ড. মো. মনজুর রহমান

(পূর্ব প্রকাশের পর) নজরুলের বিশ্ববোধ প্রকাশিত হয়েছে তাঁর ছোটগল্পগুলোতে। ব্যথার দান গল্পগ্রন্থের ‘হেনা’ ও ‘ব্যথার দান’ গল্পে বিপ্লবের পরের রুশ দেশের প্রতি নজরুল যে বিশেষভাবে আকৃষ্ট হয়েছিলেন তার পরিচয় পাওয়া যায়। আলোচ্য গল্পের নায়কেরা- দারা ও সয়ফুল্মুল্ক পাহাড়-পর্বত অতিক্রম করে লালফৌজে যোগ দিচ্ছে। দেখা যাচ্ছে, নজরুল আইরিশ বিদ্রোহ ও রুশবিদ্রোহ সম্পর্কে খোঁজখবর রাখতেন। নজরুলের তিনটি গল্পগ্রন্থে মোট আঠারোটি গল্প আছে। এ গল্পগুলোর মধ্যে দুটিতে মধ্যপ্রাচ্যের বেশ কিছু দেশের এবং ইউরোপের কোনো কোনো অঞ্চলের প্রেক্ষাপট আছে। ‘ব্যথার দান’ গল্পে খোলেস্তান, বোস্তান এবং ‘হেনা’ গল্পে ফ্রান্সের ভার্দুন, ট্রেঞ্চ, সিঁন নদীর তীর, প্যারিসের পাশের ঘন বন, হিন্ডেনবার্গ লাইন, বেলুচিস্তান, পেশোয়ার, কাবুল প্রভৃতি স্থানের নাম উল্লেখ আছে। ‘রিক্তের বেদন’ গল্পের পটভূমি বাংলাদেশ থেকে শুরু করে লাহোর, নৌশারা, কুর্দিস্তান, কারবালা, আজিজিয়া, কুতল আমারা, করাচি পর্যন্ত বিস্তৃত।

প্রবন্ধগুলোতেও নজরুলের বিশ্ববোধের পরিচয় মেলে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তীকালে বাংলায় তথা ভারতবর্ষে মার্কস-এঙ্গেলসের স্বপ্নের ও লেনিনের সংকল্পের রূপায়ণে অনুপ্রাণিত কবি নজরুল ইসলামই সর্বপ্রথম শোষিত, দলিত, বঞ্চিত, লাঞ্ছিত, নিপীড়িতে হয়ে সমাজ-রাষ্ট্রে তাদের স্বাধিকার প্রতিষ্ঠায় প্রতিজ্ঞাবাক্য উচ্চরণ করেছিলেন। আর সেই বিশ্বপ্রেমিকতার, আন্তর্জাতিক চেতনার প্রবল উৎসারণ লক্ষ করা যায় তাঁর রুদ্রমঙ্গল প্রবন্ধ গ্রন্থে-

হে আমার অবহেলিত, পদপিষ্ট কৃষক, আমার মুটে-মজুর ভাইরা, তোমার হাতের এ লাঙল অত্যাচরীর বিশ্ব উপড়ে ফেলুক, উল্টে ফেলুক। আন তোমার হাতুড়ি, ভাঙ এই উৎপীড়কে প্রাসাদ, ধূলায় লুটাও অর্থপিশাচ বলদর্পীর শির, ছোঁড় হাতুড়ি,চালাও লাঙল, উচ্চে তুলে ধর তোমার বুকের রক্তে মাখা লাল ঝাণ্ডা। [ রুদ্রমঙ্গল ]

বিশ্বমানবের বেদনার অনুভূতির সঙ্গে তাঁর অন্তর-অনুভূতির যোগসাধন হয়েছে বলেই তাঁর রচনায় বিশ্বমানবের কাঙ্ক্ষিত সাম্যবাদে প্রকাশ লক্ষ্য করা যায়। ‘নবযুগ’ প্রবন্ধে নজরুল রুশ বিপ্লব, আয়ারল্যান্ডের স্বাধীনতা সংগ্রাম, সামাজতান্ত্রিক শৃঙ্খলমুক্ত নবীন তুরস্ক এবং পরাধীন ভারতবর্ষের মুক্তির সংগ্রামকে একসূত্রে গ্রথিত করেছেন। নজরুলের সাহ্যিতিক-সাংবাদিক জীবনের সূচনা থেকেই তাঁর জাতীয় ও আন্তর্জাতিক চেতনার পরিচয় পাওয়া যায়। ঐ সমাজের ভিন্ন ভিন্ন সংগ্রামের প্রকৃতি ভিন্ন ভিন্ন হলেও তিনি মানুষের মুক্তিসংগ্রামের কোনো প্রভেদ লক্ষ্য করেননি। সংগ্রামের চিত্র তুলে ধরাই ছিল তাঁর মুখ্য উদ্দেশ্য-

রুশিয়া বলিল, মারো অত্যাচারীকে! ওড়াও স্বাধীনতা বিরোধীর শির। ভাঙো দাসত্বের নিগড়, এই বিশ্বে সবাই স্বাধীন! মুক্ত আকাশের এই মুক্ত মাঠে দাঁড়াইয়া কে কাহার অধীনতা স্বীকার করিবে? ... আল্লাহ আকবর বলিয়া তুর্কী সাড়া দিল... আইরিশ উঠিয়া দাঁড়াইয়া বলিল, যুদ্ধ শেষ হয় নাই, এখন বিশ্বে দানবশক্তির বজ্রমুষ্টি আমাদের টুটি টিপিয়া ধরিয়া রহিয়াছে। [ নবযুগ : নবযুগ ]

অক্টোবর বিপ্লব থেকে রুশ দেশের জনগণ যা পেয়েছিলেন, সে পাওয়াকে কবি সমগ্র বিশ্বের জনগণের পাওয়া বলে প্রচার করেছেন। ভারতসহ বিশ্বের বিভিন দেশের জনপ্রতিনিধিরা সেজন্যে লালফৌজকে সাহায্য করতে এগিয়ে এসেছিলেন। বস্তুতপক্ষে, নজরুল ইসলাম ‘নবযুগ’ প্রবন্ধে রাশিয়া, আয়ারল্যা- ও তুরস্কে সংগ্রাম উল্লেখ করে বিশের দশকে ভারতের জাগরণের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটের পরিচয় দিয়েছেন। নজরুল স্বদেশের মুক্তিসংগ্রামকে বিশ্বের মুক্তি সংগ্রামের সঙ্গে একসূত্রে গেঁথেছেন। নজরুলের প্রথম প্রকাশিত প্রবন্ধ ‘তুর্ক মহিলার ঘোমটা খোলা’। তিনি এ প্রবন্ধে আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে প্রথম বক্তব্য উপস্থাপন করেছেন। ‘তুর্কি মহিলারা সুন্দরী নয়’-এরকম একটি মন্তব্যের প্রতিবাদে প্রবন্ধটি রচিত। কারণ তিনি তুরস্কের কামাল পাশা ও তাঁর ধর্মনিরপেক্ষ চিন্তাধারার সমর্থক ছিলেন। কামালের নেতৃত্বে ধর্মনিরপেক্ষ তুরস্ক প্রতিষ্ঠা হলে তা বিশ্বের বহু মুসলিমকে আকর্ষণ করে। ‘নবযুগ’ প্রবন্ধে নজরুল রুশবিপ্লব, আয়ারল্যান্ডের স্বাধীনতা সংগ্রাম, সামন্ততান্ত্রিক শৃঙ্খলমুক্ত নবীন তুরস্ক এবং পরাধীন ভারতে মুক্তিসংগ্রামকে এক সুত্রে গেঁথেছেন। এ প্রবন্ধে নজরুল বিশ্বসাহিত্য সম্পর্কে যে মূল্যবান আলোচনা করেছেন, তা তাঁর বিশ্ববোধ বুঝে নেওয়ার জন্য যথেষ্ট সহায়ক হবে। নজরুলের ‘রুদ্রমঙ্গল’ প্রবন্ধে আন্তর্জাতিক চেতনার প্রবল উৎসারণ লক্ষ্য করা যায়। প্রবন্ধকার বলেছেন :

হে আমার অবহেলিত পদপিষ্ট কৃষক, আমার মুটে-মজুর ভাইরা! তোমার হাতের এ-লাঙ্গল ... অত্যাচরীর বিশ্ব উ’পড়ে ফেলুক-উল্টে ফেলুক! আন তোমার হাতুড়ি, ভাঙ ঐ উৎপীড়কের প্রাসাদ- ধূলায় লুটাও অর্থ-পিশাচ বল-দর্পীর শির, (রুদ্রমঙ্গল, ন.র, ১ম খণ্ড, বা.এ, ১৯৮৩, পৃ. ৬৯৩-৬৯৪)।

প্রতি-ভাষণে নজরুল নিজেকে সুন্দরের পূজারী এক সার্বজনীন মানুষ হিসাবে পরিচয় দিয়ে বিশ্ববোধের প্রকাশ ঘটিয়েছেন। তিনি বলেন : ‘আমি এই দেশে এই সমাজে জন্মেছি বলেই শুধু এই দেশেরই এই সমাজেরই নই। আমি সকল দেশের ,সকল মানুষের’ (প্রতি-ভাষণ, ন.র, ৪র্থ খণ্ড, বা.এ, ১৯৯৩)।

তিনি চিঠিতেও বিশ্ববোধের পরিচয় দিয়েছেন। অধ্যক্ষ ইব্রাহীম খাঁর প্রশ্নের উত্তরে লিখিত পত্রে নজরুলের বিশ্বমানবের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা প্রতিবিম্বিত হয়েছে। তিনি বলেছেন :‘আমি মানুষকে শ্রদ্ধা করি-ভালোবাসি। স্রষ্টাকে আমি দেখিনি, কিন্তু মানুষকে দেখেছি। এই ধূলিমাখা পাপলিপ্ত অসহায় দুঃখী মানুষই একদিন বিশ্ব নিয়ন্ত্রণ করবে’ (চিঠি ন. ৩০ ,ন.র, ৪র্থ খণ্ড, বা.এ, ১৯৯৩) ।

শেষকথা

নজরুল আমাদের জাতিসত্তার অন্যতম রূপকার, স্বাধীনতার পথিকৃৎ, সামনে চলার প্রেরণা। নজরুলের অবিনাশী কবিতা, গান, গল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ-নিবন্ধ, নাটক-নাটিকা আমাদের অন্ধকারে পথ দেখায়। তাঁর সৃষ্টি অনাচার-অত্যাচার, জুলুম-নিপীড়নের বিরুদ্ধে বিদ্রোহী হতে উৎসাহী করে। ভাঙার গান দিয়ে যিনি আবার গড়ার স্বপ্নে বিভোর করেন, তিনিই তো জাতির শ্রেষ্ঠ রূপকার। নজরুল শুধু অঞ্চল বা দেশজ সঙ্কীর্ণ ধারায় গণ্ডিবদ্ধ ছিলেন না, প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার স্বল্পতা সত্ত্বেও শৈল্পিক একাগ্রতা নিয়ে তিনি দৃষ্টি ফেলেছেন বহির্বিশ্বে। তিনি দৃষ্টি যত প্রসারিত করেছেন, বিশ্ব ততই তাঁর কাছে নিকটজন হয়েছে। শুধু আদর্শ নয়, চিত্তপ্রকর্ষেও নজরুল বিশ্বমেলা থেকে সম্পদ আহরণ করেছেন। নজরুল-শিল্পের প্রাণ ও প্রতিষ্ঠার অন্যতম প্রধান অবলম্বন তাঁর বিশ্বজাত অভিজ্ঞতা। নজরুল আমাদের সবার জন্য অনুকরণীয়, অনুস্মরণীয় ও ঔৎসুক্যের এক বিস্ময়কর অধ্যায়।

লেখক : অধ্যাপক, বাংলা বিভাগ, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া

(দ্য রিপোর্ট/একেএমএম/আগস্ট ২৭,২০১৮)