মাহমুদুল হাসান ও কাওসার আজম, দ্য রিপোর্ট : দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি নেতৃত্বাধীন ১৯ দলীয় জোট অংশ না নিলেও উপজেলা নিবার্চনে জোটের প্রার্থীরা অংশ নিচ্ছেন। জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মতো স্থানীয় পরিষদ নির্বাচনে সরাসরি দল থেকে সমর্থন দেওয়া হয় না। তারপরও দলীয় ব্যানারেই প্রার্থীরা নির্বাচন করে থাকেন।

উপজেলা নির্বাচনের জন্য আগামী ১৯ ফেব্রুয়ারি ৯৮টি উপজেলায় নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করা হয়েছে। এ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বিএনপি ও জোট শরিকদের মধ্যে দেখা দিয়েছে সমন্বয়হীনতা। পাশাপাশি বিএনপির মধ্যে রয়েছে বিদ্রোহী প্রার্থী।

তৃণমূল নেতাদের দাবি- অনেক উপজেলায় শরিকদের মধ্যে সমন্বয় না থাকায় উপজেলা নির্বাচনের ফল বিএনপির পক্ষে নেয়া কঠিন হবে। শুধু শরিক নয়, নিজ দলের মধ্যেও আছে বিভাজন। কয়েকটি উপজেলা ছাড়া বাকিগুলোতে রয়েছে একাধিক প্রার্থী।

উপজেলা নির্বাচনে জোট শরিকদের মধ্যে সমন্বয়হীনতার কথা অস্বীকার করে জোটের অন্যতম শরিক জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টি (জাগপা) সভাপতি শফিউল আলম প্রধান দ্য রিপোর্টকে বলেন, এই নির্বাচনে বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্য খুঁজছে ১৯ দলীয় জোট। আমরা বৈচিত্র্যের মধ্যেই ঐক্য চাই।

প্রধান বলেন, একক প্রার্থী হলে ভালো হত। তবে আমরা ইচ্ছা করেই যে সব এলাকায় অন্য শরিকদের জনপ্রিয়তা বেশি আছে সে সব এলাকা ছেড়ে দিয়েছি। যে যার মতো করে প্রার্থী হয়েছে। সবাইকে জানিয়ে দিতে চাই, একাধিক প্রার্থী থাকা সত্ত্বেও ১৯ দলের প্রার্থী জয়ী হবে।

তবে এ ব্যাপারে একমত নয় বিএনপি। কেন্দ্র থেকে কোনো রকম নিয়ন্ত্রণের কথা অস্বীকার করেন বিএনপির যুগ্ম-মহাসচিব ও দফতর সম্পাদক অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী।

উপজেলা নির্বাচনে জোট এবং বিএনপির একাধিক প্রার্থী বাছাই সম্পর্কে রিজভী আহমেদ দ্য রিপোর্টকে বলেন, কেন্দ্র থেকে এ ব্যাপারটি নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে না। জেলা বিএনপির নেতাদের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে তারাই বিষয়টি দেখভাল করবেন। যে কারণে আমার পক্ষে কিছু বলা সম্ভব হচ্ছে না।

রিজভী আহমেদ বলেন, ‘কেন্দ্র থেকে আমরা টুকটাক খবর রাখছি।’

সিরাজগঞ্জ জেলা জামায়াতের সেক্রেটারি মাওলানা শাহিনুর আলম দ্য রিপোর্টকে বলেন, ‘এককভাবে প্রার্থী দেওয়ার ক্ষেত্রে বিএনপির পক্ষ থেকে কোনো ধরনের উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। তারা শুধুমাত্র সদর উপজেলার ক্ষেত্রে একটু আগ্রহ দেখায়।’

সিরাজগঞ্জ জেলায় চারটি উপজেলার মধ্যে তিনটিতেই জামায়াত ভালো অবস্থানে আছে বলে দাবি করেন তিনি।

দ্য রিপোর্টের জেলা প্রতিনিধিদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে জানা গেছে, ৯৮টি উপজেলা নির্বাচনে বেশিরভাগ আসনেই বিএনপি জোটের একাধিক প্রার্থী রয়েছে। কোথাও বিএনপির একাধিক প্রার্থী আবার কোথাও বিএনপি-জামায়াত উভয় দলের প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। কুষ্টিয়া, মানিকগঞ্জ, নীলফামারী, খুলনা, রাজবাড়ী, কুড়িগ্রাম, সাতক্ষীরা, দিনাজপুর, রংপুর, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও সিরাজগঞ্জের একাধিক উপজেলায় এককভাবে বিএনপির এবং শরিকগতভাবে বিএনপি ও জামায়াতের একাধিক প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।

কুষ্টিয়া : কুষ্টিয়া সদর উপজেলা বিএনপির সমর্থিত প্রার্থী উপজেলা বিএনপির যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক জাকির হোসেন সরকার, বিদ্রোহী প্রার্থী সদর উপজেলা যুবদল সভাপতি মো. জাহিদুল ইসলাম, জামায়াতে ইসলামীর নেতা ও সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান মো. মোশাররফ হোসাইন। ভেড়ামারা উপজেলায় বিএনপির প্রার্থী উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক তৌহিদুল ইসলাম আলম, বিদ্রোহী প্রার্থী ভারপ্রাপ্ত উপজেলা চেয়ারম্যান শাজাহান আলী।

মানিকগঞ্জ : সিংগাইর উপজেলা বিএনপির প্রার্থী খান মোহাম্মদ রুমি, আবিদুর রহমান। সাটুরিয়া উপজেলা- বশির উদ্দিন ঠান্ডু, জামায়াতে ইসলামের দেলোয়ার হোসেন। তবে দৌলতপুর উপজেলায় ১৯ দলের একক প্রার্থী তোজাম্মেল হক তোজা।

নীলফামারী : ডিমলা উপজেলায় ১৯ দলের প্রার্থীরা হলেন, উপজেলা বিএনপির সভাপতি রাইসুল আলম চৌধুরী ও জামায়াতে ইসলামীর উপজেলা আমীর মাওলানা আব্দুস সাত্তার। জলঢাকা উপজেলায় জামায়াতে ইসলামী নেতা উপজেলা চেয়ারম্যান আলহাজ্ব সৈয়দ আলী। সৈয়দপুর উপজেলায় বিএনপির জেলা সভাপতি আব্দুর গফুর সরকার ১৯ দলের একক প্রার্থী।

খুলনা : কয়রা উপজেলায় বিনপির দুজন ও জামায়াতের একজন প্রার্থী রয়েছেন। এরা হলেন, বিএনপি সভাপতি অ্যাডভোকেট মোমরেজুল ইসলাম ও বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী মতিয়ার রহমান ও খুলনা দক্ষিণ জেলা জামায়াতের আমীর সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান মাওলানা তমিজ উদ্দিন। দীঘলিয়া উপজেলায় বিএনপির একক প্রার্থী মাহফুজুর রহমান।

রাজবাড়ী : বালিয়াকান্দি উপজেলায় ১৯ দলের প্রার্থীরা হলেন, বিএনপির সভাপতি মোহাম্মদ আবুল হোসেন খান ও জেলা বিএনপির সহ-সভাপতি গোলাম শওকত সিরাজ। পাংশা উপজেলায় জেলা বিএনপির সহ-সভাপতি আশরাফুল ইসলাম বিএনপির একক প্রার্থী। রাজবাড়ী উপজেলায় বিএনপির একক প্রার্থী জেলা বিএনপির সহ-সভাপতি অ্যাডভোকেট এম এ খালেক।

কুড়িগ্রাম : ভুরুঙ্গামারী উপজেলায় বিএনপি থেকে উপজেলা সভাপতি কাজী গোলাম মোস্তফা, জামায়াতে ইসলামী থেকে জেলা আমীর হাফেজ আজিজুর রহমান রয়েছেন। ফুলবাড়ী উপজেলায় উপজেলা বিএনপির সভাপতি নজির হোসেন একক প্রার্থী। উলিপুর উপজেলায় পৌর বিএনপির সভাপতি হায়দার আলী ও জামায়াত নেতা মাওলানা আব্দুল কুদ্দুস প্রার্থী হয়েছেন ।

সাতক্ষীরা : আশাশুনি উপজেলায় ১৯ দলের প্রার্থীরা হলেন, উপজেলা বিএনপির সভাপতি এসএম রফিকুল ইসলাম, জামায়াতের সাবেক সংসদ সদস্য মাওলানা রিয়াছাত আলীর ছেলে নূ.আ.ম মুরতাজুল আলী।

দিনাজপুর : কাহারোলে উপজেলা বিএনপির সহ-সভাপতি মামুনুর রশিদ চৌধুরী একক প্রার্থী। খানাসামা উপজেলায় বর্তমান চেয়ারম্যান শহিদুজ্জামন শাহ ও বিদ্রোহী প্রার্থী মোফাচ্ছের হক শাহ বিএনপি সমর্থিত প্রার্থী।

রংপুর : মিঠাপুকুর উপজেলা- বিএনপি নেতা সাজেদুর রহমান, উপজেলা জামায়াতের আমীর অধ্যাপক গোলাম রাব্বানী। বদরগঞ্জ উপজেলা- জামায়াত নেতা অ্যাডভোকেট বায়েজিদ ওসমানি, উপজেলা বিএনপির সভাপতি শাখাওয়াত হোসেন। পীরগঞ্জ উপজেলা- জেলা বিএনপির যুগ্ম-আহ্বায়ক ও সাবেক সংসদ সদস্য নূর মোহাম্মদ মন্ডল একক প্রার্থী।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ : নাচোল উপজেলায় রয়েছেন বিএনপি নেতা আবু তাহের, এম মজিদুল হক, জামায়াত নেতা সিরাজুল ইসলাম।

সিরাজগঞ্জ : রায়গঞ্জ উপজেলায় প্রার্থী হয়েছেন বর্তমান উপজেলা চেয়ারম্যান জামায়াত নেতা এবিএম আব্দুস সাত্তার ও বিএনপি নেতা আইনুল হক। উল্লাপাড়াতে উপজেলা বিএনপির সহ-সভাপতি অ্যাডভোকেট শামছুল ইসলাম ও জামায়াত নেতা অ্যাডভোকেট জাহিদ হোসেন মিন্টু প্রার্থী হয়েছেন। সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলায় হয়েছেন বিএনপি সভাপতি মজিবুর রহমান লেবু ও শহর জামায়াতের আমীর অধ্যাপক শহিদুল ইসলাম। কাজীপুর উপজেলায় রয়েছেন বিএনপি নেতা আব্দুল কাদের ও অ্যাডভোকেট রবিউল হাসান।

উল্লেখ্য, ১৯ ফেব্রুয়ারি ৯৮টি উপজেলায় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। গত ১৯ জানুয়ারি দেশের ৪৮৭ উপজেলা পরিষদের মধ্যে ১০২টির নির্বাচনী তফসিল ঘোষণা করে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। এর মধ্যে ৯৮টি আসনে ১৯ ফেব্রুয়ারি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। সীমানা সংক্রান্ত জটিলতার কারণে বাকি চারটিতে নির্বাচন হচ্ছে না।

(দ্য রিপোর্ট/এমএইচ/কেএ/এনআই/এমডি/সা/জানুয়ারি ০৪, ২০১৪)