দিরিপোর্ট২৪ ডেস্ক : কালী হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের পূজিত দেবী। দার্শনিক দিক থেকে কালী একটি শক্তিশালী ধারণা। এ অঞ্চলের নিজস্ব চিন্তাধারার পরিচয় মেলে ‘কালী’ ধারনার মাধ্যমে। লৌকিক এ দেবির আরাধনা শনিবার।

সাধারণত ‘কাল’ অর্থ নির্ধারিত সময়। আবার ‘মৃত্যু’ অর্থও প্রকাশকও। এর সঙ্গে ‘কালো’র সম্পর্ক না থাকলেও লৌকিকভাবে এ অর্থটি প্রচলিত হয়ে গেছে। কালীকে কেন্দ্র করে ভিন্ন ভিন্ন ব্যাখ্যা ও তত্ত্বের চর্চা ভারত উপমহাদেশে চোখে পড়ে। যেমন- পাণিণির মতে ‘কালী’ শব্দটি ‘কাল’ শব্দের স্ত্রী রূপ, যার অর্থ ‘কৃষ্ণ, ঘোর বর্ণ’ (৪।১।৪২)। হরিবংশ গ্রন্থে কালী একটি দানবীর নাম (হরিবংশ, ১১৫৫২)। মহাভারত অনুসারে, কালী দুর্গার একটি রূপ (মহাভারত, ৪।১৯৫)। এছাড়া মহাভারতে উল্লেখ আছে যিনি নিহত যোদ্ধা ও পশুদের আত্মাকে বহন করেন, তাঁর নাম কালরাত্রি বা কালী। মহাভারতের ভীষ্মপর্বে পাণ্ডবদের বিজয় লাভের আকাঙ্ক্ষায় কালীপূজার উল্লেখ পাওয়া যায় । ‘কালী’ নামটি উচ্চারিত হয়েছে অথর্ব বেদের ‘কথাগ্রহসূত্র’ ও ‘মুণ্ডকউপনিষদে’। তবে অনেকে মনে করে তিনি একান্তই সাঁওতালি দেবী। তাকে শিবের স্ত্রী পাবর্তীরূপেও দেখা হয়।

কালীর অন্য নাম শ্যামা বা আদ্যাশক্তি। শাক্ত ধর্মাবলম্বীদের তন্ত্রশাস্ত্র মতে, তিনি দশমহাবিদ্যা। তন্ত্রমতে পূজিত প্রধান দশজন দেবীর মধ্যে প্রথম। শাক্তরা কালীকে বিশ্বব্রহ্মাণ্ড সৃষ্টির আদিকারণ মনে করে। বাঙালী হিন্দু সমাজে কালীর মাতৃরূপের পূজা বিশেষ জনপ্রিয়।

কালী সংহারমূর্তি। কিন্তু এই সংহার নিষ্ঠুর ধ্বংস নয়। এই সংহার সংহরণ অর্থাৎ আপনার মধ্যে আকর্ষণ। ঢেউ যেমন সমুদ্রে সৃষ্টি হয়ে আবার সমুদ্রে মিলিয়ে যায়- সংহার তেমনই একটি ব্যাপার। আবার আদ্যাশক্তি হলো বিশ্বপ্রসবকারিণী মায়ের উদর থেকেই জগতের সৃষ্টি। তখন তিনি সৃজনী শক্তি।

তার ভিন্ন ভিন্ন ধরণের মূর্তি চোখে পড়ে। সাধারণভাবে তাকে চারটি হাতে খড়গ, অসুরের ছিন্নমুণ্ডু, বর ও অভয়মুদ্রা, গলায় মানুষের মুণ্ডের মালা, বিরাট জিভ, কালো রং, এলোকেশী এবং স্বামী শিবের বুকের উপর দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়।

কালীর বিভিন্ন রূপভেদ আছে। যেমন– দক্ষিণাকালী, শ্মশানকালী, ভদ্রকালী, রক্ষাকালী, গুহ্যকালী, মহাকালী, চামুণ্ডা ইত্যাদি। আবার বিভিন্ন মন্দিরে ব্রহ্মময়ী, ভবতারিণী, আনন্দময়ী, করুণাময়ী ইত্যাদি নামে কালী প্রতিমা প্রতিষ্ঠিত ও পূজিত হয়।

সাধারণত দুর্গাপূজার বিজয়া পরবর্তী অমাবস্যার রাতেই দীপাবলীর আয়োজন করা হয়। দীপাবলীর রাতে অনুষ্ঠিত হয় কালীপূজা। দীপাবলী ভারতে 'দিওয়ালী' নামেও পরিচিত। অমাবস্যা রাতের সমস্ত অন্ধকার দূর করতে এই রাতে প্রদীপ জ্বালানো হয়। যাতে পৃথিবী প্রতিনিয়ত অশুভ শক্তির হাত থেকে রক্ষা পায়।

এছাড়া মাঘ মাসে রটন্তী ও জৈষ্ঠ্য মাসে ফলহারিণী কালীপূজাও বিশেষ জনপ্রিয়। অনেক জায়গায় প্রতি অমাবস্যা এবং প্রতি মঙ্গলবার ও শনিবারে কালীপূজা হয়ে থাকে। বাংলাদেশের মতো আসামের সমতল অঞ্চলেও কালীপূজা প্রচলিত। মিথিলার কোনও কোনও অংশে কালীপূজা এবং অপর অংশে লক্ষ্মীপূজা একই দিনে হয়ে থাকে। এছাড়া ভারতের অন্যান্য অঞ্চলে আলাদা নামে এই পূজা পালিত হয়।

কালীপূজাতে গৃহে বা মণ্ডপে মৃন্ময়ী প্রতিমা নির্মাণ করে পূজা করা হয়। মধ্যরাতে তান্ত্রিক পদ্ধতিতে মন্ত্রোচ্চারণের মাধ্যমে পূজা অনুষ্ঠিত হয়। দেবীকে ছিন্নমাথাসহ বলির পশুর রক্ত, মিষ্টান্ন, অন্ন বা লুচি, মাছ ও মাংস উৎসর্গ করা হয়। গৃহস্থবাড়িতে সাধারণত অতান্ত্রিক ব্রাহ্মণ্যমতে আদ্যাশক্তিরূপে কালীর পূজা হয়। দেবীর পূজায় ছাগল, মেষ বা মহিষ বলির প্রথা রয়েছে। সুদূর অতীতে নরবলি দিয়েও কালীপূজা হতো। লোকবিশ্বাস অনুযায়ী, কালী শ্মশানের অধিষ্ঠাত্রী দেবী। এই কারণে বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলে শ্মশানে মহাধুমধামে শ্মশানকালী পূজা অনুষ্ঠিত হয়।

কালীর সাজসজ্জা প্রতীকিভাবে তার গুণের আধার। নিচে তা সংক্ষেপে ব্যাখ্যা করা হলো-

মুক্তকেশী: কালী মুক্ত স্বভাবা। তাই তিনি মুক্তকেশী। তার কেশ বা চুল মৃত্যুর প্রতীক। চন্ডীতে আছে মহিষাসুরের হাতে পরাজিত দেবতারা যখন দেবের কাছে গেলেন তখন ত্রিদেব ও সমস্ত দেবতাদের তেজরাশি একত্রিত হয়ে ভগবতী মহামায়ার আবির্ভাব ঘটে। যমের তেজে দেবীর কেশরাশি গঠিত হয়।

মুণ্ডুমালা: কালীর কন্ঠে থাকে মুণ্ডুমালা। এটি জ্ঞানের প্রতীক। দেবী ব্রহ্মজ্ঞান ও চেতনা দান করেন। অন্ধকারে আবদ্ধ জীবকে আলোর পথ দেখান।

ত্রিনয়নী: কালীর ত্রিনয়ন বা তিন চোখ। একটি নয়ন চন্দ্রস্বরূপ আর একটি সূর্যস্বরূপ। তৃতীয়টি অগ্নিস্বরূপ। দেবী ভূত, ভবিষ্যত, বর্তমান সব কিছুই দেখেন। তাঁর ত্রিনয়নের ইঙ্গিতেই ত্রিকাল নিয়ন্ত্রিত হয়।

চতুর্ভুজা: দেবীর চার হাত। ওপরের দুহাতে অভয় ও খড়গ। নীচে বরমুদ্রা ও ছিন্ন নরমুণ্ডু। অভয় ও বরমুদ্রা সৃষ্টির প্রতীক। খড়গ ও ছিন্ন নরমুণ্ডু ধ্বংসের প্রতীক। দুটি বিপরীত কাজের অর্থ দেবীর ইচ্ছাতেই সৃষ্টি ও ধ্বংস ঘটে। দেবী খড়গ দিয়ে অবিদ্যারূপী অসুরকে ধ্বংস করেন।

কৃষ্ণবর্ণ: কালী কৃষ্ণবর্ণা। আদিতে যখন কিছুই ছিল না তখনও তিনি ছিলেন। তিনি অনন্ত, তাই কৃষ্ণবর্ণা। কখনো নীলবর্ণা- যা সুদীর্ঘ সুনীল নীল আকাশের তুলনীয়। এর অর্থ দেবী অনন্ত।

রক্তমাখা জিহবা: দেবীর রক্তমাখা জিহবা তার রজঃ গুণের প্রতীক। তার দাঁত সাদা। সাদা হলো স্বত্বঃ গুণের প্রতীক। এর মানে কালী স্বত্বঃ গুণ দ্বারা রজঃ গুণকে সংহত করার শিক্ষা দেন।

মহাশ্মশানবাসিনী: দেবী মহাশ্মশানে বিচরণ করেন। জীবের শেষ আশ্রয়স্থল হলো শ্মশান- সেখানে তারা জননীর কোলে সুখনিদ্রা যায়।

কালীকে বিষয়বস্তু করে রচিত শ্যামা-সংগীত বাংলাসাহিত্য ও সংগীত ধারার একটি গুরুত্বপূর্ণ বর্গ। রামপ্রসাদ সেন, কমলাকান্ত ভট্টাচার্য প্রমুখ কালী সাধক এবং কাজী নজরুল ইসলাম ও দ্বিজেন্দ্রলাল রায় প্রমুখ বিশিষ্ট কবি শ্যামা-সংগীত লিখেছেন।

(দিরিপোর্ট২৪/ডব্লিউএস/এমডি/নভেম্বর ০১, ২০১৩)