দ্য রিপোর্ট প্রতিবেদক : বিএনপি চেয়ারপারসন ও ১৯ দলীয় জোট নেতা খালেদা জিয়া গুলশানের হোটেল ওয়েস্টিনে মঙ্গলবার বিকেলে সংবাদ সম্মেলন করেন। সংবাদ সম্মেলনে তার দেওয়া পূর্ণাঙ্গ বক্তব্য দ্য রিপোর্টের পাঠকদের জন্য উপস্থাপন করা হলো।

বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম

প্রিয় সাংবাদিকবৃন্দ,

শোকের মাস ফেব্রুয়ারিতে আমি শুরুতেই অমর ভাষা শহীদদের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করছি। মাতৃভাষা বাংলার মর্যাদা প্রতিষ্ঠায়, জীবন দিয়ে তাঁরা আমাদের জাতীয়তাবাদী চেতনার উন্মেষ ঘটিয়েছিলেন।

আজ হিন্দু সম্প্রদায়ের স্বরস্বতী পূজা। আমি দেশের হিন্দু ভাই-বোন, বিশেষ করে সনাতন ধর্মাবলম্বী শিক্ষার্থীদের শুভেচ্ছা জানাচ্ছি।

দেশে গণতন্ত্র নেই। গণতন্ত্রকে হত্যা করে, প্রায় একদলীয় ও একব্যক্তির স্বৈরশাসন জাতির কাঁধে চেপে বসেছে। এটা করা হয়েছে কারসাজি ও জবরদস্তির মাধ্যমে। ইচ্ছেমতো সংবিধান বদল করে, সেই সংবিধানের দোহাই দিয়ে, বিনাভোটে ও বিনাপ্রতিদ্বন্দ্বিতায় এরা ক্ষমতা দখল করেছে। নির্বাচনকে জালিয়াতিপূর্ণ তামাশায় পরিণত করা হয়েছে। জনগণের ভোটের অধিকার কেড়ে নেয়া হয়েছে।

তিনশ’ আসনের মধ্যে সংখ্যাগরিষ্ঠ ১শ’ ৫৩ আসন তারা ভোটের আগেই ভাগবাটোয়ারা করে নিয়েছিলেন। বিএনপিকেও তারা এর ভাগ দিতে চেয়েছিলেন। আমরা আসন ভাগাভাগি চাইনি। চেয়েছি সুষ্ঠু, অবাধ, নিরপেক্ষ ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচন। যেখানে মানুষ ভোট দিতে পারবে। তেমন নির্বাচন নিশ্চিত করতেই আমরা নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের দাবি জানিয়েছিলাম। সকলের সামনে পরিষ্কার হয়ে গেছে যে, এ দাবি কত সঠিক ছিলো।

জনগণের ভোট, অনুমোদন ও সমর্থন ছাড়া ইতিমধ্যে তামাশার সংসদ ও ক্ষমতা দখলকারী একটি অবৈধ সরকার গঠন করা হয়েছে। এই সরকার ও সংসদ বৈধ জনপ্রতিনিধিদের দ্বারা গঠিত নয়। এই সংসদের নেতা, স্পীকার, ডেপুটি স্পীকার, সাজানো বিরোধীদলের নেতা, কেউ-ই জনগণের ভোটে নির্বাচিত হননি। জনপ্রতিনিধিত্বহীন সরকারের প্রধানমন্ত্রী ও বেশীভাগ মন্ত্রীই হয়েছেন ভোট ছাড়া। এরা কেউ-ই নির্বাচিত নন। ইচ্ছেমাফিক রদবদল করা সংবিধানের ধুয়া তুলে, আইনের ফাঁকে এদেরকে নির্বাচিত বলে ঘোষণা করা হয়েছে।

এরা এক সময় বলতেন, সংবিধান তারা বদল করেছেন জনগণের ভোটের অধিকার রক্ষার জন্য। অথচ তারা জনগণের ভোটের অধিকার কেড়ে নিয়ে তাদের ভোট ও সমর্থন ছাড়াই তথাকথিত সংসদ ও অবৈধ সরকার গঠন করেছেন। দেশবাসীর সঙ্গে এতোবড় প্রতারণার পর তাদের মুখে আর জনগণের কথা শোভা পায় না।

১৯৭৫ সালে এরা গণতন্ত্র হত্যা করে বাকশাল গঠনের মাধ্যমে একদলীয় স্বৈরশাসন কায়েম করেছিল। জনগণের সম্মতি ও অনুমোদন ছাড়া সরকার ও সংসদের মেয়াদ বাড়িয়ে নিয়েছিল। তাদের দলের নেতাকে জনগণের ভোট ছাড়াই রাষ্ট্রপতি পদে অধিষ্ঠিত করে ঘোষণা করেছিল: ‘যেন তিনি নির্বাচিত।’ একই ধারায় এবার তারা ভোট ছাড়াই তামাশার সংসদ ও অবৈধ সরকার গঠন করেছে। এরা কেউ নির্বাচিত নন। ‘যেন তারা নির্বাচিত।’ এই ‘নির্বাচিত বলে গণ্য’ ব্যক্তিদের নিয়ে গঠিত সরকার ও সংসদ আর যাই হোক, গণতান্ত্রিক যে হতে পারেনা, তাতে কোনো সন্দেহ নেই।

যারা নির্বাচনের নামে প্রহসন করে জনগণের ভোট ছাড়াই সংসদ ও সরকার গঠনের মতো জোচ্চুরি করেছে, তারাই আবার নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের গণদাবি এই অজুহাতে মানতে চায়নি যে, তারা নির্বাচিত নয়। অথচ নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দাবিতে আওয়ামী লীগ এক সময় আন্দোলনের নামে যে ভয়াবহ নৈরাজ্য ও সন্ত্রাস সৃষ্টি করেছিল তা’ কারো অজানা নয়। আসলে চরম সুবিধাবাদী এই দলটি যখন যেটাই তাদের কাছে সুবিধাজনক মনে হয়, তারা তখন সেটাই বলে এবং করে। আবার সুবিধা না হলে, তারা এর চরম বিপরীত অবস্থান নিতেও সামান্যতম লজ্জাবোধ করেনা।

বাংলাদেশের জনগণ এই সুবিধাবাদী ও প্রতারণার রাজনীতির স্বরূপ হাড়ে হাড়ে উপলব্ধি করেছেন। তাই তারা ওদেরকে উচিত-শিক্ষা দিয়েছেন। গত ৫ জানুয়ারি নির্বাচনের নামে যে প্রহসনের আয়োজন করা হয়েছিল দেশবাসী স্বত:স্ফূর্তভাবে তা বর্জন করেছেন। শতকরা ৫ জন ভোটারও ভোটকেন্দ্রে যাননি। আওয়ামী রাজনীতির এতোবড় বিপর্যয় ও এমন শোচনীয় পরাজয় সাম্প্রতিককালে আর কখনো ঘটেনি। তারা যে কতটা গণবিচ্ছিন্ন, তাদের গণভিত্তি যে কতটা দুর্বল, তা সারা দুনিয়ার সামনে হাতে-কলমে প্রমাণ হয়ে গেছে।

যদি দেশের জনগণ তাদের শক্তির উৎস হতো এবং যদি তাদের রাজনৈতিক অস্তিত্বের শেকড় বাংলাদেশের অভ্যন্তরে থাকতো, তাহলে তারা নিজেদের ভুল শুধরে নিতেন। জনগণকে আস্থায় নিতেন। সকল রাজনৈতিক দল ও পক্ষের সঙ্গে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে সংকটের সুরাহা করে একটা সমঝোতায় পৌঁছাতেন। কিন্তু তারা বাস্তবতা থেকে আরো দূরে সরে গিয়ে মিথ্যাচার ও অপপ্রচারের মাত্রা বাড়িয়ে দিয়েছেন। সন্ত্রাস ও অস্ত্রের শক্তির ওপর ভর করে অবৈধ শাসনকে প্রলম্বিত করতে চাইছেন। চক্ষুলজ্জা সম্পূর্ণ বিসর্জন দিয়ে গলাবাজি এবং জনগণ ও রাজনৈতিক দলগুলোকে হুমকি ধামকি দিয়ে চলেছেন। প্রতিদ্বন্দ্বী সকল পক্ষ, গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক শক্তি ও দলসমূহকে নিশ্চিহ্ন করে দিয়ে ক্ষমতায় টিকে থাকার অপকৌশল গ্রহণ করেছেন। এর মাধ্যমে তারা সংকটকে আরো গভীর ও প্রলম্বিতই করছেন শুধু।

সাংবাদিক ভাই ও বোনেরা,

আপনারা জানেন দুর্বলের প্রতিশোধ ভয়ংকর। পরাজয়ের গ্লানি ভয়াবহ। অক্ষমতার জিঘাংসা মারাত্মক। সম্পূর্ণ গণবিচ্ছিন্ন ও জনগণ কর্তৃক বর্জিত আওয়ামী লীগ রাজনৈতিকভাবে পরাজিত হয়ে আরো বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। তারা একদিকে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস চালাচ্ছে, অপর দিকে দলীয় সন্ত্রাসীদের সারা দেশে লেলিয়ে দিয়েছে জনগণ ও প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক দলগুলোর বিরুদ্ধে। প্রতিপক্ষকে নির্মূল করার এমন নিষ্ঠুর তান্ডব ও ভয়ংকর হত্যাযজ্ঞ স্বাধীনতা-পরবর্তী আওয়ামী-বাকশালী শাসনামলের পৈশাচিক বর্বরতাকেও হার মানিয়েছে। বিরোধীদলের নেতা-কর্মীদের তালিকা করে বেছে বেছে খুন, গুম, বিচার বহির্ভূত হত্যা, আটক করে গুলি চালিয়ে বা নির্মম দৈহিক নির্যাতনে পঙ্গু করে দেয়া এখন স্বাভাবিক ঘটনায় পরিণত হয়েছে। তারা দেশকে পাইকারি হত্যাকান্ডের এক আতঙ্কিত জনপদে পরিণত করেছে। খুনী, সন্ত্রাসীদের ছেড়ে দিয়ে দেশের কারাগারগুলো ভরে ফেলা হয়েছে রাজনৈতিক নেতা-কর্মীদের দিয়ে। এক-একটি ঘটনায় হাজার হাজার অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিকে আসামী করে মামলা দায়ের করা হচ্ছে। আর বিরোধী দলের নেতা-কর্মীদের যখন যাকে খুশি গ্রেফতার-নির্যাতন চালিয়ে ওই মামলার আসামী দেখানো হচ্ছে। নির্যাতন ও হেনস্থা ছাড়াও চলছে গ্রেফতার-বাণিজ্য।

বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপি’র কেন্দ্রীয় দফতরে এ পর্যন্ত যে খুন, গুম, নির্যাতন ও গ্রেফতারীর হিসেব, তালিকা ও নাম-ঠিকানা এসেছে তা আমি এখন আপনাদের মাধ্যমে তুলে ধরছি। এ হিসেব গত ২৬ ডিসেম্বর থেকে ২৭ জানুয়ারি পর্যন্ত মাত্র এক মাসের। প্রাপ্ত এ পরিসংখ্যান অনুযায়ী এ সময়ে সারা দেশে প্রায় তিনশ’ রাজনৈতিক নেতা-কর্মী খুন ও গুম হয়েছেন।

ঠাকুরগাঁও জেলায় যৌথবাহিনী ও আওয়ামী সন্ত্রাসীদের গুলিতে নিহত হয়েছেন বিএনপি ও জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের মোট ৪ জন থানা পর্যায়ের নেতা। দিনাজপুর জেলায় ৫ জন নিহত হয়েছেন।

নীলফামারীতে বিএনপি, ছাত্রদল ও যুবদলের স্থানীয় নেতা-কর্মীসহ ৬ জন নিহত ও ৯ জন গুম হয়েছেন। যারা গুম হয়েছেন তারা সকলেই বিএনপি ও জাতীয়তাবাদী স্বেচ্ছাসেবক দলের স্থানীয় নেতা।

লালমনিরহাটে বিএনপি ও স্বেচ্ছাসেবক দলের স্থানীয় ৪ জন নেতা-কর্মীসহ মোট ৬ জন আওয়ামী সন্ত্রাসীদের গুলিতে নিহত হয়েছে। রংপুরে যৌথবাহিনী ও আওয়ামী সন্ত্রাসীদের গুলিতে ২ জন নিহত হয়েছে। কুড়িগ্রামে ২ জনকে গুলি করে হত্যা করা হয়। আওয়ামী সন্ত্রাসী ও যৌথবাহিনীর গুলিতে গাইবান্ধায় নিহত হয়েছেন ৬ জন। এদের বেশিরভাগেই জামায়াত-শিবিরের স্থানীয় নেতা-কর্মী। গুম হয়েছেন স্থানীয় বিএনপি’র ২ জন নেতাসহ ১১ জন। জয়পুরহাট জেলায় আওয়ামী সন্ত্রাসী ও যৌথবাহিনীর গুলিতে ১২ জন নেতা-কর্মী নিহত হয়েছেন। বগুড়ায় আওয়ামী সন্ত্রাসী ও যৌথবাহিনীর গুলিতে জাতীয়তাবাদী যুবদলের ৩ নেতা-কর্মীসহ নিহত হয়েছেন ৫ জন। স্থানীয় বিএনপি’র ৭ জন স্থানীয় নেতা-কর্মীসহ ১৯ দলীয় জোটের ১৩ জন নিহত হয়েছেন চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলায়। নওগাঁয় নিহত হয়েছেন বিএনপির ইউনিয়ন পর্যায়ের এক নেতাসহ ১৯ দলের ২ জন। রাজশাহী পৌর ছাত্রদলের যুগ্ম-সম্পাদকসহ জেলায় আওয়ামী সন্ত্রাসীদের গুলিতে নিহত হয়েছেন দু’জন ছাত্রনেতা। নাটোরে নিহত দুজন ছাত্রদল ও যুবদলের স্থানীয় নেতা। বিএনপি, ছাত্রদল ও যুবদলের স্থানীয় ৭ নেতা-কর্মীসহ সিরাজগঞ্জ জেলায় আওয়ামী সন্ত্রাসীদের গুলিতে ১৪ জন নিহত হয়েছেন। পাবনা জেলায় বিএনপি ও যুবদলের থানা পর্যায়ের ৬ নেতা-কর্মীসহ ৭ জন নিহত হয়েছেন যৌথবাহিনী ও আওয়ামী সন্ত্রাসীদের গুলিতে। মেহেরপুরে যৌথবাহিনী ও আওয়ামী সন্ত্রাসীদের গুলিতে নিহত ৭ জনের মধ্যে ৬ জন বিএনপি ও যুবদল নেতা। অপরজন জামায়াতে ইসলামীর জেলা আমীর তারেক মোহাম্মদ সাইফুল হক। কুষ্টিয়ায় জেলা বিএনপি’র ৪ জন গুরুত্বপূর্ণ নেতা আওয়ামী সন্ত্রাসীদের গুলিতে নিহত হন। যৌথবাহিনী ও আওয়ামী সন্ত্রাসীদের গুলিতে বিএনপি’র ১ নেতাসহ ১৯ দলের দু’জন নিহত হয়েছেন চুয়াডাঙ্গায়। ঝিনাইদহে যৌথবাহিনীর গুলিতে নিহত হয়েছেন ১৯ দলের ১ জন। আর দুজন গুম হয়েছেন। ছাত্রদলের জেলা সহ-সভাপতি কবির হোসেন পলাশ ও থানা পর্যায়ের এক যুবদল নেতাসহ মোট ৪ জন যৌথবাহিনী ও আওয়ামী সন্ত্রাসীদের গুলিতে নিহত হয়েছেন যশোর জেলায়।

মাগুরা ও বাগেরহাট জেলায় ছাত্রদল ও যুবদলের দুই নেতাকে গুলি করে ও কুপিয়ে হত্যা করা হয়।

বিএনপি ও ছাত্রদলের স্থানীয় পর্যায়ের ৪ জন নেতাকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে খুলনা জেলায়। গুম হয়েছেন একজন।

সাতক্ষীরায় বিএনপি ও যুবদলের ৫ জন নেতাসহ ২৭ জন যৌথবাহিনী ও আওয়ামী সন্ত্রাসীদের গুলিতে নিহত হয়েছেন। গুম করা হয়েছে স্থানীয় পর্যায়ের তিন বিএনপি নেতাসহ ৬ জনকে। যারা নিহত ও গুম হয়েছেন তাদের বেশিরভাগই জামায়াত-শিবিরের স্থানীয় নেতা-কর্মী।

পটুয়াখালীতে ১ জন বিএনপি নেতা ও পিরোজপুরে ১৯ দলীয় জোটের একজন কর্মীকে গুলি করে হত্যা করা হয়।

কিশোরগঞ্জে এক বিএনপি নেতাকে আওয়ামী সন্ত্রাসীরা কুপিয়ে এবং মুন্সিগঞ্জে যৌথবাহিনী গুলি করে ছাত্রদলের এক নেতাকে হত্যা করে। ঢাকা মহানগরীতে এই এক মাসে কেবল বিএনপি ও এর বিভিন্ন অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের থানা ও ওয়ার্ড পর্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ ২১ জন নেতাকে বিভিন্ন স্থান থেকে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী আটক করে নিয়ে গিয়ে গুম করে ফেলেছে। সিলেটে গুম হয়েছে ছাত্রদল নেতা-কর্মীসহ ৩ জন। কুমিল্লা জেলায় যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দল ও ছাত্রদলের ৩ নেতা-কর্মীসহ ৪ জন নিহত হয়েছেন। গুম করা হয়েছে লাকসাম উপজেলা বিএনপি’র সভাপতি সাইফুল ইসলাম হিরু ও লাকসাম পৌর বিএনপির সভাপতি হুমায়ুন পারভেজকে। চাঁদপুর জেলায় আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও আওয়ামী সন্ত্রাসীদের হাতে নিহত হয়েছে ১৯ দলের মোট ২৩ জন। এরমধ্যে ২১ জনই বিএনপি, ছাত্রদল, যুবদল ও শ্রমিক দলের স্থানীয় নেতা-কর্মী। ফেনীতে বিএনপি, ছাত্রদল ও যুবদলের স্থানীয় ৫ নেতা-কর্মীসহ ৯ জন নিহত হয়েছে যৌথ বাহিনী ও আওয়ামী সন্ত্রাসীদের হাতে। নোয়াখালীতে বিএনপি ও ছাত্রদল নেতাসহ ১৯ দলের ১১ জন নিহত হয়েছে। লক্ষ্মীপুরে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী ও আওয়ামী সন্ত্রাসীদের ভয়াবহ তান্ডবে ২০ জন নিহত হয়েছে। তাদের প্রায় সবাই বিএনপি ও এর বিভিন্ন অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের স্থানীয় নেতা। গুম করা হয়েছে জেলা যুবদলের সাধারণ সম্পাদক ইকবাল মাহমুদ জুয়েলসহ ২ জনকে। চট্টগ্রাম জেলায় এক মাসে বিএনপি এবং অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠন সমূহের ৮ স্থানীয় নেতা-কর্মীসহ ১৫ জন যৌথ বাহিনীর গুলি ও আওয়ামী সন্ত্রাসীদের হাতে নিহত হয়েছে। গুম করা হয়েছে ৩ জনকে। বিএনপি, ছাত্রদল, যুবদলের ১৭ নেতা-কর্মীকে হত্যা করা হয়েছে কক্সবাজার জেলায়।

বিএনপি’র কেন্দ্রীয় দফতরে সংগ্রহীত তথ্য অনুযায়ী মাত্র এক মাসেই বিরোধীদলের ২শ ৪২জন নেতা-কর্মীকে হত্যা ও ৬০ জনকে গুম করা হয়েছে। প্রকৃত চিত্র আরো ভয়াবহ।

রাজনৈতিক নেতা-কর্মীদের আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী দিয়ে ধরে নিয়ে গিয়ে বিনা বিচারে হত্যা ও গুম একটি সভ্য সমাজে চলতে পারে না। আমি দুটি ঘটনার কথা বলবো। গত ২৮ জানুয়ারি বিকালে নোয়াখালীর সোনাইমুড়ি উপজেলার বিএনপি’র যুগ্ম-আহবায়ক তৌহিদুল ইসলামকে জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে থেকে ডিবি পুলিশ গ্রেফতার করে। তাকে র‌্যাবের হাতে দেয়া হয়। র‌্যাব তাকে পল্টন থানায় হস্তান্তর করে। বিএনপি’র অন্যতম যুগ্ম-মহাসচিব ব্যারিস্টার মাহবুবউদ্দিন খোকন রাতে থানায় গিয়ে তৌহিদের উপস্থিতিতে পুলিশের সঙ্গে কথা বলে। পরদিন তৌহিদকে পুলিশ পাহারায় তাদের গাড়িতে করে নোয়াখালী নিয়ে যায়। খোকন পুলিশ ও র‌্যাবের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রেখে তৌহিদকে আদালতে সোপর্দ করার অনুরোধ করে। তা সত্ত্বেও তৌহিদকে গুলি করে হত্যা করে হাসপাতালে লাশ রেখে যায়।

নিলফামারীর একজন সংসদ সদস্যের গাড়ি বহরে হামলার ঘটনায় অভিযুক্ত বিএনপি’র তিন স্থানীয় নেতাকে যৌথবাহিনী গ্রেফতার করে নিয়ে যায়। পরে রাস্তায় গুলিবিদ্ধ অবস্থায় তাদের লাশ পাওয়া যায়।

বিভিন্ন সংবাদ-মাধ্যমে প্রকাশিত পরিসংখ্যান অনুযায়ী প্রহসনের নির্বাচনের বিরুদ্ধে বিরোধীদল আন্দোলন শুরুর পর থেকে গত ৩১ জানুয়ারি পর্যন্ত বিরোধী দলের ২শ’ ৭৬ জন নেতা-কর্মীকে হত্যা করা হয়েছে। আটকের পর বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডে শিকার হয়েছেন ৩৪ জন। গ্রেফতার করা হয়েছে ২৯ হাজার ২শ’ ৬২ জনকে।

প্রিয় সাংবাদিকবৃন্দ,

দেশে এখন কী ধরনের পরিস্থিতি বিরাজ করছে আমি এখন সে-সম্পর্কে কয়েকটি মানবাধিকার সংগঠনের ও সংবাদপত্রের রিপোর্টের সার-সংক্ষেপ তুলে ধরছি। মানবাধিকারের চরম অস্থিতিশীল অবস্থা অতিক্রম করছে বাংলাদেশ। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সমঝোতা না হলে দেশে জঙ্গিবাদ বা সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের উত্থান হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এ জন্য তৃতীয় শক্তি ক্ষমতায় আসার সম্ভাবনা রয়েছে। রাজনৈতিক অস্থিরতার সুযোগে দেশে ঢালাও অভিযান শুরু হয়েছে। এতে নিরপরাধ লোকজনকে গ্রেফতার করছে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী। আবার অনেক সংখ্যালঘু পরিবারের সদস্যদের ধরে শিবিরকর্মী বানিয়ে ফেলছে পুলিশ। ৩১ ডিসেম্বর মঙ্গলবার সকালে ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির হলরুমে মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসাক) বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি-২০১৩ প্রতিবেদন প্রকাশ করে। এ উপলক্ষে সংস্থাটির কর্মকর্তারা এসব বলেছেন। আসক-এর পরিসংখ্যানে জানানো হয়, এক বছরে সারা দেশে ৫৩ জন গুপ্তহত্যার শিকার হয়েছে। রাজনৈতিক সংঘাতে ৫শ’ ৭ জন নিহত, ৭২ জন বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, সন্ত্রাসীদের হামলায় ৩ সাংবাদিক নিহত ও ২শ’ ৮০ জন আহত, সীমান্তে ২৬ জনকে হত্যা ও ৮শ’ ১২ জন নারী ধর্ষণের শিকার হয়েছে। (সূত্র : দৈনিক যুগান্তর)

বেসরকারি মানবাধিকার সংগঠন অধিকার এক বিবৃতিতে বলেছে, অধিকারের প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী ২৫ নভেম্বর থেকে সহিংসতায় ১ শ’ ৪৯ জন নিহত এবং ৪ হাজার ৮শ’ ৮৬ জন আহত হয়েছেন। এসময় ৫৯ জন বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এ ছাড়া একই সময়ে ১০ জনকে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য পরিচয়ে ধরে নিয়ে যাওয়ার পর থেকে তাদের গুম হওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। গত ৩ জানুয়ারি শুক্রবার সংগঠনটির এক বিবৃতিতে এসব কথা বলা হয়েছে। (সূত্র : মানবজমিন)

নির্বিচারে গ্রেফতার বন্ধ এবং শান্তিপূর্ণভাবে সভা-সমাবেশ ও মত প্রকাশের স্বাধীনতার অধিকার প্রদানের জন্য বাংলাদেশ সরকারের উপর চাপ সৃষ্টির আহ্বান জানিয়েছে নিউইয়র্কভিত্তিক আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ(এইচআরডব্লিউ)। গত ৮ জানুয়ারি বুধবার সংস্থার ওয়েবসাইটে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে এ আহ্বান জানানো হয়েছে। (সূত্র : ইত্তেফাক)

বাংলাদেশ সরকারের কঠোর দমননীতির কারণে ২০১৩ সালের মানবাধিকার পরিস্থিতির মুখ থুবড়ে পড়েছে বলে মন্তব্য করেছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ। ২১ জানুয়ারি মঙ্গলবার বিশ্ব মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে একথা বলা হয়।

(সূত্র : বাংলাদেশ প্রতিদিন)

৫ জানুয়ারির একতরফা নির্বাচনের আগের রাত থেকে দেশজুড়ে সহিংসতায় ৩শ’ ১৫টি মামলা হয়েছে। এসব মামলায় নামে-বেনামে আসামি করা হয়েছে ৬৩ হাজারের বেশি লোককে। এই আসামিদের ধরতে চলছে যৌথ বাহিনীর অভিযান। এই অভিযানে পুলিশের হিসাব অনুসারে চলতি মাসের ১০ দিনেই গ্রেফতার হয়েছে ২২ হাজারের বেশি লোক। তবে পুলিশ কর্মকর্তাদের দাবি, ২২ হাজারের মধ্যে নিয়মিত আসামিও রয়েছে। এদিকে যৌথ বাহিনীর অভিযানকে কেন্দ্র করে নিরীহ মানুষকে হয়রানি ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের অভিযোগ উঠেছে। (সূত্র : প্রথম আলো)

হঠাৎ বেড়ে গেছে কথিত সাদা পোশাকধারীদের তৎপরতা। তাদের এই তৎপরতার কারণে দেশে গুমের ঘটনা বেড়ে গেছে। তারা কখনও নিজেদের সরকারের আইন প্রয়োগকারী সংস্থা র‌্যাব, কখনও বা ডিবি পুলিশ বলে পরিচয় দিলেও তারা আসলে কারা সে বিষয়টি বছরের পর বছর রহস্য হয়েই থাকে। এক সময় শুধু র‌্যায়াবের ওপর গুমের অভিযোগ আনা হলেও এখন ডিবি পুলিশের নামও ব্যবহার করতে শোনা যাচ্ছে। সূত্রগুলো বলেছে, দেশে গত কয়েক মাসে বেশকিছু লোক নিখোঁজ বা গুম হয়েছে।

(সূত্র : যুগান্তর)

বাংলাদেশের আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বন্ধের আহ্বান জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ)। গত ২৭ জানুয়ারি সোমবার সংস্থাটির ওয়েবসাইটে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে বলা হয়, সম্প্রতি বৃদ্ধি পাওয়া বিচার-বহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে সরকারের স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্ত করা উচিত। একই সঙ্গে নিরাপত্তা হেফাজতে আটক সব ব্যক্তির নিরাপত্তা নিশ্চিতে সরকারের উচিত আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোকে প্রকাশ্যে নির্দেশ দেয়া। (সূত্র : ইত্তেফাক)

৩০ জানুয়ারি বৃহস্পতিবার পর্যন্ত দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর কথিত বন্দুকযুদ্ধ বা গুলি বিনিময়ের ঘটনায় নিহতের সংখ্যা দাঁড়াল ২০। তাদের মধ্যে ১৬ জনই রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মী। এসব মৃত্যুর ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করে মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) বলেছে, বিচারবহির্ভূতভাবে কারও শাস্তি তাঁর প্রাপ্য হতে পারে না। (সূত্র : প্রথম আলো)

সাংবাদিক বন্ধুগণ,

দেশের বর্তমান চিত্র যে ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে, আমি তার একটি খণ্ডচিত্র তুলে ধরলাম মাত্র। দলীয়করণ ও হীন রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে অপব্যবহারের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর নৈতিক শক্তি ধ্বংস করে ঘাতক বাহিনীতে পরিণত করা হয়েছে। বাইরের নির্দেশনায় গোয়েন্দা সংস্থাগুলোকে গণতান্ত্রিক রাজনীতি দমন ও বিরোধী দল নির্মূলের অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। সীমান্ত অরক্ষিত রেখে সীমান্তরক্ষী বাহিনীকে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ নির্মূলের অসৎউদ্দেশ্যে অপব্যবহার করা হচ্ছে। জঙ্গীবাদ ও গুরুতর সন্ত্রাস দমনে আমরা র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন বা র‌্যাব গঠন করেছিলাম। সেই জনপ্রিয় বাহিনীর সুনাম ধ্বংস করে এটিকে গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক নেতা-কর্মীদের কাছে মূর্ত্তিমান আতঙ্কে পরিণত করা হয়েছে। পুলিশ ও এর গোয়েন্দা শাখার কার্যক্রমকে অপরাধ দমনের চেয়ে গণতান্ত্রিক রাজনীতি দমনের কাজেই বেশি প্রয়োগ করা হচ্ছে। শুধু রাজনৈতিক নেতা-কর্মীরাই নন, সাধারণ মানুষও আজ আক্রান্ত ও আতঙ্কিত। দেশজুড়ে এক চরম অস্বাভাবিক অবস্থা বিরাজ করছে। বিরোধী দলের নেতা-কর্মীরা হত্যা, গুম, নির্যাতন ও গ্রেফতারের ভয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছে। তারা বাড়িতে থাকতে পারেনা। অনেকের পরিবার ছাত্রখান হয়ে যাচ্ছে। স্বজনেরা উৎকণ্ঠায় সময় অতিবাহিত করছে। আক্রান্ত জনপদে বাড়ি-ঘরে হামলা, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটের পাশাপাশি ধর্ষণের মতো গুরুতর অভিযোগও উঠছে।

বাংলাদেশের জনগণ রাষ্ট্রীয় কোনো বাহিনীর বিরুদ্ধে নন। এগুলো জনগণের বাহিনী। কিন্তু অবৈধ সরকারের ক্ষমতা রক্ষায় তাদেরকে আজ জনগণের প্রতিপক্ষে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে। আমরা খবর পেয়েছি, এসব বাহিনীর অধিকাংশ সদস্য বেআইনী জুলুম-নির্যাতন চালানোর বিরুদ্ধে। কিন্তু অতিউৎসাহী কিছু কর্মকর্তা তাদেরকে বেআইনি কর্মকাণ্ডে বাধ্য করছে।

শুধু আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাবাহিনী বা রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস নয়, আওয়ামী লীগের সহযোগী সংগঠনগুলোর সন্ত্রাসীরা বিভিন্ন জায়গায় প্রকাশ্যে সশস্ত্র হামলা চালাচ্ছে। খুন করছে, জখম করছে, অত্যাচার করছে, লুটপাট করছে। প্রতিকারের কেউ নেই। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী এই দুর্বৃত্তদের সঙ্গে যোগ দিয়ে অত্যাচারে অংশ নিচ্ছে।

আপনারা যারা সংবাদ-মাধ্যমে কাজ করছেন তাদের পক্ষেও সাহস করে সত্য তুলে ধরা এখন কঠিন হয়ে পড়েছে।

অন্যায় অবিচারের বিরুদ্ধে প্রতিকারের পথ খুবই সংকুচিত হয়ে পড়েছে। দলীয়করণ ও নানামুখী নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে বিচার বিভাগকে অধিকাংশ ক্ষেত্রে ক্ষমতাসীনদের পছন্দমাফিক রায় ও সিদ্ধান্ত দিতে বাধ্য করা হচ্ছে। বিচার বিভাগীয় কার্যক্রমের মাধ্যমেও কোনো কোনো ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের পথ প্রশস্ত হতে দেখা যাচ্ছে।

রাজনৈতিক আন্দোলন ও সন্ত্রাসকে সমার্থক হিসাবে প্রচার করে অবৈধ সরকার রাজনৈতিক দমন-পীড়ন, হত্যা-গুম, হামলা-মামলা, গ্রেফতার-নির্যাতনের পথ বেছে নিয়েছে। সেই অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করলেই মিথ্যা মামলায় জড়িয়ে সিনিয়র রাজনৈতিক নেতাদের হেনস্থা- হয়রানি করা হচ্ছে। আমাদের শান্তিপূর্ণ সভা-সমাবেশ ও মিছিল করতেও বাধা দেয়া হচ্ছে। পুলিশ-র‌্যাব হামলা চালাচ্ছে। ঢাকায় বিরোধী দলের সমাবেশ, গণজমায়েত, জনসভা ও মিছিল করার অধিকার কার্যত: হরণ করা হয়েছে। জবরদস্তি ও ত্রাসের এই বেআইনি শাসনের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের জনগণ বেশিদিন নীরব থাকবে না। আমরাও নিশ্চেষ্ট বসে থাকবো না। হত্যা, গুম, উৎপীড়ন ও বিরোধী দল নির্মূলের এই রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস অবিলম্বে বন্ধের জন্য আমি জোর দাবি জানাচ্ছি। যে সব হত্যাকাণ্ড ঘটেছে তার সুষ্ঠু তদন্ত করে দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। কারো বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ থাকলে তাকে গ্রেফতার করে বিচারে সোপর্দ করা যায়। কিন্তু বিনাবিচারে হত্যা করলে সেই খুনের বিচার হতে হবে।

আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী ও দলীয় সন্ত্রাসীদের দিয়ে বিরোধী দলের নেতা-কর্মীদের অপহরণ ও গুম বন্ধ করতে হবে। গুমের ঘটনা তদন্ত করে দোষীদের শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। রাজনৈতিক নেতা-কর্মীদের গ্রেফতার-হয়রানি বন্ধ এবং তাদের বিরুদ্ধে দায়ের করা মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার ও মুক্তি দেওয়ার জন্য আমি দাবি জানাচ্ছি। আমাদের দাবি, রাজনৈতিক সভা-সমাবেশ ও মিছিলের ওপর থেকে সকল বিধিনিষেধ অবিলম্বে তুলে নিতে হবে। দমন-পীড়ন বন্ধ করে সকল বন্ধ সংবাদ-মাধ্যম খুলে দিয়ে আটক সাংবাদিকদের মুক্তি দেয়ার দাবি জানাচ্ছি। জনগণ-বর্জিত প্রহসনের নির্বাচন থেকে দৃষ্টি অন্যদিকে ফেরাতে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সংখ্যালঘু, বিশেষ করে হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজনের স্থাবর সম্পদ, বাড়ি-ঘর ও উপাসনালয়ে হামলার সুপরিকল্পিত ঘটনার ব্যাপারে বিএনপির উদ্যোগে গঠিত নাগরিক তদন্ত কমিটি কাজ করছে। এসব ন্যক্কারজনক ঘটনাকে বিরোধী দলের নেতা-কর্মীদের হয়রানির অস্ত্র হিসাবে ব্যবহার বন্ধ করতে হবে। প্রকৃত অপরাধীদের গ্রেফতার করে বিচারের আওতায় আনতে হবে।

বিভিন্ন স্থানে প্রকাশ্যে সশস্ত্র সন্ত্রাস লিপ্ত আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ ও শ্রমিক লীগের সন্ত্রাসীদের গ্রেফতার ও বিচারের আওতায় আনতে হবে।

ভয়ংকর সন্ত্রাসীদের একের পর এক জেল থেকে মুক্ত করার ঘৃণ্য ও ভয়ংকর প্রক্রিয়া বন্ধ করতে হবে।

ফেব্রুয়ারি মাস চলছে। এই মাসেই ২০০৯ সালে পিলখানায় ২৫ ফেব্রুয়ারি ৫৭ জন চৌকষ ও মেধাবী সেনা কর্মকর্তা নিহত হন। সেই শোকাবহ দিনে ঢাকায় এশিয়া কাপ ক্রিকেটের উদ্বোধন উপলক্ষে জাঁকজমকপূর্ণ নাচ-গানের অনুষ্ঠানের আয়োজনের কথা আমরা শুনেছি। বেদনাবিধূর ওই দিনটিতে কোনো আড়ম্বরপূর্ণ অনুষ্ঠান না করার জন্য আমি সংশ্লিষ্টদের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি।

বাংলাদেশে রাষ্ট্রীয় ও ক্ষমতাসীনদের মদতপুষ্ট সন্ত্রাসের মাধ্যমে মানবাধিকারের চরম লংঘণ করে যে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করা হয়েছে, অবাধ যে হত্যালীলা চলছে আমি সে দিকে জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক সকল মানবাধিকার সংস্থার দৃষ্টি আকর্ষণ করছি। কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানাচ্ছি।

গণতন্ত্রহীন বাংলাদেশে আইনের শাসন ও ন্যায়বিচারের অনুপস্থিতিতে অবাধ রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস যে-ভাবে বেড়ে চলেছে তাতে এখানে একটি মানবিক বিপর্যয় ত্বরান্বিত হচ্ছে। গণতান্ত্রিক অধিকার ও রাজনীতির নিষ্ঠুর দলনের পরিনতিতে চরমপন্থী ও জঙ্গীবাদী শক্তির উত্থানের পথ প্রশস্ত করা হচ্ছে। উগ্রবাদী পথে ঠেলে দেয়া হচ্ছে প্রতিবাদী তারুণ্য ও অবদমিত শক্তিকে। এই হঠকারিতার পরিণাম সম্পর্কে আমি সংশ্লিষ্ট সকলকে সচেতন ও সক্রিয় হবার আহ্বান জানাচ্ছি।

আমরা মানুষের জন্য রাজনীতি করি। তাদের সমর্থন আমাদের একমাত্র শক্তি। সেই সমর্থন আমাদেরকে উজ্জীবিত ও অনুপ্রাণিত করেছে। ভোট ও অধিকারবঞ্চিত মানুষ সুযোগের অপেক্ষায় আছে। আমরা নিশ্চিত ইনশআল্লাহ্ তার এর উপযুক্ত জবাব দেবে।

শত উৎপীড়ন সয়ে জীবন দিয়ে আমাদের নেতা-কর্মীরা ও সাধারণ মানুষ তাদের আন্দোলন সকল করেছেন। বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের হৃদয় ও গণতান্ত্রিক রাজনীতির অভিধান থেকে আওয়ামী লীগের নাম মুছে গেছে। তাদের হাতে রচিত হয়েছে বাংলাদেশের গণতন্ত্র হত্যার কলঙ্কিত দ্বিতীয় অধ্যায়। এই কলঙ্ক মোচনের জন্য আমরা বারবার তাদের প্রতি সংলাপ শুরু ও সমঝোতায় উপনীত হবার আহবান জানিয়ে আসছি। এ আহ্বানে সাড়া দেয়া বা না-দেয়া তাদের সিদ্ধান্তের বিষয়। তবে এই দেশকে যে-কোনো উপায়ে গণতন্ত্রের পথে ফিরিয়ে আনতেই হবে। এর জন্য নির্দলীয়-নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ, অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ জাতীয় নির্বাচনের কোনো বিকল্প নেই।

আমি আজ আপনাদের মাধ্যমে দেশবাসীকে শুধু এটুকু জানাতে চাই যে, বিএনপি একদলীয় বাকশালী স্বৈরশাসনের ধ্বংসস্তুপ থেকে বহুদলীয় গণতন্ত্র এনেছে। আওয়ামী লীগসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের পুনর্জন্ম দিয়েছে। স্বৈরচার হটিয়ে সংসদীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেছে। জনগণের সমর্থনে বারবার দেশ পরিচালনায় অভিজ্ঞ বিএনপি জানে কোন্ পরিস্থিতিতে কী সিদ্ধান্ত নিতে হয়। রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক বিষয়ে স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদী বিভিন্ন কৌশল ও কর্মপন্থা নিরুপন করেই বিএনপি এগিয়ে যাচ্ছে।

রাজনীতি ও ইতিহাস সম্পর্কে আমার যতটুকু জ্ঞান আছে, তা থেকে বুঝি যে, আজকের সভ্য পৃথিবীতে দু-একটি সার্টিফিকেট জোগাড় করে এই অন্যায় ও অবৈধ শাসনকে প্রলম্বিত করা সম্ভব নয়। বাংলাদেশের জনগণ দীর্ঘদিন এই স্বৈরাচার ও স্বেচ্ছাচারকে মেনে চলবে না। আমরাও অনির্দিষ্টকাল ধরে শুধু সংলাপ ও সমঝোতার আহ্বান জানিয়েই যাবো, এমন ভাবারও কোনো কারণ নেই। তাই সময় থাকতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য আবারও আহ্বান জানিয়ে আমার বক্তব্য আজকের মতো এখানেই শেষ করছি।

আপনাদের সকলকে ধন্যবাদ।

আল্লাহ হাফেজ, বাংলাদেশ জিন্দাবাদ।

(দ্য রিপোর্ট/টিএস-এমএস/এমএআর/ফেব্রুয়ারি ০৪, ২০১৪)