পাভেল চৌধুরী

আবু সালেহ্ তোতা-তোতা ভাই, চলে গেলেন, বয়স ৬৮/৬৯ বছর হবে, সেপ্টেম্বর মাসের ২৩ তারিখে, স্থানীয় এক হাসপাতালে, চিকিৎসাধীন অবস্থায়।

যদিও ‘জন্মিলে মরিতে হবে’ ‘মৃত্যুই জীবনের অমোঘ সত্যি’ এ ধরণের আপ্তবাক্যের সাথে আমরা পরিচিত তারপরও কোন মানুষের মৃত্যু যদি একেবারে অপ্রত্যাশিত আকস্মিকভাবে হয় তবে সে ক্ষেত্রে বিমূঢ় না হয়ে উপায় থাকে না।

তোতা ভাই হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন গলব্লাডারে অপারেশনের জন্য। মামুলি ধরণের অস্ত্রপচার। উদ্বিগ্ন হওয়ার কারণ ছিলো না। তিনি নিজেও উদ্বিগ্ন ছিলেন না, তার ঘনিষ্ঠ বন্ধুবান্ধবরাও না। শোনা যায় অস্ত্রপচার সফল হয়েছিলো, কিন্তু মারা গেলেন হৃদযন্ত্র বিকল হয়ে। দোষটা কি তাহলে হৃদযন্ত্রেরই? আমাদের শহরে শুধু না, সারা বাংলাদেশ জুড়েই এখন হাসপাতালের বাহার। সুদৃশ্য সব ভবন, সিনেমার নায়কদের মতো বিশাল ডিগ্রিধারী ডাক্তারদের সচিত্র বিজ্ঞাপন। কিন্তু হাসপাতাল মানে তো শুধু বিল্ডিং না, ডিগ্রিধারী ডাক্তারও না। হাসপাতাল মানে সুচিকিৎসার ব্যবস্থাপনা। তার জন্যে দরকার ভবন, ডাক্তার, রোগী পরিচর্যাকারী, প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ইত্যাদি। এসবের উপর নির্ভর করেই একটা হাসপাতালের চিকিৎসার পরিধি নির্ধারিত হয়। এই নির্ধারণ যদি যথাযথ না হয় সে ক্ষেত্রে নানা ধরণের বিপর্যয় হতে বাধ্য।

‘চিকিৎসা সেবা’ অত্যন্ত বিজ্ঞাপন পারদর্শী দক্ষ প্রচার অনুযায়ী আমাদের বেসরকারি হাসপাতালগুলো যে সেবা দেয়, সেই সেবার অন্তরাল উদ্দেশ্য যদি হয় অর্থ উপার্জন তবে সেটা আর সেবা থাকে না, সেটা হয়ে যায় ব্যবসা, চিকিৎসা ব্যবসা, আর সেই ব্যবসার উপকরণ হয় মানুষের অসুখ, ক্ষেত্র বিশেষে মানুষের জীবনও। এই ব্যবসা এখন চলছে পৃথিবীজুড়ে কিন্তু অন্যান্য দেশের তুলনায় আমাদের দেশের পার্থক্য এই যে অন্যান্য দেশে এই ব্যবসায় এক ধরণের শক্ত জবাবদিহিতা থাকে, আমাদের দেশে বলা যায় মোটেই নেই। একজন রোগীর অহেতুক ভোগান্তি হোলো কি না, ভুল চিকিৎসায় মারা গেলো কি না, ব্যবস্থাপনার ক্রটি হোলো কি না, এসব ব্যাপারে ডাক্তার কিংবা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সামান্য কোনো দায়বদ্ধতা নেই। লক্ষ তাদের একটাই,- টাকা। সেই টাকা যাতে পকেটস্থ হয় সে ব্যাপারে কি ডাক্তার, কি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ, একেবারে মরিয়া। বড়ো ডাক্তার বলতে আমরা সাধারণত বুঝি বড়ো ডিগ্রি। সে কারণে ডাক্তাররা নিজের বড়োত্ব বোঝাতে বিজ্ঞাপনে নিজের সুদৃশ্য ছবি যেমন ছাপে তেমন ডিগ্রির লেজ যাতে লম্বা করে ছাপা যায় সে ব্যাপারেও বিভিন্ন কৌশল নিয়ে থাকে। দেখা যাবে এমন সব তথাকথিত বড়ো বা বিখ্যাত ডাক্তার এমন সব হাসপাতালের অধীনে এমন সব অপারেশন করছেন যেখানে আসলে অপারেশনের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থাপনাই নেই। অপারেশনের পূর্ব বা পরবর্তী ব্যবস্থাপনা বলে যে অত্যন্ত প্রয়োজনীয় একটা বিষয় আছে সে রকম কোনো ব্যবস্থাপনাই সেখানে নেই। কিন্তু তাতে কিছু এসে যাচ্ছে না, লক্ষ্য যেহেতু টাকা কাজেই টাকাটা পকেটস্থ করতে পারলেই দায়িত্ব শেষ। কসাইদের কাছে যেমন পশু জবাই করতে পারাটাই মূল বিষয়; পশু সুস্থ না অসুস্থ; ভোক্তাদের জন্য ক্ষতিকর হবে কিনা ইত্যাদি বিষয় যেমন তাদের বিবেচ্য না, ডাক্তাররাও যেন তেমনই। এই জন্যেই যেন, আগে যেমন একজন ডাক্তার মানুষের কাছে ত্রাতা হিসেবে সম্মানিত হোতেন, এখন আর তেমন হন না। এখন বরং ডাক্তারদের ‘কসাই’ বলতেই মানুষ পছন্দ করে।

এ রকম কোনো অপারেশন পরবর্তী অব্যবস্থাপনার জন্য যদি তোতা ভাইয়ের মৃত্যু হয়ে থাকে তবে সেটা শাস্তিযোগ্য অপরাধ। এর সুস্থ তদন্ত হওয়া দরকার, অন্যথায় মনে করা ভালো, কোনো রকম প্রতিকার ছাড়া এ রকম ঘটনা আকছারই ঘটতে থাকবে।

যতোদূর জানি সাংস্কৃতিককর্মী হিসেবে তোতা ভাইয়ের জীবন শুরু। যশোরের ঐতিহ্যবাহী সঙ্গীত প্রতিষ্ঠান ‘সুরবিতান সঙ্গীত একাডেমি’কে কেন্দ্র করেই ছিলো তার কর্মকান্ড। ভালো তবলা বাজাতেন, মঞ্চে তাঁর তবলার সংগত অনেকেই প্রত্যক্ষ করেছেন। পরবর্তীতে তিনি রাজনীতিতে যুক্ত হন, পাকিস্তান আমলে। তখন পূর্ব বাংলা ছাত্র ইউনিয়ন নামে একটা বেশ গম্ভীর ধরণের ছাত্র সংগঠন ছিলো। পারতপক্ষে এটা ছিলো কোনো কমিউনিস্ট পার্টির অঙ্গ সংগঠন।

যশোরে পূর্ব পকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের দাপট ছিলো কিন্তু পূর্ব বাংলা ছাত্র ইউনিয়নের গুরুত্বও কম ছিলো না। তোতা ভাই, রুমি ভাই, অশরাফ ভাই, ধীরা ভাই প্রমূখ, বাহ্যত এরা সবাই ছিলেন এই ছাত্র সংগঠনের সক্রিয় কর্মী। কিন্তু এদের গোপন রাজনৈতিক তৎপরতা ছিলো। দেশের সংখ্যা গরিষ্ঠ মানুষের মুক্তির প্রশ্নে ছিলো প্রগাঢ় অঙ্গিকার আর বিশ্বাস। যে কেনো ধরণের ত্যাগ স্বীকারের নিমিত্ত এরা ছিলেন প্রস্তুত। তোতা ভাই ছিলেন স্বচ্ছল সুশৃঙ্খল পরিবারের সন্তান, আবেগী আর সদা তৎপর। আজকের বিচারে তাঁর পক্ষে এ ধরণের কর্মকান্ডে যুক্ত হওয়াটা খুব মানানসই ছিলো না। কিন্তু সে সময়টা ছিলো এমনই যখন অনেক স্বচ্ছল পরিবারের সদস্য বা অনেক সম্ভাবনাময় ছাত্র সমূহ বিপদের ঝুঁকি নিয়ে হোলেও সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের স্বপ্নে উদ্বুদ্ধ হয়ে সর্বস্ব ত্যাগে প্রস্তুত হয়ে উঠেছিলো। তোতা ভাই ছিলেন সেই কাতারে। গ্রামের মানুষকে সচেতন করতে তখন তাঁরা গ্রামে যেতে শুরু করেছে এবং গ্রামের বিচিত্র অভিজ্ঞতার মধ্যে দিয়ে বৃহত্তর জীবনের স্বাদ গ্রহণে উদ্বুদ্ধ হয়ে উঠছে।

এসব পাকিস্তান আমলের অন্তিম সময়ের কথা। স্বাধীন বাংলাদেশে তোতা ভাই আর রাজনৈতিক কর্মকান্ডে প্রত্যক্ষভাবে সংযুক্ত থাকেননি। ব্যবসা শুরু করেছিলেন। ব্যবসায়ে উন্নতিও করেছিলেন কিন্তু তার অতীত স্বপ্ন থেকে তিনি যে বিচ্যুত হয়েছিলেন এমন বলা যাবে না। সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের সাথে যুক্ত এক সময়ের সক্রিয় কর্মী বা নেতা পরবর্তীকালে দেখা গেছে বিরোধী শিবিরে অবস্থান নিয়েছেন এবং সংকীর্ণ আত্মস্বার্থ সিদ্ধির জন্য সমাজতান্ত্রিক রাজনীতি বা আদর্শের ধ্বংস সাধনে আত্মনিয়োগ করেছেন শুধু না, মাথায় টুপি চড়িয়ে জান্নাতের সাধনায় মত্ত হয়েছেন। তোতা ভাই এই দলের না, রাজনীতি ছেড়েছিলেন সত্যি, নিজেকে দাঁড় করিয়েছিলেন প্রগতিশীল রাজনীতির সহায়ক শক্তি হিসেবে।

সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডই হয়ে উঠেছিলো তাঁর মূল কাজ। ‘সুরবিতান সঙ্গীত একাডেমী’র তিনি প্রাতিষ্ঠানিক উন্নতি সাধন করেছিলেন। এক সময়ের প্রায় অবক্ষয়িত এই সংগঠণটি হয়ে উঠেছিলো যশোরের অন্যতম শেষ্ঠ সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান। নিজেও তিনি সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে প্রায় শীর্ষে উঠেছিলেন। যশোরের এমন কোনো সাংস্কৃতিক কর্মকান্ড ছিলো না যেখানে তোতা ভাই তার সক্রিয় অবস্থান রাখেননি।

তোতা ভাইয়ের মধ্যে তঞ্চকতা ছিলো না। হঠাৎ হঠাৎ রেগে যাওয়া ছিলো তার স্বভাব, ছিলেন উচ্চকণ্ঠ, আচরণগত কারণে স্বেচ্ছাচারী মনে করাও অস্বাভাবিক ছিলো না। কিন্তু এ সবই ছিলো তাঁর সহজাত বাহ্যিক স্বভাব, প্রকৃতপক্ষে স্নেহ আর শ্রদ্ধার যে অফুরন্ত ভান্ডার তিনি ধারণ করতেন তাই দিয়েই তিনি জয় করেছিলেন বালক বৃদ্ধ সকলের মন। বয়সের পার্থক্যকে তিনি খুব গুরুত্ব দিতেন না। মিশতেন বন্ধুর মতো, কোনো রকম ভেদাভেদ ছাড়াই, যে কারণে জনপ্রিয়তা ছিলো, ছিলো গ্রহণযোগ্যতাও।

তোতা ভাইয়ের মতো মানুষ সহজে গঠিত হয় না। দীর্ঘ সময় যেমন লাগে তেমন লাগে পরিচ্ছন্ন মন এবং মানসিকতা। নানা রকম দ্বন্দ্ব সংঘাত বাঁধা বিঘ্নের মধ্যেও নিজের লক্ষ্যকে স্থির রেখে এগিয়ে যাওয়া সে অনেকটা সাধনার মতো। ত্যাগ লাগে, এক ধরণের মোহমুক্তিও লাগে। শুরু করেছিলেন রাজনীতি দিয়ে, সমাজের বৃহৎ অংশ মানুষের মুক্তির লক্ষ নিয়ে, টিকতে পারেননি কিন্তু লক্ষ্যচ্যুত হননি। সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডে নিজেকে নিয়োগ করেছিলেন। বর্তমানের বাজারী সংস্কৃতির তান্ডবে ভেসে যাননি। চেয়েছিলেন সুস্থ সংস্কৃতির বিকাশ। সেই লক্ষ্যে কাজ করেছেন আমরণ, ‘সুরবিতান সঙ্গীত একাডেমি’কে গড়তে চেয়েছিলেন সেই আদলেই, গড়েছিলেনও অনেকটা। প্রগতিশীল সব রকম কর্মকান্ডেই তাঁর সমর্থন ছিলো, ছিলো সক্রিয় সহযোগিতাও।

এই সব মানুষের অকাল আকস্মিক মৃত্যুকে প্রকৃতিতে বিশাল বটবৃক্ষের আকস্মিক ধ্বংসের সাথে তুলনা করা যায়। বটবৃক্ষের চারা দুর্লভ নয় কিন্তু একটা চারা কতোদিনে কিভাবে বিশাল বৃক্ষে রূপান্তরিত হবে সে বিষয়টা শুধু সময় সাপেক্ষ না, অনিশ্চিতও। যশোরের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে তোতা ভাইয়ের অনুপস্থিতে যে শূন্যস্থানের সৃষ্টি হলো সেটা পুরণ হবে নিশ্চয়ই কিন্তু কতোদিনে কিভাবে সেটা পুরণ হয় সেটাই এখন দেখার বিষয়।

তোতা ভাইয়ের সাথে ঘনিষ্টতা সেই পাকিস্তান আমলের শেষের দিক থেকে। আমি তখন ক্লাস ফাইভ কি সিক্স এ পড়ি। আমাদের বাড়িটা ছিলো তাঁদের গোপন রাজনৈতিক কর্মকান্ডের আখড়া। পরিবারের বাইরে তিনি ছিলেন অভিভাবকতুল্য। তাঁর এই অপ্রত্যাশিত মৃত্যু স্মৃতির-করুণ-সম্ভার হয়ে আমৃত্যু বিরাজ করবে।

লেখক : কথাশিল্পী

(দ্য রিপোর্ট/একেএমএম/অক্টোবর ০১,২০১৮)