এ.কে.এম মহিউদ্দীন

আজ ১৩ রমজান । মাগফেরাতের তৃতীয় দিবস। আমরা আগেই বলেছি যেহেতু এই মাসে রোজা রাখলে গুনাহ ক্ষমা করা হয, গুনাহকে জ্বালিয়ে পুড়িয়ে শেষ করে দেয, তাই এর নাম রমজান। রমজান মাস তিনটি ভাগে বিভক্ত। প্রথম ১০ দিন রহমত, দ্বিতীয ১০ দিন মাগফিরাত এবং তৃতীয় ১০ দিনকে নাজাতের সময় বলা হয়। এই মাসটিতে উম্মতে মুহাম্মদীর পুণ্য অর্জন এবং পাপ ক্ষমা করিয়ে  নেয়ার অপূর্ব সুযোগ তৈরি হয়। প্রতিটি কাজেরই একটা মওসুম বা ঋতু থাকে। আর অনেক কাজ বা পুণ্য অর্জনের অন্যতম মওসুম হলো এই মাস। সঙ্গত কারণেই প্রতিটি মুসলিম নর-নারী এই মাসটির জন্য ১১ মাস অপেক্ষায় থাকেন। তাই তো রাসূলে আকরাম [সা.] রজব মাস এলে দোযা করতেন, ‘হে আল্লাহ! রজব ও শাবানের বরকত আমাদের দান করো এবং রমজান পাওযার তাওফিক দাও।’ শুধু মানবজাতি নয, গোটা সৃষ্টি জগতই রমজানের জন্য অপেক্ষায় থাকে। তাই  তো দেখা যায, মাহে রমজান শুরু হলে প্রকৃতি যেন ভিন্ন রূপ ধারণ করে। রমজান ইসলামী সংস্কৃতির অন্যতম এক শ্রেষ্ঠ নিদর্শন। সাম্যবাদের এক মহান শিক্ষার বীজ এখানে রোপিত হয়েছে।

রাসূলে আকরাম [সা.] এরশাদ করেন, ‘ রোজাদারের জন্য রয়েছে দু’টি আনন্দ। একটি হলো ইফতারের সময এবং অন্যটি হলো আল্লাহ্‌র সাথে সাক্ষাতের সময়। আল্লাহর কাছে রোজাদারের মুখের গন্ধ মেশক আম্বরের সুঘ্রাণের চেয়েও উত্তম।’

[বোখারি, মুসলিম]

সত্যিকারভাবেই ইফতারির পূর্বক্ষণে বান্দাহ অজানা এক আনন্দে পুলকিত হয। সারা দিনে ক্ষুধা পিপাসার কথা ভুলে যায। পারিবারিকভাবে হোক কিংবা সামাজিকভাবে হোক ইফতারসামগ্রী সামনে নিয়ে যখন বসা হয, তখন রোজাদারেরা অপেক্ষমাণ থাকে কখন মাগরিবের আজান হবে। যখনই আজানের সুর ভেসে আসে, তখনই ইফতার শুরু হয়ে যায়। এ এক অনাবিল আনন্দ, যা ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। অপর আনন্দটি হলো আল্লাহর সাথে সাক্ষাৎ। তার জন্যই তো কঠোর সাধনা করে রোজা রাখা হয়। রাসূলে আকরাম [সা.].এরশাদ করেন, বেহেশতে রাইয়ান নামক একটি দরজা আছে। রোজাদার ছাডা আর কেউ সেই দরজা দিয়ে প্রবেশ করতে পারবে না। (বোখারি, মুসলিম) মানুষের শারীরিক সুস্থতার জন্য রোজা একান্ত প্রয়োজন। আল্লাহতাযালা রোজা শুধু উম্মতে মুহাম্মদীর জন্য ফরজ করেননি, অতীতের সব নবীর উম্মতের জন্যও রোজা ফরজ ছিল। অর্থাৎ রোজা রেখে মানুষ সুস্থ থাকবে, আর সুস্থ শরীর নিয়ে আল্লাহ্‌র ইবাদত করবে। আমার যা খাই পাকস্থলির মাধ্যমে পারিপাক হয়। শরীরের যে অংশে যা যা প্রয়োজন তা সেই অংশে চলে যায় এবং বাকি অংশ বর্জ্য আকারে বের হয়ে যায়। একটি যন্ত্র অনবরত চলতে থাকলে নষ্ট হয়ে যায বা অল্প সময়ে বিকল হয়ে যায়। যারা রোজা রাখেন তাদের শরীরের পরিপাকতন্ত্র কিছু সময়ের জন্য বিশ্রামে থাকে, ফলে রোজাদার কঠিন রোগব্যাধি থেকে রক্ষা পায। রাসূলে আকরাম [সা.] এরশাদ করেন, তোমরা রোজা রাখো, সুস্থ থাকবে। হাদিসটির বৈজ্ঞানিক ভিত্তি রয়েছে, বিজ্ঞান এই হাদিসের বার্তার কাছে নতি স্বীকার করেছে। প্রায় সাড়ে চৌদ্দশ’ বছর আগে রাসূলে আকরাম [সা.] এর মুখনিঃসৃত পবিত্র এই বাণীটুকু আজ বিজ্ঞানের কাছে অপার বিস্ময। কারণ এ পর্যন্ত রোজার মাধ্যমে অনেক রোগের প্রতিকারের রহস্য আবিষ্কৃত হয়েছে। মূলত ইসলামি শরিযার প্রতিটি বিধানের মধ্যে রয়েছে মানবতার অপার কল্যাণ, যা আজ বৈজ্ঞানিকভাবে সত্য বলে প্রমাণিত।

রোজা কম খাওয়ার অন্যতম ট্রেনিং। রোজার মাধ্যমে ক্ষুধার্ত এবং পিপাসার্ত মানুষের কষ্ট কিছুটা হলেও বোঝা যায। বর্তমানে কিছু রোজাদার এমন আছেন, যারা ইফতারের পর থেকে সাহরির পূর্ব পর্যন্ত রকমারি সুস্বাদু খাবার খেতেই থাকেন। যা রোজার ল্ক্ষ্য ও উদ্দেশ্যের সম্পূর্ণ বিপরীত। রোজাদার সর্বেক্ষেত্রে সংযমী হবে। খাবার খেতেও সংযমী হতে হবে। রোজা ইসলাম ধর্মের এক বিজ্ঞান সম্মত বিধান। এর ফজিলত অপরিসীম। এই ফজিলত অর্জন করতে হলে দেহের প্রতিটি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গকে রোজার আওতায় নিয়ে আসতে হবে। প্রথমেই অন্তরকে পরিশুদ্ধ করতে হবে। এরপর পালন করতে হবে পেটের রোজা। পেটের রোজা হলো হালাল খাবার অর্থাৎ পেটকে হারাম খাদ্য ও পানীয় থেকে বাঁচাতে হবে। সুতরাং, সুদ, ঘুষ, জুয়া, হারাম জিনিসের ব্যবসায-বাণিজ্য, চোরকারবারি, মজুদদারি, ওজনে কম দেয়া, ভেজাল মেশানো, চুরি, ডাকাতি, জুলুম, নির্যাতন ও ছিনতাই ইত্যাদির মাধ্যমে উপার্জিত খাবার দ্বারা রোজা রাখলে ওই ব্যক্তির রোজা আল্লাহ্‌র দরবারে কখনো কবুল হবে না। হায়! আফসোস, উল্লিখিত ইসলাম ও সমাজবিরোধী কার্যকলাপই আমাদের সমাজে ব্যাপকভাবে প্রচলিত আছে। তাই তো দেখা যায, রমজান আসার আগেই সব জিনিসের দাম হু হু করে বেড়ে যায, যা রোজার শিক্ষার একবারে বিপরীত। এ কারণেই রাসূলে [সা.] এরশাদ করেন, বহু রোজাদার রোজার মাধ্যমে ক্ষুধা ও পিপাসা ছাডা আর কিছুই লাভ করে না এবং রাতের বহু নামাজী রাত জাগরণ ছাডা আর কিছুই পায না। (ইবনে মাজাহ)

জিহ্বার রোজা হলো- মিথ্যা, অশ্লীল ও খারাপ কথা থেকে জিহ্বাকে সংযত রাখতে হবে। জিহ্বা হলো মানুষের কথা বলার বাহন। এটি আল্লাহর এক অপূর্ব নেয়ামত। সুতরাং এই জিহ্বা দ্বারা সব সময আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করতে হবে। কারণ পরকালে মানুষের মুখনিঃসৃত প্রতিটি শব্দ ও বাক্য সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে। তিনি এরশাদ করেছেন, যে ব্যক্তি মিথ্যা কথা ও খারাপ কাজ ত্যাগ করে না তার খানাপিনা বর্জনে আল্লাহ্‌র কোনো প্রয়োজন নেই। [বোখারি] অর্থাৎ যে ব্যক্তি রোজা রাখার পরও মিথ্যা কথা বর্জন করল না, তার রোজা আল্লাহ্‌র কাছে গ্রহণযোগ্য হবে না। কান শরীরের একটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ। এটি আল্লাহর এক বিশেষ নিযামত। কানের রোজা হলো, গান-বাজনা না শোনা; বরং কুরআন তিলাওযাত ও ভালো ভালো কথা শোনা। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তায়ালা বলেন, তারা যখন বেহুদা কথা শোনে তখন তারা তা এড়িয়ে যায।’ [সূরা : আল-কিসাস আয়াত: ৫৫]

প্রিয় পাঠক, আশা করা যায, বাকি ১১ মাসে এই অনুশীলন বা প্রশিক্ষণ কাজে লাগবে। রমজান মাস মহিমান্বিত মাস। এই মাসেই আমাদের পবিত্র ধর্মগ্রন্থ কুরআন নাজিল হয়েছে; যা মানবজাতির হেদায়াতের জন্য আল্লাহ তায়ালা কিয়ামত পর্যন্ত অটুট ও অক্ষয় রাখার ব্যবস্থা করেছেন। এই মাসেই রয়েছে পবিত্র লাইলাতুল-কদর, যা হাজার মাস থেকে উত্তম। এই রজনীর ইবাদত হাজার মাসের ইবাদতের চেয়েও বেশি। এখানে হাজার মাস বলতে আধিক্য বুঝানো হয়েছে। যার সীমা-পরিসীমা খোদাতায়ালাই ভালো জানেন।

(দ্য রিপোর্ট/একেএমএম/ মে ১৯,২০১৯)