দিরিপোর্ট২৪ ডেস্ক : প্রখ্যাত সাংবাদিক গিয়াস কামাল চৌধুরী রাজধানীর একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শনিবার ভোরে মৃত‌্যুবরণ করেছেন। বাংলাদেশের সাংবাদিকতায় তাঁর অবদান অনস্বীকার্য। দিরিপোর্ট২৪ ডটকম পরিবারের পক্ষ থেকে প্রথিতযশা এই সাংবাদিকের স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা।

বাংলাদেশের সাংবাদিকতার ইতিহাসে গিয়াস কামাল চৌধুরী এক অবিস্মরণীয় নাম। তিনি একাধারে সাংবাদিক, সাংবাদিক নেতা, কলামিস্ট ও সংবাদ বিশ্লেষক ছিলেন। রাজনীতিসচেতন সংবেদনশীল মানুষ হিসেবে সাংবাদিক সমাজে তাঁর পরিচিতি ব্যাপক। মজলুম জননেতা মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানীর অনুসারী ছিলেন তিনি।

পাকিস্তান আমলে গণতান্ত্রিক ও স্বায়ত্তশাসনের পক্ষে আন্দোলনে অংশ নিয়ে কারাবরণ করেন তিনি। সাংবাদিকদের বিভিন্ন সংগঠনের নেতৃত্বদানসহ তিনি বাংলাদেশের হয়ে লন্ডনের বাংলাদেশ হাইকমিশনে কূটনীতিকের দায়িত্বও পালন করেন। সাংবাদিকতায় অবদানের জন্য সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় পুরস্কার একুশে পদক পান তিনি।

জন্ম ও শিক্ষাজীবন

গিয়াস কামাল চৌধুরীর পৈতৃক নিবাস ফেনী সদর উপজেলার শর্শদীতে হলেও তাঁর জন্ম ১৯৩৯ সালের ২১ জুলাই চট্টগ্রামে। কুমিল্লার বিখ্যাত দারোগা বাড়ির সন্তান তিনি। প্রাবন্ধিক মোতাহার হোসেন চৌধুরী ও সঙ্গীতজ্ঞ ওস্তাদ মোহাম্মদ হোসেন খশরু ছিলেন তাঁর চাচা। তাঁর মা মুনীর আখতার খাতুন চৌধুরাণী ছিলেন কবি। ‘চির সুমধুর’ নামে তাঁর একটি কবিতা সংকলন রয়েছে।

গিয়াস কামাল চৌধুরী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমএ ও এলএলবি ডিগ্রি নেওয়ার পর সাংবাদিকতায় ডিপ্লোমা করেন। ছাত্র আন্দোলনে অংশ নেওয়ার অপরাধে পাকিস্তান আমলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কারও হয়েছেন।

কর্মজীবন

গিয়াস কামাল চৌধুরীর সাংবাদিকতা শুরু হয় ১৯৬৪ সালে, ইত্তেফাক গ্রুপের 'ঢাকা টাইমস' পত্রিকায়। পরবর্তী সময়ে তিনি ইংরেজি দৈনিক মর্নিং নিউজ পত্রিকার আইন প্রদায়ক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। বাংলাদেশ স্বাধীনতা অর্জনের পর তিনি বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থায় (বাসস) যোগ দেন। এ ছাড়া তিনি ভয়েস অব আমেরিকাসহ (ভোয়া) দেশি-বিদেশি বিভিন্ন পত্রিকা ও সংবাদ সংস্থায় কাজ করেছেন। ১৯৮০-র এরশাদবিরোধী আন্দোলনের সময় ভয়েস অব আমেরিকায় তাঁর বস্তুনিষ্ঠ ও নির্ভরযোগ্য রিপোর্টের জন্য বাংলাদেশের মানুষ আকুল হয়ে থাকতেন। সর্বশেষ দৈনিক খবরপত্র পত্রিকার সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন তিনি।

তিনি লন্ডনে বাংলাদেশ হাইকমিশনের ইকোনমিক মিনিস্টারের দায়িত্ব পালন করেন।

সংগঠক

একাধিক মেয়াদে তিনি ডিইউজে (ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন), বিএফইউজে (বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়ন) ও জাতীয় প্রেস ক্লাবের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর সম্পর্কে কবি ও সাংবাদিক আবদুল হাই শিকদার লিখেছেন, ‘একটা সময় ছিল, গিয়াস কামাল চৌধুরীকে ছাড়া বাংলাদেশের চলত না। কথাটা শুনে অনেকে আড়চোখে তাকাবেন। তাতে আমার কিছু যায় আসে না। কারণ সভা-সেমিনার-সিম্পোজিয়ামে, মিছিলে, স্লোগানে গিয়াস কামাল ছিলেন অনিবার্য নাম। সাংবাদিকদের রুটি-রুজির সংগ্রামে গিয়াস কামাল ছিলেন প্রথম কাতারের নেতা। গণতন্ত্র, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা ও মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে তিনি রেখেছেন স্মরণযোগ্য ভূমিকা।’

কবি ও সাংবাদিক সাইফুল্লাহ মাহমুদ দুলাল তাঁর সম্পর্কে লিখেছেন, ‘১৯৯৬ সালে মে. জে. আনোয়ারুল কবীর তালুকদার আমাকে চাকরিচ্যুত করলে তার প্রতিবাদ করে আমাকে মানসিকভাবে খুব সাহায্য করেছিলেন। আরেকবার আমার প্রকাশনীর একটি বই নিয়ে মৌলবাদীরা আন্দোলনে নামলে, তা নিয়ে দৈনিক ইনকিলাবে প্রতিদিন প্রথম বা দ্বিতীয় পাতায় উস্কানিমূলক এবং প্রতিহিংসায় মিথ্যা খবর ছাপা হচ্ছিল। তা কিছুতেই বন্ধ করা যাচ্ছিল না। তাতে আমার জীবন প্রায় বিপন্ন হচ্ছিল। তখন গিয়াস কামাল চৌধুরী উদ্যোগ নিয়ে সম্পাদককে ফোন করে আমাকে বিপদ থেকে উদ্ধার করেন।’

বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে অংশগ্রহণসহ জাতীয় গণতান্ত্রিক ও পেশাজীবীদের অধিকার আদায়ের প্রতিটি আন্দোলনে তিনি অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন। সাম্রাজ্যবাদ ও আধিপত্যবাদবিরোধী জাতীয়তাবাদী ও দেশপ্রেমিক সাংবাদিক হিসেবে সাংবাদিক সমাজে শ্রদ্ধাভাজন ছিলেন। তিনি বাংলাদেশের মজলুম জননেতা মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানীর একনিষ্ঠ অনুসারী হিসেবে এ দেশের স্বার্থ রক্ষার জন্য আজীবন তাঁর কলম সচল রেখেছেন। কারাগারেও যেতে হয়েছে একাধিকবার।

ব্যক্তিগত জীবন

দুই মেয়ে ও এক ছেলের জনক গিয়াস কামাল চৌধুরী। তাঁর ছেলে রফিকুর মনির চৌধুরী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক।

অসুস্থতা ও মৃত্যু

১৯৯৩ সালে মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণজনিত কারণে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। উন্নত চিকিৎসার পরও সুস্থতা ফিরে পাননি। পরবর্তী সময়ে তিনি দুরারোগ্য পারকিনসন রোগে আক্রান্ত হন। ২০১১ সালে এ রোগ তাঁর স্মৃতিশক্তি ও স্বাভাবিক জীবনকে গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে। ২০১৩ সালের ৯ অক্টোবর হাসপাতালে ভর্তির পর থেকেই তাঁর ফুসফুসের অবস্থা ক্রমশ অবনতির দিকে যায়। বেশ কিছুদিন ধরেই গিয়াস কামালকে আইসিইউতে (নিবিড় পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র) কৃত্রিম শ্বাস-প্রশ্বাস দেওয়া হচ্ছিল। ২৬ অক্টোবর শনিবার ভোর সাড়ে ৫টার দিকে রাজধানীর ধানমন্ডিতে আনোয়ার খান মডার্ন হাসপাতালে মৃত্যু হয় তাঁর।

সম্মাননা

১৯৯২ সালে বাংলাদেশ সরকার তাঁকে সাংবাদিকতায় অবদানের জন্য সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় পুরস্কার একুশে পদক প্রদান করে।

(দিরিপোর্ট২৪/ওএস/ডব্লিউএস/এএস/এম/অক্টোবর ২৬, ২০১৩)