রেজাউর রহমান

"একজন মানুষের জন্মভূমিই হলো সেই স্থান, যেখানে সে সমৃদ্ধ হয়"

স্বগৃহ যতটা সমৃদ্ধ,  গৃহের স্থানিক উৎকর্ষতা ততই বেশি। আচ্ছা আবাস যদি প্রকৃতির এক  আদি মিশেলের রূপান্তর হয়, তবে তো সমৃদ্ধির স্বর্গভূমিও হতে পারে।

হতে পারে প্রকৃতির এক অপার লীলাভূমি, যেখানে টিকে থাকবার সকল উপাদান ছড়িয়ে ছিটিয়ে রেখে, এক খেলায় মেতেছে। খেলার এক বড় উপাদান ঐ স্থান, যে কিনা হাজার মাইল অতিক্রম করে শান্তজলের প্রবাহ এবং সঙ্গে বয়ে আনা অকৃত্রিম মৃত্তিকা পলি যা এই ভূমির মানুষের হাজার বছর ধরে সংগ্রামী-তে পরিণত করেছে।

এই জল, মৃত্তিকা, আর প্রবাহিত আদিম বায়ুর মিশেলে গঠিত ব-আকৃতির সৃষ্ট দ্বীপ নিয়ে আমাদের দ্বৈধতা।

বাংলা ব-আকৃতির দ্বীপ হলো ব-দ্বীপ। বাংলাদেশ নদীমাতৃক দেশ, এই দেশের বুকচিরে জালের মতন ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে অজস্র নদী। পলি এই ভূভাগের আশীর্বাদ, আরেকটি হলো এখানকার ঋতু, যা কিনা খুবই উপভোগ্য বটে, যদিও বাহ্যজগৎতের উপর নির্ভরশীল।

মানুষও অধীনস্থ কিন্তু তারপরও মুখোমুখি নিসর্গ ও নিজে। প্রকৃতি যেন দিতেই শিখেছে কোন কিছু নিতে সে শেখেনি, কিন্তু ভালোবাসলে নিজেকে উজাড় করতে জানে, যা মানুষ হয়তো জানে না। সমৃদ্ধভূমির সন্তানেরা তো উর্বর মস্তিষ্কের তারপর কেন দ্বৈধতা, এর কারণ হয়তো মানবসন্তানের জীবনাচরণে উৎকর্ষতার আয়োজন যেটা কিনা স্বভাববিরুদ্ধ।



" মা এবং মাতৃভূমি স্বর্গের চেয়েও বেশিকিছু "

নিজেকে আদ্যশক্তির সামনে সমর্পণ ও তার সাথে দ্বৈধতার গল্প নিয়ে ‘বৃহত্ত্ব’ হাজির বিশ্বশিল্পের আসরে।মাতৃভূমি- যেখানে সে নিজেকে সমৃদ্ধ করে, সেই ভূমি যখন পৃথিবী নামক গ্রহের বৃহত্তম ব-দ্বীপ তখন মাথা না নুইয়ে থাকতে পারাটা কঠিন। বৃহত্ত্ব আর্ট ফাউন্ডেশন নিজেদেরকে সমর্পণ করেছেন স্বদেশের প্রতি তা তাদের শিল্পকথনে বারবারই উঠে আসছে।শিল্পী মাত্রই দায়বদ্ধ ও আত্মসচেতন।

" সকল শিল্প হতে হবে জীবন অনুগামী "

শিল্প জীবনঘনিষ্ঠ হলে তা দায়বদ্ধ হতে বাধ্য। এই দায় কিভাবে এড়িয়ে যাবে! এই ব-দ্বীপের জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব যে সমৃদ্ধ ঋতুর বিরূপ আচরণের কারণ তা বৃহত্ত্ব’র শিল্পীদের মগজ বিদ্ধ করে, পীড়িত করে।

পলি মৃত্তিকার আবহে যে ধানের ঘ্রাণে দ্বীপের কৃষক পুলকিত হতো নতুন সংগ্রামের জন্য, হিমালয় থেকে পাড়ি দেওয়া জল ভূমিকে জলজ গ্রন্থে পরিণত করতো, সেই গ্রন্থের পাঠক বৃহত্ত্ব’র শিল্পীরা।
অন্তর্নেত্র দিয়ে ‘বৃহত্ত্ব’ পরিবার তা অবলোকন করেছে এবং কিছুটা ঋণ মুক্তি দিতে হাজির স্থাপনা শিল্পকর্ম" দ্বৈধ" নিয়ে।

" যারা মাতৃভূমির সাথে বিশ্বাস ঘাতকতা করেছে তাদের বই আমি পড়ি না"



শিল্পী বিশ্বজিৎ গোস্বামী একদল মনন সচেতন শিল্পী নিয়ে এই স্থাপনা শিল্পে দেখিয়েছেন জলের, ভূমির, বায়ুর সঙ্গে বৈপরীত্যে প্রতিনিয়ত চলে-তা খুবই চাতুর্যতার সাথে দেখিয়েছেন। বৃহত্ত্ব’র স্থাপনায় দাঁড়ালেই এক টুকরো ব-দ্বীপ যেন স্পর্শ করা যায়, তার ঘ্রাণ, পলির রং যেন গায়ে মেখে নিজেকে অবমুক্ত করা যায়। এই মৃত্তিকা কীভাবে আমাদের আগলে রেখেছে তা চোখে আঙুল দিয়ে বৃহত্ত্বরা দেখিয়েছে। বৃহত্ত্ব শেকড়কে ভুলতে শেখেনি, অগ্রজশিল্পী ও শিল্পকর্মের সাথে দ্বীপের গল্পের মিশেল একাকার। জলবায়ু পরিবর্তনে ভূমি, জলের ক্ষয়ে যাওয়ায় পিড়িত বৃহত্ত্ব, তা বোঝা যায় সংকীর্ণ গণ্ডিতে মৃদু আলোর চামড়া শিল্পের অসচেতনতার হিসসা দেখে।

পলির ঘ্রাণ, জলের স্পর্শ, নোনাভূমির প্রতি কৃতজ্ঞতা স্বীকার করতে একটুখানিও কার্পণ্য দেখাইনি বৃহত্ব।
দ্বৈধতার গল্প নিয়ে আমরা নিজেদের অস্তিত্ব কে প্রশ্নবিদ্ধ করে চলেছি নিয়ত তারই খণ্ড গল্পের রূপকার এই বৃহত্ব। নতুন গল্পের অপেক্ষায় শিল্পরসিক ও বিশ্বশিল্পের আসর।