গত ক'বছর ধরে আমেরিকান ভিটামিন ডি সোসাইটি-র আহ্বানে নভেম্বরের ০২ তারিখকে বিশ্বব্যাপী 'আন্তর্জাতিক ভিটামিন ডি' দিবস হিসেবে উদযাপন  করা হচ্ছে। ভিটামিন ডি বিসয়ে সচেতনা সৃষ্টি দিনে দিনে আরও প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠছে।

ভিটামিন ডি একটি চর্বিতে দ্রবনীয় যা শরীরের ক্যালসিয়াম, ফসফেট ইত্যাদির মাত্রা নিয়ন্ত্রণ করে। ভিটামিন ডি অস্থির কাঠামো তৈরি এবং ঘনত্ব বৃদ্ধিতে প্রভূত ভূমিকা রাখে। নাম শুনে ভিটামিন মনে হলেও ভিটামিন ডি আসলে একটি স্টেরোয়েড হরমোন। অন্যান্য ভিটামিন যেখানে এন্টি অক্সিজেন বা কো-এনজাইম হিসাবে কাজ করে, ভিটামিন ডি (স্টেরোয়েড হরমোন) জিন এক্সপ্রেশন নিয়ন্ত্রণ করে অর্থাৎ দেহের প্রোটিন তৈরিতে নিয়ন্ত্রণকারীর ভূমিকায় থাকে। প্রাণীজ ও উদ্ভিদজাত স্টেরল ও ফাইটোস্টেরল হতে সূর্যালোকের অতি বেগুনী রশ্মি দ্বারা রূপান্তরিত হয়ে দেহে ভিটামিন ডি তৈরি হয়। ভিটামিন ডি-২ ও ভিটামিন ডি-৩ মানব দেহে থাকে।

ভিটামিন ডি অভাবে কি কি উপসর্গ দেখা যায় ?


শিশুদের মধ্যে - গুরুতর ভিটামিন ডি অভাবে রিকেটস রোগ (হাড় বাঁকা ), শিশু পেশী খিঁচুনি, শ্বাস প্রশ্বাসের সমস্যা, হাপানি, চর্ম রোগ এবং এই সব শিশুদের ক্যালসিয়ামের স্বল্পতা ও দেখা দেয়, সে জন্য শীত প্রধান দেশের শিশুরা ৪০% বেশী আক্রান্ত হয় গ্রীষ্ম প্রধান দেশের চাইতে, তার কারণ সেখানের শিশুরা রৌদ্র থেকে ভিটামিন ডি যোগান খুব কম পায় বিধায় খাবার থেকে গ্রহণ করলে ও অনেক সময় ঠিক মত হজম শক্তির অভাবে বণ্টিত হয়না (ব্রিটেনে প্রতি ৫ জনে একজন ভিটামিন ডি স্বল্পতায় ভোগে থাকেন)।
তীব্র ভাবে ভিটামিন ডি অভাব থাকলে শিশুদের যা হতে পারে ⦁ শিশুর মস্তিষ্কের খুলি, পায়ের হাড় নরম হয়ে বা বাঁকা হয়ে যাওয়া,সামান্য একটু চাপে পায়ের হাড়ের যন্ত্রনায় কাঁদে শিশুরা যা পেশী যন্ত্রনা বা পেশী দুর্বলতার লক্ষণ; এটাই রিকেটস।


রিকেটস- ভিটামিন ‘ডি’এর অভাব হলে এবং ক্ষুদ্রান্ত্র থেকে ক্যালসিয়াম শরীরে শোষিত হতে না পারলে রিকেটস হয় কেননা হাড় গঠনের জন্য ক্যালসিয়াম এবং ফসফেট অতিপ্রয়োজনীয় উপাদান কিন্তু ভিটামিন ডি তা ক্ষুদ্রান্ত্রে শোশনে সাহায্য করে বিধায় হাড়ের ভঙ্গুরতা বা ক্ষয় হওয়া অথবা নরম হওয়া থেকে রক্ষা করে । বিশেষ করে শিশুদের বেলায় জন্মের তিন মাস থেকে ১৮ মাস পর্যন্ত যদি তার শরীরে পর্যাপ্ত ভিটামিন ডি যোগান দেওয়া না হয় তখন তার পা বা হাত বেঁকে যাওয়া বা ভঙ্গুর হওয়া দেখা দিতে পারে বিধায় শিশুদের ভিটামিন ডি জাতীয় খাবার দেওয়া অত্যান্ত জরুরী এবং সেই সাথে ভিটামিন ডি ৩ তে পৌঁছানোর জন্য প্রতিদিন সকালের রৌদ্রে ১৫/২০ মিনিট রাখা কর্তব। রিকেটসের লক্ষণ হিসাবে যা দেখা দিতে পারে। অনেক সময় ক্যালসিয়ামের ঘাটতি জনিত কারনে যদি খিচুনি দেখা দেয় তা হলে তাকে হাসপাতালে রেখে চিকিৎসা দেওয়া ভাল ।


অনেক সময় এ ধরনের শিশুদের দুর্বল হাড় বৃদ্ধির কারনে উচ্চতার চাইতে ওজন বেশী মনে করে শিশুরা হাটতে অনিচ্ছুক থাকে বা হাটতে বিলম্ব হতে পারে ( অনেকে বলেন মাথা বড় হওয়ায় হাটতে দেরি হইতেছে ইত্যাদি তাও ভুল )।তেমনই, দাঁত উঠতে বিলম্ব হতে পারে । শিশুদের শ্বাস- প্রশ্বাস ও চর্ম রোগ জনিত অসুখ বেশী হতে দেখা যায় ভিটামিন ডি অভাবে (শীত প্রধান দেশে প্রতি ৫ জনে একজন শিশুর ভিটামিন ডি অভাব মনে করা হয় বা ইউকে তে শিশুরা বেশির ভাগ হাঁপানি জনিত অসুখের শিকার হয় যে কারণে তার মধ্যে ভিটামিন ডি জনিত ঘাটতি অন্যতম – ব্রিটিশ মেডিক্যাল জার্নাল) । অন্য এক গবেষণায় দেখানো হয়েছে গর্ভবতী মায়েরা ভিটামিন-ডি পর্যাপ্ত পরিমাণে খেলে জন্মের তিন থেকে পাঁচ বছরের মধ্যে সন্তানদের অ্যাজমা হওয়ার সম্ভাবনা প্রায় ৪০ শতাংশ কম থাকে।

প্রাপ্তববয়স্কদের মধ্যে ভিটামিন ডি অভাবে যা দেখা দিতে পারে :

সাধারণ গ্লানি বা ক্লান্ত বোধ এবং অস্পষ্ট ব্যথা – যন্ত্রনা টি মাংস পেশি না হাড়ের মধ্যে করে তা অনেক সময় বয়স্ক রোগির বেলায় বুজাতে খুব কস্ট হয়, তবে গুরুত্বর ভাবে ভিটামিন ডি অভাব দেখা দিলে অস্টিওমেলাসিয়া জাতীয় আসুখ হবেই ইহা নিশ্চিত। সাধারন ভাবে যা দেখা যায় পেশীর দুর্বলতা, সিঁড়িআরোহণ করতে কষ্ট অনুভব, মেঝে বাচেয়ার থেকে উঠতে বসতে ভীষণ কস্ট পাওয়া, বিশেষ করে উরু ও পায়ের মাংশপেশি সমূহ হাড়ের সাথে ঝড়িয়ে ধরার মত মনে হয় ।
সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গিয়েছে,হৃদ রোগ, ডায়াবেটিস, স্ট্রোক ইত্যাদি অন্যান্য অসুখে ভিটামিন ডি যে যোগ সুত্র আছে।


হাড়ের ক্ষয় হওয়া জনিত অসুখে শুধু মাত্র ভিটামিন ডি কে একা ব্যবহার করলে একেবারেই কাজ করেনা বলে চিকিৎসা বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, হাড়ের ক্ষয় রোধ করতে ক্যালসিয়াম ,ফসফরাস এবং ভিটামিন ডি সহ একত্রে চিকিৎসা দিলে কয়েক বছরের জন্য কিছুটা রোধ করা সম্ভব। পুরুষের বয়স ৫৫ অতিরিক্ত পৌঁছে গেলে তিনি যদি তখন থেকেই ভিটামিন ডি, ক্যালসিয়াম ও ফসফরাস জাতীয় খাবারের দিকে একটু বেশী গুরুত্ব দেন তাহলে আরও ১২/১৫ বছর হাড়ের দুর্বলতা জাতীয় আসুখ। মহিলাদের রজঃ নিবৃতিরপর হতেহাড়েরঘনত্বকমতে শুরু করে তখন যদি তিনি ভিটামিন ডি, ক্যালসিয়াম ও ফসফরাস জাতীয় খাবারের দিকে গুরুত্ব দেন তা হলে কয়েক বছরের জন্য প্রতিহিত করা সম্বভ । এর পরে ও যদি না সারে তা হলে চিকিৎসকের পরামর্ষে ব্যবস্থা নিতে পারেন । কিন্তু ভিটামিন ডি বা ক্যালসিয়াম ইত্যাদি, কিডনির অসুখ বা হার্টের অসুখ অথবা যকৃতের কোন সমস্যা থাকলে অনেক সময় দুর্ভাগ্য বসত তা ব্যবাহার করতে চাইলে ও সে জাতীয় ঔষধ সেবন করতে পারবেন না, কেন না সে সময় ৬০% বেলায় এসব অসুখ থাকার কথা; তাই শরীর ভাল থাকতেই শরীরের রিজার্ভ পদার্থ সমুহের দিকে একটু লক্ষ রাখা উচিৎ । তখন খাবারের মাধ্যমেই ভিটামিন ডি বা অন্যান্য খনিজ পদার্থ গ্রহণ করতেই হবে ।
এ আলোচনা থেকে এটি নিশ্চিতভাবে ধরে নেয়া যায়, ভিটামিন কম বেশী সকলের প্রয়োজন হলে ও শিশু এবং বয়স্কদের জন্য খুব বেশি প্রয়োজন এবং একজন গর্ভবতী মায়ের জন্য প্রয়োজন তার আগামি সন্তান টি সুদৃঢ় ও মুজবুত অবকাটামো নিয়ে জন্ম নেওয়ার জন্য জরুরী ।


ভিটামিন ডি-র উৎস:

তালিকা: ৪০ আইইউ ভিটামিন ডি-র কার্যকারিতা ১ মাইক্রোগ্রাম সমতুল্য।

সূর্যালোক থেকে ভিটামিন ডি পেতে হলে মার্চ-অক্টোবর মাসের (অন্যান্য মাসগুলোতে আরো বেশি সময় ধরে) প্রতিদিন কমপক্ষে ৩০ মিনিট রোদ পোহাতে হবে যখন শরীরের ১৮ শতাংশের বেশি অংশে রোদ লাগবে।

১-৭০ বছর বয়সি মানুষের গড়ে প্রতিদিন ৬০০ আইইউ এবং ৭০ বছরের বেশি বয়সীদের ৮০০ আইইউ ভিটামিন ডি গ্রহণ করা দরকার।

ভিটামিন ডি ওষুধ হিসাবে খেতে হতে পারে কাদের?


১। নবজাতক যারা শুধুই মায়ের দুগ্ধ পান করছে ও যারা ১০০০ মিলিলিটারের কম শিশু খাদ্য গ্রহণ করে।
২। শিশু-কিশোর যারা অপরিকল্পিত ভাবে গড়ে উঠা নগরে বা অস্বাস্থ্যকর শহরে (ঢাকা অন্যতম) বসবাস করছে।
৩। দৈহিক স্থুল শিশু-কিশোর যাদের ত্বকের বিভিন্ন অংশে মকমলের মতো কালো অংশ দেখা দিচ্ছে।
৪। ধর্মীয় বা অন্য কারণে পোশাকে প্রায় সারাদেহ আবৃত শিশু-কিশোর।
৫। খাদ্য নালীর সমস্যার কারণে হজম ও বিপাকীয় কার্যক্রম হ্রাস পেলে।
৬। প্রাতিষ্ঠানিক জীবন যাপন (হেস্টেল, হাসপাতাল বা অফিস) যাতে রোদে যাবার সুযোগ কমে যায়।
৭। এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে গিয়েছে, এমন হলে।
ভিটামিন ডি-র ঘাটতি খুব বেশি হলে ৪০ হাজার আইইউ সপ্তাহে এবং পরবর্তীতে মাসে একটি করে ভিটামিন ডি ক্যাপসুল খেয়ে যেতে হবে। ঘাটতি কম হলে ২০ হাজার ক্যাপসুল যথেষ্ট হতে পারে।

ভিটামিন ডি-র ঘাটতি থাকলে তো বটেই, অন্য ক্ষেত্রেও, সকলকে সূর্যালোকে যেতে হবে নিয়মিত। দূর্ভাগ্যবশত: বাংলাদেশে প্রচলিত খাদ্যসমূহে ভিটামিন ডি-র উপস্থিতি খুবই কম, তারপরও যেসব খাদ্যে ভিটামিন ডি-র কিছু পরিমাণে উপস্থিতি আছে (উপরের তালিকা ভুক্ত) তা যতটা সম্ভব নিয়মিত খাওয়ার অভ্যাস করতে হবে।


ডাঃ শাহজাদা সেলিম
সহযোগী অধ্যাপক, এন্ডোক্রাইনোলজি বিভাগ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়
ইমেইল: selimshahjada@gmail.com