thereport24.com
ঢাকা, শনিবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ৭ আশ্বিন ১৪২৫,  ১১ মহররম ১৪৪০

বাংলাদেশে বিলুপ্তির পথে অসমিয়াদের ভাষা

২০১৬ ফেব্রুয়ারি ২০ ২০:০২:১০
বাংলাদেশে বিলুপ্তির পথে অসমিয়াদের ভাষা

কাওসার আজম (রাঙামাটি থেকে ফিরে) : বারো ফেব্রুয়ারি দুপুরে কাপ্তাই লেকের স্বচ্ছ পানিতে প্রায় দেড় ঘণ্টা নৌকাযাত্রার পর ‘‘অসমিয়া (আসাম) উন্নয়ন সংসদ, রাঙামাটি পার্বত্য জেলা’’-এর পারিবারিক বনভোজন দল পৌঁছে বালুখালি টিলায় (পিকনিক স্পট)। পার্বত্য রাঙামাটি, বান্দরবান ও খাগড়াছড়ি জেলায় বসবাসকারী আসামের বংশোদ্ভূত (অসমিয়) পরিবারের নারী-পুরুষ, শিশু-কিশোরসহ বিভিন্ন বয়সের মানুষ এই বনভোজনে শরিক হন। রাঙামাটি সৌন্দর্যমণ্ডিত বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় আয়তনের জেলা। পাহাড় কাটা রাস্তার সঙ্গে সুবিশাল কাপ্তাই লেকের ছোট-বড় অসংখ্য টিলা পর্যটকদের কাছে আকর্ষণীয় ব্যাপার। এদিন সকাল পৌনে ১১টার দিকে রাঙামাটি শহরস্থ আসামবস্তি বাজারের পাশের কাপ্তাই লেক থেকে ইঞ্জিন চালিত বনভোজনের দু’টি নৌকা যখন বালুখালি টিলার দিকে এগুচ্ছিল, তখন নৌকায় লাগানো মাইকে উচ্চ সুরে অসমিয়া ভাষার গান বাজছিল। গানের তালে তালে দুই নৌকার ছাদে নাচছিলেন শিশু-কিশোর ও যুবকরা। বড়দেরও কেউ কেউ নাচছিলেন তাদের সঙ্গে। ছাদের নিচে নৌকার ভেতরেও আনন্দের কমতি ছিল না।

নৌকার ছাদে যারা অসমিয়া ভাষার গানের সুরে হেলে দুলে নাচছিলেন, সে সব কিশোর-কিশোরীদের সঙ্গে বালুখালি পিকনিক স্পটে কথা হয় এই প্রতিবেদকের। তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল— তাদের পূর্বপুরুষদের ভাষা অসমিয়া হলেও তারা এ ভাষা জানে না। বাংলা মিশ্রিত অসমিয়া ভাষার কিঞ্চিত অংশ বুঝেই আনন্দে নৌকায় নেচেছেন। অনেকে আবার আবেগেই গানের সুরে নেচে আনন্দ করেছেন।

রাঙামাটির মাঝের বস্তির বাসিন্দা কলেজপড়ুয়া মুন্না আসাম দ্য রিপোর্ট টুয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আসলে আমরা অসমিয়া ভাষা জানি না। এটা পূর্বপুরুষদের ভাষা, তাই জানা দরকার।”

রাঙামাটি কলেজের একাদশ শ্রেণীর ছাত্রী প্রার্থনা আসাম বলেন, “সব জাতিরই নিজস্ব ভাষা থাকে। কিন্তু আমাদের অসমিয়া ভাষার কিছুই জানি না আমরা। আসামের টিভিতে এবং ইউটিউভে অসমিয়া ভাষার সিনেমা ও গান দেখি। কিন্তু বাস্তবে অসমিয়া ভাষার চর্চা নেই। আমরা আমাদের পূর্বপুরুষদের এ ভাষা শিখতে চাই।”

একই কথা বলেন, একাদশ শ্রেণীর আরেক ছাত্রী টিনা আসাম। তিনি বলেন, “অসমিয় ভাষা-সংস্কৃতি অনেক সুন্দর। অসমিয়া ভাষার বহু নাচ ও গান খুব ভাল লাগে। ওরা (অসমিয়া) এত সুন্দর গান করে, নাচগুলো এত সুন্দর যে, তা শিখতে ইচ্ছে করে। আমাদের গুরুজনরা যারা আছেন, তারা তো এটা শেখাননি। তাহলে আমরা কীভাবে তা শিখব-জানব।”

শুধু যে শিশু-কিশোর বা তরুণ-তরুণীরাই অসমিয় ভাষা জানে না— তাই নয়, বড়দেরও কেউই শতভাগ এই ভাষা জানেন না। আসামের বংশোদ্ভূত বেশিরভাগ অসমিয়াই তাদের পূর্বপুরুষদের ভাষা ও সংস্কৃতি ভুলে গেছেন।

আসামবস্তির বাসিন্দা নিহার আসাম দ্য রিপোর্টকে বলেন, “আমাদের নিজস্ব ভাষা ও সংস্কৃতি রয়েছে। কিন্তু এর চর্চা না থাকায় তা ভুলতে বসেছি। আমরা যে বাঙালি নই, আমরা যে আলাদা একটি জাতি তা ভুলতে বসেছি। আমাদের কৃষ্টি-কালচার হারাতে বসেছি। আমরা নিজেরাও শতকরা ২০-৩০ ভাগ অসমিয়া ভাষা জানি না। এভাবে চলতে থাকলে তো আমাদের নতুনপ্রজন্ম তাদের পূর্বপুরুষদের কৃষ্টি-কালচার ভুলেই যাবে। আর এ কারণেই তিন জেলার অসমিয়াদের নিয়ে আমাদের এই বনভোজন। অনেক দিন আগে আমরা তিন জেলার অসমিয়ারা মিলে ‘অসমিয়া উন্নয়ন সংসদ’ গঠন করেছি। আমরা এখানে এসেছি নিজেদের সমস্যা ও সুখ-দুঃখগুলো শেয়ার করার জন্য।”

পিকনিকে খাগড়াছড়ি থেকে অংশ নেওয়া স্কুলশিক্ষক বিজয় আসাম দ্য রিপোর্টকে বলেন, “ব্রিটিশ আমলে আমাদের পূর্বপুরুষরা যোদ্ধা হিসেবে পার্বত্য এলাকায় বিশেষ সম্মানের ছিলেন। তাদের উত্তরসূরি আমরা আজ অবহেলিত। কারণ, আমরা আমাদের নিজস্ব ভাষা ও কৃষ্টি-কালচার ভুলতে বসেছি। আমরা অন্যদের সঙ্গে আস্তে আস্তে মিশে যাচ্ছি।”

তিনি বলেন, “এই ধরেন আমি অসমিয়া। কিন্তু বিয়ে করেছি অন্য জাতিতে। আমার মতো আরও অনেকেই রয়েছেন যারা অসমিয়া হয়েও নিজ জাতি-সত্তার মধ্যে বিয়ে-শাদি না করায় অন্য জাতির সঙ্গে মিশে যাচ্ছি। এটা সেই অনেক আগে থেকেই হয়ে আসছে।”

একই কথা বলেন, অনিল কুমার আসামও। তিনি তথ্য মন্ত্রণালয়ের স্থানীয় কর্মকর্তা।

বালুখালি টিলায় বনভোজনের উদ্দেশ্য নিয়ে কথা বলছিলেন অসমিয়া উন্নয়ন সংসদ-এর সাধারণ সম্পাদক পঙ্কজ আসাম। অসমিয়াদের ভাষা ও কৃষ্টি-কালচার ম্লান হওয়ার জন্য অন্য জাতির মধ্যে বিয়ে-শাদি করা বা দেওয়াকে দায়ী করেন তিনি।

এ সময় সেখানে উপস্থিতদের মধ্য থেকে তাকে বলা হয়, এটা ঠিক। কিন্তু সেটা যেন আপনাকে দিয়ে শুরু হয়। আপনার মেয়েকে যেন অন্য জাতির মধ্যে বিয়ে না দেন।

পঙ্কজ আসাম এ সময় সবাইকে কথা দেন, তার মেয়েকে অন্য জাতির মধ্যে বিয়ে দেবেন না।

বনভোজনে যাওয়া আসাম বংশোদ্ভূত ছোট বড় কমপক্ষে ১০-১২ জনের সঙ্গে কথা হয় এই প্রতিবেদকের। এদের মধ্যে দুয়েকজন অসমিয়া ভাষায় কিঞ্চিত কথা বলতে পারেন বলে জানান। তারা বলেন, “বংশপরাম্পরায় বিগত বছরগুলোতে আমাদের পূর্বসূরিরা আলাদা জাতিগোষ্ঠী হিসেবে অসমিয়া ভাষা ও সংস্কৃতিকে রক্ষা করতে পারেননি। আমরাও সেভাবে পারছি না। তাই হারিয়ে যাওয়া অসমিয়া কৃষ্টি-কালচার ধরে রাখতে বাংলাদেশ সরকারের সহযোগিতা প্রয়োজন। তেমনি ভারতের আসাম সরকারের সঙ্গে যদি আমাদের ভাব-বিনিময় হয়, সংস্কৃতির সমন্বয় সম্ভব হয় তাহলে প্রায় ম্রিয়মাণ আমাদের অসমিয়া ভাষা ও সংস্কৃতি রক্ষা করা সম্ভব।”

তিন পার্বত্য জেলায় বসবাসকারী আসামের বংশোদ্ভূতদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তাদের অধিকাংশ বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান ও সনাতন ধর্মাবলম্বী। বছরের পর বছর ধরে পাহাড়ি অঞ্চলে বসবাস করছেন। পাহাড়ের বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠী বিশেষ করে বাঙালিদের সঙ্গে মিশতে মিশতে তাদের স্বতন্ত্র ভাষা ও সংস্কৃতিও মিশে গেছে। এক কথায় এসব অসমিয়দের পূর্বপুরুষদের ভাষা ও সংস্কৃতি বাঙালি ও পাহাড়ের বিভিন্ন উপজাতিদের ভাষা ও সংস্কৃতির সঙ্গে বিলীন হয়ে গেছে। তাই বিলীন হয়ে যাওয়া পূর্বপুরুষদের ভাষা ও সংস্কৃতি উদ্ধারে তিন পার্বত্য জেলার অসমিয়াদের এই নতুন উদ্যোগ বলে জানান তারা।

এ ব্যাপারে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (উন্নয়ন) মো. শামসুজ্জামান দ্য রিপোর্টকে প্রথমে বলেন, “অসমিয়ারা এখানে এসেছেন এবং তাদের নিজস্ব ভাষা আছে বলে জানা নেই।”

রাঙামাটিতে আসামবস্তিসহ পার্বত্য তিন জেলায় প্রায় দুই শ’ আসাম বংশোদ্ভূত পরিবার আছে এবং তাদের সঙ্গে এই প্রতিবেদকের কথা হয়েছে জানালে শামসুজ্জামান বলেন, “আমার জানামতে রাঙামাটিতে আসামবস্তি নামে একটি এলাকা আছে। তবে সেখানে বসবাসকারীরা যে আসাম বংশোদ্ভূত তা জানা নেই। হতে পারে তারা এখন মেইনস্ট্রিমের সঙ্গে মিশে বাংলা ভাষাভাষি হয়ে গেছে।”

তিনি আরও বলেন, ‘পার্বত্যাঞ্চলে চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা ছাড়াও আমাদের অনেক ক্ষৃদ্র নৃ-গোষ্ঠী আছে। তাদেরই তো নিজস্ব ভাষা হারানোর পথে। যেহেতু তাদের (উপজাতি) নিজস্ব (ভাষার) লেখনি নেই, তাই অন্যান্য জাতিগোষ্ঠীর সঙ্গে মিশতে মিশতে তারা আস্তে আস্তে মিলিয়ে যাচ্ছে। আর ওরা তো (অসমিয়া) উপজাতিই নয়। পুরোপুরি বাঙালি সেটেলার।”

“হতে পারে তারা এখন বাঙালিদের সঙ্গে মিশে বাংলা ভাষাভাষি হয়ে গেছেন। এই জনগোষ্ঠীকে কেন্দ্র করে পার্বত্য চট্টগ্রাম মন্ত্রণালয়ের বিশেষ কোনো প্রজেক্ট বা উদ্যোগ নেই”— যোগ করেন এই অতিরিক্ত সচিব।

(দ্য রিপোর্ট/কেএ/এসআর/সা/ফেব্রুয়ারি ২০, ২০১৬)

পাঠকের মতামত:

SMS Alert

বিশেষ সংবাদ এর সর্বশেষ খবর

বিশেষ সংবাদ - এর সব খবর



রে