thereport24.com
ঢাকা, শনিবার, ২৯ মার্চ 25, ১৫ চৈত্র ১৪৩১,  ২৯ রমজান 1446

পিলখানা হত্যাকাণ্ডের ৫ বছর

২০১৪ ফেব্রুয়ারি ২৫ ০৩:০৬:০১
পিলখানা হত্যাকাণ্ডের ৫ বছর

আহমদুল হাসান আসিক, দ্য রিপোর্ট : আজ ২৫ ফেব্রুয়ারি। পাঁচ বছর আগে ২০০৯ সালের এ দিনেই ভয়াল সেই বিডিআর বিদ্রোহের ঘটনা ঘটেছিল পিলখানার সদর দফতরে। বিক্ষুব্ধ বিডিআর জওয়ানরা পরিকল্পিতভাবে ৫৭ সেনা কর্মকর্তাসহ ৭৪ জনকে নৃশংসভাবে হত্যা করে। সূচিত হয় নির্মমতার এক ইতিহাস।

অপারেশন ডাল-ভাত কর্মসূচির দুর্নীতি নিরসন, বিডিআর সদস্যদের জাতিসংঘ মিশনে অন্তর্ভুক্তি, বিডিআরের নিজস্ব কর্মকর্তাদের মাধ্যমে বাহিনী পরিচালনাসহ বেশ কয়েকটি দাবিতে সেদিন তারা বিদ্রোহ ঘোষণা করে। ওইদিন ইতিহাসের এ নারকীয় হত্যাকাণ্ডে হতবাক হয়ে পড়ে দেশবাসী।

ঘটনার সূত্রপাত যেভাবে

২০০৯ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি। সেদিন সদর দফতরের দরবার হলে চলছিল বার্ষিক দরবার অনুষ্ঠান। সকাল ৯টা ৫ মিনিটে তৎকালীন বিডিআরের মহাপরিচালক (ডিজি) মেজর জেনারেল শাকিল দরবার হলে প্রবেশ করেন। এরপর ঢাকা সেক্টর কমান্ডার কর্নেল মুজিবুল হক তার কাছে প্যারেড হস্তান্তর করলে ডিজি ও ডিডিজি মঞ্চে নির্দিষ্ট আসন গ্রহণ করেন।

এরপরই শুরু হয় বার্ষিক দরবারের আনুষ্ঠানিকতা। পিলখানা জামে মসজিদের ইমাম সিদ্দিকুর রহমানের কোরআন তেলাওয়াতের পর দরবারের সবাইকে সাদর সম্ভাষণ জানিয়ে বক্তৃতা শুরু করেন মেজর জেনারেল শাকিল।

প্রথমেই তিনি ‘অপারেশন ডাল-ভাত’ কার্যক্রম প্রসঙ্গে কথা বলেন। তিনি জানতে চান, ডাল-ভাতের দৈনিক ভাতা সৈনিকরা ঠিকমতো পেয়েছে কি-না? কিন্তু সৈনিকদের জোরালো জবাব ছিল না। দরবারে সাধারণত সৈনিকদের যে ধরনের তাৎক্ষণিক স্বতঃস্ফূর্ত ইতিবাচক সাড়া থাকে, সেদিন তা ছিল না।

তিনি বলেন, ‘২০০৮ সালে আপনাদের শৃঙ্খলা ভালো ছিল না। অনেক অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটেছে।’

ডিজির এ বক্তব্য সৈনিকদের মধ্যে প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়। তখনও তার বক্তব্য চলছিল। কিন্তু হঠাৎই বদলে যায় দৃশ্যপট। ঘড়িতে তখন আনুমানিক সাড়ে ৯টা। এ সময় আকস্মিকভাবে ১৩ ব্যাটালিয়নের সিপাহী মইন অস্ত্র হাতে মঞ্চে উঠে যান। ডিজির দিকে অস্ত্র তাক করেন। মেজর জেনারেল শাকিলের দিকে অস্ত্র তাক করলে পাশের কর্মকর্তারা তাকে নিরস্ত্র করতেই ‘জাগো’ স্লোগানের সঙ্গে বেরিয়ে পড়ে বিদ্রোহীরা। শুরু হয় দরবার হলে হট্টগোল আর বৃষ্টির মতো গোলাগুলি।

এ সময় বিদ্রোহীদের ঠেকাতে গেলে কর্নেল মুজিব, লেফটেন্যান্ট কর্নেল এনায়েত এবং মেজর মকবুলকে গুলি করে হত্যা করা হয়। এরপর বিদ্রোহীরা তৎকালীন ডিজি মেজর জেনারেল শাকিল আহমদকে দরবার হল থেকে টেনেহিঁচড়ে রাস্তায় নিয়ে আসে এবং নির্মমভাবে হত্যা করে। একই সময় ব্রাশফায়ারে হত্যা করা হয় আরও ৬ সেনা কর্মকর্তাকে। অস্ত্রাগার ভেঙে ভারী অস্ত্র নিয়ে সদর দফতরের ভেতরে কর্মকর্তাদের বাসায় বাসায় ঢুকে হামলা ও লুটপাট চালায় বিদ্রোহীরা।

ঘটনা এখানেই শেষ নয়; যেসব সেনা কর্মকর্তা প্রাণ বাঁচাতে এদিক-ওদিক পালিয়ে যান, তাদেরও খোঁজা শুরু হয়। যাকে যেখানে পায়, তাকে সেখানেই হত্যা করে বিদ্রোহী জওয়ানরা।

এমনকি ডিজির বাসায় ঢুকে তার স্ত্রী নাজনীন শাকিল ও গৃহপরিচারিকাকে নির্মমভাবে গুলি চালিয়ে হত্যা করা হয়। তার বাসায় বেড়াতে আসা স্বজনরাও রক্ষা পাননি বিদ্রোহীদের হাত থেকে।

সেদিন বিদ্রোহীদের কয়েকটি অংশ ভারী অস্ত্র নিয়ে অবস্থান নেয় বিভিন্ন গেটে। ৩ নাম্বার গেট দিয়ে বিদ্রোহীরা মর্টারশেল ছুড়তে থাকে। পিলখানার প্রবেশপথগুলোতে আর্মডকারসহ গোলাবারুদের গাড়ি ও এসএমজি বসিয়ে বৃষ্টির মতো গুলি চালানো হয়।

এ ঘটনায় হত্যা করা হয় মোট ৫৭ জন সেনা কর্মকর্তাসহ ৭৪ জনকে। এ ছাড়া অমানুষিক অত্যাচার চালানো হয় সেনা কর্মকর্তাদের স্ত্রী ও সন্তানদের ওপর।

সেনা কর্মকর্তাদের হত্যার পর মৃতদেহগুলো প্রথমে পুড়িয়ে ফেলার পরিকল্পনা করা হলেও পরে কয়েকটি মৃতদেহ নর্দমার ম্যানহোলে ফেলে দেওয়া হয়।

দরবার হলের সামনে থেকে দুপুর ১টার দিকে বাকি মৃতদেহগুলো ট্রাকে করে নিয়ে যাওয়া হয়। দুটি গর্ত খুঁড়ে মৃতদেহগুলোকে পিলখানার ভেতরেই মাটিচাপা দেওয়া হয়।

নিয়ন্ত্রণে আসে যেভাবে

ঘটনার দিন সকাল থেকেই পিলখানাজুড়ে চলছিল গোলাগুলি। স্থানীয় সংসদ সদস্য আর জনপ্রতিনিধিরা বিদ্রোহীদের সঙ্গে সমঝোতা করার চেষ্টা করেছিলেন। দুপুরের মধ্যে পিলখানার চারপাশে সশস্ত্র অবস্থান নেয় সেনাবাহিনী।

ঘটনার পরপরই প্রধানমন্ত্রী তার বাসভবনে তৎকালীন সেনাপ্রধান জেনারেল মইন ইউ আহমেদ ও বিদ্রোহী বিডিআর সদস্যদের প্রতিনিধি দলের সঙ্গে দফায় দফায় বৈঠক করেন। এর পরিপ্রেক্ষিতেই ডিএডি তৌহিদের নেতৃত্বে বিদ্রোহীদের একটি দল প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনে বৈঠক করেন। বিদ্রোহীরা অস্ত্রসমর্পণের প্রতিশ্রুতি দিলেও তারা তা করেননি। বিকেলে জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সন্ধ্যা থেকে পাশের একটি হোটেলে চলে দফায় দফায় বৈঠক। এরপর রাত ১টার দিকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর নেতৃত্বে একটি দল প্রবেশ করে পিলখানার ভেতরে। বিডিআরের কিছু সদস্য অস্ত্রসমর্পণও করে। ভোরের দিকে কয়েকটি পরিবারকে উদ্ধার করেন তারা।

রক্তাক্ত ওই বিদ্রোহের পর সীমান্তরক্ষী বাহিনী পুনর্গঠন করা হয়। পরিবর্তন করা হয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর আইন। বাংলাদেশ রাইফেলসের (বিডিআর) নাম বদলে রাখা হয় বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)।

বিডিআর আইনে বিদ্রোহের সর্বোচ্চ সাজা ছিল সাত বছর কারাদণ্ড। আইন পরিবর্তনের পর বর্তমানে বিদ্রোহের সর্বোচ্চ সাজা মৃত্যুদণ্ড।

শহীদদের স্মরণে দিনব্যাপী কর্মসূচি

পিলখানা হত্যাকাণ্ডে নিহত সেনাদের স্মরণে দিনব্যাপী বিভিন্ন কর্মসূচির আয়োজন করেছে বিজিবি।

শহীদদের রুহের মাগফিরাতের উদ্দেশে পিলখানাসহ বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) সকল রিজিয়ন, সেক্টর, প্রতিষ্ঠান ও ইউনিটের ব্যবস্থাপনায় বিজিবির সব মসজিদে দোয়া ও মিলাদ মাহফিলের আয়োজন করা হবে।

বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ব্যবস্থাপনায় মঙ্গলবার সকাল ৯টায় বনানী সামরিক কবরস্থানে রাষ্ট্রপতির প্রতিনিধি, প্রধানমন্ত্রীর প্রতিনিধি, স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী, তিন বাহিনীর প্রধান (সম্মিলিতভাবে), স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব এবং বিজিবি মহাপরিচালক শহীদদের স্মৃতিস্তম্ভে পুষ্পস্তবক অর্পণ করবেন।

এ ছাড়া বুধবার বিকেল সাড়ে ৪টায় পিলখানায় বীরউত্তম ফজলুর রহমান খন্দকার মিলনায়তনে শহীদদের আত্মার মাগফিরাত কামনা করে বিশেষ দোয়া ও মিলাদ মাহফিল অনুষ্ঠিত হবে।

(দ্য রিপোর্ট/এএইচএ/এনডিএস/এমডি/এজেড/ফেব্রুয়ারি ২৫, ২০১৪)

পাঠকের মতামত:

SMS Alert

জেলার খবর এর সর্বশেষ খবর

জেলার খবর - এর সব খবর