thereport24.com
ঢাকা, শনিবার, ২৫ মে 24, ১০ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১,  ১৭ জিলকদ  1445

তৃণমূলে বাড়ছে সংঘাত

২০১৩ ডিসেম্বর ০৩ ০০:২৬:৫৮
তৃণমূলে বাড়ছে সংঘাত

বাহরাম খান, দ্য রিপোর্ট : দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের টিকেটপ্রাপ্তদের বেশিরভাগই এখন যার যার এলাকায় অবস্থান করছেন। নির্বাচন কমিশন ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী সোমবার ছিল মনোনয়নপত্র দাখিলের শেষদিন। মনোনয়নপত্র দাখিল এবং নির্বাচনী মাঠ গোছাতে মনোনীত প্রার্থীরা এখন এলাকামুখী হচ্ছেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. নেহাল করিম দ্য রিপোর্টকে বলেন, ‘একক নির্বাচন খুব বাজে ধরনের প্রভাব ফেলবে। বিবাদমান পক্ষগুলো সংঘর্ষে জড়াবে। এসবের সুযোগে ঘোলা পানিতে মাছ শিকারের ঘটনা ঘটাতে তৎপর হবে কেউ কেউ। সামগ্রিকভাবে আমাদের সামাজিক রাজনৈতিক অবস্থা আরও নাজেহাল হবে।’

সাবেক বাণিজ্যমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের বাণিজ্য সম্পাদক লে. কর্নেল (অব.) ফারুক খান দ্য রিপোর্টকে বলেন, ‘রাজনীতির সঙ্গে সংঘাতের কোনো সম্পর্ক নেই। আজকে নির্বাচনী এলাকা থেকে এলাম। এলাকার মানুষ বিরোধী দলের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছে। আমরা গণতান্ত্রিক রীতি অনুসরণ করি বলেই কঠোর পদক্ষেপ নিচ্ছি না।’

নির্বাচন কমিশন ঘোষিত ডেটলাইন অনুযায়ী নির্বাচনে প্রধান বিরোধী দলের অংশগ্রহণ এখনও অনিশ্চিত। আওয়ামী লীগের মনোনয়নপ্রাপ্ত প্রার্থীরা তাদের মনোনয়নপত্র দাখিল করতে দেশব্যাপী নিজ নিজ এলাকায় ছড়িয়ে আছেন। এতে চলমান সংঘাতমুখর রাজনৈতিক পরিবেশ আরও ঘনীভূত হতে পারে বলে অনেকে আশঙ্কা প্রকাশ করছেন।

বর্তমান পরিস্থিতি নির্বাচনী এলাকায় সামাজিক ও রাজনৈতিকভাবে কী ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে? এমন প্রশ্নের উত্তরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী দ্য রিপোর্টকে বলেন, ‘এবারের রাজনৈতিক সংঘাতের ব্যাপ্তি অনেক। বেশিরভাগ সংঘাত গ্রামকেন্দ্রিক সংঘটিত হচ্ছে। নির্বাচন উপলক্ষে দুটি বড় দলের এমন মুখোমুখি অবস্থান থাকলে সংঘর্ষের মাত্রা অনেক বেশি বাড়বে বলেই মনে হচ্ছে।’

বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল-বাসদের সাধারণ সম্পাদক খালেকুজ্জামান বলেন, ‘সরকার রাজধানীকে নিরাপদ রেখে বিশ্ববাসীর কাছে দেশের স্বাভাবিক অবস্থা তুলে ধরতে চাচ্ছে। অন্যদিকে বিরোধী দলও এটাকে সুযোগ হিসেবে নিয়ে রাজধানীকে অন্যান্য অঞ্চল থেকে বিচ্ছিন্ন করে তাদের শক্তি দেখাতে চাচ্ছে।’

ইতোমধ্যে আওয়ামী লীগের কয়েকজন নেতা মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার জন্য এলাকায় যাওয়ার পথে হামলার শিকার হয়েছেন। কোনো জায়গায় পরস্পরবিরোধী সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটেছে। অভ্যন্তরীণ দলীয় দ্বন্দ্বও রয়েছে অধিকাংশ এলাকায়।

কক্সবাজার-৪ আসনের এমপি বদিউর রহমান সোমবার মনোনয়ন জমা দিতে গিয়ে বিরোধী রাজনৈতিক জোটের নেতাকর্মীদের বিরোধিতার সম্মুখিন হন। একপর্যায়ে গুলি করে নিজেকে নিরাপদ রাখার চেষ্টা করেন তিনি। পরে পুলিশ প্রহরায় বাড়ি পৌঁছান।

আওয়ামী লীগের উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য এবং শিল্প ও গণপূর্তমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ সোমবার মনোনয়নপত্র জমা দেন ভোলায়। জমাদানের পর স্থানীয় একটি অনুষ্ঠানে তার সঙ্গে থাকা নেতাকর্মীদের সঙ্গে ১৮ দলীয় জোটের নেতাকর্মীদের ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া হয়।

মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার শেষ দিন সোমবার নিজ নির্বাচনী এলাকা কিশোরগঞ্জ যাচ্ছিলেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম। সকাল আটটায় টঙ্গীর হোসেন মার্কেট এলাকায় পৌঁছালে ককটেল হামলায় পড়ে তার গাড়ি।

একইদিন দুপুরে ফেনী-৩ (দাগনভূইয়া-সোনাগাজী) নির্বাচনী এলাকার আওয়ামী লীগ প্রার্থী আবুল বাসার মনোনয়নপত্র দাখিল করে ফেরার সময় পথে বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের সঙ্গে তাদের সংঘর্ষ হয়।

এই সংঘাত শুধু প্রধান দুই রাজনৈতিক দলেরই নয়। আওয়ামী লীগের প্রথম দফার চূড়ান্ত মনোনয়ন ঘোষণার পর দেশের কয়েকটি এলাকায় দলটির অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের চিত্রও দেখা গেছে।

অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বে ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ, হরতাল ডাকার মাধ্যমে কেউ কেউ প্রতিক্রিয়া জানাচ্ছেন। অন্যদিকে মনোনয়নবঞ্চিত অনেকে দল থেকে পদত্যাগ করে বিদ্রোহী প্রার্থী হচ্ছেন। এই ত্রিমুখি সংঘর্ষে সামনের দিনে দেশব্যাপী রাজনৈতিক অস্থিরতা বাড়ার ইঙ্গিত বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ ড. তোফায়েল আহমদ দ্য রিপোর্টকে বলেন, ‘ইতোমধ্যেই আমরা সংঘাতের মধ্যে আছি। এবারের রাজনৈতিক সংঘাত স্থানীয়ভাবে বেশি হচ্ছে। দুই দল যে অবস্থায় আছে তাতে নির্বাচনী কার্যক্রম শুরু হলে সংঘাত আরো বাড়বে বলেই মনে হচ্ছে। তবে রাজনৈতিক অবস্থা পরিবর্তিত হতে বেশি সময় লাগে না। সমঝোতার প্রত্যাশা করি।’

সাবেক যোগাযোগমন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেন এমপির নির্বাচনী এলাকা মাদারীপুর-৩ (সদর-কালকিনি) আসনে এবার মনোনয়ন পেয়েছেন আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাসিম। আবুল হোসেন সমর্থকরা এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে কালকিনি-ভুরঘাটা সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেছে রবিবার।

নেত্রকোনা-১ (কলমাকান্দা-দুর্গাপুর) আসনে মনোনয়নবঞ্চিত সংসদ সদস্য মোস্তাক আহমেদ রুহী এমপি রবিবার তার নির্বাচনী এলাকার দুর্গাপুর উপজেলায় আধাবেলা হরতাল আহ্বান করেন। এর আগেরদিন তার সমর্থকরা যানবাহন ও দোকানপাট ভাঙচুর করে।

প্রধান দুই রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী এবং দলগুলোর অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের জের ধরে দেশব্যাপী রাজনৈতিক উত্তেজনা বাড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। ইতোমধ্যে বিরোধী দলের ডাকা ৭২ ঘণ্টা অবরোধের সঙ্গে নতুন করে যোগ হয়েছে আরো ৬০ ঘণ্টা। অবরোধ চলবে বৃহস্পতিবার বিকেল পাঁচটা পর্যন্ত।

চলমান সংঘাত কি রাজনৈতিক কারণে ঘটছে? জবাবে সাবেক এই মন্ত্রী বলেন, ‘বিএনপি ন্যূনতম গণতান্ত্রিক ভাষা বোঝে না। সংসদে তাদের আসন ৩৫টি, অন্যদের বাকি ২৬৫টি। এখানে তাদের কথা অনুযায়ী দেশ চলে কীভাবে?

বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য শামসুজ্জামান দুদু বলেন, ‘আমরা অনেক বড় সংঘাতের মধ্যে আছি। প্রতিদিনই এই মাত্রা বাড়ছে। প্রতিদিনই প্রায় দশ জন করে মানুষকে প্রাণ দিতে হচ্ছে।এরপরও সরকারের টনক নড়ছে না।’

(রিপোর্টটি তৈরিতে সংশ্লিষ্ট এলাকার সংবাদদাতারা সহযোগিতা করেছেন)

(দ্য রিপোর্ট/বিকে/এইচএসএম/ডিসেম্বর ০৩, ২০১৩)

পাঠকের মতামত:

SMS Alert

বিশেষ সংবাদ এর সর্বশেষ খবর

বিশেষ সংবাদ - এর সব খবর