তারেক সালমান ও মাহমুদুল হাসান, দ্য রিপোর্ট : উপজেলা নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দলের সমর্থন দেওয়া না দেওয়ার ব্যাপারে প্রভাবশালী নেতাদের বিরুদ্ধে অর্থবাণিজ্যের অভিযোগ উঠেছে। বিএনপির তৃণমূল নেতাকর্মীদের অভিযোগ, তৃণমূলে জনসমর্থন থাকার পরও অনেকে অর্থ দিতে না পারায় দলের সমর্থন থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। অন্যদিকে অর্থের বিনিময়ে অযোগ্য ও জনসমর্থনহীন নেতাদের বিএনপির পক্ষ থেকে সমর্থন দেওয়া হচ্ছে।

উপজেলা নির্বাচনে অর্থের বিনিময়ে দলের সমর্থন দেওয়ার বিষয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার রফিকুল ইসলাম মিয়া দ্য রিপোর্টকে বলেন, ‘এ সব অভিযোগ সম্পর্কে আমি অবহিত নই। আমার কাছে এ ধরনের কোনো অভিযোগ আসেনি। তাই কোনো বক্তব্য নেই।’

জানা গেছে, বঞ্চিত ও ক্ষুব্ধ নেতাকর্মীরা এ সব অভিযোগ নিয়ে প্রতিদিনই ধরনা দিচ্ছেন বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয় থেকে শুরু করে দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতাদের দ্বারে দ্বারে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে তারা নয়াপল্টন কার্যালয়ে উপস্থিত হয়ে দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবসহ দফতরে লিখিত ও মৌখিক অভিযোগ জানাচ্ছেন। অনেকে কোনো প্রতিকার না পেয়ে হতাশ হয়ে ফিরছেন। এ সব গুরুতর অভিযোগের বিষয়ে দলের তৃণমূল নেতাকর্মীরা দ্রুত পদক্ষেপ নিতে বিএনপি হাইকমান্ডের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। না হলে সাংগঠনিকভাবে বিধ্বস্ত বিএনপি তৃণমূল নেতাকর্মীদের আস্থা হারাবে বলেও তারা আশংকা প্রকাশ করেছেন।

ক্ষুব্ধ নেতাকর্মীদের আশংকা, উপজেলা নির্বাচনে যোগ্য প্রার্থী বাছাইয়ে ব্যর্থতা আগামী আন্দোলন ও জাতীয় নির্বাচনেও বিরূপ প্রভাব ফেলবে। একে কেন্দ্র করে কোন্দল দল ও জোটের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়বে বলে তারা মনে করছেন।

দলীয় সূত্র জানায়, নির্বাচন কমিশন ঘোষিত প্রথম পর্বের ৯৭ উপজেলায় নির্বাচন হবে আগামী ১৯ ফেব্রুয়ারি। এ সব উপজেলায় বিএনপির দীর্ঘদিনের ত্যাগী ও জনসমর্থন আছে এমন নেতাদের সমর্থন না দিয়ে টাকার বিনিময়ে নতুন ও ‘হঠাৎ নেতা’দের দল ও ১৯ দলীয় জোটের সমর্থন দেওয়া হচ্ছে। নেতাদের এ সব অন্যায়ের প্রতিবাদ করায় প্রতিবাদকারীদের তারা অবৈধ প্রভাব খাটিয়ে দল থেকে বহিষ্কার করাচ্ছে। তৃণমূল নেতাকর্মীদের মতামতকে পাশ কাটিয়ে কেন্দ্র ও জেলা পর্যায়ের নেতাদের পছন্দ চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে।

বিএনপি সূত্রে জানা গেছে, গত ১২দিনে কমপক্ষে ৭০ নেতাকে বহিষ্কার করেছে বিএনপি।

রাজশাহী বিএনপির প্রভাবশালী নেতা ও কেন্দ্রের বিশেষ সম্পাদক এডভোকেট নাদিম মোস্তফা এবং জেলার নেতা আজিজুর রহমানের বিরুদ্ধে কেন্দ্রের কাছে অভিযোগ করেছেন তৃণমূল নেতাকর্মীরা। অভিযোগ নিয়ে গত শনিবার দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন স্থানীয় নেতারা। এ সময় তারা নাদিম মোস্তফার বিরুদ্ধে ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের কাছে ১৬ পৃষ্ঠার অভিযোগও দেন। এর মধ্যে ওইসব নেতার বিরুদ্ধে টাকার বিনিময়ে প্রার্থী দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।

রাজশাহীর বাঘা উপজেলা বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও ইউপি চেয়ারম্যান আকবর আলী দ্য রিপোর্টকে অর্থবাণিজ্যের অভিযোগ সম্পর্কে বলেন, ‘আমাদের বাঘা উপজেলায় দলের সাধারণ নেতাকর্মীদের মতামতের ভিত্তিতে বিএনপির প্রার্থী অধ্যাপক জাহাঙ্গীর হোসেন। কিন্তু তাকে দলের সমর্থন না দিয়ে জুনিয়র একটি ছেলেকে (থানা যুবদলের নেতা আবদুল্লাহ) অর্থের বিনিময়ে সমর্থন ঘোষণা করেন নাদিম মোস্তফা ও আজিজুর রহমান। আমরা ঢাকায় গিয়ে ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবকে অভিযোগ জানিয়েছি।’

আকবর আলী বলেন, ‘আবদুল্লাহকে মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের জন্য গতকাল (রবিবার) কেন্দ্র থেকে চিঠি দিয়েছে। তবে সে এখনও প্রত্যাহার করেনি। দলের সাধারণ নেতাকর্মীরা অধ্যাপক জাহাঙ্গীরের পক্ষে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করে যাচ্ছেন।’

এ ব্যাপারে নাদিম মোস্তফার বক্তব্য জানতে বার বার তার মোবাইলে ফোন করলেও তিনি তা রিসিভ করেননি।

বিএনপির দফতর সূত্রে জানা যায়, উপজেলা নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর সারাদেশে তৃণমূলের মতামতের ভিত্তিতে একক প্রার্থী নির্ধারণে দলের পক্ষ থেকে কয়েকটি সাংগঠনিক টিম গঠন করা হয়। কিন্তু কিছু কেন্দ্রীয় নেতার প্রভাব বিস্তার, জেলা নেতাদের কোন্দল ও সংশ্লিষ্ট এলাকার বিএনপিদলীয় সাবেক এমপিদের প্রতিবন্ধকতার কারণে বেশিরভাগ উপজেলায় একক প্রার্থী নির্ধারণে ব্যর্থ হয় টিম। পরে বিএনপির উচ্চপর্যায়ের মনিটরিং টিম বিদ্রোহী প্রার্থীদের সঙ্গে কথা বলে সমঝোতার চেষ্টা করেন। কিছু এলাকায় নেতারা আলোচনার ভিত্তিতে দলীয় সিদ্ধান্ত মেনে সরে দাঁড়ালেও অনেকেই তা অমান্য করেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ১০/১২ দিনে অন্তত ৬০/৭০ জন তৃণমূল নেতাকে বহিষ্কার করে বিএনপি। শোকজ করা হয়েছে আরও ৭ জনকে। আবার উপজেলা নির্বাচনকে কেন্দ্র করেই অনেকের বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার করেছে বিএনপি। এ সব ক্ষেত্রে আর্থিক অনিয়মেরও অভিযোগ করেছেন নেতাকর্মীরা। তারা জানান, শুধু প্রার্থীকে সমর্থন দেওয়ার শর্তে ও অনেককে বহিষ্কার এবং দলে ফেরানোকে কেন্দ্র করে অনেক কেন্দ্রীয় নেতা আর্থিক লেনদেনের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছেন।

বাগেরহাট জেলা বিএনপি সূত্রে জানা যায়, জেলার ফকিরহাট উপজেলায় দলীয় প্রার্থী বাছাইয়ে গত ১ ফেব্রুয়ারি ১৯ দলীয় জোটের একটি বৈঠক হয়। সেখানে কমিটির ৫৩ সদস্য গোপন ভোটের মাধ্যমে ৯০ দশকের সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান জেলা বিএনপির সহসভাপতি শেখ কামরুল ইসলাম গোরাকে প্রার্থী হিসেবে নির্বাচিত করেন। তৃণমূলের ভোটের পরও জেলা বিএনপির হস্তক্ষেপে থানা বিএনপি নেতা শরিফুল কামাল তারিন ফকিরহাটে প্রার্থী হন।

এ বিষয়ে শেখ কামরুল ইসলাম গোরা দ্য রিপোর্টকে বলেন, ‘উপজেলা নির্বাচনে প্রার্থিতা নির্ধারণে তৃণমূল নেতাকর্মীরা গোপন ভোটের মাধ্যমে আমাকে দলের প্রার্থী হিসেবে সমর্থন দেয়। কিন্তু জেলা বিএনপির সিনিয়র সহসভাপতি এডভোকেট অহিদুজ্জামান দীপু ও সাধারণ সম্পাদক আলী রেজা বাবু অন্য প্রার্থীর কাছ থেকে সুবিধা নিয়ে আমার প্রার্থিতার বিরোধিতা করছে।’

তিনি দাবি করেন, ‘আমাকে সমর্থন দেওয়ার কথা বলে সাধারণ সম্পাদক বাবু আমার কাছে অর্থদাবি করেন। আমি টাকা না দেওয়ায় থানা বিএনপি নেতা শরিফুল কামাল তারিনের পক্ষে মাঠে নেমেছেন তারা। এ সব নেতা তাদের পছন্দকে চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টার সঙ্গে সঙ্গে আমার দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনকে ব্যাহত করার ষড়যন্ত্র করছে।’

গোরা বলেন, ‘বিষয়টি জানিয়ে আমি ইতোমধ্যেই দলের চেয়ারপারসন, ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব এবং আমাদের নেতা স্থায়ী কমিটির সদস্য তরিকুল ইসলাম ও সাংগঠনিক সম্পাদক মশিউর রহমানকে জানিয়েছি।’

অপরদিকে খুলনা জেলা বিএনপির সভাপতি অধ্যাপক মাজেদুল ইসলামের ভাই আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থী ড. মাহবুবুল ইসলামকে জয়ী করার জন্য বর্তমান উপজেলা চেয়ারম্যান মো. আলাউদ্দিন সরদার মিঠুকে বাদ দিয়ে অপেক্ষাকৃত দুর্বল প্রার্থীকে সমর্থন দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এমনকি নির্বাচিত উপজেলা বিএনপির কমিটি ভেঙ্গে একটি আজ্ঞাবহ আহ্বায়ক কমিটি গঠন করা হয়েছে। যাতে আলাউদ্দিন সরদার বিএনপির সমর্থন লাভে ব্যর্থ হন।

এ ব্যাপারে আলাউদ্দিন সরদার দ্য রিপোর্টকে বলেন, ‘আমার বিরুদ্ধে অনেক ষড়যন্ত্র হয়েছে। দলের ভেতর থেকেই তা করা হয়েছে। এই মুহূর্তে সবকিছু বলা যাচ্ছে না। দলের চেয়ারপারসনকে আমি সব বিষয় জানাব।’

এদিকে দ্য রিপোর্টের বগুড়া প্রতিনিধি আলমগীর হোসেনের কাছে সদ্য দল থেকে বহিষ্কৃত ধুনট থানা বিএনপি সভাপতি তৌহিদুল আলম মামুন বলেন, ‘চেয়ারম্যান পদে বিএনপি বা ১৯ দল আমাকে আগে থেকেই আনুষ্ঠানিকভাবে সমর্থন দিয়েছে। হঠাৎ করে স্থানীয় বিএনপির সাবেক এমপি সংস্কারপন্থি নেতা গোলাম মো. সিরাজ ধুনট থানার আরেক প্রার্থীর পক্ষে মোটা অঙ্কের অর্থ দিয়ে দলের কেন্দ্রীয় নেতাদের বুঝিয়ে তার লোককে সমর্থন দিয়েছেন।’

মামুন বলেন, ‘সোমবার বিকাল পর্যন্ত বহিষ্কারের কোনো চিঠি আমি হাতে পাইনি। আমি বিএনপির সমর্থন নিয়েই নির্বাচনের মাঠে আছি।’

নন্দীগ্রাম উপজেলার জামায়াত নেতা নুরুল ইসলাম মণ্ডলও চেয়ারম্যান পদে জোটের প্রার্থী নির্ধারণে বিএনপি নেতাদের বিরুদ্ধে অর্থবাণিজ্যের অভিযোগ করেছেন। তিনি দ্য রিপোর্টকে বলেন, আমাকে ১৯ দলের নেতাকর্মী এবং দলের হাইকমান্ড আনুষ্ঠানিকভাবে এবং লিখিতভাবে চেয়ারম্যান পদে সমর্থন দিয়েছে। এখন জেলা নেতারা বিএনপির প্রার্থী ফরিদের কাছ থেকে টাকা নিয়ে তার পক্ষে গণসংযোগ করছে। তিনি আরও বলেন, বিএনপি যে জোটের পক্ষ থেকে আমাকে দেওয়া সমর্থনকে ফিরিয়ে নিয়েছে, সে ব্যাপারেও আমাকে কিছু জানায়নি।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য লে. জে. (অব.) মাহবুবুর রহমান নেতাদের অর্থবাণিজ্যের অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, উপজেলা নির্বাচন দলীয় নির্বাচন নয়। এখানে কেন্দ্রের চেয়ে স্থানীয় রাজনীতির প্রভাব বেশি। স্থানীয়ভাবে সমন্বয় করা না গেলেও কেন্দ্রীয়ভাবে জোটের একক প্রার্থী দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। কেন্দ্রীয়ভাবে এর জন্য চেষ্টা চলছে বলেও জানান তিনি।

(দ্য রিপোর্ট/টিএস-এমএইচ/এইচএসএম/আরকে/ফেব্রুয়ারি ১৭, ২০১৪)