দ্য রিপোর্ট ডেস্ক : বিপ্লবী বিনোদবিহারী চৌধুরী ১৯১১ সালের ১০ জানুয়ারি চট্টগ্রাম জেলার বোয়ালখালিতে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি বৃটিশবিরোধী আন্দোলনে বিপ্লবী সূর্য সেনের সহকর্মী ছিলেন।

বিনোদবিহারী উকিল কামিনী কুমার চৌধুরী ও রমা রাণী চৌধুরীর ৫ম সন্তান। ফটিকছড়ির রাঙ্গামাটিয়া বোর্ড স্কুলে তার প্রাথমিক শিক্ষা শুরু৷ তিনি ফটিকছড়ি করোনেশন উচ্চ বিদ্যালয়, বোয়ালখালির পিসি সেন সারোয়ারতলী উচ্চ বিদ্যালয় ও চট্টগ্রাম কলেজে পড়াশোনা করেন। ১৯২৯ সালে মাধ্যমিক স্কুল সার্টিফিকেট পরীক্ষা কৃতিত্বের সঙ্গে পাস করায় তাকে বৃত্তি দেওয়া হয়৷ ১৯৩৪ সালে ভারতের রাজপুতনা দেউলি ডিটেনশন ক্যাম্পে বন্দী অবস্থায় পরীক্ষা দিয়ে ইন্টারমিডিয়েট প্রথম বিভাগে পাশ করেন। ১৯৩৬ সালে ওই ক্যাম্পে বন্দী থাকাকালে ডিস্টিংশনসহ বিএ পাশ করেন। ১৯৩৯ সালে ইংরেজিতে এমএ ও বিএল (আইনে স্নাতক) পাশ করেন গৃহবন্দী অবস্থায়।

তিনি ১৯৩০ সালে কংগ্রেস চট্টগ্রাম জেলা কমিটির সহ-সম্পাদক ছিলেন। এ ছাড়া ১৯৪০-১৯৪৬ সালে বঙ্গীয় প্রাদেশিক কংগ্রেস নির্বাহী কমিটির সদস্য থাকার পাশাপাশি ১৯৪৬ সালে কংগ্রেস চট্টগ্রাম জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। ১৯৪৭ সালে তিনি পশ্চিম পাকিস্তান কংগ্রেসের সদস্য হন। ১৯৫৮ সালে আইয়ুব খান সামরিক আইন জারির মাধ্যমে সব রাজনৈতিক দলকে বেআইনি ঘোষণা করলে রাজনীতি থেকে অবসর নেন৷

শৈশবে বাবা কামিনী কুমার চৌধুরীর কাছে তার রাজনীতির হাতেখড়ি। বাবার বিপ্লবী চেতনা তাকে আলোড়িত করে। ১৯২১-২২ সালে ১১ বছর বয়সে বাবার সঙ্গে অসহযোগ আন্দোলনে জড়িয়ে পড়েন। স্বদেশি আন্দোলনের সময় তিনি বাবার মতো বিলেতি কাপড় ছেড়ে খদ্দরের কাপড় পরতে শুরু করেন। ১৯২৭ সালে তিনি তৎকালীন বিপ্লবী দল যুগান্তরে যোগ দেন। বিপ্লবী দলে যোগ দেওয়ার অল্প দিনেই তিনি মাস্টারদা সূর্যসেনের প্রিয়ভাজন হয়ে উঠেন। ১৯৩০ সালের ঐতিহাসিক অস্ত্রাগার লুন্ঠনে ছিলেন সূর্য সেনের অন্যতম তরুণ সহযোগী। ১৯৩০ সালের ১৮ এপ্রিল চট্টগ্রামকে ৪ দিনের জন্য স্বাধীন করেন তারা। বিপ্লবী দলের সর্বাধিনায়ক মাস্টারদা ১৮ এপ্রিল চট্টগ্রামকে চারটি অ্যাকশন পর্বে ভাগ করেছিলেন। প্রথম দলের দায়িত্ব ছিল ফৌজি অস্ত্রাগার আক্রমণ, দ্বিতীয় দলের ছিল পুলিশ অস্ত্রাগার দখল, তৃতীয় দলের ছিল টেলিগ্রাফ ভবন দখল, চতুর্থ দলের ছিল রেললাইন উৎপাটন। বিনোদবিহারী চৌধুরী ছিলেন পুলিশ অস্ত্রাগার দখল করার দলে।

ব্রিটিশ সৈন্যরা ২১ তারিখে বিপ্লবী দলের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। বিপ্লবীরাও জালালাবাদ পাহাড়ে যুদ্ধ চালিয়ে গিয়েছিলেন। জালালাবাদ যুদ্ধ ছিল বিনোদবিহারী চৌধুরীর প্রথম সম্মুখযুদ্ধ। গলায় গুলিবিদ্ধ হয়েও লড়াই থামাননি তিনি। চোখের সামনে দেখেছিলেন ১২ জন সহকর্মীর মৃত্যু। বেশ কিছুদিন গোপনে চিকিৎসার পর তিনি সুস্থ হয়ে ওঠেন। ১৯৩৩ সাল পর্যন্ত তিনি আত্মগোপনে ছিলেন। তাকে মৃত কিংবা জীবিত ধরিয়ে দিতে ব্রিটিশ সরকার ৫০০ টাকা পুরষ্কার ঘোষণা করে।

১৯৩৩ সালের জুন মাসে ব্রিটিশ সরকারের হাতে বিনোদবিহারী চৌধুরী গ্রেফতার হন। সাক্ষ্য-প্রমাণ সংগ্রহ করতে না পারলেও বেঙ্গল ক্রিমিনাল ল অ্যামেন্ডমেন্ট অ্যাক্ট অনুযায়ী চট্টগ্রাম জেল, কলকাতা প্রেসিডেন্সি জেল, দিউলি ডিটেনশান জেল ও বাহরামপুর জেলে বিনা বিচারে পাঁচ বছর কারারুদ্ধ রাখা হয় তাকে। জেলজীবন থেকে ১৯৩৮ সালে মুক্তি পান তিনি। পরের এক বছর বাড়িতেই নজরবন্দী অবস্থায় জীবন কাটান। ১৯৩৯ সালে তিনি সম্পূ্র্ণ মুক্ত হন।

১৯৪১ সালের মে মাসে গান্ধীজীর ভারত ছাড় আন্দোলনে যোগদানের প্রস্তুতিকালে তাকে ব্রিটিশ সরকার আবারও গ্রেফতার করে। এ সময় চিটাগাং জেল, হিজলি বন্দী শিবির, ঢাকা জেল ও খকশি বন্দী শিবিরে তাকে বন্দী রাখা হয়। ১৯৪৫ সালের শেষের দিকে তিনি ছাড়া পান।

ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের পর ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। তখন তিনি ছিলেন আইনসভার সদস্য। ২১ ফেব্রুয়ারি তিনি অ্যাসেম্বলিতে গিয়ে পাকিস্তান বাহিনীর হত্যাকাণ্ডের কথা সারা বিশ্ববাসীর কাছে প্রচার করেন। পাকিস্তান আমলে ১৯৬৫ সালে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ শুরু হলে পাকিস্তান সরকার সিকিউরিটি অ্যাক্ট অনুযায়ী তাকে বিনাবিচারে এক বছর কারাগারে আটক রাখে। ১৯৭১ সালে তিনি চট্টগ্রাম থেকে পালিয়ে ভারতে গিয়ে তরুণ যোদ্ধাদের রিত্রুট করেন।

১৯৩৯ সালে দৈনিক পত্রিকার সহকারী সম্পাদক হিসাবে তার কর্মজীবন শুরু হয়। ১৯৪০ সালে চট্টগ্রাম কোর্টের একজন আইনজীবী হিসেবে অনুশীলন শুরু করেন। অবশেষে তিনি শিক্ষকতাকেই পেশা হিসেবে গ্রহণ করেন।

১৯৪০ সালে বিনোদবিহারী চট্টগ্রাম কোর্টের আইনজীবী কিরন দাশের মেয়ে বিভা দাশকে বিয়ে করেন। বিভা দাশ চট্টগ্রামের মানুষের কাছে বেলা চৌধুরী নামে পরিচিত। ২০০৯ সালে ২৯ ডিসেম্বর তিনি মারা যান। তাদের একমাত্র ছেলে বিবেকান্দ্র চৌধুরী।

২০১১ সালে বিনোদবিহারী স্বাধীনতা পদক লাভ করেন। এ ছাড়া শহীদ নতুন চন্দ্র স্মৃতি পদক, বিপ্লবী তীর্থ চট্টগ্রাম স্মৃতি সংস্থার সম্মাননাসহ লাভ করেন বহু সম্মাননা। সম্মাননার সঙ্গে যে আর্থিক সম্মানী দেওয়া হয়েছিল তার কিছুই নিজের জন্য রাখেননি তিনি। তার বিপ্লবী জীবনের অংশবিশেষ নিয়ে আকতারুল ইসলাম জিন্নাহ নির্মাণ করেছেন প্রামাণ্যচিত্র ‘সূর্যসাথী’। তাকে নিয়ে লিখিত বইয়ের মধ্যে উল্রেখযোগ্য অলকা নন্দিতার ‘শতবর্ষের সন্ত বিপ্লবী বিনোদবিহারী চৌধুরী’।

২০১৩ সালের ১০ এপ্রিল তিনি কলকাতার ফর্টিজ হাসপাতালে মৃত্যুবরণ করেন।

(দ্য রিপোর্ট/ডব্লিউএস/এসকে/জানুয়ারি ১০, ২০১৪)