thereport24.com
ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১৪ ডিসেম্বর ২০১৭, ৩০ অগ্রহায়ণ ১৪২৪,  ২৫ রবিউল আউয়াল ১৪৩৯
ফকির মুহম্মদ শওকত আলী

যুদ্ধে যাইবেন কবি

২০১৭ অক্টোবর ১২ ০১:২৩:৩৭
যুদ্ধে যাইবেন কবি

ষোড়শ শতকের আরাকান রাজসভার মহাকবি আলাউল, কোরেশী মাগন ঠাকুর, শাহ মোহাম্মদ সগীর, সৈয়দ সুলতান, তাহাদের কালজয়ী সৃষ্টি পদ্মাবতী,ইউসুফ জুলেখা,ছইফুল মূলকসহ মধ্যযুগীয় আরাকানী বাংলা সাহিত্যের অসংখ্য সম্পদ আমাদের সামনে যে ছবি হাজির করে তাহাতে ইতিহাসের ধার না ধারিয়াও নিশ্চিতভাবেই বলা যায়, আরাকান রাজ্য আসলে মধ্যযুগীয় বাংলারই এক আঞ্চলিক সংষ্করণ বা স্বশাসিত এক খন্ড বাঙলা। সুলতানী ও মোঘল আমলে বাংলা মূলুকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্য চর্চার যে অনুকূল পরিবেশ ও সুযোগ সৃষ্টি হয়, আরাকান রাজাদের আনুকূল্যে তাহার উৎকর্ষতা ঘটে। আরাকান রাজ দরবার, সেই রাজ্যের আর্থ সামাজিক বাস্তবতা বাঙলা ভাষা-সাহিত্যকে এক অনন্য উচ্চতায় পৌছাইয়া দেয়।

নাফ নদের নীল-দরিয়া সঙ্গমের অপরূপ লীলাভূমি, দুই পাড়ের পাহাড় বনভূমির অপরূপ প্রাকৃতিক বৈচিত্র ও বৈশিষ্ট, জনজাতি ভাষা সংস্কৃতির মিলন ভূমি সেদিনের আরাকান আজ বিভক্ত। রাজনৈতিক টানাপোড়েন, যুদ্ধ-বিগ্রহ ও দখল দারিত্বের কারণে যাহার পূর্বাংশের আংশিক আজকের মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য। যেইখানে আরাকানী বা রোহিঙা বা বাঙালী জনজাতির বিরুদ্ধে বার্মিজ সেনাবাহিনী, জঙ্গী বৌদ্ধ,মগদের পোড়ামাটিনীতিতে লাখ লাখ ইনসান আজ স্বজনহারা,আশ্রয়হারা। জান বাঁচাইতে তাহারা নাফসঙ্গম পার হইয়া এইপারে পাড়ি জমাইতেছেন। আলাউল যুগীয় সেই আরাকানী বাঙ্গালীরা কালের বিবর্তনে এখন রোহিঙ্গা নামে পরিচিত। নাম যাহাই হউক, বাঙলাদেশের মানুষকে তাহারা স্বজাতিই মনে করে।

আজ বাঙালী জাতির রোহিঙ্গা সত্তাকে নির্মূল করিবার বর্মীয় নৃশংসতা দেখিয়া মহাকবি আলাউলের উত্তরসূরী সত্তরোর্দ্ধ বাঙ্গালী কবি নির্মলেন্দু গুন যারপর নাই ব্যথিত, ক্ষুব্ধ। তাই এই বয়সেও কবি বার্মার বিরুদ্ধে যুদ্ধে যাইবার অভিপ্রায় ব্যক্ত করিয়াছেন। কবির এই অভিপ্রায় দেখিয়া মনে পড়িয়া যায় জাতিসত্তার কবি হিসাবে খ্যাত কবি মুহম্মদ নুরুল হুদার ঐতিহাসিক চরণ ‘যতদূর বাঙলা ভাষা ততদূর বাঙলাদেশ’।

এখন প্রশ্ন হইল, কবির এই অভিপ্রায়কে আমরা কিভাবে দেখিব। ইহা কি তাৎক্ষনিক কোন উত্তেজনা নাকি ইহার মধ্যে রহিয়াছে নিজ জাতিসত্তা টিকাইয়া রাখিবার বা বিকাশের এক ঐতিহাসিক দায়বদ্ধতার ইঙ্গিত।

কবির যুদ্ধে যাইবার অভিপ্রায়কে রাজনৈতিক অরাজনৈতিক কোন মহল আমলে নিয়াছেন বলিয়া নজরে আসে নাই। হয়ত হেয়ালী মনে করিয়াছেন কবির ভক্তকুলও। তাই কবির অভিপ্রায় লইয়া যেখানে ঝড় উঠিবার কথা সেখানে বিষয়টি আলোচনায়ও নাই।

এইবারের রোহিঙ্গা সমস্যা শুরুর পর হইতে আজ পর্যন্ত নাফ নদ দিয়া অনেক পানি গড়াইয়া বঙ্গোপসাগরে পড়িয়াছে। একই সাথে কলের সাম্পানে চাপিয়া লাখ লাখ রোহিঙ্গা পাড়ি দিয়াছে এই পারে। ইহাদের অনেকে দরিয়ায় ডুবিয়া মরিয়াছে। স্থলপথে যাহারা আসিতেছে তাহাদের অনেকে মরিতেছে বার্মিজ সেনাবাহিনীর পুতিয়া রাখা স্থল মাইন বিষ্ফোরনে। কিন্তু শরণার্থী আসিবার ধারা থামিয়া নাই।

১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের সময় আরাকানীরা পাকিস্তানের সাথে অর্থাৎ পূর্ব বাংলা বা পূর্ব পাকিস্তানের সাথে থাকিতে চাহিয়াছিল কিন্তু পাকিস্তানের জনক মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ রাজী না হওয়ায় তাহাদের ভাগ্য আবারও অনিশ্চিত হইয়া পড়ে। ১৯৪৮ সনে বৃটিশ শাসন হইতে স্বাধীনতা লাভের সময় আরাকানের ভাগ্য চির বৈরী বার্মার ইচ্ছাধীন হইয়া পড়ে। আরাকান রাজ্যের মর্যাদায় বার্মার অন্তর্ভূক্ত থাকিয়া যায়। সেই হইতে গত কয়েক দশক ধরিয়া বার্মিজ সরকার,বৌদ্ধ সম্প্রদায় বা মগদের রোহিঙ্গা বিতাড়নে ইতিমধ্যে আরাকানের আদি বসতিরা-সম্প্রদায় হিসাবে বেশীর ভাগ মুসলমান, জাতি হিসাবে আদিতে বাঙ্গালী,অধুনা রোহিঙ্গা-সেখানে এখন একচেটিয়া সংখ্যা গুরুত্ব হারাইয়াছে। কমবেশী ২১ হাজার বর্গমাইলের আরাকান রাজ্যটি কাটছাট করিয়া ১৪ হাজার বর্গ মাইলে নামানো হইয়াছে। বার্মিজকরন করিবার জন্য আরাকান নাম পাল্টাইয়া করা হইয়াছে রাখাইন। বার্মা বা মিয়ানমারের মূলভূখন্ড হইতে আনা বা আগত বৌদ্ধ বার্মিজ বা মগরা এখন সেইখানে সংখ্যাগুরু। সরকারী আনুকুল্যে তাহারা এখন এই জনপদে জাকিয়া বসিয়াছে। সেনাবাহিনীর প্রত্যক্ষ মদদে তাহারা কোনঠাসা করিয়াছে রোহিঙ্গাদের। নাগরিকত্ব কাড়িয়া লওয়া হইয়াছে বা হইতেছে। অধিকার বলিতে তাহাদের আর তেমন কিছু নাই। স্বভূমে পরবাসী হইয়া রোহিঙ্গারা কোন রকম টিকিয়া থাকিবার চেষ্টা করিয়া যাইতেছেন মাত্র।

লাগাতার নিপীড়ন নির্যাতনে সুস্থভাবে বাঁচিয়া থাকিতে না পারিয়া অনেকে হয়ত চরমপন্থার কথাও ভাবিতে পারেন। কিন্তু লড়াই করিয়া টিকিয়া থাকিবার বা যুদ্ধ করিবার মত যথেষ্ট বাস্তবতা রোহিঙ্গাদের নাই বিধায় দেশ ত্যাগ করিয়া নিরাপদ আশ্রয় খোঁজাই তাহাদের নিয়তি হইয়া দাড়াইয়াছে। গরীব,মজলুমের দোষের কোন শেষ নাই। সেই হিসাবে বার্মা বা হালের মিয়ানমার তাহাদের বিরুদ্ধে পাহাড় প্রমান অভিযোগ আনিবার পারে।

মোদ্দা কথা হইল গত কয়েক দশক ধরিয়া বার্মিজরা আরাকানে যাহা করিয়া চলিয়াছে তাহার মানবতার অংশ লইয়াই বিশ্ব সম্প্রদায় কিঞ্চিৎ কথা বলিতেছে। আমাদের দেশের অবস্থানও অনেকটা তাই। কিন্তু ইহা নিছক মানবতার বা মানবাধিকারের কোন বিষয় নয়, একান্তই রাজনৈতিক, যুগযুগ ধরিয়া বিশেষ করিয়া আধুনিক জামানায় আসিয়া সেই অংশই আড়ালে রহিয়া যাইতেছে বা আড়াল করা হইতেছে। আশ্রয় দিয়া, সাহায্য দিয়া এই সমস্যা সমাধানের নয়। সমস্যাটি রাজনীতি হইতে উদ্ভুত, রাজনৈতিক ভাবেই সমাধান করিতে হইবে।

ভারতবর্ষে বাঙালীরাই একটি জাতিরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করিয়াছে। এই রাষ্ট্রের বাহিরেও অনেক বাঙালী বসবাস করিতেছে। তাহাদের ভিন্ন ভিন্ন রাষ্ট্রীয় পরিচয় রহিয়াছে বা থাকিতে পারে। ইহা তাহাদের স্বাধীন ইচ্ছামাফিক। নিজ রাষ্ট্র কাঠামোর মধ্যে তাহাদের সাফল্যে আমরা আনন্দিত হই, গর্ববোধ করি। কিন্তু তাহারা যদি জাতিসত্তা লইয়া বিপদগ্রস্থ হয়, অপমানিত হয় তাহা হইলে আমাদের হৃদয় নিশ্চয় ব্যথিত হইবে, কাঁদিবে। দায়ও বর্তাইবে।

ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়,মগ বা অন্য বহিরাগতদের আক্রমণ হইতে আরাকান রাজ্য রক্ষা করিতে সুলতানী, মোঘল, এমন কি বৃটিশ আমলেও এই অঞ্চলের সেনারা বারবার আগাইয়া গিয়াছে। আমাদের পূর্ব পুরুষদের বহু রক্ত ঝরিয়াছে আরাকানের মাটিতে। শুধু জাতিসত্তার একত্ব বা নৈকট্যের বিচারে নহে আরাকানের সাথে বাঙলার সম্পর্ক বহুপক্ষীয়,অবিভাজ্য।

যে আরাকান অঞ্চলকে আত্মস্থ করিতে বার্মিজদের নৃশংসতা, ভৌগলিকভাবে তা দুর্গম আরাকানিয়াম-পেগুয়াম পাহাড় দিয়া বার্মা হইতে বিভক্ত। তাই আরাকানী জাতি গঠনে বার্মিজ মঙ্গলয়েড জাতিসত্তার তেমন কোন প্রভাব পড়িতে পারে নাই। বিপরীতে ভূ-ভাগটি স্থল ও নৌপথে বাঙলার সাথে নিবিড় বন্ধনে আবদ্ধ, তাই এখানকার জাতি গঠনের কাজটিও বাঙলার মূল ভূ-ভাগের সাথে একই প্রক্রিয়ায় ঘটিয়াছে। সময়ের বিবর্তনে আলাদা রাজনৈতিক পরিচয় ঘটিলেও নৃতাত্বিক, ধর্মীয় বা সাংস্কৃতিক দিক দিয়া রোহিঙ্গা বাঙ্গালী আলাদা করা যায় না। বিপদে পড়িলে তাই তাহারা বারবার স্বজনদের কাছে ছুটিয়া আসে। তাহাদের সাহায্য চায়।

আরাকানে আধিপত্য বিস্তার করিতে জবর দখল ও জাতিগত বিলুপ্তির পথ ধরিয়াছে বার্মিজ বা মগরা। ইহার বড় ধাক্কাটি বরাবরের মত এবারও লাগিয়াছে বাংলাদেশের উপর। করণীয় কী হইবে তাহা রাষ্ট্রই ঠিক করিবে। কিন্তু কবি নির্মলেন্দু গুনের অভিপ্রায়টি যে নিছক হেয়ালী নহে, ইতিহাসেরই এক অনিবার্য দায় তাহা অস্বীকার করা যাইবে না।

লেখক : সাংবাদিক

পাঠকের মতামত:

SMS Alert

সংবাদ পর্যালোচনা এর সর্বশেষ খবর

সংবাদ পর্যালোচনা - এর সব খবর



রে