুল ইসলাম।

ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার ও কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটি) ইউনিটের প্রধান মনিরুল ইসলাম বলেন, ১৫ আগস্টকে কেন্দ্র করে নাশকতার পরিকল্পনা করছিল নব্য জেএমবির একটি সেল। মিছিলে ঢুকে আত্মঘাতী বোমার বিস্ফোরণ ঘটিয়ে নাশকতার মাধ্যমে তারা সংগঠনের অস্তিত্ব জানান দিতে চেয়েছিল। ওই পরিকল্পনা সফল করতে চলতি মাসের ৭ তারিখে নিহত সাইফুল ইসলাম চাকরির কথা বলে বাড়ি থেকে ঢাকায় এসেছিল। গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে আমরা এ সব তথ্য নিশ্চিত হওয়ার পর ধানমণ্ডি ৩২ নম্বরের আশপাশের তিনটি এলাকায় ব্লক রেড চালাই। পরে নিশ্চিত হই একজন এই হোটেলে অবস্থান করছে। তখন ওই রুমে বাইরে থেকে তালা দিয়ে দেওয়া হয়।

তিনি আরও বলেন, মঙ্গলবার সকালে সোয়াট সদস্যরা তাকে আত্মসমর্পণের অনুরোধ করেন। সাড়া না দিলে অভিযান শুরু হয়। সোয়াট সদস্যরা গুলি করতে করতে ভেতরে ঢুকে গ্যাস ছোড়ে। তখন একটি বিস্ফোরণে দরজা ভেঙে যায় আর বোমাসহ সাইফুল বেরিয়ে আসে। সোয়াট গুলি চালালে সে আত্মঘাতী বিস্ফোরণ ঘটায়। তার কাছে তিনটি শক্তিশালী বোমা ছিলো যার একটি অবিস্ফোরিত ছিল, সেটি নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে। হোটেলের রেজিস্টারে উল্লেখিত তথ্য নিয়ে স্থানীয়ভাবে যোগাযোগ করে জানা যায় নিহত সাইফুল বিএল কলেজের রাষ্ট্রবিজ্ঞান ৩য় বর্ষ’র ছাত্র ছিল। তার বাবার নাম আবুল খায়ের। তিনি জামায়াতের রাজনীতি করতেন। তাদের বাড়ি খুলনার ডুমুরিয়ায়।

এদিকে আমাদের খুলনা প্রতিনিধি জানিয়েছেন, নিহতের চাচা আব্দুর রউফ মোল্লা দাবি করেছেন, সাইফুল নিহতের ঘটনা পুলিশের মিস ফায়ারে হয়েছে। নিজেকে ছাত্রলীগের সাবেক নেতা দাবি করে রউফ মোল্লা বলেন, হোটেলে হয়তো আসে পাশে কেউ ছিল। তাদের ধরতে না পেরে পুলিশের নিজেদের পদোন্নতির জন্য সাইফুলকে জঙ্গি বানানো হয়েছে।

(দ্য রিপোর্ট/এমএসআর/আগস্ট ১৫, ২০১৭)