মহিউদ্দীন মোহাম্মদ

কদিন ধরেই গোটা ভারতজুড়ে একটাই বিতর্ক চলছিল, যার রেশ এখনো রয়েছে। ভারতের সাবেক রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জী উগ্রজাতীয়তাবাদী দল আরএস (রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘ)-এর আমন্ত্রণে নাগপুরে যাচ্ছেন। পরে গেলেনও তাদের সদর দফতরে। প্রিয়জনদের তুমুল আপত্তি সত্ত্বেও বৃহস্পতিবার আরএস'র মঞ্চে ভাষণ দেন তিনি। সারাটা জীবন যার পাত হলো কংগ্রেসের রাজনীতিতে। ওই দলের দর্শনে একাত্মহয়েই জীবনের এই সায়াহ্ন বেলায় এ কী করলেন প্রণব বাবু? আজ কিনা সব কিছু তার বিসর্জন দিয়ে বিষঅর্জন করতে হলো? মেনে নিতে পারেন নি সুধিজনেরা। কেননা যারা তাকে আমন্ত্রণ জানিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন তারা ভারতবর্ষে চূড়ান্ত সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্প ছড়িয়ে দিয়েছে। সহিষ্ণু পথের বদলে অসহিষ্ণুতার আগুন ছড়িয়েছে সবখানে। তাদেরই আমন্ত্রণে সাড়া দিলেন তিনি-এটা মানা সম্ভব হয়নি বলেই অনেক প্রশ্ন উদয় হয়েছে। সেই প্রশ্নের উত্তর খোঁজারও চেষ্টা চলছে নানা ভাবে। এমনকি তিনি ভবিষ্যতে প্রধানমন্ত্রী হওয়ার খায়েশ দেখছেন কিনা প্রশ্ন তোলা হয়েছে। বলা হয়েছে ভারতে এমন রেকর্ড নেই যে, সাবেক রাষ্ট্রপতি পরবর্তীতে কখনো প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন। কিন্তু প্রণব বাবু কি সেই রেকর্ড গড়তে যাচ্ছেন? এইভাবে প্রশ্নের পাহাড় জমেছে।

উনার যাওয়ার খবরে অনেকের মতো তার কন্যা-ও কম ক্ষুব্ধ হননি। কন্যা শর্মিষ্ঠা মুখার্জি বলেন, যা ভয় ছিল তাই হল। যোগদানের আগের দিন তিনি তার বাবাকে আরএসএস-এর সভায় যোগদান করতে নিষেধ করেছিলেন, বুধবার তিনি একটি টুইট করে নিজের মতামত প্রকাশ করেন ।

তার পিতাকে তিনি বারংবার সতর্ক করা সত্ত্বেও তিনি তার কোনো কথা কানে নেন নি। তিনি অভিযোগ করেন যে তার ভয় ছিল, এটা বিজেপি/আরএসএস-এর 'একটা ঘৃণ্য চাল', আর সেটাই সত্যি বলে প্রমাণিত হল। তিনি বলেন যে সোশ্যাল মিডিয়ার কারসাজির জন্য একটা ছবি দেখে এটাই মনে হচ্ছে, প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি আরএসএস-এর নেতা এবং কর্মীদের মত অভিবাদন করছেন। শর্মিলা মুখার্জী রুচি শর্মা এর একটি টুইটকে রিটুইট করেছেন যেখানে দুটি ছবি আছে। তার মধ্যে একটিতে শ্রী প্রণব মুখার্জিকে সঙ্ঘের কালো টুপি মাথায় দেখা যাচ্ছে। পরে অবশ্য এটাকে অনেকে গুজব বলে উড়িয়ে দিয়েছেন।

অন্যদিকে কংগ্রেস জানিয়েছে যে, আরএসএস-এর সভায় শ্রী প্রণব মুখার্জির ছবি দেখে পার্টির লক্ষাধিক কর্মী এবং যারা বিশ্বাস করেন যে ভারত বৈচিত্রের মধ্যেও ঐক্য, তাদের আবেগ খুবই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।আরএসএস-এর সম্পর্কে কংগ্রেসের মন্তব্য হলো-''ইংরেজদের বিরুদ্ধে স্বাধীনতা সংগ্রামের সময় আরএসএস তাতে অংশ গ্রহণ করেনি। ব্রিটিশ আমলে তারা ঔপনিবেশিক শক্তির অধীনেই নিজেদের জীবন কাটিয়েছে। ১৯৩০ সালে যখন গান্ধীজি লবন-সত্যাগ্রহ আন্দোলন শুরু করেন তখন হেডগেওয়ার বলেছিলেন যে, সঙ্ঘের এই আন্দোলনের সাথে কোনো রকম সম্পর্ক নেই।'' পার্টির তরফ থেকে আরও বলা হয়েছে যে, ''আরএসএস আগে কোনো দিন তিরঙ্গার সম্মান করেনি, বর্তমানে তাদের ভারতমাতা নিয়ে এত মাতামাতি করতে দেখা যাচ্ছে।'', কংগ্রেস আরো বলেছে যে, ''গান্ধীজিকে যখন হত্যা করা হয়েছিল তখন আরএসএস-এর লোকেরা আনন্দ করেছিল, মিষ্টি বিতরণ করেছিল। বিনায়ক দামোদর সাওয়ারকর ব্রিটিশ সরকারের কাছে ক্ষমা চেয়েছিল এবং তিনি তাদের ভরসার পাত্র হয়ে উঠেছিল। জেলে থাকার সময় সে বহুবার দয়া ভিক্ষা করেছে।''

সভায় যাওয়া নিয়ে সবাই যখন প্রশ্ন তুলেছেন তখন পার্টির অভিষেক সিঙ্ঘভি বলেছেন যে, প্রণব দা সভায় গেছেন, সেটা কোনো সমস্যা নয়,কিন্তু তিনি সভায় দাঁড়িয়ে যে কথা গুলি বলেছন , সেগুলি অবশ্যই বিশ্লেষণ করে দেখা জরুরি।

দগদগে যে ক্ষত তিনি হঠাৎ তৈরি করলেন তা মেনে নিতে সত্যিই কষ্ট হচ্ছে, তাই প্রশ্ন আসছে বিভিন্ন কর্নার থেকে। আরএসএস-এর আমন্ত্রণে প্রণব মুখোপাধ্যায় সাড়া দেওয়ায় যে কংগ্রেস দলে তিনি ২০১২ সালে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার আগেও প্রায় পাঁচ দশক ছিলেন, সেই দলের কর্মীদের মনে অসন্তোষ সৃষ্টি করেছে।

কংগ্রেস যে প্রণবের ভূমিকায় খুশি নয় তা সরাসরিই জানিয়ে দিয়েছে সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে। ‌পার্টির মুখপাত্র রণদীপ সিং সুরজেওয়ালা একগুচ্ছ প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়েছেন আরএসএস–‌বিজেপির দিকে। জানতে চাইলেন, ওরা কি অন্যের মত শুনতে প্রস্তুত?‌ ভারতের যে বহুত্ববাদ, অহিংসা এবং ধর্মনিরপেক্ষতার ঐতিহ্য আছে তা কি তারা রক্ষা করতে আগ্রহী?‌ তারা কি তৈরি মহিলা, দলিত, পিছিয়েপড়া শ্রেণীকে নিয়ে যে সব কুসংস্কার আছে, তা পরিত্যাগ করতে?‌ বৈজ্ঞানিক মানসিকতা, ভাবনাকে গ্রহণ করতে?‌ ভারতের ভিত্তি দাঁড়িয়ে আছে তার দেশ ও মানুষকে নিয়ে। আর তা আছে মূল্যবোধ, আত্মত্যাগ আর ঔদার্যের ওপর। অহিংসা নীতির ওপর। আরএসএস কি তা স্বীকার করে?‌ তারা কি গান্ধীজি, বাবাসাহেব আম্বেদকার বা রামমনোহর লোহিয়ার পথে চলতে প্রস্তুত?‌ প্রণববাবু যে সাংবিধানিক জাতীয়তাবাদ ও ধর্মনিরপেক্ষতার কথা বলেছেন, তা কি তারা মেনে চলতে পারবে?‌ আরএসএস–‌এর মোহন ভাগবত এবং বিজেপি–‌র নরেন্দ্র মোদিকে এই সব প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে।

লেখক: সাংবাদিক